,



উত্তরে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি

বাঙালি কণ্ঠ নিউজঃ  উজানের ঢলে দেশের উত্তর-পূর্বের নদীগুলোর পানি বেড়ে তীরবর্তী জেলাগুলোর বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। এর মধ্যে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও জামালপুর জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যার পানিতে আউশ ধান, আমনের বীজতলা, সবজি, পাটের ক্ষেত ডুবে গেছে। এসব জেলার কয়েক হাজার হেক্টর ফসলের ক্ষতি হতে পারে বলে জানিয়েছে স্থানীয় কৃষি অফিস। অন্যদিকে যমুনার তীরবর্তী নিম্ন অঞ্চলগুলোতে বন্যার পানি আরও বাড়ায় আশ্রয়, খাদ্য ও খাবার পানির সঙ্কট দেখা দিয়েছে। পাঠদান বন্ধ রয়েছে চরের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। তবে সিলেট ও মৌলভীবাজারে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। গতকাল পানি উন্নয়ন বোর্ড বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পূর্বাভাসে বলা হয়, যমুনা, পদ্মা, সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি বাড়ছে। যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি আজও অব্যাহত থাকতে পারে। তবে ব্রহ্মপুত্র আজ স্থিতিশীল থাকতে পারে। যমুনা বাহাদুরাবাদে বিপদসীমার ৩৬ সেন্টিমিটার ও সারিয়াকান্দিতে ২৫ সেন্টিমিটার, কাজীপুরে ২৪ সেন্টিমিটার, সিরাজগঞ্জে ২৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যমুনা ছাড়াও বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে সুরমা, কুশিয়ারা, কংস। আমাদের বগুড়া অফিস জানিয়েছে, যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এতে যমুনা তীরবর্তী বগুড়ার ৩টি উপজেলা-সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনটের বেশ কিছু নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।  এখানে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় পাঁচ হাজার পরিবার। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ সংলগ্ন এলাকার বাড়িঘরে পানি ওঠায় লোকজন দুর্ভোগে পড়েছে। ৪০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১টি মাদ্রাসাসহ ৬টি উচ্চ বিদ্যালয়ে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। অনেকে সারিয়াকান্দির বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়েছে। আবার অনেকে মাচাং ফেলে পানির মধ্যে বসবাস করছে। এ পরিবারগুলোর মধ্যে দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট। যমুনার পানি বিপদসীমা অতিক্রম করায় সারিয়াকান্দির কামালপুর, কুতুবপুর, চন্দনবাইশা ইউনিয়নের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের পূর্ব পাশে অবস্থিত ১০টি গ্রামের ৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ১ হাজার ৬০ হেক্টর জমির আউশ আবাদ, ১ হাজার ৯০০ হেক্টর জমির পাট, ২৫ হেক্টর জমির সবজি, ২০ হেক্টর জমির বীজতলা বন্যাকবলিত হয়েছে। ধুনট উপজেলার ভাণ্ডরবাড়ি ও গোসাইবাড়ি এবং সোনাতলা উপজেলার পাকুল্লা ও তেকানী, চুকাইনগর ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় বাঁধ সংলগ্ন বেশ কিছু গ্রামের বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করেছে। সারিয়াকান্দি সংবাদদাতা জানান, এখানে ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে এবং ৫৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ হয়ে গেছে। পানিবন্দি পরিবারের লোকজনের দুর্ভোগ বেড়েছে। বাঁধে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোকে তাদের গবাদি পশু নিয়ে গাদাগাদি করে বসবাস করতে দেখা গেছে। উপজেলা শিক্ষা অফিসার রফিকুল আলম জানান, যমুনার চরসহ বন্যাকবলিত এলাকার ৫১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বন্যার পানি প্রবেশ করায় পাঠদান বন্ধ রয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিসার শাহাদুজ্জামান জানান, উপজেলায় পাট, ধান, সবজি ও বীজতলাসহ  ৩ হাজার ৩৪০ হেক্টর জমির ফসল বন্যার পানিতে আক্রান্ত হয়েছে। সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বাঁধের বাইরে এবং চরাঞ্চলের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে নদীতীরবর্তীসহ চরাঞ্চলের নিচু এলাকায় উঠতি ফসল ডুবে গেছে। কোনো কোনো চরের নিচু এলাকার বাড়িঘরে পানি উঠেছে বলে জানা গেছে। কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার পানি সামান্য হ্রাস পেলেও বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। চিলমারী উপজেলার ২০ ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলসহ চরাঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষ গত ৫ দিন ধরে পানিবন্দি। এসব এলাকায় শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ খাবার পানির সঙ্কট দেখা দিয়েছে। গবাদি পশুর খাদ্য সঙ্কটে পড়েছে বন্যাকবলিতরা। গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, গাইবান্ধার ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, যমুনা, করতোয়া ও ঘাঘটসহ সব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ওইসব এলাকার নিম্ন ও চরাঞ্চলের রাস্তাঘাট, ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও সদর উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নের প্রায় ২৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। অন্তত ৩ হাজার একর তোষা পাট পানিতে ডুবে আছে। জামালপুর প্রতিনিধি জানান, যমুনা নদীর পানি সামান্য বৃদ্ধি পাওয়ায় জামালপুরের পাঁচ উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হয়েছে। বন্যায় জেলার ইসলামপুর উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন, দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার ৪টি ইউনিয়নসহ সরিষাবাড়ী,  মেলান্দহ ও মাদারগঞ্জ উপজেলার কিছু অংশ বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। ইসলামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবিএম  এহছানুল মামুন বলেন, দুর্গতদের মাঝে ত্রাণের পাশাপাশি পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হচ্ছে। সিলেট অফিস জানায়, সিলেটের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও উন্নতি হয়েছে।  বিভিন্ন এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করেছে। তবে সুরমা ও কুশিয়ারার তিনটি পয়েন্টে এখনও বিপদসীমার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। খাবার ও কাজ না থাকায় অসহায় অবস্থায় রয়েছে আট উপজেলার প্রায় ২০ হাজার পরিবারের দেড় লক্ষাধিক মানুষ। মৌলভীবাজার প্রতিনিধি জানান, মৌলভীবাজার জেলার হাকালুকি ও কাউয়াদিঘি হাওর এলাকায় বসতঘর থেকে বন্যার পানি কমলেও জনভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে। বন্যাকবলিত এলাকায় দেখা দিয়েছে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব। সাপ-বিচ্ছুর ভয় ছাড়াও বিভিন্ন এলাকায় ডায়রিয়াসহ নানা পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। মৌলভীবাজার জেলা সিভিল সার্জন সত্যকাম চক্রবর্তী জানান, হাকালুকি হাওরসহ বন্যাদুর্গত এলাকায় ১০টি মেডিক্যাল টিম কাজ করছে।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর