পাবনা সেচ ও পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের ২০ বিলে জলাবদ্ধতা

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ পাবনা সেচ ও পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের ডি-২ কাকেশ্বরী নদীর পানি নিষ্কাশন ক্যানেলে সোঁতি জালের বাঁধ দেয়ায় পানি নিষ্কাশন বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় প্রকল্পের অভ্যন্তরের ২০টি বিলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে আসন্ন রবি মৌসুমে বিলগুলোর প্রায় আট হাজার বিঘা জমিতে বীজতলা তৈরি, পেঁয়াজ, মরিচ, রসুন, সরিষাসহ শাকসবজি আবাদ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

পাবনার বেড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) একটি সুত্র জানায়, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পাবনা সেচ ও পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের ডি-২ কাকেশ্বরী (নদী) নিষ্কাশন ক্যানেলের চার-পাঁচটি পয়েন্টে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা মাছ ধরার জন্য সোঁতি জালের বাঁধ দিয়েছেন। ফলে প্রকল্পের আওতাভুক্ত বেড়া ও সাঁথিয়া উপজেলার মুক্তরধর বিল, সোনাই বিল, ঘুঘুদহ বিল, জামাইদহ বিল, বড়গ্রাম বিল, খোলসাখালি বিল, কাটিয়াদহ বিল, আফড়া বিল, গাঙভাঙ্গার বিল, টেংড়াগাড়ির বিলসহ প্রায় ২০টি বিলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।

জানা যায়, পাবনা সেচ ও পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের কমান্ড এরিয়ার বেড়া কৈটোলা পাম্পিং স্টেশন থেকে মুক্তরধর বিল পর্যন্ত পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রায় ৩০ কিলোমিটার দৈর্ঘের ডি-২ কাকেশ্বরী নিষ্কাশন ক্যানেল রয়েছে। এ ক্যানেল দিয়ে বর্ষা শেষে পাবনা সেচ প্রকল্পের কমান্ড এরিয়া বেড়া ও সাঁথিয়া উপজেলার প্রায় ২০টি বিলের পানি কৈটোলা স্লুইস গেট দিয়ে যমুনা নদীতে নিষ্কাশিত হয়। বিলগুলো থেকে শত শত মণ রুই, কাতল, লওলা, মৃগেল, বোয়াল, গজার, সোল, আইড়, চিতল, ফলি, শিং, মাগুর, টাকি, টেংরা, পুঁটিসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশী মাছ কাকেশ্বরী নদীতে নেমে আসে। এই মাছ শিকারের জন্য কাকেশ্বরী নিষ্কাশন ক্যানেলের সাঁথিয়া উপজেলার শামুকজানি বাজারের দক্ষিণে ও দত্তপাড়া গ্রামের বড়গ্রাম মাঠের ভিটায় বাঁশ গেঁড়ে চাটাই, পলিথিন বিছিয়ে ঘন সোঁতি জালের বাঁধ পাতা হয়েছে। এতে বিলগুলোর পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় প্রায় আট হাজার বিঘা জমির পাকা, আধাপাকা আমন ধান পানিতে পচে নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।

ভুক্তভোগী স্থানীয় কৃষকরা জানান, বর্ষা মৌসুমে বিলগুলো মাছের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়। বর্ষা শেষে বিলের পানি কাকেশ্বরী নদী হয়ে কৈটোলা স্লুইস গেটের মাধ্যমে যমুনা নদীতে গিয়ে পড়ে। এ সময় পানির সাথে শত শত মণ বিভিন্ন প্রজাতির ছোট-বড় দেশী মাছ কাকেশ্বরী নদীতে নেমে আসে। এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এই মাছ শিকারের জন্য কাকেশ্বরী নদীতে (নিষ্কাশন ক্যানেল) সোঁতি জালের বাঁধ দেয়। এতে পানি নিষ্কাশন বাঁধাপ্রাপ্ত হয়ে বিলগুলোতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। ঘুঘুদহ বিল পাড়ের কৃষক উজ্জল হোসেন জানান, সোঁতি জালের বেড়ার কারণে বিল থেকে পানি নামতে অনেক দেরি হচ্ছে। ফলে বীজতলা তৈরি এবং পেঁয়াজ, মরিচ, রসুন, সরিষাসহ শাকসবজি আবাদ পিছিয়ে পড়বে। আর বীজতলা তৈরি, পেঁয়াজ, মরিচ, রসুন, সরিষাসহ শাকসবজি আবাদ পেছালে বোরো ধানের আবাদ পেছাবে। এতে ফলন অনেক কম হবে।

স্থানীয় কৃষকরা আরো জানান, ডি-২ নিষ্কাশন ক্যানেল দিয়ে পানি নিষ্কাশিত হয়ে বিলগুলোর হাজার হাজার হেক্টর সমতল ভূমি জেগে উঠে। স্থানীয় কৃষকরা জেগে ওঠা সমতল ভূমিতে বীজতলা তৈরি, পেঁয়াজ, মরিচ, রসুন, সরিষা, শাকসবজিসহ বিভিন্ন ফসল আবাদ করে থাকেন। নিষ্কাশন ক্যানেলে সোঁতি জালের বাঁধ দেয়ায় সৃষ্ট জলাবদ্ধতা দ্রুত নিরসন না হলে আসন্ন রবি মৌসুমে প্রায় সাত হাজার বিঘা জমিতে ফসল আবাদ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এতে স্থানীয় কৃষকরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এ দিকে জমিতে আমন ধান পাকতে শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক ক্ষেতের ধান পেকে গেছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে কৃষকরা পুরোদমে আমন ধান কাটতে শুরু করবেন। জমিতে পানি থাকার কারণে পাকা ধান জমিতেই নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেছেন তারা।

বিল পাড়ের আফড়া গ্রামের কৃষক আজিবর শেখ বলেন, আমার ক্ষেতের ধান পেকে গেছে। ক্ষেতে পানি থাকার কারণে ধান কাটতে পারছি না। কবে বীজতলা তৈরি করব আর কবেই বা জমিতে বপন করব। একই গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গির ও সাত্তার খা বলেন, আমরা একদিকে যেমন পাকা ধান কাটতে পারছি না, অন্য দিকে বীজতলা দেয়ার জন্য জমিতে ছাই দিতে পারছি না। সংগ্রহ করা ছাই স্তূপ করে সড়কের পাশে রাখা হয়েছে। সময় মতো ওই ছাই জমিতে প্রয়োগ করতে না পারলে রোদে শুকিয়ে ছাইয়ের গুণগতমান কমে যাবে। তারা আরো জানান, বিলে প্রত্যেকের ১৫-১৬ বিঘা জমিতে আমন ধান আছে। ধান কাইটা কালাই, পিঁজের দানা, শরিসার আবাদ করব। যদি সুতি জালের কারণে বিলির পানি আটকে থাকে, তাহলি আমাগের পিঁজির দানা চারা, মুরিকাটা পিঁজ লাগানো ক্ষতি হবে।

পাবনার বেড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাব চৌধুরী বলেন, পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টিকারী সোঁতি জালের বাঁধ দিয়ে মাছ শিকার না করার জন্য সতর্ক করে দিয়েছি। কৃষকের ক্ষতি হবে এমনটা আমরা কখনোই মেনে নেবো না। সরেজমিন পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে।

এ ব্যাপারে সাঁথিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সঞ্জিব কুমার গোস্বামী বলেন, সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানদের স্থানীয়ভাবে সোঁতি জালের বাঁধ অপসারণ করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। এতে যদি কাজ না হয় তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সাঁথিয়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, পাবনা সেচ ও পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের ডি-২ নিষ্কাশন ক্যানেলে সোঁতি জালের বাঁধ দেয়া হয়েছে কি না সেটা আমার জানা নেই। যদি কেউ দিয়ে থাকে তাহলে সেটা অবৈধ। তিনি বলেন, আমরা এলাকা পরিদর্শ করব এবং অভিযান চালিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে সোঁতি জাল ও বাঁশের বাঁধ অপসারণ করব।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর