বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আগামী ২৫ ডিসেম্বর দেশে আসছেন। প্রায় ১৭ বছর পর তিনি দেশের মাটিতে পা রাখবেন। গত শুক্রবার রাতে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই বার্তা দেন এবং তারেক রহমানের দেশে ফেরার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তাঁর দেশে ফেরার এই সংবাদে বিএনপির নেতাকর্মী তো বটেই, দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে। দেশের মাটিতে তাঁকে স্বাগত জানানোর জন্য সবাই প্রস্তুত। কারণ, তারেক রহমান শুধু বিএনপির নেতাই নন, তিনি জাতীয় নেতায় পরিণত হয়েছেন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং কৌশলগত কারণে তিনি দীর্ঘদিন দেশ থেকে বহুদূর লন্ডনে থাকলেও তিনি কর্মকাণ্ডে দেশের মাটি ও মানুষের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছেন। অতি ডান ও অতি বামপন্থী রাজনীতি চর্চার দেশে তিনি মধ্যপন্থী হিসেবে ডান-বাম এবং সর্বশ্রেণি পেশার মানুষের কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য নেতার আসনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত এবং অপরিহার্য করে তুলেছেন।
৯২ ভাগ মুসলমানের দেশে অনেক ইসলামী চেতনার যোগ্য নেতা রয়েছেন; কিন্তু মুসিলম-হিন্দু-খ্রিষ্টান-বৌদ্ধসহ সব ধর্ম ও মতের শ্রেণিপেশার মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারেননি। স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সুযোগ্য পুত্র হিসেবে তারেক রহমান কর্মের মাধ্যমে সে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছেন। বিশ্ব রাজনীতির ঘুর্ণিপাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং হিন্দুত্ববাদী ভারত যে চাণক্য রাজনীতিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে এবং বিভিন্ন নেতা ও দল বিভিন্নমুখি রাজনীতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন; সেখানে খাঁটি বাংলাদেশপন্থী রাজনীতিক হিসেবে তারেক রহমনান পিতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মতো নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন। বিশ্ব রাজনীতি ও আঞ্চলিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে দেশের নেতৃত্বের জন্য তিনি হয়ে উঠেছেন অপরিহার্য নেতা। অপ্রিয় হলেও সত্য যে পাকিস্তানের দিকে তাকালে কি দেখছি? আয়তনে বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বড় পাকিস্তান কেবল যোগ্য নেতৃত্বের সংকটে দেউলিয়া হওয়ার পথে। আবার যোগ্য নেতৃত্ব দেউলিয়া শ্রীলংকাকে টেনে তুলেছে। আফগানিস্তানের কথা নাইবা বললাম।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতনের পর দেশের নতুন প্রেক্ষাপটে, দেশ পুনর্গঠন ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। যার হাতে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিরাপদ থাকবে, এমন একজন জাতীয় নেতার অভাব জনগণ খুব অনুভব করছে বেশকিছুদিন থেকে। তারেক রহমানও প্রতিনিয়ত জনগণের এ অনুভব উপলব্ধি করে আসছেন। সকলেই আশা করেছিল, হাসিনার পতনের পর তিনি দ্রæতই দেশে ফিরবেন। বিএনপির পক্ষ থেকে বরাবরই বলা হয়েছে, তিনি শিগগিরই দেশে ফিরবেন। তবে তাঁর এই ফেরা নিয়ে জনগণের অপেক্ষা যেন শেষ হচ্ছিল না। গত ২৩ নভেম্বর তাঁর মা বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া অত্যন্ত সংকটজনক অবস্থায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হলে সকলেই ধরে নিয়েছিল, এবার হয়ত তিনি দেরি না করে দেশে ফিরবেন। এ নিয়ে যখন নানা আলাপ-আলোচনা চলছিল, তখন তিনি তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুকে দেয়া পোস্টের এক অংশে লিখেছিলেন, ‘দেশে ফেরার বিষয়টি তাঁর একক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে না’। অন্তর্বর্তী সরকার সাথে সাথে তাঁর পোস্টের প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, ‘দেশে ফিরতে তারেক রহমানের কোনো বাধা নেই এবং তাঁর সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেয়ার পদক্ষেপ নেয়া হবে’। অবশেষে তারেক রহমান দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত যে সময়োপযোগী, প্রজ্ঞাপূর্ণ এবং রাজনৈতিক দূরদর্শী, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই।
আমি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে বলছি না, বলছি, একজন জাতীয় নেতার দেশে ফেরার কথা। জাতির জন্য প্রয়োজন, এমন নেতার কথা। এ কথা অনস্বীকার্য, তারেক রহমান তাঁর প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দিয়ে নিজেকে দলের ঊর্ধ্বে নিয়ে জাতীয় নেতায় পরিণত হয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক, এমনকি তাঁর বিরুদ্ধবাদীরাও স্বীকার করে, তাঁর ক্যারিশমাটিক নেতৃত্ব তাঁকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। তিনি দেশের জনপ্রিয় নেতায় পরিণত হয়েছেন। দেশে যে নেতৃত্ব শূন্যতা চলছে, তা পূরণে তাঁর মতো এমন সাহসী, বিচক্ষণ, প্রজ্ঞাবান ও সক্ষম নেতার বিকল্প নেই। জনগণও মনে করে, তারেক রহমানই পারবেন দেশের ক্রান্তিকালে দেশের দিশারী হয়ে উঠতে। তার হাত ধরেই দেশের গণতন্ত্রের পথ প্রশস্ত এবং অর্থনৈতিক উন্নতি-অগ্রগতি ও জনগণের ভাগ্য পরিবর্তিত হবে। অপ্রিয় হলেও সত্য যে দেশের মানুষ দেখেছে তারেক রহমান লন্ডনে বসে শুধু বিএনপি পরিচালনা করেননি। তিনি একদিকে সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন; অন্যদিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্পায়ন, বেকারত্ম দূরীকরণ, কৃষি উৎপাদন বাড়ানোসহ সবকিছু নিয়ে নিজেদের ভাবনা তুলে ধরেছেন। তিনি যে দেশের মাটি মানুষ ও নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যত নিয়ে প্রচুর গবেষণা, পড়াশোনা এবং সুচিন্তা করেছেন তা বলাবাহুল্য।
দেশের অর্থনীতি এখন শোচনীয় পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেছে। বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রফতানি, শিল্পোৎপাদন থেকে অর্থনীতির সবখাতে স্থবিরতা বিরাজ করছে। মানুষের আয় কমে গেছে, বেকারত্ব হু হু করে বাড়ছে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্যয়সংকুলান করতে কর্মী ছাঁটাই করছে। গত এক বছরের বেশি সময়ে শত শত শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। লাখ লাখ কর্মজীবী বেকার হয়েছে। সাধারণ মানুষ দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে। অর্থনৈতিক এই শোচনীয় পরিস্থিতির মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। একের পর এক টার্গেট কিলিং হচ্ছে। মবসন্ত্রাস বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশকে অস্থিতিশীল ও নির্বাচন বানচাল করার জন্য পতিত আওয়ামী লীগ ও ভারত ক্রমাগতভাবে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত করে যাচ্ছে।
গত শুক্রবার জুলাই যোদ্ধা শরিফ ওসমান বিন হাদির ওপর যে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, তা এই ষড়যন্ত্রেরই অংশ হিসেবে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। এতে কার লাভ, তা বোধ করি ব্যাখ্যা করে বলার অবকাশ নেই। দেশের এমন শোচনীয় ও শঙ্কাজনক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে তারেক রহমানের মতো যোগ্য নেতার প্রয়োজন। গণতন্ত্রকে সুসংহত করে দেশকে কীভাবে উন্নত ও মর্যাদার আসনে নিয়ে যাওয়া যায়, মানুষের জীবনমান উন্নত করা যায়- সে পরিকল্পনা, চিন্তা ও দর্শন প্রতিনিয়ত তিনি জাতির সামনে তুলে ধরেছেন। জনগণও মনে করছে, তারেক রহমানই সেই নেতা, যিনি দেশকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারবেন।
পবিত্র কুরআনের সূরা আলে ইমরানের ২৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ এরশাদ করেছেন, ‘রাজত্বের মালিক আল্লাহ। তিনি যাকে চান রাজত্ব দেন, যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজত্ব কেড়ে নেন এবং যাকে চান সম্মান দান করেন, যাকে চান অপমানিত করেন। তার হাতেই কল্যাণ। নিশ্চয়ই তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।’ একই সূরার ২৭ নম্বর আয়াতে তিনি বলেছেন, ‘তিনি রাতকে দিনের মধ্যে প্রবেশ করান এবং দিনকে রাতের মধ্যে প্রবেশ করান। আর মৃত থেকে জীবিতকে বের করেন এবং জীবিত থেকে মৃতকে বের করেন। আর যাকে চান বিনা হিসাবে রিজিক দান করেন।’ মহান আল্লাহ তার বান্দার কল্যাণে প্রতি জনপদেই প্রতিনিধি নির্ধারণ করে দেন। সেই প্রতিনিধির মধ্যে প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দান করে তাকে দিয়ে কর্মসাধন করিয়ে নেন। যিনি আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞানের সদ্ব্যবহার করে দেশের সেবা করতে চান, আল্লাহ তাকে সাহায্য করেন।
তারেক রহমান দেশের সেবা এবং দায়িত্ব নেয়ার জন্য যে প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের পরিচয় দিচ্ছেন, তাতে মহান আল্লাহর রহমত তার সাথে রয়েছে। দেশের মানুষ তাঁকে বরণ করে নিতে প্রস্তুত।
তারেক রহমানের দেশে ফিরুক, তা যেমন পতিত আওয়ামী লীগ ও ভারত চায় না, তেমনি দেশের ভেতরের কোনো কোনো গোষ্ঠীও চায় না। ভারত চাইবে না, কারণ ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেন তথা বিএনপিকে ক্ষমতাচ্যুত করার ক্ষেত্রে তাদের ষড়যন্ত্র ছিল। তারেক রহমানকে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রেও ভারতের হাত ছিল বলে রাজনৈতিক মহলে বিস্তর আলোচনা রয়েছে। ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি তার বইয়ে ওয়ান-ইলেভেন কাণ্ড স্বীকার করে গেছেন। কাজেই, তারেক রহমান যাতে দেশে ফিরতে না পারেন, সে অপচেষ্টা তাদের থাকবে। অন্যদিকে, পতিত আওয়ামী লীগ ও দেশের একটি গোষ্ঠীও তার প্রত্যাবর্তন চাইবে না। ইতোমধ্যে তার আলামত দেখা গেছে। দেশে ঘোলাটে পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গুলিতে গুরুতর আহত হাদিকে দেখতে গিয়ে মির্জা আব্বাসকে যেভাবে হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে, তা উসকানিমূলক এবং পরিস্থিতি ঘোলাটে করার দূরভিসন্ধি ছাড়া কিছু নয়। এসব আলামত তারেক রহমানের নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ ব্যাপারে সরকারকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হবে।
যদিও সরকার বলেছে, তারেক রহমানের পূর্ণ নিরাপত্তা দেয়া হবে। সরকার তাঁকে বহন করার জন্য বুলেটপ্রুফ গাড়ি আনার অনুমতি দিয়েছে। সেই গাড়ি এখন প্রস্তুত। বিএনপি দলীয়ভাবে তাঁর নিরাপত্তা, থাকার বাসস্থান এবং কার্যালয়ের প্রস্তুতি শেষ করেছে। দলীয় নেতাকর্মী এবং দেশের মানুষের কাছে সহযোগিতা চেয়েছে। দেশের মানুষ তাদের প্রিয় নেতাকে সেই নিরাপত্তা দেবে। তবে সকল নিরাপত্তা দেয়ার মালিক ও ভরসা একমাত্র আল্লাহ। এক আল্লাহ ছাড়া কারো ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। তারেক রহমানও নিশ্চয়ই তা জানেন। জানেন বলেই তিনি আল্লাহর উপর ভরসা করে দেশে ফেরার সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দলমত নির্বিশেষে সকলে তাঁর ফেরার খবরে আনন্দিত। তাঁকে সাদরে বরণ করে নেয়ার জন্য পুরো জাতি প্রস্তুত।
সকলেরই প্রত্যাশা, তারেক রহমান দেশে ফিরবেন, সকলের মন জয় করে দেশের নেতৃত্ব দেবেন।

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 

























