সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ

গত ১৫ মার্চ প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিলেটে ২২ মার্চ আওয়ামী লীগের তৃণমূল প্রতিনিধিদের বিভাগীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক এ কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি সভা ১৪ মার্চ বিকালে সিলেটের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। সভার পর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী তার ফেসবুকে ছবিসহ স্ট্যাটাস দেন। এতে বলা হয়, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের তৃণমূল প্রতিনিধি সমাবেশের প্রস্তুতি সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মো. রাহাত আনোয়ার। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জেলা প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ওই সভায় সভাপতিত্ব করা ও বক্তব্য রাখার কথা স্বীকার করেন। রাজনৈতিক দলের সভায় রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রস্তুতি সফল করতে এ রকম সভা সরকারি দফতরে আয়োজন করা এবং এতে জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্ব করা নিয়ে খোদ প্রশাসনে চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, আমাদের শাসনব্যবস্থায় মাঠ প্রশাসন কেন্দ্রীয় সরকারের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় হচ্ছে মাঠ প্রশাসনের কেন্দ্রস্থল। অন্যান্য দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সঙ্গে মাঠ প্রশাসন জাতীয় নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন পরিচালনা করে থাকে। প্রচলিত সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালায় কোনো সরকারি কর্মচারীর (কর্মচারী বলতে কর্মকর্তাকেও বোঝাবে) কোনোভাবেই কোনো রাজনৈতিক দল বা এর কোনো অঙ্গ সংগঠনের সঙ্গে জড়িত হওয়া বা তাদের কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ হলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভাবধারায় বিশ্বাসী মাঠ প্রশাসনের একশ্রেণীর কর্মকর্তার এরূপ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণের মাত্রা দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে। এতে স্বাভাবিকভাবে যে প্রশ্নটি উঠতে পারে তা হল, এরূপ মাঠ প্রশাসন দ্বারা পরিচালিত আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়া সম্ভব হবে কি?

আমাদের সংবিধান জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত করলেও কমিশনের পক্ষে এ নির্বাচন পরিচালনা করে মূলত মাঠ প্রশাসন। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এ সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে কাকে নিয়োগ দেয়া হবে সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা না থাকলেও কমিশন কর্তৃক ডিসিকে রিটার্নিং অফিসার ও ইউএনওকে সহকারী রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ প্রদান একটা নিয়মে পরিণত হয়েছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে প্রাপ্ত ক্ষমতাবলে রিটার্নিং অফিসার মাঠ পর্যায়ে নির্বাচন পরিচালনার জন্য প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসারদের নিয়োগ দেন। এ আদেশে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে একজন রিটার্নিং অফিসার তার কর্তৃত্বাধীন এলাকায় সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনার স্বার্থে প্রয়োজনীয় যে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। প্রতিটি কন্সটিটুয়েন্সিতে একজন সহকারী রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি রিটার্নিং অফিসারকে তার দায়িত্ব পালনে সব ধরনের সহায়তা প্রদান করেন। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক কোনো শর্ত আরোপ সাপেক্ষে তিনি রিটার্নিং অফিসারের নিয়ন্ত্রণে থেকে রিটার্নিং অফিসারের ক্ষমতা ভোগ ও কার্যাবলী সম্পন্ন করেন। নির্বাচনের সময় আইনশৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, এসপি, ওসিসহ পুলিশ এবং অন্যান্য আইনশৃংখলা বাহিনী। ডিসি, ইউএনও, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, এসপি, ওসি- এসব কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণ অর্থাৎ তাদের পদোন্নতি, বদলিসহ তাদের বিরুদ্ধে শৃংখলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা সরকারের হাতে থাকায় সরকারের পক্ষে নির্বাচনে তাদের দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা অনেকটা সহজ হয়। তাই নির্বাচন কমিশন যতই শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ হোক, সরকারের সদিচ্ছা না থাকলে এবং নির্বাচন পরিচালনাকারী মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা নিরপেক্ষ না থাকলে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়।

বিগত চার দশকের বেশি সময়কালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৯১-২০০৮ সময়কালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে অনুষ্ঠিত কয়েকটি নির্বাচন ছাড়া দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত কোনো সাধারণ নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হয়নি। দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত কোনো সাধারণ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের পরাজিত হওয়ার কোনো নজির নেই। ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও প্রশাসনযন্ত্রকে ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর দু’জন সামরিক শাসক সামরিক ও বেসামরিক পোশাকে ১৫ বছর দেশ শাসন করেন। তারা বেসামরিক পোশাকে রাজনৈতিক দল গঠন করে যে তিনটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন, সেসব নির্বাচনে জয়লাভের জন্য তারা মাঠ প্রশাসনসহ পুরো প্রশাসনযন্ত্রকে ব্যবহার করেন। এসব নির্বাচনের ফল ছিল অনেকটাই পূর্বনির্ধারিত। নির্বাচনের ফল আগে থেকেই ছকে বাঁধা থাকায় রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তা কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। মানুষ নির্বাচনের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বিলোপের পর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনেকটা একদলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচনেও মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। গত তিন বছরে অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচন, পৌরসভা নির্বাচন ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে রয়েছে গুরুতর অভিযোগ।

একাধিক কারণে আগামী (একাদশ) জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা বজায় না থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এক. সংসদীয় গণতন্ত্রে জাতীয় সংসদ বহাল রেখে পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের নজির না থাকলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তাদের গত মেয়াদে (২০০৯-১৩) সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদ বহাল রেখে পরবর্তী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান করে। এর অর্থ দাঁড়ায়, প্রায় একদলীয় দশম সংসদ নির্বাচনে সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার তিন-চতুর্থাংশের বেশি আসনে যেসব আওয়ামী লীগ প্রার্থী জয়ী হয়েছেন, তারা সবাই একাদশ সংসদ নির্বাচনের সময় ক্ষমতায় থাকবেন। ক্ষমতাসীন দলের এমপি ও মন্ত্রীদের স্বার্থহানি হয় এমন অবস্থান নিয়ে মাঠ প্রশাসনের পক্ষে নিরপেক্ষভাবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।

দুই. মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানেন, যে সরকার ক্ষমতায় আসবে সে সরকারই তাদের রক্ষা করাসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে পারবে। তাই নির্বাচন কমিশন কোনো শাস্তি দিলেও শেষমেশ তা কার্যকর করতে পারবে না। সঙ্গত কারণে প্রশাসনের যারা বেনিফিশিয়ারি তারা নিজেদের স্বার্থেই সরকারের পরিবর্তন চাইবেন না।

তিন. কেন্দ্রীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেকে আছেন যারা আওয়ামী লীগের ভাবাদর্শে বিশ্বাসী। তারা মনেপ্রাণে চান একাদশ সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ আবার সরকার গঠন করুক। আগামী সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে জয়ী করতে এসব কর্মকর্তা মাঠ প্রশাসনে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের ওপর যে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করবেন তা অনেকটা জোর দিয়েই বলা যায়। বাস্তব অবস্থার কারণে কেন্দ্রীয় সরকারের এসব ক্ষমতাবান কর্মকর্তার প্রভাবমুক্ত হয়ে মাঠ প্রশাসনে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের পক্ষে নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন পরিচালনা করা কঠিন হবে।

সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের পথে কোনো দলবাজ কর্মকর্তা বাধা হয়ে দাঁড়ালে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে মর্মে নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার যত হুশিয়ারি দেন না কেন, নির্বাচনকালীন মাঠ প্রশাসন কোনো পক্ষ নিয়ে কাজ করলে নির্বাচন কমিশন তা প্রতিহত করতে পারবে না। তবে কমিশন কয়েকটি ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হলে অবস্থার অনেকটা উন্নতি হতে পারে। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে যেসব পদক্ষেপ নিতে হবে তার মধ্যে রয়েছে- এক. একাদশ সংসদ নির্বাচনের সময় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং তাদের অধীন অধিদফতর, পরিদফতরের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি, বদলি ইত্যাদির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দুই. মাঠ প্রশাসনের যেসব দলবাজ কর্মকর্তা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে, কমিশনের নিজস্ব সোর্সের মাধ্যমে তাদের চিহ্নিত করে নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা নেই এমন পদে তাদের বদলির ব্যবস্থা করতে হবে। তিন. নির্বাচনকালীন মাঠ প্রশাসনকে নিরপেক্ষ থাকতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা করে মাঠ প্রশাসন যে সুনাম অর্জন করেছিল, তা স্মরণ করে দিয়ে হৃতগৌরব পুনরুদ্ধারে তাদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। চার. নির্বাচন পরিচালনার ব্যাপারে কমিশনকে সরকারি দলসহ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দলের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে এবং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে তাদের পূর্ণ সহযোগিতা চাইতে হবে। অবশ্য সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সবচেয়ে বেশি দরকার সরকারের সদিচ্ছা ও সহযোগিতা।

সরকারের সদিচ্ছা ও সহযোগিতা, বিরোধী দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ এবং কমিশন ও মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতায় একাদশ সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হোক- এটাই জাতির প্রত্যাশা।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর