,



চালের দরে মিলারদের কারসাজি চলছেই আমনেও ভোক্তার স্বস্তি ফেরেনি

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ খাদ্য মন্ত্রণালয় বলছে, দেশে চালের কোনো ঘাটতি নেই। তবুও খুচরা বাজারে সব ধরনের চাল এক মাসের বেশি সময় ধরে কেজিতে ৪ থেকে সর্বোচ্চ ৬ টাকা বাড়তি দরে বিক্রি হচ্ছে।

পাইকারি ও খুচরা বি ক্রেতারা বলছেন, ধানের দাম বাড়ার অজুহাতে মিলাররা চালের দাম বাড়িয়েছে। তবে দাম কমার আশায় সবাই তাকিয়ে ছিলেন আমনের দিকে। ধারণা ছিল আমন উঠলেই চালের দাম কমবে। কিন্তু না, বাজারে আমন ওঠার পরও দাম কমেনি। বরং বাড়তি দরেই বিক্রি হচ্ছে। এতে আমন মৌসুমেও ভোক্তাদের বাড়তি দরে চাল কিনতে হচ্ছে। ফলে নিু ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের নাভিশ্বাস বাড়ছে।

এদিকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হালনাগাদ পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, সরকারি গুদামে খাদ্যশস্যের মোট মজুদ আছে ১৩ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে চাল ১০ লাখ ৫৭ হাজার টন এবং গম ৩ লাখ ২৮ হাজার টন। সেখানে এটাও বলা আছে- খাদ্যশস্যের মজুদ সন্তোষজনক। মাসিক চাহিদা ও বিতরণ পরিকল্পনার তুলনায় পর্যাপ্ত খাদ্যশস্যের পর্যাপ্ত নিরাপদ মজুদ রয়েছে। এ মুহূর্তে খাদ্যশস্যের কোনো ঘাটতি নেই বা ঘাটতির সম্ভাবনা নেই। তবুও বাজারে চালের দাম বাড়তি।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) বলছে, এক মাস ধরে খুচরা বাজারে সরু চালের মধ্যে ভালো মানের নাজিরশাল ও মিনিকেট চাল ৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি মানের চাল ৪ দশমিক ২৬ শতাংশ বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। আর মোটা চাল ৪ দশমিক ২৯ শতাংশ বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, দেশে পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও চালের দাম বৃদ্ধির পেছনে মিল মালিকদের কারসাজি আছে। তবে নতুন ধান ওঠা শুরু হয়েছে। তাই দ্রুতই দাম কমে আসবে। চাল নিয়ে কারসাজির বিরুদ্ধে ২২টি মনিটরিং টিম কাজ করছে। ৯ নভেম্বর থেকে ধানের দাম বাড়ার অজুহাতে কারসাজি করে মিল পর্যায় থেকে মিলমালিকরা চালের দাম বাড়ায়। এখন পর্যন্ত তারা মিল পর্যায়ে প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) চালে ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা বাড়তি দরে বিক্রি করছে।

জানতে চাইলে কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান যুগান্তরকে বলেন, এখন আমনের মৌসুম। স্বাভাবিকভাবে প্রত্যাশা ছিল দাম কমবে। কিন্তু দাম কমার কোনো প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। তার মতে, নিুবিত্ত মানুষের আয়ের একটা বড় অংশ চাল কিনতে ব্যয় হয়ে যায়। তাই সংশ্লিষ্টদের বাজার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে চালের দাম কমাতে হবে। শনিবার নওগাঁ, দিনাজপুর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের চালের মোকামের মিলমালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মোকামে যে মিনিকেট চাল প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) এক মাস দুই হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। সেই চাল এখন ২২৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। নাজিরশাল প্রতি বস্তা বিক্রি হচ্ছে ২৫০০ টাকায়। যা এক মাস আগে ২৪০০ টাকা ছিল। বিআর-২৮ বিক্রি হচ্ছে ১৭৫০ টাকায়। যা আগে ছিল ১৬০০ টাকা। এ ছাড়া স্বর্ণা চাল প্রতি বস্তার দাম ছিল ১৫০০ টাকা। যা এখন বিক্রি হচ্ছে ১৬০০ টাকায়। তারা বলছেন, গত মাস থেকে ধানের দাম বেড়েছে। যে কারণে চাল তৈরিতে খরচ বেড়েছে। এ কারণে দাম বাড়তি। তবে কিছুদিনের মধ্যে কমে আসবে।

রাজধানীর চালের আড়ত কারওয়ান বাজারের আল্লাহর দান রাইস এজেন্সির মালিক ও পাইকারি চাল ব্যবসায়ী সিদ্দিকুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, শনিবার মিনিকেট চাল বিক্রি হয়েছে প্রতি বস্তা ২৩০০ টাকা। যা এক মাস আগে ছিল ২১০০ টাকা। নাজিরশাল প্রতি বস্তা বিক্রি হয়েছে ২৭৫০ টাকা। যা এক মাস আগে বিক্রি হয়েছে ২৬০০ টাকা। বিআর-২৮ চাল বিক্রি হয়েছে দুই হাজার টাকা। যা এক মাস আগে বিক্রি হয় ১৮০০ টাকা। এছাড়া স্বর্ণা চাল প্রতি বস্তা বিক্রি হয় ১৭০০ টাকা। যা এক মাস আগে বিক্রি হয়েছে ১৬০০ টাকা।

তিনি বলেন, এক মাস আগে থেকেই মিলাররা কারসাজি করে দাম বাড়িয়েছে। ধানের দাম বাড়ার অজুহাতে তারা সব ধরনের চালের দাম বাড়িয়েছে। তাদের কাছে চালের অর্ডার দিলে তারা বাড়তি রেট (দর) আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে। তাই সে দামেই আমাদের আনতে হচ্ছে। বিক্রিও করতে হচ্ছে বাড়তি দরে। কিন্তু বাজারে আমন চাল আসতে শুরু করেছে। তবুও তারা চালের দাম কমাচ্ছে না।

রাজধানীর মালিবাগ কাঁচাবাজার, নয়াবাজার ও কারওয়ান বাজারের খুচরা চাল বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এদিন প্রতি কেজি মিনিকেট চাল বিক্রি হয়েছে ৪৮-৫০ টাকা। যা এক মাস আগে বিক্রি হয় ৪২-৪৪ টাকা। বিআর-২৮ বিক্রি হয়েছে ৩৮-৪০ টাকা। যা এক মাস আগে বিক্রি হয়েছে ৩৪-৩৫ টাকা। এ ছাড়া মোটা চালের মধ্যে স্বর্ণা বিক্রি হয়েছে ৩৮ টাকা। যা এক মাস আগে ৩২-৩৩ টাকায় বিক্রি হয়।

কারওয়ান বাজারে চাল কিনতে আসা বোরহান উদ্দিন বলেন, চালের দাম কমেনি। বিক্রেতারা বেশি দরে এখনও চাল বিক্রি করছে। যা আমাদের মতো সাধারণ ভোক্তাদের দিশেহারা করে ফেলছে। তিনি বলেন, বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে। আর ভোক্তারা বাড়তি দরেই ক্রয় করে। এটা যেন একটা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। বাজার পরিস্থিতি দেখে ব্যবস্থা নেয়ার মতো যেন কেউ নেই।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরে ৫৮ লাখ ৭৯ হাজার হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে এক কোটি ৫৩ লাখ ৫৭ হাজার টন। কিন্তু অধিদফতরের তথ্যমতে, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আরও বেশি হয়েছে। সব জেলায় ধান কাটা শেষ হলে আসল চিত্র তুলে ধরা যাবে। তবে অধিদফতর বলছে, সারা দেশে এখন পর্যন্ত ৭০ শতাংশেরও বেশি জমির ধান কাটা শেষ হয়েছে। হিসাব মতে, এরই মধ্যে ৪২ লাখ হেক্টর জমির ধানা কাটা হয়েছে। আর বাজারেও চাল আসতে শুরু করেছে।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর