রাজধানী ঢাকা ক্রমে ব্যাটারিচালিত রিকশার নগরীতে পরিণত হচ্ছে। প্রতি বছর সড়কে নামছে লাখো রিকশা। নগরীর মূল সড়কের গতি কমিয়ে দেওয়া এ যানের পিছনেও রয়েছে বিশাল এক সিন্ডিকেট। সরকার বদলালেও সিন্ডিকেট আসে নতুন মোড়কে। প্রতিদিন লেনদেন হয় কোটি কোটি টাকা।
দরিদ্র চালকদের জিম্মি করে চলছে এ রমরমা কাঁচা টাকার বাণিজ্য। গত ২৬ এপ্রিল সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) প্রকাশিত ‘শহুরে পরিবহন নেটওয়ার্কে বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান: চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানীতে বর্তমানে প্রায় ২০ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক চলাচল করছে। মাত্র ছয়-সাত বছর আগেও এ সংখ্যা ছিল প্রায় ১১ লাখ।
অবৈজ্ঞানিক, বিআরটিএর নিবন্ধনহীন এ যানটি এত দ্রুত বাড়ার কারণ কী, কেনই বা সিন্ডিকেট- এ বিষয়ে কথা হলে সিপিডির প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট মো. খালিদ মাহমুদ বলেন, ‘গবেষণাকালে আমরা রিকশাচালকদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছি, তবে সিন্ডিকেট প্রসঙ্গে সরাসরি আলোচনা হয়নি। এ বাহনটির চাহিদা রয়েছে, কিন্তু এর জন্য কোনো বিধিমালা বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নেই। একই সঙ্গে এটি নিম্নআয়ের মানুষের আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে।’
যারা এ বাহন চালান, তাদের অধিকাংশই দরিদ্র জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আর্থিক অসঙ্গতির কারণে খুব কম চালকই নিজের টাকায় রিকশা কিনতে পারেন। একটি ব্যাটারিচালিত রিকশার সর্বনিম্ন মূল্য ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত। ফলে অধিকাংশ চালকই ভাড়ায় রিকশা চালান।’
এ খাতে ব্যবসার সুযোগ থাকায় অনেক বিত্তশালী ব্যক্তি ৪০ থেকে ৫০টি রিকশা কিনে ভাড়ায় পরিচালনা করেন জানিয়ে বলেন, ‘এক্ষেত্রে অনেক সময় রিকশাচালক নানা ধরনের শোষণের শিকার হন। এছাড়া বিভিন্ন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চাঁদাবাজির তথ্য আমরা বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখেছি। তবে সিন্ডিকেট বিষয়ে সিপিডির কোনো সরাসরি গবেষণা নেই।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, লাইসেন্স ও নিবন্ধনবিহীন এ খাত কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব, গ্যারেজ মালিক, লাইনম্যান, বিদ্যুৎ খাতের কিছু অসাধু ব্যক্তি, পুলিশ ও প্রশাসনের কিছু সদস্যের পরোক্ষ সম্পৃক্ততায় এ ব্যবস্থা পরিচালিত হওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফলে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থের অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের মাধ্যমে একটি সমান্তরাল অর্থনীতি তৈরি হচ্ছে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তন, এমনকি সরকার পরিবর্তন হলেও এ নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর মৌলিক চরিত্র খুব একটা বদলায় না বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
‘নিষিদ্ধ’ যানটি সড়কে চলে কীভাবে, কাকে ম্যানেজ করে?
ব্যাটারিচালিত রিকশা ভিআইপি সড়কসহ রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। প্রশ্ন হলো, তাহলে এসব রিকশা কীভাবে নির্বিঘ্নে চলাচল করছে?
গত মে মাসে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার রিকশাচালকদের সঙ্গে কথা বলে জাগো নিউজের এ প্রতিবেদক জানতে পারেন, ভিআইপি সড়কসহ প্রধান সড়কে তারা সব সময় ডাম্পিং আতঙ্ক নিয়ে চলাচল করেন। বিশেষ করে শাহবাগ, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, আসাদ গেট, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী ও এয়ারপোর্ট রোড এলাকায় নামলে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের নানা উপায়ে ‘ম্যানেজ’ করেই চলতে হয়।
পুরান ঢাকার এক রিকশাচালক রফিকুল ইসলাম (ছদ্মনাম) বলেন, ‘ট্রাফিক পুলিশ কোনো রিকশা আটক করলে সাধারণত ডাম্পিং স্টেশনে পাঠায়। এক্ষেত্রে ১২শ টাকা জরিমানা দিতে হয়। রিকশাটি ডাম্পিং স্টেশনে আটকে রাখা হয় ১২ দিন।’
তার অভিযোগ, ডাম্পিংয়ে পাঠানো রিকশার ব্যাটারি অনেক সময় অক্ষত অবস্থায় ফেরত পাওয়া যায় না। তিনি বলেন, ‘জরিমানার জন্য পস মেশিন ও হাতে লেখা—দুই ধরনের রসিদ দেওয়া হয়। পস মেশিনের মাধ্যমে আদায় করা অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হলেও হাতে লেখা রসিদের অর্থ নয়-ছয় হয়।’
গত ২৩ মে শাহবাগ মোড়ে কর্তব্যরত সরোয়ার আলম নামে এক পুলিশ সার্জেন্টের কাছে অবৈধ এ যানবাহনটি কীভাবে চলছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এগুলো বৈধভাবেই চলছে।’ তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘নিষিদ্ধ হলে এগুলো চলছে কীভাবে?’
যাত্রাবাড়ী এলাকার রিকশাচালক সামাদ (ছদ্মনাম) বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে রিকশা চালানো চালকেরা ভিআইপি রোডসহ বিভিন্ন প্রধান সড়কে ‘ম্যানেজ’ করেই চলাচল করেন। রিকশা আটকানোর পর অনেকেই পরিস্থিতি অনুযায়ী কর্তব্যরত ট্রাফিক কনস্টেবলের হাতে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা গুঁজে দেন।’
তিনি বলেন, ‘ডাম্পিংয়ে গেলে ১২শ টাকা জরিমানার পাশাপাশি যাতায়াত ও অন্য খরচ মিলিয়ে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১৫শ থেকে ১৮শ টাকা। জরিমানার পুরো টাকাই চালককে বহন করতে হয়। এ কারণে অধিকাংশ চালক ঘটনাস্থলেই বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেন।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত রিকশা বর্তমানে ট্রাফিক পুলিশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, এটি আমাদের কাজের একটি বড় অংশজুড়ে বিড়ম্বনার সৃষ্টি করছে।’
পুলিশের বিরুদ্ধে ঘুস গ্রহণের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আনিছুর রহমান বলেন, ‘যতদিন রাস্তায় পুলিশ থাকবে ততদিন অভিযোগ থাকবে।’
অনিয়ম ও পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো দূর করতে আধুনিক ও ডিজিটাল ট্রাফিক ব্যবস্থার পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাস্তায় পুলিশের উপস্থিতি কমিয়ে আনার কথা ভাবা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
প্রতিদিন কত টাকা চাঁদা দিতে হয়?
ব্যাটারিচালিত রিকশা থেকে রাজধানীসহ সারাদেশে প্রতিদিন শতাধিক কোটি টাকার চাঁদাবাজি হয় বলে দাবি বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির।
২০২৪ সালের ২৫ নভেম্বর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির মহাসচিব মোজাম্মেল হোসেন জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সারাদেশের ৪০ লাখ অটোরিকশা থেকে দৈনিক ১১০ কোটি টাকা হিসেবে বছর ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি চাঁদাবাজি হতো।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, রাজধানী ঢাকায় প্রায় ১০ লাখের মতো ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করে। এসব রিকশা থেকে প্রতিদিন গড়ে ১৫০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হয়। সেই হিসেবে শুধু ঢাকা শহরেই প্রতিদিন প্রায় ১৫ কোটি টাকা চাঁদা ওঠে। বর্তমানে অনুমিত ২০ লাখ রিকশার হিসেবে চাঁদার টাকার পরিমাণ দৈনিক ৩০ কোটি টাকা।
চাঁদা না দিলে গ্যারেজ মালিকদের পুলিশে দেওয়ার হুমকি
কামরাঙ্গীরচর এলাকার একাধিক গ্যারেজ মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নিয়োজিত ম্যানেজারদের প্রতি গ্যারেজ থেকে মাসে দুই থেকে তিন হাজার টাকা করে চাঁদা দিতে হতো। তাদের দাবি, আগের তুলনায় পরিমাণ কমলেও বর্তমানে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ম্যানেজারদেরও অর্থ দিতে হয়। অন্যথায় পুলিশে ধরিয়ে দেওয়াসহ বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, লালবাগ, নবাবগঞ্জ, হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ, আজিমপুর ও নিউমার্কেট এলাকার বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী রিকশাগুলোকে দৈনিক ১৭০ টাকা করে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মধ্যস্থতাকারী বা ‘লাইনম্যানকে’ দিতে হয়।
চালকদের অভিযোগ, এসব অর্থের একটি অংশ দলীয় নেতাকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সদস্যদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। অন্য এলাকা থেকে রিজার্ভে আসা রিকশার কাছ থেকে অতিরিক্ত ফিও আদায় করা হয়। টাকা না দিলে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়া বা মামলা দিয়ে ডাম্পিংয়ে পাঠানোর ভয় দেখানো হয় বলে অভিযোগ করেন চালকেরা।
সিন্ডিকেটের হাতবদল, বদলায়নি চাঁদাবাজির ধরন
কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ ও হাজারীবাগ এলাকায় প্রতিবন্ধীদের নামে নিবন্ধিত তিনটি ভুঁইফোড় সংগঠন একসময় রিকশা রুট নিয়ন্ত্রণ করতো। স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও তৎকালীন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কয়েকজন ওয়ার্ড কাউন্সিলরের অনুসারী ও ক্যাডাররা এসব কার্ড নিয়ন্ত্রণ করতেন।
স্থানীয় গ্যারেজ মালিকদের একটি জোট ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা মাঠপর্যায়ে চাঁদা আদায়ের কাজ পরিচালনা করতেন। অভিযোগ রয়েছে, সুস্থ ব্যক্তিদের কাছ থেকেও ‘প্রতিবন্ধী কোটা’ বা বিশেষ কার্ডের নামে দৈনিক ১০০ টাকা এবং সাধারণ চালকদের কাছ থেকে মাসিক ১ হাজার থেকে ১২শ টাকা ‘লাইন খরচ’ হিসেবে আদায় করা হতো। চালকদের দাবি, এসব অর্থ থানা পুলিশ, ট্রাফিক বিভাগ ও স্থানীয় ওয়ার্ড পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে বণ্টন করা হতো।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুরোনো সিন্ডিকেট ভেঙে নতুন একটি গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। তবে চালকদের মতে, চাঁদাবাজির পদ্ধতিতে খুব বেশি পরিবর্তন আসেনি। শুধু নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠীর পরিবর্তন হয়েছে।
বর্তমানে হাজারীবাগ বেড়িবাঁধ, নবাবগঞ্জ সেকশন ও রায়েরবাজারের একাংশে স্থানীয় বিএনপি এবং এর অঙ্গসংগঠন যুবদল ও ছাত্রদলের নাম ব্যবহার করে কয়েকটি নতুন ‘কমিটি’ ও ‘মালিক সমিতি’ গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গ্যারেজ মালিকদের ছত্রছায়ায় এসব রুট নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।
চালকদের তথ্যমতে, আগের ‘প্রতিবন্ধী কার্ড’ ব্যবস্থা এখন আর নেই। এর পরিবর্তে নতুন টোকেন ও সিরিয়াল নম্বর চালু করা হয়েছে। বর্তমানে লাইনম্যানরা রিকশাপ্রতি দৈনিক ৫০ থেকে ৮০ টাকা এবং মাসিক টোকেন বাবদ সর্বোচ্চ ১৫শ টাকা পর্যন্ত আদায় করছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, এ খাতের নিয়ন্ত্রণে আছে একটি বহুস্তরবিশিষ্ট নেটওয়ার্ক। শীর্ষস্তরে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক বলয়, মধ্যস্তরে গ্যারেজ মালিক ও লাইনম্যান এবং নিচের স্তরে রিকশাচালকরা অবস্থান করেন।
গ্যারেজ ও চার্জিং পয়েন্টগুলো অর্থ সংগ্রহ ও বণ্টনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। চালকদের অভিযোগ, বিভিন্ন এলাকায় টোকেন বা কার্ড ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হয়। এর বিনিময়ে তারা রাস্তায় চলাচলের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম বাধার মুখোমুখি হন।
টোকেন অর্থনীতির কাঠামো
গত কয়েক বছরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় টোকেন ও স্টিকারভিত্তিক একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সূর্য, তারা, ঈগল, জবা ফুল, কেআর, এসআর ও ফাইভ স্টারসহ বিভিন্ন প্রতীক সম্বলিত স্টিকার রিকশায় ব্যবহৃত হতো। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এ ধরনের প্রতীক সম্বলিত স্টিকারের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র।
চালকদের অভিযোগ, এসব টোকেনের জন্য মাসে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হতো। ইজিবাইকের ক্ষেত্রে এ অঙ্ক আরও বেশি ছিল। নির্ধারিত টোকেন না থাকলে রিকশা আটকানো, জরিমানা কিংবা প্রশাসনিক হয়রানির মুখে পড়তে হতো বলে তারা অভিযোগ করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক রিকশাচালক ও গ্যারেজ মালিকের ভাষ্য অনুযায়ী, সংগৃহীত অর্থ কয়েকটি স্তরে বণ্টন করা হয়।
স্থানীয় প্রভাবশালী বা রাজনৈতিক বলয় ৪০ শতাংশ, লাইনম্যান ও মাঠপর্যায়ের নিয়ন্ত্রকরা ৩০ শতাংশ, বিভিন্ন ‘ব্যবস্থাপনা’ খাত ২০ শতাংশ ও গ্যারেজ বা সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কের তহবিল ১০ শতাংশ।
প্রতি চার্জে ১০০
ব্যাটারিচালিত রিকশা খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো চার্জিং ব্যবস্থা। অনুসন্ধানে জানা যায়, অনেক এলাকায় সরকারি বিদ্যুৎ লাইনের অবৈধ সংযোগ কিংবা অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের মাধ্যমে চার্জিং কার্যক্রম পরিচালিত হয়। চালকরা জানিয়েছেন প্রতিটি রিকশা চার্জ বাবদ নেওয়া হয় কমপক্ষে ১০০ টাকা। প্রতিদিনের রিকশা ভাড়ার সঙ্গে এ টাকা পরিশোধ করতে হয়।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, এ অর্থের একটি অংশ গ্যারেজ মালিক, লাইনম্যান ও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের মধ্যে বণ্টন করা হয়। ফলে বিদ্যুৎ ব্যবহারের এ খাত কেন্দ্র করে একটি স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক চক্র গড়ে উঠেছে— এটি যেন ‘হুইল উইদিন এ হুইল’ বা চাকার ভেতর আরেকটি চাকা।
সরেজমিন কামরাঙ্গীরচর
পুরান ঢাকার কামরাঙ্গীরচর। প্রায় ৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের তিনটি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার গ্যারেজের ছড়াছড়ি। এলাকায় মোট কতগুলো গ্যারেজ রয়েছে সে সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে একাধিক সূত্রের মতে সংখ্যাটি কমপক্ষে ২০০ থেকে ৩০০।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন এলাকায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, তার প্রভাববলয়ের মাধ্যমে ব্যাটারিচালিত রিকশা থেকে টোকেনভিত্তিক অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা চালু ছিল।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, ওই সময় কামরাঙ্গীরচরের গ্যারেজ থেকে প্রতি মাসে দুই হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হতো এবং বিদ্যুৎ ও প্রশাসনিক বিষয়েও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো হতো।
আওয়ামী লীগের আমলে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল
ওই সময়ে কামরাঙ্গীরচর থানার সভাপতি ছিলেন সাবেক এমপি হাজী সেলিমের অনুসারী আবুল হোসেন সরকার (বর্তমানে কারাবন্দি) ও সেক্রেটারি ছিলেন হাজি সোলায়মান মাদবর (অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মৃত)। উভয়েই ৫৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। এই ওয়ার্ডে কাউন্সিলর ও সভাপতি ছিলেন হাজি সেলিমের অনুসারী হাজি সাইদুল মাদবর (পলাতক) সেক্রেটারি মোস্তফা সরকার।
৫৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রয়াত হাজি নূরে আলম চৌধুরী (অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রয়াত)। ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি হাজি আমিনুল ইসলাম (পলাতক) ও সেক্রেটারি হাজি জামাল দেওয়ান (কারাবন্দি), শাহআলী থানার সহ-সভাপতি (পলাতক) মোহাম্মদ আলী পলাশ। এরা জোটবদ্ধ থাকলেও ৫ বর্গ কিলোমিটারজুড়ে গড়ে ওঠা কামরাঙ্গীরচরের ৫৫, ৫৬ ও ৫৭ নম্বর ওয়ার্ডের বিস্তীর্ণ জনপদে ১০ লক্ষাধিক মানুষের বসবাসস্থলে একক আধিপত্যে ছিলেন সাবেক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট. কামরুল ইসলামের অনুসারী ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন।
স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের দাবি, গোটা এলাকায় রিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহনে চাঁদাবাজি, জমি দখল, মাদক বাণিজ্যসহ সব ধরনের অপকর্মে লিপ্ত ছিলেন মোহাম্মদ হোসেনের পিএস মাহিন, অনুসারী রাজ্জাক, সুমন-কিরন, পারভেজ হোসেন বিপ্লব, জিকু, ড্যানি, মশিউর, মফিজ, জাবেদুল ইসলাম জাবেদ ওরফে সমিতি জাবেদ, লালচাঁন সুমন, ফ্লেক্সি সাহাবুদ্দিন, খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মচারী মামুন, ভোলাইয়া, কানা কাদির, বিল্লাল, ময়লা জয়নাল, তাইজুল ইসলাম রনি, সিরাজ তালুকদার, শাহানূর শাহীন ওরফে কন্ডাক্টর শাহীন, জসিম, ইমন প্রমুখ।
ক্ষমতার পালাবদলে ভিন্ন মোড়কে চাঁদাবাজি
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ব্যাপক গণ-আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যাটারিচালিত রিকশায় চাঁদাবাজিসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে।
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের দাবি, মির্জা আব্বাস ও আরেকজন বড় নেতার অনুসারী সাবেক কাউন্সিলর এবং বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হাজি মনির হোসেন চেয়ারম্যান চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। তার প্রধান সহযোগী নুরবাগের রহমত, কয়লাঘাটের সিদ্দিক এবং ঠোটা এলাকার পারভেজ।
এছাড়া ভাতিজা ও জামাতা হাজি সাইফুল ইসলাম, কাঠপট্টির কাঠ নাজির, জান্নাতবাগের মোতালেব ও তার সমন্ধি জাকির হোসেন, হাজি আওলাদ হোসেন, হাজি রশিদ, শামীম আহমেদ, আক্কাস, ভূত জামাল, কালা সিরাজ, ওহিদুল, মিন্টু, ছিট ফারুক, শহীদুল, শহিদ, দুলাল, সামির, জাহাঙ্গীর, রাজু, অপু, কামরুল, আসাদ, স্টুডিও মারুফ, চঞ্চল, কানা রায়হান, ইব্রাহীম, কানা কাদিরের ছেলে সোহেল, বুলেট, বাবু, মির্জা আলমগীর, জুলহাস হাওলাদার, শরীফ প্রমুখ নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কামরাঙ্গীরচরে মনিরের নেতৃত্বাধীন প্রভাবশালী চক্রটি অটোরিকশাসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের মাধ্যমে আধিপত্য বিস্তার করছে।
অভিযোগ রয়েছে সালিশের নামে অর্থ আদায়, জমি ও ব্যবসা দখল, ভয়-ভীতি প্রদর্শন, হামলা ও হুমকির ঘটনাও ঘটছে। এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে থানায় জিডি ও মামলা হয়েছে। ভুক্তভোগীরা বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত অভিযোগ দিয়ে প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন।
দায়িত্বশীল সূত্রে জানা যায়, হাজি মনির হোসেন বিগত সরকারের আমলে কামরাঙ্গীরচরের মাতবরবাজারের টিটুর গ্যারেজ দখল করেছেন। বর্তমানে তার আস্থাভাজন রহমতউল্লাহ জনৈক জমিরের কাছে মাসিক ৬০ হাজার টাকা ভাড়াও দিয়েছেন। দখল করা রিকশার গ্যারেজটি সাত কাঠা জমির ওপর, বর্তমান বাজারমূল্য পাঁচ কোটি টাকা।
এছাড়া কয়লাঘাটের মিলন মাতব্বরের অফিস ও রিকশার গ্যারেজ দখল নিয়েছেন বলে অভিযোগ মনির হোসেনের আরেক আস্থাভাজন সিদ্দিক ওরফে কুত্তা সিদ্দিকের বিরুদ্ধে। গ্যারেজ ভাড়ার পাশাপাশি এ জমিতে প্রতি সপ্তাহে মেলা বসে। সেখান থেকেও উপার্জন হয় তাদের।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও এমপি আমানউল্লাহ আমানের অনুসারী নাঈম, গাফফার, সায়েম ও শামীমের নেতৃত্বে রয়েছে অর্ধশতাধিক চাঁদাবাজ। মোহাম্মদ নাঈম বর্তমানে কামরাঙ্গীরচর থানা বিএনপির আহ্বায়ক।
এছাড়া সেকশন টু বাবুবাজার রুটে লেগুনা ও অটো চলাচল নিয়ন্ত্রণে করেন কালা রফিক, দেলোয়ার হোসেন দিলু ও আব্দুস সাত্তার। সেকশন টু নিউমার্কেট রুটে আমিন, ঝন্টু, মাহবুব ও সিদ্দিক। সেকশন টু মোহাম্মদপুর ও গাবতলী রুটে ইব্রাহিম, জসিম, ভুট্টো, সোহেল ও সোহাগ। সেকশন বটতলা টু গুলিস্তান গোলাপ শাহ মাজার রুটে রাজন, হাবিব, ইমরান প্রমুখ।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রধান দুই অভিযুক্ত হাজি মনির হোসেনের মোবাইল (০১৮৭….৭০) নম্বরে কয়েক দফা যোগাযোগ করা হয়। কখনো নম্বর বন্ধ আবার কখনো রিং হলেও রিসিভ করা হয়নি। সবশেষ ৪ জুন বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে রিপন নামে এক ব্যক্তি ফোন রিসিভ করেন এবং প্রতিবেদকের নাম পরিচয় জেনে মনির হোসেনকে জানাবেন বলে জানান। একই সময়ে তার মোবাইলে ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হয়। কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
অপর অভিযুক্ত মোহাম্মদ নাইমের (০১৬৩….৭০) নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন রিসিভ করেননি। তাকেও প্রতিবেদক তার পরিচয় দিয়ে ক্ষুদেবার্তা পাঠিয়ে কলব্যাগ করার অনুরোধ জানান। উনিও কোনো যোগাযোগ করেননি।
তথ্য দিলে ব্যবসা বন্ধের আশঙ্কা
কামরাঙ্গীরচরের তিনটি ওয়ার্ড ঘুরে একাধিক গ্যারেজ মালিক ও রিকশাচালকের সঙ্গে কথা বলে জাগো নিউজ। বর্তমানে কারা অর্থ আদায় করেন বা কীভাবে গ্যারেজগুলো পরিচালিত হয়—এ বিষয়ে প্রথমদিকে কেউ কথা বলতে রাজি হননি। তারা নিয়ম মেনে গ্যারেজ পরিচালনা করছেন এবং কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি বা প্রভাবশালী মহলকে অর্থ দিতে হয় না বলে জোর দাবি করেন।
পরে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কামরাঙ্গীরচরের এক গ্যারেজ মালিক বলেন, ‘আমরা কোনো তথ্য দিলে গ্যারেজ ভাঙচুর হতে পারে, ব্যবসা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।’
কামরাঙ্গীরচর রিকশাচালক জব্বার মিয়া (ছদ্মনাম) বলেন, আগে ‘যাদের নাম শুনে সবাই চলতো, ৫ আগস্টের পর তাদের কেউ আছে, কেউ নেই। এখন নতুন কিছু বলয় এসেছে। তবে আমাদের পথে-ঘাটে খরচ আগের মতোই আছে।’
সিন্ডিকেট নিয়ে যা বলছেন শ্রমিক নেতা
২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়ন একটি সম্মেলন করে। সেখানে নেতারা বিভিন্ন দাবি-দাওয়া তোলার পাশাপাশি সমস্যাগুলোও তুলে ধরেন।
সম্মেলন উপলক্ষে তৈরি করা লিফলেট ও পোস্টারের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬০ লাখ মানুষ প্যাডেল রিকশা-অটোরিকশা-ভ্যান-ইজিবাইকের সঙ্গে যুক্ত থেকে তাদের জীবিকা নির্বাহ করছে। তাদের ওপর চলে নানা শোষণ-বৈষম্য-জুলুম-অত্যাচার। ব্যাটারিচালিত যানবাহনের বিআরটিএ কর্তৃক নিবন্ধন না থাকায় নেই জীবিকার নিরাপত্তা।
শোষণ-বৈষম্যের অবসান ও সংকট নিরসনে বিভিন্ন দাবির চার নম্বর পয়েন্টে ছিল, শ্রমিকদের ওপর সব জুলুম-নির্যাতন-চাঁদাবাজি-হয়রানি বন্ধ করতে হবে। ১০ নম্বর পয়েন্টে ছিল, অসৎ বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে রিকশা যন্ত্রাংশসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম কমাতে হবে।
রিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলামের কাছে সিন্ডিকেটের চাঁদাবাজি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন এলাকায় সিন্ডিকেট সদস্যরা বিভিন্ন রুটের ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করতো। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে চাঁদাবাজি ছিল না। বর্তমানে ক্ষমতাশীন দলের নেতাকর্মীরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চাঁদাবাজির পাঁয়তারা করছে। কিন্তু আমার জানামতে এখনো পর্যন্ত তারা সুবিধা করতে পারেনি।’
ক্ষমতা যাদের হাতে, তাদেরই একাংশ নৈরাজ্যের সুরক্ষাকারী
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ এহসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘এই খাতে বিপুল অঙ্কের অনানুষ্ঠানিক লেনদেন রয়েছে। চালকদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন স্তরে অর্থ দিতে বাধ্য হন। খাতটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় এলে এই অস্বচ্ছ অর্থনীতির বড় অংশ দৃশ্যমান হবে।’
ব্যাটারিচালিত রিকশার লাইসেন্স ও পরিচালনা ঘিরে যে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) পর্যবেক্ষণে এর মূল দুর্নীতির উৎসগুলো কী? এই দুর্নীতির নেপথ্যে স্থানীয় সরকার, ট্রাফিক বিভাগ নাকি রাজনৈতিক প্রভাব—কোন স্তরের দায়বদ্ধতা সবচেয়ে বেশি?
জানতে চাইলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশাকেন্দ্রিক সিন্ডিকেট, অনিয়ম মূলত অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ক্রমবর্ধমান নগরবাসীর চাহিদার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ অবকাঠামো, রাস্তাঘাট ও যানবাহন নির্ভরতার ফলে দীর্ঘকাল লালিত নৈরাজ্যজনিত রোগের লক্ষণমাত্র।’
তিনি বলেন, ‘ক্যানসারের চিকিৎসায় যেমন প্যারাসিটামাল কোনো ফল দেয় না, তেমনই ব্যাটারিচালিত রিকশার লাইসেন্স বা পরিচালনায় অনিয়ম মোকাবিলায় নীতি বা আইনি ঘাটতি পূরণ করে তার সর্বোচ্চ মাত্রায় প্রয়োগ নিশ্চিত করা যদিও বা সম্ভব হয়, তারপরও মূল সমস্যার টেকসই সমাধান অধরাই থেকে যাবে।’
‘রাজনৈতিক নেতাকর্মী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, আমলাতান্ত্রিক ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার একাংশের যোগসাজশের সিন্ডিকেটের অন্যতম পুঁজি শহরে নাগরিক চাহিদার বিপরীতে পর্যাপ্ত জনবান্ধব গণপরিবহণের ঘাটতি। তাছাড়া মনে রাখতে হবে, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ও ক্ষমতা যাদের হাতে, তাদেরই একাংশ এসব নৈরাজ্যের সুরক্ষাকারী।’ বলছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক।
এ অবস্থার পরিবর্তন করতে হলে করণীয় বিষয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘একদিকে যেমন সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে পরিচয়, অবস্থান নির্বিশেষে আইনের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক প্রয়োগ অপরিহার্য, তেমনই অবিলম্বে পরিকল্পিত ও টেকসই নগরায়ণ এবং অবকাঠামোসহ বহুমুখী, বহুমাধ্যমনির্ভর জনবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।’
ব্যাটারিচালিত রিকশা এখন একই সঙ্গে জীবিকা ও নগর ব্যবস্থাপনার বড় চ্যালেঞ্জ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সিন্ডিকেট নিয়ে যা বলছে পুলিশ
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) নবনিযুক্ত কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত রিকশার বিস্তার একদিনে হয়নি। বিগত সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এ সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এছাড়া জনসংখ্যার চাপ ও পরিবহন চাহিদা এই বিস্তারকে ত্বরান্বিত করেছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে।’
ব্যাটারিচালিত রিকশা এখন ঢাকার নগর অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু নিবন্ধন, লাইসেন্সিং, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা ও রুট নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতিমালা না থাকায় খাতটি এখনও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। ফলে সরকার পরিবর্তনের পরও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর চরিত্রে আসছে না মৌলিক পরিবর্তন

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 




















