রাজনীতিতে বাম ও প্রগতিশীল দলগুলোর অবস্থান সব সময়ই সাধারণ মানুষের পক্ষে। তাই সীমিত সামর্থ্য নিয়েই দুর্নীতি, বৈষম্য, নারী নির্যাতন ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী যেকোনও অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাজপথে তাদের সোচ্চার হতে দেখা যায়।
বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জনমত তৈরি করে দলগুলো। বুর্জোয়া শ্রেণির কালো টাকা ও সাম্রাজবাদবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে ছিল আপসহীন। শুধু রাজধানী নয়, একেবারেই তৃণমূল পর্যায়ে ছুটে যেতেন নেতারা।
তবে সময়ের ব্যবধানে দলগুলোর কর্মকাণ্ডে কিছুটা স্থবিরতা নেমে এসেছে। নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে ব্রেকেট বন্দি হয়ে কয়েকভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। মূলত ২০০৮ সালের পর থেকেই ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে সম্পৃক্ততার কারণে দিনে দিনে নিজস্বতা হারাচ্ছে দলগুলো। এ জন্য সাধারণ মানুষের কাছে আগের মতো আবেদন নেই তাদের। ভোটের মাঠেও নেই তেমন প্রভাব। শীর্ষ নেতাদের প্রাপ্ত ভোট অনেক সময় আঙুলের কড়ায় গোনার অবস্থা হয়ে দাঁড়ায়। সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ভরাডুবি হয়েছে তাদের।
দিনে দিনে ক্ষয়িষ্ণুতার দিকে যাচ্ছে বাম রাজনীতি। কিন্তু কোনও প্রক্রিয়ায় ঘুরে দাঁড়াবে, তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বিশ্লেষক বলেন, বুর্জোয়া দলগুলোর সঙ্গে মিশতে গিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব বিলীন করেছে বামশক্তি। কিন্তু নতুন আঙ্গিকে ঘুরে দাঁড়ানোর তেমন কোনও উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সহ-সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি সম্পদ লুণ্ঠন করছে। পাশাপাশি তারা মানুষের মনমগজও দখলের লড়াই করছে। ইরানের মতো দেশে সম্পদ লুট করেও মানুষের চিন্তাজগতকে ভিন্নভাবে পরিবর্তন করে হামলাকে বৈধ করার চেষ্টা করছে।’’
সাংগঠনিকভাবে আমাদের বাম শিবিরের বিরুদ্ধেও দেশি-বিদেশি নানা শক্তি কাজ করছে। প্রশাসন ও রাজনৈতিক শক্তির সমন্বয়ে যে শোষণকারী শক্তি কাজ করছে, অনেক সময় আমরা তাদের মোকাবিলা করতে পারিনি। তারা যেভাবে মানুষের মনোজগতে প্রভাব বিস্তার করে, এর বিপরীতে চিন্তা ও নৈতিক জগতে আমাদের সে ধরনের ধৈর্য্য কাজ করেনি। তাই আমরা জনগণের কাছে দৃশ্যমান হতে পারিনি।’’
তবে বামশক্তিকে যে যেভাবেই মূল্যায়ন করুক না কেন, আমরা কিন্তু সব সময় জনগণের দাবি আদায়ে সোচ্চার রয়েছি। বিদ্যুৎ, জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জাতীয় সংকটে আমাদের কাজ অব্যাহত থাকবে। আর সাংগঠনিক কাজ ঢেলে সাজাতেও নেওয়া হয়েছে নানা পরিকল্পনা।’’
একদল ভেঙে একাধিক দল, কোন দলের নেতৃত্বে কে?
বাম রাজনৈতিক দলগুলোর কয়েকটি দল ভেঙে হয়েছে ভিন্ন দল। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে এক ধরনের নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব থেকেই তারা আলাদা আলাদা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেছেন। গত প্রায় দুই দশকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেখা গেছে— বড় দলগুলোর সঙ্গে মিশে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির কারণে অনেক সময় ব্র্যাকেটবন্ধি হয়ে গেছে দলগুলো। এরই মধ্যে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ভেঙে হয়েছে তিন গ্রুপ। এর একটির নেতৃত্বে রয়েছেন হাসানুল হক ইনু ও শিরীন আক্তার। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর থেকে এ দলের প্রধান হাসানুল হক ইনু কারাগারে রয়েছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি দলটির কোনও নেতা।
আরেক অংশ বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) নামে নিবন্ধন পেয়েছে। এর নেতৃত্বে রয়েছেন আ স ম আবদুর রব ও শহিদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন। তৃতীয় অংশ বাংলাদেশ জাসদ এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন শরীফ নুরুল আম্বিয়া ও নাজমুল হক প্রধান।
শেষের দুটি দল ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও সব আসনেই জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।
বাম দলগুলোর মধ্যে মোটামুটি সক্রিয় বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) ও দুই ভাগে বিভক্ত। এর একাংশে রয়েছেন খালেকুজ্জামান, বজলুর রশিদ ফিরোজ ও রাজেকুজ্জামান রতনের মতো নেতারা। সেটি ভেঙে হয়েছে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ (মার্কসবাদী)। এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন মাসুদ রানা ও সীমা দত্ত।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির নেতৃত্বে রাশেদ খান মেনন ও ফজলে হোসেন বাদশা। সেই দল থেকে বের হয়ে গঠন হয়েছে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি। যার নেতৃত্বে রয়েছেন সম্পাদক সাইফুল হক ও আকবর খান।
এই দুটি পক্ষই বড় দুটি দলের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছিল। এর মধ্যে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী-এমপি ছিলেন। তারা কারাগারে আছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি।
আর বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বিএনপির সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও তেমন সুবিধা করতে পারেননি।
এছাড়াও সাবেক মন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়ার বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল ভেঙে প্রয়াত সাইফ উদ্দিন মনি গঠন করেছেন একই নামের আরেক দল। তারা বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনে কিছুটা সক্রিয় থাকলেও বর্তমানে অস্তিত্বহীন।দিলীপ বড়ুয়ার দলেরও একই অবস্থা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাংলাদেশ জাসদ) এর প্রেসিডিয়াম সদস্য মোশতাক হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বাম দলগুলো নানাভাবে বিভক্ত হওয়ার কারণে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ভিন্নমত পোষণ করার অধিকার সবারই আছে।’’ এ নিয়ে আর বেশি কিছু বলতে তিনি রাজি হননি।
কিছুটা দৃশ্যমান সিপিবি
অতীতে বিভিন্ন নেতা দল থেকে বের হয়ে ভিন্ন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে গেলেও গত দেড় দশকে মোটামুটি স্বনামে সক্রিয় রয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। এখনও বড় রকমের ভাঙ্গণের মুখে পরেনি। প্রতিবারই নির্দিষ্ট সময়ে তাদের নেতৃত্ব নির্বাচন হয়ে থাকে। এই দলেই রয়েছেন মঞ্জুরুল ইসলাম, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, শাহ আলম, রুহিন হোসেন প্রিন্সসহ জাতীয় নেতারা। বর্তমানে সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আব্দুল্লাহ আল ক্বাফী রতন।
দলের সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, তার দল যেকোনও ইস্যুতে সব সময় রাজনীতির মাঠে সক্রিয় থাকে তাদের নেতৃত্ব নির্বাচনে নিয়মিত কাউন্সিল হচ্ছে। মূল দায়িত্বে না থাকলেও আমাদের সাবেক নেতারাও জবাবদিহির আওতায় থাকেন। তাই আমরা ক্ষমতার রাজনীতির কাছে ধর্না দিই না। এখনও মুক্তি ভবনে আমাদের পাঠচক্রসহ সাংস্কৃতিক চর্চা নিয়মিত হয়ে থাকে। তিনি মনে করেন বামপন্থিরা সাময়িক সংকটে থাকলেও নিজস্ব সত্ত্বা নিয়ে এগিয়ে যাবে।
সর্বশেষ নির্বাচনে দলগুলোর অবস্থান
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রগতিশীল ও বাম ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলোর ভড়াডুবি হয়েছে।
বিএনপির সঙ্গে থাকায় একমাত্র প্রার্থী গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি জয়ী হয়েছেন। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক তৃতীয় হয়ে জামানত রক্ষা করেছেন। আর বিগত দিনে বিএনপির সঙ্গে থাকলেও আসন সমঝোতায় বনিবনা না হওয়া শেষ পর্যন্ত এককভাবে নির্বাচন করেছে আ স ম আবদুর রবের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি)। তারাও কোনও আসনে জামানত রক্ষা করতে পারেননি।
সিপিবি, বাসদ, বাসদ (মার্কসবাদী) ও বাংলাদেশ জাসদের সমন্বয়ে ৮টি বাম দলের প্ল্যাটফর্ম গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টও তেমন সুবিধা করতে পারেনি।
শীর্ষ নেতাদের অবস্থা ধরাশায়ী। বেশিরভাগ প্রার্থীই ৫ হাজার বেশি ভোটের সংখ্যা অতিক্রম করতে পারেননি। অনেক জায়গায় কেন্দ্রীয় নেতারাও ভোট পেয়েছেন পাঁচশ এর নিচে।
এই জোটভুক্ত দলগুলোর প্রার্থী ছিল ১৪৭টি আসনে। এর মধ্যে সিপিবি ৬৫, বাসদ ৩৭, বাসদের (মার্কসবাদী) ৩৩ এবং বাংলাদেশ জাসদের প্রার্থী ছিল ১৫টি আসনে। সবগুলোতেই জামানত খুইয়েছেন নেতারা।
এই জোটের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়েছেন বরিশাল-৫ (সদর) আসনের বাসদের প্রার্থী মনীষা চক্রবর্তী। মই প্রতীকে ২২ হাজার ভোট পেয়ে চমক দেখালেও শেষ পর্যন্ত তিনিও জামানত রক্ষা করতে পারেননি।
ভোটের মাঠে বাম দলগুলোর এমন ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা কেন? এ নিয়ে নানা আলোচনা হচ্ছে। দলগুলোর নেতারা নিজেরাও মনে করেন তারা কাঙ্ক্ষিত ফল পাননি। যদিও তারা বুর্জোয়া দলগুলোর কালো টাকা ও পেশীশক্তিকে দুষছেন। আবার নিজেদের দুর্বল সাংগঠনিক ও জনভিত্তির কথা স্বীকার করেছেন। দলগুলোর নেতারা জানিয়েছেন এ বিষয়ে তারা দল ও জোটগত পর্যালোচনা সভা করবেন। এরপর নতুন করে দেশব্যাপী রাজনৈতিক কর্মসূচি শুরু করবেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘নির্বাচনে ফলাফল বিপর্যয় নিয়ে আমরা প্রথমে দলগত পর্যালোচনা করবো। এরপর জোটগত আলোচনা হবে। অচিরেই এই প্রক্রিয়া শুরু হবে। তবে প্রাথমিকভাবে আমি বলবো, আমাদের দুর্বলতাগুলো নিয়ে গভীরভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। এর বাইরেও বলবো আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার হয়নি। নির্বাচনে টাকার খেলা ও পেশীশক্তির ব্যবহার ছিল। শেষদিকে এসে দ্বি-দলীয় ব্যবস্থাকে উচ্চকিত করা হয়েছে।’’
‘‘মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তির পক্ষে এক ধরনের হাইপ উঠানো হয়েছে। এতে করে প্রগতিশীল শক্তির ভোটও অন্যদিকে চলে গেছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘তবে অজুহাত না দেখিয়ে বলতে চাই, আমাদের আরও সচেতন হতে হবে ও গণভিত্তি মজবুত করতে হবে।’’
ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা যেভাবে
বাম দলগুলোর দুর্বল সাংগঠনিক ভিত্তির বিষয়টি স্বীকার করেন নেতারা। তারা মনে করেন, এ নিয়ে নিজেদের আরও পর্যালোচনা জরুরি। সে অনুযায়ীই তারা পরিকল্পনা ঢেলে সাজাচ্ছেন। আপাতত জাতীয় ইস্যুতে দল ও জোটগতভাবে সক্রিয় থাকবেন। পরবর্তীকা ধাপে ধাপে দেশব্যাপী কর্মসূচি দেবেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) এর সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, ‘‘আমাদের সাংগঠনিক কাজ নিয়মিতই হচ্ছে। নির্বাচনের পরও বিভিন্ন ইস্যুতে আমরা একাধিক মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছি। পর্যায়ক্রমে সারা দেশেই কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। এছাড়াও আমাদের জনশক্তি তৈরির প্রক্রিয়া নিয়েও নানা পর্যালোচনা হচ্ছে। আশা করি, দ্রুতই দৃশ্যমান সাফল্য দেখা যাবে।’’

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 
























