,



বন্যাদুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্কঃ  যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় দেশের উত্তর অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। যমুনা নদীর বাহাদুরাবাদ, নলীন, সারিয়াকান্দি, কাজীপুর ও সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ১২ থেকে ৩৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে সিরাজগঞ্জের পাঁচ উপজেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। অধিকাংশ পাকা-কাঁচা সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কুড়িগ্রামের ২০টি ইউনিয়নের দেড় শতাধিক গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ভেঙে পড়েছে গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা। খাদ্য ও বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকটে পড়েছে বানভাসীরা। গাইবান্ধার চরাঞ্চলের নিম্নাঞ্চলগুলো প্লাবিত হয়ে পড়েছে। পানি বৃদ্ধির ফলে ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এলাকায় বসবাসরতদের মাঝে বাড়ছে আতঙ্ক। বগুড়ার সারিয়াকান্দি ও ধুনট উপজেলার চারটি ইউনিয়নের কমপক্ষে ৫ হাজার পরিবার ও টাঙ্গাইলের ভুয়াপুর ও গোপালপুর উপজেলার চারটি ইউনিয়নের অন্তত ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। হুমকিতে পড়েছে টাঙ্গাইল-তারাকান্দি সড়ক। এদিকে সিলেট ও মৌলভীবাজারের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও উন্নতি হয়েছে। তবে পানি কমলেও দুর্ভোগ কমছে না দুর্গত মানুষের। মৌলভীবাজারের রাজনগরে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দুই দিনের ব্যবধানে একই পরিবারের ২ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পানিবন্দি গ্রামগুলোয় ভাইরাস জ্বর দেখা দিয়েছে। ব্যুরো ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর—

সিরাজগঞ্জ : যমুনা নদীর তীরবর্তী কাজীপুর, শাহজাদপুর, বেলকুচি, চৌহালী ও সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ২৯টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল বন্যার পানিতে সয়লাব। সেই সঙ্গে আরও নতুন নতুন অঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। নিচু এলাকার অনেক পরিবার স্থানীয় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিচ্ছেন। স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ ইমাম হাসান জানান, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ২-১টি স্থানে হুমকির উপক্রম হলেও সেখানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু ক্যান্টনমেন্টের একটি বিশেষজ্ঞ দল শনিবার দুপুরে সিরাজগঞ্জ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের খোকশাবাড়ী এলাকা পরিদর্শন করেছে। সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক কামরুন নাহার সিদ্দীকা জানান, জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে শুক্রবার রাতে জেলা বন্যা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।

কুড়িগ্রাম : ব্রহ্মপুত্র ও ধরলা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। বন্যার পানি প্রবেশ করছে নতুন নতুন এলাকায়। পানিতে তলিয়ে গেছে চিলমারী, উলিপুর, রৌমারী, রাজিবপুর ও সদর উপজেলার ২০টি ইউনিয়নের নদনদী ও তীরবর্তী চর।  এসব এলাকার দেড় শতাধিক গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। কাঁচা সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। খাদ্য ও বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকটে পড়েছে অনেকেই। গবাদি পশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন বন্যা কবলিতরা। বন্যা কবলিত এলাকাগুলোতে এখনও কোনো সরকারি বেসরকারি ত্রাণ তৎপরতা শুরু হয়নি। কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খান জানান, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য মেডিকেল টিমসহ সবরকমের প্রস্তুতি নেয়া আছে।

বগুড়া : পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপসহকারী প্রকৌশলী হারুনুর রশিদ জানান, ধুনটের সহড়াবাড়ী ঘাট পয়েন্টে ও সারিয়াকান্দি উপজেলায় বিপদসীমার ২৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে যমুনার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। অব্যাহত রয়েছে পানি বৃদ্ধি। সারিয়াকান্দি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সরোয়ার আলম জানান, উপজেলার চন্দনবাইশা, কামালপুর ও কুতুবপুর ইউনিয়নের ১০টি গ্রামের প্রায় আড়াই হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যাদুর্গত এলাকায় শনিবার স্থানীয় সংসদ সদস্য আবদুল মান্নান ১০০০ পরিবারকে ২০ কেজি চাল ত্রাণ হিসেবে দিয়েছেন। এছাড়াও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি কাজলা ইউনিয়নে ১৪৪টি পরিবারকে ৫ হাজার করে টাকা অনুদান দিয়েছে। ধুনটের ভাণ্ডারবাড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বেলাল হোসেন জানান, নতুন করে আরও ৫০০সহ মোট আড়াই হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পানিবন্দি অনেক পরিবার এরই মধ্যে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন। খাদ্য ও বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকটে পড়েছেন তারা।

গাইবান্ধা : উজানের নেমে আসা ঢল এবং চার দিনের বর্ষণের কারণে গাইবান্ধায় বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ফলে অব্যাহতভাবে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় চরাঞ্চলের নিম্নাঞ্চলগুলো প্লাাবিত হয়ে পড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্রের পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ১২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া তিস্তা, করতোয়া এবং ঘাঘট নদীর পানি বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। এদিকে বন্যার পানি বৃদ্ধির ফলে ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এলাকায় বসবাসরত মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। এছাড়া বাঁধের ১৫টি পয়েন্ট অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। যে কোনো সময় বাঁধের দুর্বল অংশগুলো পানির চাপে ভেঙে যেতে পারে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের গাইবান্ধা অংশে ৭৮ কিলোমিটার বাঁধ রয়েছে। গোটা বাঁধটির এখন জরাজীর্ণ অবস্থা। জেলা প্রশাসক গৌতম চন্দ্র পাল সদর উপজেলার কামারজানি থেকে সাঘাটা উপজেলা পর্যন্ত বিস্তৃত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং বন্যাকবলিত এলাকা শনিবার পরিদর্শন করেছেন। এখন পর্যন্ত কোনো ত্রাণ তৎপরতা শুরু হয়নি।

টাঙ্গাইল : যমুনার পানি টাঙ্গাইলের নলীন পয়েন্টে বিপদসীমার ১৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধির কারণে ভূঞাপুর উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন ও গোপালপুর উপজেলার একটি ইউনিয়নের অন্তত ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। তারা খাদ্য ও বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকটে পড়েছেন। অর্জুনা ইউনিয়নের অর্জুনা এলাকায় তীব্র ভাঙন শুরু হওয়ায় হুমকির মধ্যে পড়েছে টাঙ্গাইল-তারাকান্দি সড়ক। এছাড়া নতুন করে ভাঙন আতঙ্কে রয়েছে শতাধিক গ্রাম, স্কুল, মাদরাসা, কলেজ, হাট-বাজার, মন্দির, মসজিদ, পোলট্রি খামার ও রাস্তাঘাট।

জামালপুর : বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় যমুনার পানি ১২ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ৩৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলায় ৭৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তলিয়ে গেছে ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জের চুকাইবাড়ী, মাদারগঞ্জ ও সরিষাবাড়ী উপজেলার নিম্নœাঞ্চলের বসতভিটা, ফসলি জমি, রাস্তাঘাট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বন্যার্তরা উঁচু রাস্তা, আশ্রয় কেন্দ্রসহ বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। নেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা ও ত্রাণ সামগ্রী। দেখা দিয়েছে নানা ধরনের পানিবাহিত রোগ। বন্যাকবলিত এলাকায় এখনও কোনো ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছেনি বলে বানভাসি মানুষের অভিযোগ ।

ইসলামপুর : জামালপুরের ইসলামপুরে শনিবার নতুন করে আরও বেশ কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। উপজেলার পাথর্শী, কুলকান্দি, সাপধরী, বেলগাছা, চিনাডুলী ও নোয়াপাড়া ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতি নাজুক আকার ধারণ করেছে। ইসলামপুর-গুঠাইল রাস্তার বানিয়াপাড়া গ্রামের কিছু অংশ তলিয়ে গেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ বি এম এহছানুল মামুন জানান, বানভাসিদের জন্য জামালপুর জেলা প্রশাসন নতুন করে ১০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দিয়েছে। এ পর্যন্ত সরকারিভাবে ৬টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। ইসলামপুর উপজেলার সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে।

সিলেট : নদীর পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে প্লাবিত বিভিন্ন এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করেছে। তবে সুরমা ও কুশিয়ারার তিনটি পয়েন্টে এখনও বিপদসীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এ কারণে বন্যাকবলিত উঁচু এলাকার পানি নেমে গেলেও নিম্নাঞ্চলের পানি নামছে ধীরে ধীরে। সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে পাওয়া তথ্য মতে, শনিবার কানাইঘাটে সুরমা বিপদসীমার ৪৬ সেন্টিমিটার, শেওলায় কুশিয়ারা বিপদসীমার ৬৪ সেন্টিমিটার, অমলসীদে কুশিয়ারা বিপদসীমার ৬৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে শনিবার ফেঞ্চুগঞ্জের ১ নং ইউনিয়নে বিশেষ বরাদ্দের ত্রাণ বিতরণ করা হয়। জেলা ও ত্রাণ পুনর্বাসন কর্মকর্তা মুফজেলুর রহমান মজুমদার জানান, পরিস্থিতি ক্রমেই উন্নতি হচ্ছে। সরকারিভাবে বিভিন্ন উপজেলায় ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে।

মৌলভীবাজার : স্থানীয় লোকজন জানান, সোমবার রাতে রাজনগর উপজেলার আমিরপুর গ্রামের রুকু উদ্দিনের মেয়ে তামান্না আখতার  এক সপ্তাহ জ্বরে ভোগে মৃত্যুবরণ করে। এর দুই দিন পর ৫ জুলাই  একই পরিবারের কুটি মিয়ার মেয়ে রুমা বেগম জ্বরে আক্রান্ত হয়ে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মারা যায়। ওই গ্রামের অর্ধশত পরিবারের শতাধিক নারী-শিশু, পুরুষ জ্বরাক্রান্ত হয়েছেন বলে জানান। এ গ্রামের লোকজন পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট পায়নি। এদের অধিকাংশই হাওরের পানি ব্যবহার করছেন। এদিকে উত্তরভাগ ইউনিয়নের কামালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশ্রয় কেন্দ্রেও নারী-শিশুরা জ্বরাক্রান্ত হয়ে পড়েছে। কামালপুর, আমিরপুর, রক্তা, আমনপুর, সুরিখাল, কেশরপাড়া, ফতেহপুর, অন্তেহরি, বাঘমারা, কেউলা, ধুলিজুড়াসহ পানিবন্দি গ্রামগুলোয় ভাইরাস জ্বর দেখা দিয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, রাজনগর উপজেলার বন্যাপ্রবণ এলাকায় ৫টি মেডিকেল টিম কাজ করছে। রোগীদের তাৎক্ষণিক প্যারাসিটামল, স্যালাইনসহ প্রয়োজনীয় ওষুধ দেয়া হচ্ছে।

এদিকে  হাকালুকি হাওরতীরের কুলাউড়া উপজেলার বন্যাকবলিত এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে পানিবাহিত রোগ। কুলাউড়া হাসপাতালে গত এক সপ্তাহে ৫৭ জন রোগী ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে। অবশ্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, হাওর এলাকায় মেডিকেল টিমের পাশাপাশি একটি মোবাইল মেডিকেল টিমও কাজ করছে। ভর্তি হওয়া ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা স্বাভাবিক। মৌলভীবাজার সিভিল সার্জন অফিস থেকে বন্যাকালীন করণীয় ও সতর্কবাণী সংবলিত একটি প্রচারপত্র হাওর এলাকায় বিলি করা হচ্ছে। তাছাড়া বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের জন্য মোবাইল ফোনে জরুরি ব্যবস্থাপত্র প্রদানের লক্ষ্যে একটি মোবাইল নম্বর সার্বক্ষণিক চালু রাখা হয়েছে। যার নং ০১৭৩০-৩২ ৪৭ ৩৭। সিভিল সার্জন সত্যকাম চক্রবর্তী জানান, বন্যাকবলিত ৪ উপজেলার জন্য ৬৭টি মেডিকেল টিম কাজ করছে। মজুদ রয়েছে পর্যাপ্ত ওষুধ।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর