,



বানের পানি কমছে বাড়ছে নদীভাঙন

বাঙালী কণ্ঠ নিউজঃ  পদ্মা ছাড়া সব প্রধান নদীতে পানি কমতে শুরু করায় নদীতীরবর্তী স্থানগুলোতে তীব্র নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। বগুড়া ও গাইবান্ধায় যমুনা, লালমনিরহাটে ধরলা ও তিস্তার তীব্র ভাঙনে বসতবাড়ি ও ফসলের ক্ষেত নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। তিন জেলার ভাঙনকবলিত এলাকাগুলোতে সহায়-সম্বল হারিয়ে মানুষ অসহায় হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে পানি কমায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে লালমনিরহাট ও নীলফামারীতে। অপরিবর্তিত রয়েছে কুড়িগ্রাম, বগুড়া ও গাইবান্ধায়। কোথাও কোথাও বাড়িঘর থেকে পানি নামতে শুরু করেছে। তবে যমুনা তীরবর্তী জেলাগুলোতে এখনও পানিবন্দি রয়েছে হাজার হাজার মানুষ। বেশ কয়েকদিন পানিবন্দি থাকায় অনেক স্থানে ঘরের খাবার শেষ হওয়ায় খাদ্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে।   গতকাল পানি উন্নয়ন বোর্ড বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পূর্বাভাসে বলা হয়, পদ্মা ও কুশিয়ারা নদীর পানি বাড়ছে। পদ্মার পানি বাড়া আগামীকাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, সুরমা স্থিতিশীল রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর পানি আজ কমতে শুরু করতে পারে। বিপদসীমার ওপরে প্রবাহিত ঘাঘট, ব্রহ্মপুত্রের পানি কমেছে। যমুনা কাজীপুর ও সিরাজগঞ্জে কমেছে। তবে যমুনা গোয়ালন্দ পয়েন্টে বিপদসীমার ৫ সেমি ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়াও যমুনা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট, কপোতাক্ষ, ধলেশ্বরী, আত্রাই, সুরমা, পুরাতন সুরমা, কুশিয়ারা ও কংস নদী বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর : সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, বানের পানির তোড়ে সিরাজগঞ্জের উজানে পানি উন্নয়ন বিভাগের বাহুকা লিঙ্ক বাঁধের প্রায় ৫০ মিটার ভেঙে গেছে। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে আটটা থেকে এই বাঁধে ভাঙন শুরু হয়। ভাঙনের ফলে বাঁধ অভ্যন্তরে হু হু করে বন্যার পানি ঢুকেছে। বাঁধ ভাঙার খবরে বাহুকা, ইটালী, ভেওমারাসহ আশপাশের এলাকার মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। এদিকে বাঁধ ভেঙে অভ্যন্তরের বাহুকা, চিলগাছা, ইটালী, ভেওয়ামারা ও গজারিয়াসহ বিভিন্ন এলাকা বন্যার পানিতে সয়লাব হয়েছে। রাতেই স্থানীয়রা বাঁধ মেরামতে স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ শুরু করে। গতকাল সকালে সেনাবাহিনীর ১১ পদাতিক ডিভিশনের রিভার কোরের লে. কর্নেল সোহেলের নেতৃত্বে সেনা সদস্যদের তত্ত্বাবধানে স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড ঠিকাদার নিয়োগ করে বাঁধ মেরামত কাজ শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে বালি ভর্তি জিও ব্যাগ ভাঙা অংশে ফেলা হচ্ছে। পরবর্তীতে মাটি ফেলে তা সংরক্ষণ করা হবে। পাউবোর প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী জানিয়েছেন, ভাঙন রোধে চেষ্টা করা হচ্ছে। যা করার সন্ধ্যার পূর্বেই করতে হবে। এদিক বাঁধ ভাঙার খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করে এলাকার মানুষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে এক বিবৃতি দিয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। বগুড়া অফিস জানায়, বগুড়ার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। বগুড়ার বন্যাকবলিত সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলার মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। অনেক এলাকায় খাবার পানির সঙ্কট দেখা দিয়েছে। ত্রাণসামগ্রী অপ্রতুল বলে বন্যার্তরা অভিযোগ করেছে। গত দু’দিনে নদীভাঙনে বন্যাকবলিত সারিয়াকান্দির চরবেষ্টিত ৩টি ইউনিয়নের ৪৮০টি পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। এসব পরিবারের অনেকেরই বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এসব পরিবার ব্যাপক দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছে। এদিকে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্র জানায়, বন্যাকবলিত ৩টি উপজেলায় কয়েক হাজার হেক্টর ফসলি জমি পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। অন্যদিকে ১০০টি পুকুর পানিতে তলিয়ে গেছে এবং ৪০০ টন খড় ও ৪৬০ টন ঘাস বিনষ্ট হয়েছে। এদিকে জেলায় ৬০ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা ও ৫ কিলোমিটার পাকা রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া জেলায় ৭১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৮টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ২টি মাদ্রাসা ও ১টি কলেজে পানি প্রবেশ করেছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। অপরদিকে গতকাল বিকেলে বগুড়ার জেলা প্রশাসক মো. নূরে আলম সিদ্দিকী তার সভাকক্ষে বগুড়ার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। তিনি বলেন, সরকার বন্যাকবলিতদের পাশে রয়েছে, থাকবে। আজ বিকেল ৪টায় ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন মায়া বগুড়ার সারিয়াকান্দির বন্যাকবলিত এলাকায় আসবেন। লালমনিরহাট প্রতিনিধি জানান, সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও উন্নতি হয়েছে। তিস্তা নদীর পানি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। বন্যাদুর্গত এলাকার পানি দ্রুত নেমে যাচ্ছে। তবে পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে তিস্তা-ধরলা পাড়ে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত কয়েকদিনে নদীগর্ভে গেছে শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি ও কয়েকশ বিঘা ফসলি জমি। ভাঙন দেখা দিয়েছে সদর ও আদিতমারী উপজেলায়। জামালপুর প্রতিনিধি জানান, জামালপুরে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। জেলায় আরও ৮৩টি গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়ে গ্রামের সংখ্যা দাঁড়াল ৪০৩টিতে। ফলে দুর্গত এলাকায় দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা তানভীর হোসেন জানান, বন্যার পানি প্রবেশ করায় জেলার সাতটি উপজেলার ৬ হাজার ২২০ হেক্টর জমির  ফসল তলিয়ে গেছে। বন্যাদুর্গতদের মাঝে এ পর্যন্ত ২৫০ মেট্রিক টন চাল, ৪ লাখ ৭৫ হাজার নগদ টাকা ও ৪ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। নীলফামারী প্রতিনিধি জানান, জেলায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তিস্তার পানি কমায় ঘরবাড়ি থেকে পানি নামতে শুরু করেছে। তিস্তা নদীর বন্যায় নীলফামারী জেলার দুই উপজেলায় তিন হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে নীলফামারী জেলা প্রশাসন। গতকাল দুপুরে বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ খালেদ রহীম এ তথ্য জানান। কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি ও রাজীবপুর সংবাদদাতা জানান, কুড়িগ্রামে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। রাজিবপুর উপজেলার বটতলা এলাকায় পাকা সড়কের ১৫ ফুট ধসে গেছে। এতে করে পার্শ্ববর্তী বালিয়ামারী, জালছিড়ারপাড়, মিয়াপাড়া, বটতলা মণ্ডলপাড়া ও কলেজপাড়াসহ ৭ গ্রামের মানুষের যোগাযোগে দুর্ভোগ বেড়েছে। এসব এলাকার লোকজনকে পার্শ্ববর্তী সড়ক দিয়ে ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার ঘুরে রাজিবপুর উপজেলা শহরে যেতে হচ্ছে। নদ-নদীতীরবর্তী চর ও দ্বীপচরসহ জেলার ৭ উপজেলার ৪২ ইউনিয়নের ৫ শতাধিক গ্রামের ২ লক্ষাধিক মানুষ গত ৮ দিন ধরে পানিবন্দি জীবনযাপন করছে। পানিবন্দি বেশিরভাগ মানুষের ঘরের সঞ্চিত খাবার শেষ হয়ে যাওয়ায় তারা চরম খাদ্য সঙ্কটে পড়েছে। এসব এলাকায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানির সঙ্কট। চারণভূমি তলিয়ে থাকায় চরাঞ্চলগুলোতে দেখা দিয়েছে গোখাদ্যের তীব্র সঙ্কট। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও মাদ্রাসাসহ ২ শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, গাইবান্ধার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় কোনো নদ-নদীর পানি বাড়েনি। এদিকে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় গাইবান্ধা সদর উপজেলার কামারজানী ইউনিয়নের প্রায় ৩০০ ঘরবাড়ি, ৫০ একর আবাদি জমি, অসংখ্য গাছপালা বিলীন হয়েছে। এ ছাড়া ইউনিয়নের কলমু এফএনসি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ধসে গেছে। যমুনা নদীর পানির চাপে গতকাল দুপুরে ফুলছড়ি উপজেলার সিংরিয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়ে। অপরদিকে গাইবান্ধা সদর, সাঘাটা, ফুলছড়ি ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বন্যাপ্লাবিত মোট ২৯টি ইউনিয়নে প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী যাচ্ছে না। এসব ইউনিয়নের পানিবন্দি ২ লক্ষাধিক মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। গতকাল দুপুরে গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক গৌতম চন্দ্র পাল কামারজানী ইউনিয়নের ভাঙনকবলিত গোঘাট এলাকা পরিদর্শন করে ৭০টি পরিবারের মধ্যে চাল-ডাল ও শুকনো খাবার বিতরণ করেন। হাবিবার বিয়েতে জমকালো আয়োজন সকালের খবর ডেস্ক: জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অনাথ হাবিবা আক্তারের নতুন জীবন শুরু হল। গতকাল দুপুরে জেলা শহরের মেড্ডায় সরকারি শিশু পরিবারে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। গোটা আয়োজনে ছিল রাজকীয় আমেজ। কোথাও কোনো কিছুর কমতি ছিল না। বিয়েতে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। সবকিছুর তদারকি করেছেন কনের ‘বাবা’ জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মিজানুর রহমান। হাবিবা আক্তার ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি শিশু পরিবারে বড় হয়েছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এসপি মিজানুর রহমান অনাথ হাবিবার অভিভাবকত্ব গ্রহণ করে তার বর ঠিক করেন। বর জাকারিয়া আলম পুলিশ কনস্টেবল। তার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার সোনারগাঁ গ্রামে। এ আয়োজনকে কেন্দ্র করে গতকাল দুপুর ১২টা থেকেই সরকারি শিশু পরিবারে ছড়িয়ে পড়ে আনন্দ-উচ্ছ্বাস। দুপুর ২টায় বরের গাড়িবহর কনের আবাসস্থলে এলে পড়ে যায় হইচই। সরকারি শিশু পরিবারে বরকে বরণ করে অন্তত একশ’ অনাথ শিশু। বিয়েবাড়িতে বরের প্রবেশের পর বাজানো হয় সানাইয়ের সুর। এর অল্প কিছুক্ষণ পর কনে হাবিবাকে মঞ্চে এনে বসানো হয় বরের পাশে। সেখানেই ২ লাখ ১ হাজার টাকা দেনমোহর নির্ধারণ করে বিয়ে পড়ান কাজী আবু জামাল। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ‘কনের বাবার দায়িত্ব নেওয়া’ পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান, জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা আল মামুন সরকার, সমাজসেবা অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন-অর্থ) এম খাইরুল আলমসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। বরের পক্ষে ছিলেন তার বাবা মো. ফরিদ মিয়াসহ নিকটাত্মীয়রা। অনুষ্ঠানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে এসে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছি। আজ আমার মধ্যে মিশ্র অনুভূতি কাজ করছে। হাবিবা সুখে থাকুক, এটাই চাই আমরা। ও সুখে থাকলে আমরা খুশি হব। তিনি আরও বলেন, এরকম শত শত হাবিবা আছে, তাদের পাশে আমাদের দাঁড়াতে হবে। সবাই মিলে এগিয়ে এলে সমাজ বদলে যাবে। এগিয়ে যাবে আমাদের দেশ। মা-বাবা হারিয়ে ছয় বছর বয়সে হাবিবা আক্তার আশ্রয় নিয়েছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরকারি শিশু পরিবারে। প্রায় এক যুগ কেটেছে এখানে। ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ায় সরকারি শিশু পরিবার ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল হাবিবার। কিন্তু মায়া কাটাতে পারেননি তিনি। তাই ১২ বছর এই শিশু পরিবারের স্মৃতি কাটিয়ে মামা-মামির কাছে ফিরে যাওয়া হয়নি তার। পরে শিশু পরিবারের উপ-তত্ত্বাবধায়ক রওশন আরা খাতুন তার পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেন। মুক্তিযোদ্ধা আল মামুন সরকারের সহায়তায় হাবিবার দায়িত্ব নেন পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান। সবার প্রচেষ্টায় ঠিক হয় তার বিয়ে। সেই বিয়ের পুরো দায়িত্বই নিজের কাঁধে তুলে নেন এসপি মিজানুর রহমান।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর