বাঙালী কণ্ঠ নিউজঃ আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ করার ক্ষেত্রে রয়েছে বয়সের বাধ্যবাধকতা। নেতাকর্মীদের ২৯ বছর বয়সসীমার মধ্যে থেকেই রাজনীতি করতে হয়। গঠনতন্ত্র অনুসারে বিবাহিতরা ছাত্রলীগ করতে পারবেন না। এ ছাড়া নির্দিষ্ট মেয়াদে ২ বছর পর পর কেন্দ্রীয় সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠন করার কথাও বলা আছে। সংগঠনটির এতসব নিয়ম কেবল গঠনতন্ত্রেই সীমাবদ্ধ। পেরিয়ে গেছে বর্তমান কমিটির মেয়াদ। অথচ এখন পর্যন্ত নতুন সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করা হয়নি।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের কমিটির মেয়াদও পার করেছে এক বছরের বেশি সময়। অথচ এসব ইউনিটেও নতুন কমিটি হচ্ছে না।
সম্মেলন কেন হচ্ছে না এমন প্রশ্নের উত্তরে কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছেন বলে জানিয়েছেন। অথচ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ২০১৫ সালের ২৫ ও ২৬ জুলাই সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সম্মেলনে বয়সের বাধ্যবাধকতার কারণে সঠিক সময়ে সম্মেলনের তাগিদ দিয়েছিলেন।
এদিকে সময়মতো সম্মেলন না হওয়া ও সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে সংগঠনটির চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে। সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসাইনের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মসহ নানা অভিযোগ তুলেছেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাই। গত ১১ জুলাই সংগঠনের বর্ধিত সভায় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের উপস্থিতিতেই তাদের তুলাধোনা করেন কয়েক নেতা।
ওইদিন সভায় সংগঠনের ভেঙে যাওয়া কাঠামো ফিরিয়ে আনতে বিবাহিত নেতাকর্মীদের স্বেচ্ছায় পদত্যাগের জন্য ৭২ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেন কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। এই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তারা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করলে কারো বিরুদ্ধে এই অভিযোগ থাকলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও হুশিয়ারি দেওয়া হয়; কিন্তু সেই ৭২ ঘণ্টা পেরিয়ে ২১ দিনে গড়িয়েছে। অথচ কেন্দ্রীয় কমিটিতে অন্তত ২০ জনের অধিক নেতা বিবাহিত থাকলেও কেউই পদত্যাগ করেননি। এ ছাড়া ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা ইউনিটের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী বিবাহিত; কিন্তু তাদের কেউই সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের আলটিমেটাম গায়ে মাখেননি।
আমাদের সময়ের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্তত ১০ জন সহসভাপতি বিবাহিত। তারা রাজনীতি টিকিয়ে রাখার স্বার্থে সব তথ্য-প্রমাণ গোপন রেখেছেন। এ ছাড়া ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রকাশ্যে অনুষ্ঠানের মাধ্যমেও বিয়ে করেছেন অনেক নেতা। তাদের মধ্যে একজন হলেন মাসুমা আকতার পলি। তিনি তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ অভ্যন্তরে বিশাল অনুষ্ঠান করে বিয়ে করেছেন। এতে ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। এ ছাড়া সহসভাপতি মেহেদী হাসান, সুপ্রীয় কুণ্ড রাজেশ, নুসরাত জাহান নূপুর বিবাহিত। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে বিয়ে করেছেন সহসভাপতি শেখ শাহজালাল সুজন। তার বিয়েতে দল ও সরকারের অনেক উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিরাও অংশগ্রহণ করেন। আলটিমেটাম ঘোষণার পরও শাহজালাল সুজনকে নিয়ে খুলনায় দলীয় প্রোগ্রাম করেছেন শীর্ষ নেতারা। বিবাহিতদের তালিকায় রয়েছেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নওশেদউদ্দিন সুজন। আমাদের হাতে পাওয়া একটি নিকাহনামায় দেখা যায়, তার স্ত্রীর নাম তানজিয়া আহমেদ চৌধুরী। ডাক নাম বুবলী। বৃহত্তর সিলেটের সন্তান সুজন দীর্ঘদিন রাজনীতিতে ছিলেন অনিয়মিত। বর্তমান ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের সিলেট বাড়ি হওয়ায় তার কোটায় যুগ্ম সম্পাদক হন।
বিবাহের অভিযোগ রয়েছে যুগ্ম সম্পাদক শেখ ফয়সাল ও শাহেদের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া সাংগঠনিক সম্পাদক শাহজালাল ও মো. জসিমউদ্দিনও বিবাহিত। মুহসীন হল থেকে কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক হওয়া এক নেতার বিরুদ্ধে রয়েছে শিবির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ। হলের সাবেক বেশ কয়েক নেতা দাবি করেন, শিবির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ওই নেতাকে হল থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল। বিবাহিতদের তালিকায় রয়েছেন কেন্দ্রীয় গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক নুরুন্নবী। তিনি অনেকটা ঘটা করেই বিয়ে করেন। এ ছাড়া সহসম্পাদক পর্যায়ের ইশরাত জাহান অর্চি (তার বাচ্চা রয়েছে), সুপর্ণা (যুব মহিলা লীগের সদস্য) বিবাহিত। এর বাইরেও কেন্দ্রীয় কমিটির অন্তত আরও ১৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
জানা যায়, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সংখ্যা নিয়েও মতবিরোধ রয়েছে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে। কেউ দাবি করেন এ সংখ্যা ৫০০, আবার কেউ দাবি করেন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সংখ্যা চারশর মতো। অনেকে রাজনীতি না করেও কেন্দ্রীয় নেতা হয়েছেন সুপারিশের ভিত্তিতে। ফলে ঢাউশ আকারের কমিটি হলেও রাজনীতিতে সক্রিয় মুষ্টিমেয় নেতা। বিশেষ করে সহসভাপতি, যুগ্ম সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক মর্যাদার বেশিরভাগই নিষ্ক্রিয়। সম্পাদক পর্যায়ের নেতারা পরবর্তী নতুন কমিটির জন্য বড় বড় নেতার বাসায় লবিংয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
এসব বিষয়ে জানতে কথা হয় সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসাইনের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমরা ইতোমধ্যে ছয়জনকে বিবাহিত চিহ্নিত করে ব্যাবস্থা নিয়েছি। অন্য যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে তাদের বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে। নিশ্চিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অব্যাহতি দেওয়া ছয়জনের পরিচয় জানতে চাইলে তিনি দপ্তর সম্পাদকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। তবে কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন শাহজাদা বলেন, আমরা প্রায় তিনশজনের একটি তালিকা করেছি। কাউকে বহিষ্কার বা অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই।

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 























