,



দেড় মাস ধরে বাঁধের ভেতর দুর্বিষহ জীবন

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ  ঈদ-পরবর্তী সময়ে ডিএনডির জলাবদ্ধতা কমতে শুরু করলেও গত কয়েক দিনের হালকা ও ভারি বর্ষণের পর ডিএনডি বাঁধের ভেতরের মানুষের দুর্ভোগ আরো বেড়েছে। গত দেড় মাস ধরে এমনিতেই ডিএনডির নিচু এলাকার কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। তার উপর নতুন করে বৃষ্টিপাত যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। জলাবদ্ধতার শিকার বাসিন্দারা জানান, কোনো জনপ্রতিনিধি এ পর্যন্ত তাদের দুর্ভোগ দেখতে আসেনি। বরং বিভিন্ন এলাকায় প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধিদের ছত্রছায়ায় বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করছে কেউ কেউ। পানি নিষ্কাশনের খাল দখল করে স্থাপনা নির্মাণও করেছে। ফলে নিষ্কাশনে ব্যাঘাত ঘটছে। তারা আরো জানান, ডিএনডিতে স্থান ভেদে এখনও ১ থেকে ২ ফুট পানিতে তলিয়ে আছে। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় ব্যাপক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে বলে ডিএনডিবাসীর অভিযোগ। কিন্তু কবে নাগাদ জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাবে ডিএনডিবাসী তাও নির্দিষ্ট করে বলতে পারছে না শিমরাইল পাম্প হাউজ কর্তৃপক্ষ। তাছাড়া ডিএনডির জলাবদ্ধতা নিষ্কাশনে ব্যবহৃত উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন ৪টি পাম্পের মধ্যে একটি অকেজো হয়ে পড়ে আছে। বাকি তিনটিও পুরাতন হয়ে যাওয়ায় পূর্বের ন্যায় পানি নিষ্কাশন করতে পারছে না। পয়ঃনিষ্কাশন, স্যূয়ারেজের পানি, ডাইং কারখানাসহ বিভিন্ন ছোট-বড় কারখানার ক্যামিকেলযুক্ত পানি জলাবদ্ধতার সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে আছে। বিবর্ণ আকার ধারণ করেছে ডিএনডির জলাবদ্ধতা। নিরুপায় হয়ে পানি মানুষ এই বিশ্রি কালো মাড়িয়ে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে আক্রান্ত হচ্ছে বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে।
এদিকে রান্না ঘরে পানি ঢুকে পড়ায় রান্না-বান্নাও করতে পারছে না অনেকেই। তার উপর বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে।
জলাবদ্ধতার কারণে বিশেষ করে নিম্নাঞ্চলের রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, স্কুল-কলেজ, মসজিদ- মাদরাসা, মিল-কারখানা, দোকানপাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গ্যারেজ, সবজি ক্ষেত, নার্সারীসহ নানা স্থাপনা ১ থেকে দেড়ফুট পানির নিচে। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজির পাইনাদী, সিআইখোলা, কালাহাতিয়ার পাড়, নতুন মহল্লা, মজিববাগ, রসুলবাগ, নয়াআটি, নিমাইকাশারী, বাঘমারা, মৌচাক, সানারপাড়, কদমতলী, নয়াপাড়, গোদনাইল, সৈয়দপাড়া, ভুইয়াপাড়া, চৌধুরীবাড়ি, ধনকুন্ডা, জালকুড়ি, ফতুল্লার হাজীগঞ্জ, গিরিধারা, বাঘমারা, সাদ্দাম মার্কেট, হাজীনগর, শহীদ নগর, সবুজবাগ, ভূইঘর, দেলপাড়া, ইসদাইর, গাবতলি, লালপুর, নন্দনালপুর, ডেমরার টেংরা, কোদালদাহ, তুষার ধারা, বক্সনগর, ডগাইর, মাতুয়াইল, আমতলীসহ বিভিন্ন এলাকার অনেক বাড়িরঘর ও রাস্তাঘাট , মসজিদ, মাদরাসা, স্কুল-কলেজ, সবজি খেত, নার্সারি বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে।
ফতুল্লার লালপুর এলাকার বাসিন্দা সাদ্দাম হোসেন জানান, এখানকার অধিকাংশ বাড়ি-ঘরে বর্ষণের পানিতে তলিয়ে আছে। রাস্তাঘাট পানির নিচে। গত তিন দিনে জলাবদ্ধতা আরো বেড়েছে। এখানকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় পানি আটকে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে বাসিন্দাদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে থাকায় রিকশার ১০ টাকার ভাড়া ৩০ টাকা গুণতে হচ্ছে। কদমতলী নয়াপাড়ার বাসিন্দা মোসলেম উদ্দিন জানান, এ এলাকার পানি কিছুদিন আগে নামতে শুরু করলেও গত কয়েক দিনের বর্ষণে আবারও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। অনেকের বাড়িঘরে পানি ঢুকেছে। রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে গেছে। পাইনাদী সিআইখোল হাজীনগরের প্রধান রাস্তাটি বুধবার রাতের বৃষ্টির পর হাটু সমান পানিতে তলিয়ে গেছে। পারভেজ মিয়া জানান, ডুবন্ত রাস্তায় ড্রেনের ময়লা-আবর্জনা বর্ষণের পানির সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে গেছে। এখানে এক ঘণ্টা বৃষ্টি হলেই রাস্তাটি ডুবে যায়। এছাড়াও এখানকার নিচু এলাকার বাড়িঘরেও পানি ঢুকেছে। রিক্সা চালক আব্দুল কুদ্দুস জানায়, রাস্তাটি বৃষ্টিতে তলিয়ে যাওয়ায় রিক্সা চালাতে অনেক কষ্ট হচ্ছে। অনেক বাড়িতে গ্যাসের চুলো বৃষ্টির পানিতে ডুবে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এভাবে ডিএনডি’র বহু এলাকায় এখন পানিতে ডুবে আছে।
খবর নিয়ে জানা যায়, ডিএনডি’র কোনো কোনো এলাকায় এখনও ১ থেকে ২ ফুট পানিতে তলিয়ে আছে। শিমরাইলের পাম্প হাউজের পাম্প অপারেটর সাইফুল ইসলাম অপু জানায়, ৫১২ কিউসেক ক্ষমতা সম্পন্ন চারটি পাম্পের মধ্যে তিনটি পাম্প চালু রাখা হয়েছে। একটি পাম্প জুন মাস থেকে নষ্ট হয়ে গেছে।  শিমরাইলের পাম্প হাউজে সরেজমিন গিয়ে ১২৮ কিউসেক ক্ষমতাসম্পন্ন ৩টি পাম্প ও ৫ কিউসেক ক্ষমতা সম্পন্ন ৪টি পাম্প চলতে দেখা গেছে। অবশ্য পাম্প হাউজ কর্তৃপক্ষ জানায়, ৫ কিউসেক ক্ষমতাসম্পন্ন ১৮টি পাম্প মেরামত ও সংস্কারের কাজ চলছে। শিগগিরই অন্যান্য পাম্পগুলো চালানো হবে।
নারায়ণগঞ্জের শিমরাইল পাম্প হাউজ বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী রাম প্রসাদ বাছাক ডিএনডিতে ব্যাপক জলাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে জানান, ৫১ বছরের পুরনো পাম্প হাউজের ৫১২ কিউসেক ক্ষমতা সম্পন্ন ৪টি পাম্প দিয়ে শীতলক্ষ্যা নদীতে পানি নিষ্কাশন করা হয়। এ পাম্পগুলো এখন আগের মতো পানি নিষ্কাশন করতে পারছে না। আমার ধারণা পাম্পগুলো এখন শতকরা ৬০ ভাগ থেকে ৭০ ভাগ ক্ষমতা কার্যকর রয়েছে। গত এক মাস ধরে ১২৮ কিউসেক ক্ষমতা সম্পন্ন ২নং পাম্পটি যান্ত্রিক দ্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে। পাম্পটি মেরামতের জন্য ঊধ্বর্তন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, ৫ কিউসেক ক্ষমতা সম্পন্ন আরো ২২টি পাম্প রয়েছে। এখন ৫ কিউসেক ক্ষমতা সম্পন্ন ৪টি পাম্প চালানো হয়েছে। অবশিষ্ট পাম্পগুলোর সংস্কার কাজ চলছে। তিনি আরো জানান, তিনটি পাম্প চালু অবস্থায় নিষ্কাশনের খালে মুখে বুধবার দুপুর পর্যন্ত পানির উচ্চতা রয়েছে ৩.৩৫ মিটার, যা শুষ্ক মৌসুমে থাকে ২.৫ মিটার। তিনি ডিএনডির কোথাও কোথাও এক থেকে দেড় ফুট পানিতে তলিয়ে আছে বলে জানান।
উল্লেখ্য, উন্নত জাতের ধান ফলনের জন্য ১৯৬৬-৬৮ সালে ৮ হাজার ৩৪ হেক্টোর জায়গা জুড়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) বাঁধ নির্মিত হয়। বাঁধের ভেতর ধানের জমিতে শুষ্ক মৌসুমে পানি সরবরাহ ও বর্ষা মৌসুমে ভেতরের পানি নিষ্কাশনের জন্য ৩০০ হর্সের ৪টি পাম্প বসানো হয়। যেটা শিমরাইল পাম্প হাউজ নামে পরিচিত। প্রতিটি পাম্প সেকেন্ডে ১২৮ কিউসেক করে পানি নিষ্কাশন করে। ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় সারা দেশ পানিতে ভাসলেও ডিএনডি ছিল বন্যা মুক্ত। ফলে ডিএনডির ভেতর বাড়ি-ঘর, শিল্প-কারখানা, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান সরকারি বেসরকারি অফিস  নির্মাণের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এতে মুখ থুবড়ে পড়ে ইরি ধান চাষের প্রকল্প। এদিকে অপরিকল্পিতভাবে স্থাপনা নির্মাণের কারণে ডিএনডির ভেতরের পানি নিষ্কাশনের খালগুলোর অধিকাংশ বেদখল হয়ে যায়। ফলে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয়। এতে বৃষ্টি হলেই দুর্ভোগে পড়েন ডিএনডির মানুষ।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর