,



আওয়ামী লীগের আশঙ্কা মহাজোট আর বিএনপির চিন্তা সুষ্ঠু ভোট

বাঙালী কণ্ঠ নিউজঃ  সাবেক একাধিক মন্ত্রী, কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা মণ্ডলীর প্রভাবশালী সদস্যসহ মনোনয়ন পাওয়ার যোগ্য একাধিক নেতা থাকার পরেও শুধু মহাজোট করার কারণে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনটি ছেড়ে দিতে হয় জাতীয় পার্টিকে। যদিও নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী রাজী মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম মুন্সীর কাছে পরাজিত হন লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করা অধ্যাপক ইকবাল হোসেন রাজু। তখন এই আসনের আওয়ামী লীগের প্রায় নিশ্চিত প্রার্থী ছিলেন সাবেক মন্ত্রী ও এমপি এবিএম গোলাম মোস্তাফা। মহাজোট ঠিক থাকলে এবারো আসনটিতে জোটগত দলীয় মনোনয়ন পেতে পারেন জাতীয় পার্টির অধ্যাপক ইকবাল হোসেন রাজুই। এই আশঙ্কায় শঙ্কিত হয়ে কৌশলী প্রচারণা চালাচ্ছেন আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা।

অপর দিকে, বিএনপির মতে দলে কিছুটা কোন্দল থাকলেও ধানের শীষের নির্বাচনের কাছে এই কোন্দল খুব একটা আমলে থাকবে না। তাদের সব চিন্তা সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে।

একাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে কুমিল্লা-৪ আসনের (দেবিদ্বার) আগাম প্রস্তুতি নিয়ে এখন মাঠে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতসহ প্রায় এক ডজন প্রার্থী। এ তালিকায় আছে বর্তমান ও সাবেক এমপি, আওয়ামী লীগ, বিএনপির একাধিক নেতা ও জামায়াতের এক প্রার্থী। তবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় টিকিট কার হাতে উঠছে এ নিয়ে প্রার্থী ও সমর্থকদের মধ্যে জল্পনা-কল্পনার অন্ত নেই।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা শুরু না হলেও ইতিমধ্যে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ছুটতে শুরু করেছেন আগ্রহী প্রার্থীরা।

উপজেলার বিভিন্ন গ্রামগঞ্জ, হাটবাজারে নির্বাচনী প্রস্তুতি সভা-সমাবেশে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থী ও তার দলীয় কর্মীরা। গেল রমজানে ইফতার পার্টি ও ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে এসব প্রার্থীর পদচারণা ছিল চোখে পড়ার মতো। যার মতো করে দলকে শক্তিশালী করতে কাজ করছেন প্রার্থীরা।

আওয়ামী লীগের দলীয় একটি সূত্র জানায়, দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও বর্তমান এমপি রাজী মোহাম্মদ ফখরুলের পিতা, সাবেক মন্ত্রী এএফএম ফখরুল ইসলাম মুন্সী, কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি প্রবীণ নেতা সাবেক মন্ত্রী ও এমপি এবিএম গোলাম মোস্তফা, বর্তমান এমপি রাজী মোহাম্মদ ফখরুল, কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি অধ্যক্ষ এম হুমায়ূন মাহমুদ, কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রৌশন আলী মাস্টার, দেবিদ্বার উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান সাবেক ছাত্রনেতা একেএম সফিকুল ইসলাম (ভিপি কামাল)।

দেবিদ্বার পৌর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আ. জলিল বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তথ্য-প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজিব ওয়াজেদ জয়ের ঘনিষ্ঠজন ও ডিজিটাল দেবিদ্বার গড়ার রূপকার হিসেবে তরুণ এমপি রাজী মোহাম্মদ ফখরুল ব্যক্তি হিসাবে সর্বমহলে জনপ্রিয়। তার এ জনপ্রিয়তা অবশ্যই প্রধানমন্ত্রী মূল্যায়ন করবেন বলে আমরা তৃণমূল নেতাকর্মীরা আশাবাদী। তাকে ছাড়া অন্য কেউ মনোনয়ন পেলে নৌকার ভরাডুবির আশঙ্কা স্থানীয় নেতাকর্মীদের।

বিএনপি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী সাবেক এমপি ইঞ্জি. মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী, উপজেলা চেয়ারম্যান মো. রহুল আমিন, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল আওয়াল খান, হংকং বিএনপির সভাপতি এএফএম তারেক মুন্সী। জাতীয় পার্টির মনোনয়ন প্রত্যাশী ইকবাল হোসেন রাজু ও জামায়াত প্রার্থী উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম শহীদ। জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় সাইফুল ইসলাম শহীদ স্বতন্ত্র অথবা অন্য কোনোভাবে নির্বাচন করবেন।

এদিকে, দেবিদ্বারে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে ২০০৮ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনেই এখানে জয়লাভ করেছেন বিএনপির ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সি। দল ক্ষমতায় থাকাকালে তার কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে তিনি এবং দল প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েন। ১/১১’র সময় তিনি গ্রেফতার হন এবং তার বিরুদ্ধে মামলাও হয়। ২০০৮ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচন তিনি প্রার্থী হতে না পেরে প্রার্থী হন তার স্ত্রী মাজেদা মুন্সী। তখন জাতীয় পার্টি থেকে সদ্য যোগ দেয়া আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে এবিএম গোলাম মোস্তাফা নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে এমপি নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে এখানে আওয়ামী লীগ থেকে প্রার্থী না দিয়ে মহাজোট থেকে জাপার রাজুকে প্রার্থী করা হয়। আর এই সুযোগটিই লুফে নেন এবিএম গোলাম মোস্তাফার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ফখরুল ইসলাম মুন্সি। তিনি তার ছেলে তৎকালীন দেবিদ্বার উপজেলা চেয়ারম্যান রাজী মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামকে স্বতন্ত্র প্রার্থী করিয়ে অখ্যাত মহাজোট প্রার্থী অধ্যাপক ইকবাল হোসেন রাজুকে পরাজিত করে এমপি হন।

বর্তমানে দৃশ্যত দেবিদ্বার উপজেলা আওয়ামী লীগ গোলাম মোস্তাফা-ফখরুল ইসলাম মুন্সী গ্রুপে বিভক্ত হলেও এই দুই গ্রুপেরও রয়েছে একাধিক ধারা উপধারার উপগ্রুপ। কোন্দলে বিপর্যস্ত দেবিদ্বার উপজেলা আওয়ামী লীগ যদি এখনিই সব ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ না হয় তবে তাদের আগামী নির্বাচনে দিতে হবে চরম মূল্য। যদিও আওয়ামী লীগের উভয় গ্রুপই শঙ্কিত, না জানি এবারো মহাজোট প্রার্থী হিসেবে ইকবাল হোসেন রাজুকে মনোনয়ন দেয়া হয়।

অপর দিকে, কুমিল্লা-৪ দেবিদ্বারের এই আসনটি এক সময় ন্যাপ মোজাফ্ফরের কুঁড়ে ঘরের আসন হিসেবে পরিচিত ছিল। এন্টি আওয়ামী লীগের আসন হিসেবেও এটিকে অভিহিত করা হয়। ফলে এই আসনে ২০০৮ সালের আগে বিএনপি যখনি নির্বাচনে গিয়েছে তখনি বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছে। এখানে বিএনপির মধ্যেও স্পষ্ট দুটি ধারা বিদ্যমান রয়েছে। একটি হচ্ছে সাবেক এমপি ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সি ধারা আরেকটি হচ্ছে কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল আউয়াল খান ধারা। যদিও স্থানীয় বিএনপির অভিমত, দেবিদ্বারে বিএনপির মধ্যে যতই গ্রুপিং থাকুক না কেন, যে প্রার্থীই ধানের শীষ নিয়ে আসবে এই এলাকার জনগণ তাকেই ভোট দেবে বলে ধারণা তার।

দেবিদ্বারে বিএনপির রাজনীতিতে গোলমাল ও বিভাজন থাকলেও নির্বাচনে আসতে পারে নতুন চমক। কার হাতে উঠছে ধানের শীষের টিকিট? এ নিয়ে বিএনপির একাধিক প্রার্থীর মধ্যেও রয়েছে চরম উৎকণ্ঠা, সম্ভাবনা। প্রচার-প্রচারণা এবং দলীয় কমান্ড অনুসরণ করে প্রচারণা চালাচ্ছেন তরুণ প্রার্থী বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান মো. রহুল আমিন। আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে বিএনপির এ নেতা কাজ করে যাচ্ছেন নীরব কৌশলে। তিনি বলেন, আমি বিভিন্ন সময়ে ছুটে গিয়েছি মানুষের দুয়ারে দুয়ারে, সাবেক এমপি ইঞ্জি. মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী দেবিদ্বারের রাজনীতির মাঠে আসতে না পারায় দলের কর্মকাণ্ড টিকিয়ে রেখেছি আমি। সাংগঠনিক শক্তি মজবুত, দলের নেতাকর্মীকে উজ্জীবিত করা, উন্নয়নমূলক কাজ করা এবং নির্যাতিত নেতাকর্মীদের মামলা মোকাদ্দমায় ব্যয়ভার বহন করাসহ পরিবার পরিজনের পাশে দাঁড়িয়েছি। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতারা আমাকে অবশ্যই মূল্যায়ন করবেন বলে আমি আশাবাদী।

৬ জুলাই দেবিদ্বারের বিএনপির সাবেক এমপি ইঞ্জি. মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী তার অফিস কার্যালয়ে উপজেলার বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের কর্মকাণ্ড আরো গতিশীল করা ও বিএনপির সদস্য নবায়ন ও প্রাথমিক সদস্য সংগ্রহ করার লক্ষ্যে উপজেলা দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, ৪ বারের মধ্যে মাত্র ১ বার আমি মনোয়ন চেয়েছি, বাকি ৩ বার দল আমাকে ভালোবেসে মনোনয়ন দিয়েছে। এবারো যদি দল আমাকে মনোনয়ন দেয় আমি নির্বাচন করব, আর যদি দল আমাকে মনোনয়ন না দেয়, অন্য কাউকে দেয় আমি তার জন্যই কাজ করব।

অন্যদিকে, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল আওয়াল খান ও হংকং বিএনপির সভাপতি এএফএম তারেক মুন্সীও দেবিদ্বারের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নে আশাবাদী। বিএনপি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী এএফএম তারেক মুন্সী বলেন, মনোনয়ন বিষয়ে বেগম জিয়া ও তারেক রহমান যাকে যোগ্য মনে করবেন তাকে দেবেন। দল যাকেই মনোনয়ন দেবে আমি তার জন্যই কাজ করব।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর