পাকুন্দিয়ায় তলিয়ে গেছে ফসলি জমি কৃষকের কান্না

পাকুন্দিয়ায় বানের পানিতে তলিয়ে গেছে উপজেলার চরাঞ্চলের অন্তত সাড়ে তিন হাজার একর ফসলি জমি। বিনষ্ট হয়ে গেছে জমির রকমারি সবজি, তুলা আর রোপা আমন ধান। ফসলহারা কৃষকের মাঝে চলছে আহাজারি। জীবন-জীবিকা নিয়ে সংকটে পড়েছেন তারা। রোববার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত সরজমিন পাকুন্দিয়া উপজেলার সবজিভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত চরফরাদী, এগারোসিন্দুর ও জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে কৃষকের এমন দুরবস্থার চিত্রই পাওয়া গেছে।
কৃষকেরা বলছেন, গত এক সপ্তাহ আগে ব্রহ্মপুত্র নদ এলাকার চরাঞ্চল প্লাবিত হয়ে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি তলিয়ে যায়। বােেনর পানিতে ফসল তলিয়ে যাওয়ায় সেখানকার কৃষক সর্বশান্ত হয়ে পড়েছেন। কৃষকেরা জানিয়েছেন, বানের পানিতে চরফরাদী ইউনিয়নের চরআলগীর চর, মির্জাপুরের চর, দক্ষিণ চরটেকীর চর, গোলোয়ার চর, এগারোসিন্দুর ইউনিয়নের বাহাদিয়ার চর এবং জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের মুনিয়ারীকান্দার চরসহ আশপাশের চর এলাকা বানের পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে বিস্তীর্ণ এই চরাঞ্চলজুড়ে কৃষকের রকমারি সবজি যেমন কুমড়া, ধুন্দল, করলা, কাঁচা মরিচ, বেগুন, পটল, লাউ, ঝিঙ্গা, লালশাক, মুলাশাক, ডাঁটা, কাকরোল ও হাইব্রিড শিমসহ সব ধরনের সবজির ক্ষেত এখন পানির নিচে চলে গেছে। এছাড়া পাট, রোপা আমন ধান এবং তুলাক্ষেতও পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বিনষ্ট হয়ে গেছে। কৃষকের পক্ষে এই ক্ষতির ধকল সামলে ওঠা খুবই দুরুহ হবে বলেও তারা জানান।
স্থানীয় কৃষক মো. আল মামুন জানান, বন্যার পানিতে চরআলগীর চরের অন্তত ৭শ’ একর, মির্জাপুরের চরের অন্তত পাঁচশ’ একর, দক্ষিণ চরটেকীর চরের অন্তত এক হাজার একর, গোলোয়ার চরের অন্তত দুইশ’ একর, বাহাদিয়ার চরের অন্তত পাঁচশ’ একর এবং মুনিয়ারীকান্দার চরের অন্তত তিনশ’ একর ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। এসব জমির বেশিরভাগেই রকমারি সবজি চাষ করা হয়েছিল। এই চরাঞ্চলের উৎপাদিত সবজি দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়। এখন জমি তলিয়ে যাওয়ায় সেই সরবরাহও বন্ধ হয়ে গেছে।
চরকাওনা গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, এক একর জমিতে তিনি কাঁচা মরিচ, ধুন্দল ও ঝিঙ্গা করেছিলেন। জমিতে উৎপাদিত সবজি বিক্রি করেই তিনি সংসারের যাবতীয় খরচ চালাতেন। কিন্তু বানের পানিতে জমি তলিয়ে যাওয়ায় তিনি এখন চরম দুরবস্থার মধ্যে পড়েছেন।
চরকাওনা পশ্চিমপাড়ার কৃষক মো. বেল্লাল মিয়া জানান, তিনি দুই একর জমিতে বেগুন, কাঁচা মরিচ, ধুন্দল ও পাট চাষ করেছিলেন। জমিতে উৎপাদিত ফসল বিক্রি করেই তিনিও সংসার চালাতেন। কিন্তু পুরো চরজুড়েই এখন অথৈই পানি।
একই এলাকার কৃষক রুবেল মিয়া, আবদুল বাতেন, আবদুস সাহিদ, বাবুল মিয়া, নুরুল ইসলাম, আবুবকর, খলিলুর রহমান, মীর হোসেন, কাইয়ুম মিয়া বন্যায় ফসলহানির পর নিজেদের দুরবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। চরকাওনা মুনিয়ারীকান্দা গ্রামের কৃষক নূর নবী জানান, তিন একর জমিতে সবজি ছাড়াও তিনি ১০ একর জমিতে বাণিজ্যিকভিত্তিতে তুলা চাষ করেছিলেন। তুলা চাষ করতে গিয়ে তুলা উন্নয়ন বোর্ড থেকে তিনি তিন লাখ টাকার মতো ঋণও নিয়েছেন। ঋণ আর ধার দেনা করে সাত লাখ টাকা তিনি তুলা চাষে খরচ করেছেন। কিন্তু এখন সবই বানের পানির নিচে। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘অহন আমি রেইন অই দিমু ক্যামনে আর চলবাম অই ক্যামনে।’
এদিকে বন্যায় ফসলহানি এবং ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের খবর পেয়ে রোববার কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. সোহরাব উদ্দিন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বন্যায় ফসলহানিতে কৃষকের যে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, তা অবর্ণনীয়। স্থানীয় প্রশাসনকে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তরা যেন প্রয়োজনীয় সহায়তা পেতে পারেন এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেণ গ্রহণ করা হবে।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর