,



অভিজাত এলাকায় রাতের দাওয়াতে তরুণীদের যেতে ভাবতেই হবে

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ  গত কয়েকমাসে এমনি কিছু অনকাঙ্খিত ঘটন ঘটে গেছে, যার ফলে রাজধানীতে রাতের বেলায় চলাফেরা বা কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে  চাপা ভয়-ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই রাতের বেলায় অনুষ্ঠান বা  কেনাকেটা এড়িয়ে চলছেন, এমনকি বিশেষ প্রয়োজন বাইরে বের হতে চাইছেন না।

তিন মাস আগে অভিজাত এলাকা বনানীর  এক হোটেলে জন্মদিনের অনুষ্ঠানে ডেকে নিয়ে দুই তরুণীকে ধর্ষণ করেন আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে শাফাত আহমেদসহ তার সহযোগীরা। এরপর আবারও গত বুধবার জন্মদিনের অনুষ্ঠানের কথা বলে নিজ বাসায় ডেকে এনে দেশের আরেক ব্যবসায়ীর পুত্র বাহাউদ্দিন ইভান এক তরুণীকে ধর্ষণ করেন। পরপর এ দুটি ঘটনা দেশে যেমন চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে একইভাবে এসব অভিজাত এলাকার অনুষ্ঠানে মেয়েদের যাওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা মেনে চলার পাশাপাশি এ ব্যাপারে অভিভাবকদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। আর বনানীর ঘটনাগুলোকে তারা সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের ‘আউটকাম’ হিসেবে মন্তব্য করেন।

এধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে এখনই পদক্ষেপ নেয়া জরুরী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তার বলছেন,  আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও প্রাথমিক পর্যায় থেকে নৈতিকতা বিষয়ে শিক্ষা দেয়া
হলে এধরনের ঘটনা কমে যাবে। পাশাপাশি প্রতিটি মেয়েকে ত্মরক্ষার বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। প্রয়োজনে প্রশিক্ষণ নিতে হবে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় এ ধরনের ঘটনা ঘটছে সেখানে সন্তানদের যাতায়াতের ব্যাপারে অভিভাবকদের নজরদারি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

একাধিক সূত্রের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, রাজধানীর মেয়েদের বিভিন্ন হোস্টেলে ঢাকার বাইরে থেকে যেসব মেয়েরা পড়ালেখা বা কাজ করতে আসছে তাদের বিভিন্নভাবে ফুঁসলিয়ে হোস্টেলের সিনিয়র মেয়েরা বিভিন্ন পার্টিতে নিয়ে অবৈধ কাজ করতে বাধ্য করছে। এক্ষেত্রে সেসব সহজ-সরল মেয়েদের ব্ল্যাকমেইল করে তারা নিজেরা লাভবান হচ্ছে। এ জন্য এসব হোস্টেল ও স্কুল-কলেজগুলোতে এ ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। আর মেয়েদের মধ্যে যারা প্রাপ্তবয়স্ক, কোনো ধরনের পার্টিতে যাওয়া অনিরাপদ এ বিষয়েও তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

সাম্প্রতিক সময়ের অনাকাঙ্খিত ঘটনা বিশ্লেষণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা বলেন, বনানীর ঘটনাগুলো সমাজের জন্য খুবই উদ্বেগজনক। পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় খারাপ ও ভালো দুই ধরনের উপাদান থাকে। আমরা এখন যে সমাজ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি সেখানে রক্ষণশীল চিন্তা-ভাবনা যেমন আছে আবার খুব আধুনিক চিন্তা-ভাবনাও কাজ করছে। আর এই দুটি বিপরীতমুখী চিন্তা-ভাবনার জন্য সমাজে এক ধরনের নৈতিক অবক্ষয় সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় আমাদের নৈতিক অবক্ষয়, মূল্যবোধ, ভয়, লজ্জা এই বিষয়গুলো চরমভাবে ধ্বংস হচ্ছে। ধনী পরিবারগুলো ভুল ধারণা দিয়ে সন্তানদের বড় করছে। মেয়েরাও কিছু ক্ষেত্রে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে সচেতন নয়। ভাবলেই অবাক হচ্ছি এ পরিস্থিতিতে এখনো অভিভাবকরা কী করে ঘুমাচ্ছেন! তারা সন্তানদের সামাজিক মূল্যবোধ, সংস্কৃতি, শ্রদ্ধাবোধ এই বিষয়গুলো নিয়ে শিক্ষা দিচ্ছেন না। আর নৈতিকতাহীন শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যাওয়ায় সন্তানরাও উচ্ছৃঙ্খল হয়ে পড়ছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, নারী-পুরুষ উভয়ের মনে রাখতে হবে স্বাধীনতা মানে স্বেচ্ছাচারিতা নয়। মেয়েদের আমি বলছি না যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যাওয়া থেকে তারা বিরত থাকবেন। কিন্তু যার অনুষ্ঠানে যাবেন, তার সম্পর্কে ও সেই ব্যক্তির চরিত্র সম্পর্কে যদি আগে থেকেই জানা থাকে তবে এ ধরনের অনুষ্ঠান এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। আর নিতান্তই যদি যেতেই হয় তবে নিরাপত্তার খাতিরে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে সেখানে যাওয়া যেতে পারে।

বর্তমানে ছেলেমেয়েদের মধ্যে নৈতিকতা কমে যাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, অনেক উঠতি ব্যবসায়ী রাতারাতি ব্যবসায় লাভ করে মেয়েদের পণ্য মনে করে তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছেন। কিন্তু অভিভাবকরা যদি সন্তানকে মূল্যবোধের শিক্ষা দেন, তারা কোথায়, কখন যেতে পারবে এ বিষয়গুলো ছোটবেলা থেকে শিক্ষা দেন তবে যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়ানো সম্ভব। অন্যদিকে মেয়েদেরও নিজেদের আত্মরক্ষার বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। কোথাও গেলে নিজের বিপদ হতে পারে এমন যদি আশঙ্কা থাকে তবে সেক্ষেত্রে মেয়েটির নিজেকে বাঁচানোর কৌশল জানতে হবে। জাপানের স্কুলগুলোর মতো আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও প্রাথমিক পর্যায় থেকে নৈতিকতা বিষয়ে শিক্ষা দিতে হবে।

চলতি সময়ের ঘটনাবলী বিশ্লেষণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন বলেন, বনানীর সাম্প্রতিক ঘটনায় যাকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে এবং যে দাওয়াত দিয়েছে তারা উভয়েই প্রাপ্তবয়স্ক। আবার ছেলেটি তার পরিবারের সদস্যদের অনুপস্থিতিতে মেয়েটিকে আসতে বলেছে আর মেয়েটিও রাতের একটি অনুষ্ঠানে তার পরিবারের কোনো সদস্য ছাড়াই সেই বাড়িতে গিয়েছিলেন। এটি আসলেও জন্মদিনের কোনো অনুষ্ঠান না প্রতারণা— তা নিয়ে সন্দেহ আছে।

তিনি বলেন, এসব  ঘটনা আমাদের সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের উদাহরণ। জন্মদিনের অনুষ্ঠানের নামে যার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাচ্ছি। সমাজ কিশোর ও তরুণ-তরুণীদের জন্য সুস্থ কোনো বিনোদনের ব্যবস্থা করে না দেওয়ায় ছেলেমেয়েরা নিজেদের মনের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পারছে না। তারা যাচাই না করেই যেখানেই পারছে।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর