,



ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়িদের ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসনের কোনো উদ্যোগ নেই

বাঙালী কণ্ঠ নিউজঃ  লংগদুতে হামলার শিকার পাহাড়িরা এখন মানবেতর জীবনযাপন করছে। ঘটনার ৫ দিন পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম তাদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু নিরাপত্তা ব্যবস্থা কিছুটা নেওয়া হলেও ক্ষতিপূরণ কিংবা পুনর্বাসন কোনোটারই ব্যবস্থা হয়নি। তাই কোনো আশ্বাসেই আর আস্থা রাখতে পারছে না লংগদুর পাহাড়িরা। গত ২ জুন রাঙামাটির লংগদু উপজেলার ৩টি পাহাড়ি পল্লীতে ২ শতাধিক বাড়িঘরে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে দুর্বৃত্তরা। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের গাফিলতি এবং সবার ছত্রছায়ায় বাঙালিরা বাড়িঘরে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে বলে অভিযোগ করেন ক্ষতিগ্রস্তরা। লংগদুতে গত ২ জুন তিনটি পাহাড়ি গ্রামে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ৫ দিন পর গত ৭ জুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন ১৪-দলীয় জোটের একটি প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যায়। উপজেলার তিনটিলা পাড়া, বাইট্ট্যাপাড়া ও মানিকজোড় ছড়া এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়িদের সঙ্গে কথা বলেন তারা। এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়ি ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা অভিযোগ করেন, হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সেটেলার বাঙালিদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও জড়িত ছিল। তারা বলেন, প্রশাসনের গাফিলতির কারণে এ ধরনের ঘৃণ্য ও ন্যক্কারজনক ঘটনার জন্ম হয়েছে। এসব কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়িরা হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, পাহাড়িদের পূর্ণ নিরাপত্তা বিধান ও যথাযথ পুনর্বাসন না করা পর্যন্ত সরকারের দেওয়া কোনো সহায়তা ও ত্রাণ নিতে অস্বীকৃতি জানান। এমনকি সরকারি চিকিত্সা সেবা বর্জনের ঘোষণাও দেন ক্ষতিগ্রস্তরা। ওই দিন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ও সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা ক্ষতিগ্রস্তদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ, যথাযথভাবে পুনর্বাসন এবং পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন। হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও আশ্বস্ত করেন এবং সরকারি সহায়তা নেওয়ার অনুরোধ জানান। কিন্তু ঘটনার দেড় মাস পার হলেও পুনর্বাসন এবং ক্ষতিপূরণ প্রদানের কোনো উদ্যোগ নেই সরকারের। এখনও ভয় ও আতঙ্কে রাত কাটে তাদের। আশ্রয়কেন্দ্রে জায়গা না থাকায় একটি বাড়িতে ৪ থেকে ৫ পরিবারকে বসবাস করতে হচ্ছে। সরজমিনে গত শুক্রবার লংগদুতে ঘরবাড়িহারা মানুষের অসহায় অবস্থা দেখা যায়। মানিকজোড় ছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশ্রয়কেন্দে  মানুষজন কম। বন্ধ শেষে প্রাইমারি স্কুলটি খুলেছে। তাই সেখানে থাকা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান স্থানীয় মায়া রঞ্জন চাকমা। স্কুলের পাশে কেউ কেউ টিনের ছাউনি দিয়ে ছোট ছোট ঝুপড়িঘর বানিয়ে সেখানে বসবাস শুরু করেছেন। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক ঝুনু খীসা জানান, মানিকজোড় ছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে ৩০টি পরিবার বসবাস করছে। ঘটনার পর ৯০টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছিল। মানিকছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টির দুটি অংশ রয়েছে। একপাশে পাকা ভবন অন্যপাশে টিনের ছাউনি বাঁশের বেড়ার পাকা বাড়ি। বেড়ার ঘরে এখনও বাঙালিদের হামলার চিহ্ন রয়েছে। সেখানে টিনের ছাউনি থেকে এক টুকরো ত্রিপাল ও দুটি ঢেউটিনের চালা নামিয়ে ছোট একটা চায়ের দোকান দিয়েছেন তিনটিলা পাড়া থেকে পালিয়ে আসা ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধা ফুলরানী চাকমা। ছোট এই চায়ের দোকানটা এখন তার বেঁচে থাকার সম্বল। বৃদ্ধা ফুলরানী চাকমা জানান, তিনটিলা বনবিহার গেট এলাকায় তারা বসবাস করতেন। রান্নাঘরসহ ৩টি বাড়ি ছিল। ফ্রিজ, ১৮ ইঞ্চি রঙিন টিভি, ফার্নিচার, সোফাসেট, ওয়্যারড্রোব, ডাইনিং টেবিল ও সেগুন গাছের ৬টি খাট ছিল। লেপ-তোশক স্তূপ করে পেট্রল ঢেলে বাড়িতে আগুন দিয়েছে বাঙালিরা। ফুলরানী চাকমা বলেন, ‘মাঝে-মধ্যে প্রয়োজন হলে তিনটিলা বাজারে যাই। সেদিকে গেলে পোড়া ঘরটা দেখলে এখনও চোখে ফোঁটা ফোঁটা জল ঝরে।’ তিনটিলা পাড়ার আরেক বাসিন্দা জয়সোনা চাকমা বলেন, ‘এখনও আমরা ভয়ে ভয়ে থাকি। আমার ছেলে প্রজ্ঞা দর্শন চাকমা রাবেতা হাইস্কুলে পড়ে। সেসহ অনেক চাকমা ছেলেও পড়ে। তাদের এখন বাঙালিরা স্কুলে নিয়ে যায় আবার বাঙালিরাই বাড়িতে দিয়ে যায়। আমাদের সেখানে যেতে ভয় লাগে। আশ্রয়কেন্দে  থাকি। গাদাগাদি করে থাকতে গিয়ে বিভিন্ন অসুখ-বিসুখ হচ্ছে।’ তিনটিলা পাড়ার কাঁঠালতলার বাসিন্দা ও বেসরকারি সংস্থা আশার সিনিয়র লোন অফিসার জ্ঞান কুমার চাকমা বলেন, ‘যেসব বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়নি সেগুলোতে লোকজন থাকা শুরু করেছে। আমার ঘরটাও অক্ষত রয়েছে। আমি ও আমার আত্মীয় দুটি পরিবার বাড়িতে থাকি। তবে ভয়ে ভয়ে আতঙ্কে রাত কাটাই।’  বাইট্ট্যাপাড়ার পাশের গ্রাম বড়াদাম। এ গ্রামের বাসিন্দা বিন্দুলাল চাকমা জানান, বাইট্ট্যাপাড়ার লোকজন যে স্কুলে আশ্রয় নিয়েছে, সেই ডানের লংগদু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তরা আশ্রয়কেন্দ  থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। কেউ আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে, কেউ ঝুপড়ি ঘর বানিয়েছে, কেউবা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত বা অক্ষত বাড়িগুলোতে ফিরে গেছে। একটা বাড়িতে ৪ থেকে ৫ পরিবার বসবাস করছে। বিন্দু লাল চাকমা আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের তো আগে থেকেই ধারণা আছে- সরকার ছলে-বলে-কৌশলে আমাদের জায়গা-জমি দখল করতে চায়। আমাদের জমি থেকে আমাদের উচ্ছেদ করাই সরকারের লক্ষ্য। এটা আমরা জানি কিন্তু আমাদের করার কিছু নেই।’ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আশ্বাস প্রসঙ্গে বিন্দু লাল চাকমা একটু ক্ষোভের সুরে বলেন, ‘মন্ত্রী-এমপি যে-ই হোক সবার আগে নাক লম্বা না নাক চ্যাপ্টা (পাহাড়ি-বাঙালি) সে পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়। আমরা তাদের আশ্বাসে আর বিশ্বাস করি না।’ বৌদ্ধ বিহারে ভিক্ষুরা তিন মাসের বর্ষাবাস শুরু করেছেন। বৌদ্ধ বিহারের থাকার জায়গা খালি করে দিতে হয়েছে। তিনটিলা পাড়ার বেশকিছু মানুষ লংগদু বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও লংগদু সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবনে বাস করছেন। সেগুলোও যে কোনো সময় ছাড়তে হতে পারে বলে জানান স্থানীয় প্রবোদ চাকমা ও বুদ্ধ কুমার চাকমা। তারা বলেন, ‘চারপাশের সব ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ভাগ্যক্রমে আমাদের বাড়িটা পুড়ে যায়নি। ১০ দিন আগে আশ্রয়কেন্দ  থেকে বাড়িতে এসেছি। রাতে সতর্কভাবে থাকি। ভয় তো সবসময় থাকে।’ তবে ভয় করলেও কিছুই করার নেই বলে মন্তব্য করেন তিনটিলা পাড়ার বাসিন্দা মমতা চাকমা। ঘটনার পর থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানবতাবাদী ব্যক্তি, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান তাদের জন্য ত্রাণ সহায়তা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়িরা। বিভিন্ন ব্যক্তি, সংস্থা, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তারা ২৭ লক্ষাধিক টাকা সহযোগিতা পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ত্রাণ কমিটির সভাপতি অশ্বিনী কুমার কার্বারি। অন্যদিকে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সম্প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত ২২৪ পরিবারের জন্য ত্রাণ বরাদ্দ দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেক পরিবারের জন্য ২ বান্ডিল ঢেউটিন, ৬ হাজার টাকা, ৩০ কেজি চাল ও ২টি করে কম্বল দেওয়া হয়েছে বলে জানান লংগদু উপজেলার আটারকছড়া ইউপি চেয়ারম্যান মঙ্গল কান্তি চাকমা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন বলেন, ‘সরকারি ত্রাণ গ্রহণ নিয়ে কেউ খুশি, কেউ বেজার। আগে থেকেই সিদ্ধান্ত ছিল সরকারের ত্রাণ নেওয়া হবে না। কিন্তু স্থানীয় মুরব্বিরা সাধারণ পাহাড়িদের সিদ্ধান্ত পাশ কাটিয়ে সরকারের ত্রাণ গ্রহণ করলেন। এটা মেনে নেওয়া যায় না।’ সরকারি ত্রাণ গ্রহণ বিষয়ে ৭নং লংগদু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কুলিনমিত্র চাকমা বলেন, ‘পর্যায়ক্রমে আমাদের দাবি পূরণ করা হবে এমন আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তাই আমরা সরকারের ত্রাণ নিচ্ছি। এসব ত্রাণ অব্যাহত থাকবে বলে জানানো হয়েছে।’ প্রসঙ্গত, গত ১ জুন লংগদু উপজেলার যুবলীগ কর্মী ও মোটরসাইকেল চালক নুরুল ইসলাম নয়নের লাশ উদ্ধারকে কেন্দ  করে লংগদুতে তিনটি পাহাড়ি গ্রামে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে উত্তেজিত বাঙালিরা। এতে ২২৪টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ৪০টি বাড়িতে লুটপাট ও ভাঙচুর করা হয় বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। এছাড়া গুনমালা চাকমা নামে ৭০ বছরের এক বৃদ্ধাকে কুপিয়ে হত্যার পর আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয় বলে জানান তার মেয়ে কালা সেনা চাকমা। ভয়াবহ এ হামলায় হতবাক হয়ে পড়ে দেশবাসী।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর