,



এহসান গ্রুপের প্রতারণায় আফসার-রহিমারাও হয়েছেন ফতুর

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ টিনশেডের পুরনো বাড়ি। স্যাঁতসেঁতে দেয়াল, খসে পড়ছে প্লাস্টার। ঘরের চারদিকে উৎকট গন্ধ। জীর্ণ খাটে দুই পা ঝুলিয়ে বসে আছেন আফসার উদ্দিন (৬৬)। শরীরে ক্যাথেটার। বাঁ পায়ের এক অংশে ব্যান্ডেজ। ব্যান্ডেজের ভেতরে নেই পায়ের এক আঙুল। চলতে পারেন না কারোর সাহায্য ছাড়া। যশোর শহরের মিশনপাড়ার আফসার ছিলেন এয়ারফোর্সের ক্লার্ক। বিয়ে করেননি। থাকেন পৈতৃক বাড়িতে। পেনশনের সময় পাওয়া ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ২০১১ সালের শেষের দিকে লগ্নি করেছিলেন এহসান এসে। দুই বছর মুনাফা ঠিক ঠিক হাতে আসে। এরপর বন্ধ হয়ে যায় লাভের মুখ দেখা। সেই সময় তিনি অনেক ঘুরেও আসল টাকার নাগাল পাননি। এখন মানুষটি কাটাচ্ছেন অসহায় জীবন।

এহসান এসের কাছে পাওনা টাকার কথা তুলতেই কেঁদে ফেললেন আফসার। বললেন, ‘চিকিৎসা যে করব সেই টাকাও নাই। ভাই-বোনরা যে ঠিকমতো চিকিৎসা করাবে, সে সামর্থ্যও তাদের নাই। ধর্মীয় লেবাস নিয়ে এহসানের কর্মকর্তারা যে এমন প্রতারক, কল্পনাও করতে পারিনি।’

রহিমা খাতুন যশোর শহরের শংকরপুরে ভিটাবাড়ির আট শতক জমি বিক্রির ১২ লাখ টাকা এবং নিজের জমানো এক লাখ ২৫ হাজার টাকা মিলিয়ে ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা লগ্নি করেন এহসান এসের যশোর শাখায়। ২০১৩ সালের জুলাইয়ে টাকা জমা রাখার পর ছয় মাস তিনি মুনাফা পান। এরপর তাঁর গচ্ছিত টাকা ফেরত দেওয়া নিয়ে টালবাহানা শুরু করে ওই প্রতিষ্ঠান। লাভ তো দূরে থাক, এখনো আসল টাকাও পাননি তিনি। এহসান এসের প্রতারণায় সর্বস্ব হারিয়ে ৭০ বছর বয়সী রহিমা খাতুন এখন বাস করেন হামিদপুর ময়লাখানা এলাকার একটি খুপরি ঘরে। দুইবার স্ট্রোক হলেও টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না। অসুস্থতা নিয়েই মাঝেমধ্যে ভিক্ষাও করেন তিনি। গত মঙ্গলবার দুপুরে তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় তার মানবেতর জীবনের এই ছবি।

রহিমা খাতুন বললেন, ‘তারা যে আমার এমন সর্বনাশা ভবিষ্যৎ করবে কখনো বুঝতি পারিনি। টাকার শোকে দুইবার স্ট্রোক হয়েছে। ঠিকমতোন দাঁড়াতিও পারিনে। ওষুধ কিনতি পারিনে টাকার জন্যি। ওই শয়তানগের কাছে পাওয়া টাকাগুলোন যদি ফেরত পাতাম তালি বাঁইচে যাতাম।’

এহসানের ফাঁদে পড়ে আফসার, রহিমাদের মতো এভাবেই টাকা খুইয়ে নিঃস্ব হয়েছেন যশোরের পশ্চিম বারান্দিপাড়া এলাকার রবিউল ইসলাম, ভেকুটিয়া গ্রামের মঞ্জিলা খাতুন, আব্দুল মতিনসহ যশোরাঞ্চলের প্রায় ১৬ হাজার গ্রাহক। এদের মধ্যে রবিউল ইসলাম ‘এহসানের ক্ষতিগ্রস্ত লগ্নিকারী সংগ্রাম কমিটি’র সাধারণ সম্পাদক বারান্দীপাড়া কদমতলার মফিজুল ইসলাম ইমনের বাবা। টাকার শোকে রবিউল স্ট্রোক করে বর্তমানে শয্যাশায়ী। পাওনা টাকা তুলতে ইমন আন্দোলন-সংগ্রাম ও মামলা করেছিলেন। এ জন্য ইমনের নামে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন সাজানো মামলা করা হয়। তাঁকে শায়েস্তা করতে এহসানের মাঠকর্মীদের দিয়ে যশোর ছাড়াও ঢাকার সাভার ও বরগুনায় মামলা করা হয়।

এ ব্যাপারে ইমন বললেন, ‘আমার বাবা মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে এহসান এস সম্পর্কে জানতে পারে। এরপর জমি বিক্রি করা ছয় লাখ ৮০ হাজার টাকা এহসানে লগ্নি করে। এ ছাড়া আমার চাচাদের টাকাও রয়েছে। পাওনা আদায়ে আমি মামলা করায় আমাকে ঠেকাতে তারা আমাদের নামে একাধিক সাজানো মামলা করেছে। তবে আমি সহজে ছাড়ছি না। আমাদের ন্যায্য টাকা আদায়ের জন্য যতদূর যেতে হয় যাব।’

উল্লেখ্য, যশোরাঞ্চলের ১৬ হাজার গ্রাহকের ৩২২ কোটি ১১ হাজার ৭৫০ টাকা এহসান এস প্রতারকরা আত্মসাৎ করেছে বলে ‘এহসানের ক্ষতিগ্রস্ত লগ্নিকারী সংগ্রাম কমিটির’ সাধারণ সম্পাদক জানিয়েছেন। যশোরাঞ্চলের জয়নাল আবেদীন, বজলুর রহমান, ইসরাফিল শেখ, নূর জাহান বেগম, মোসলেম উদ্দিনসহ ৫৬ লগ্নিকারী টাকার শোকে এরই মধ্যে মারাও গেছেন বলে জানা গেছে।

এদিকে এহসান রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের চেয়ারম্যানসহ ২৬ জনের নামে দু’জন গ্রাহকের প্রায় ৩২ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে যশোর আদালতে গত সোমবার দুটি মামলা করা হয়েছে। অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মারুফ আহম্মেদ অভিযোগ দুটি আমলে নিয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) আদেশ দিয়েছেন।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর