সাধারণত একটি কাগুজে নোট বাজারে প্রচলনে দেওয়ার পর খুব বেশি হলে ১ থেকে ৫ বছর টেকে। এরপর সেটি পুরনো হয়ে যায়, ছিঁড়ে যায় বা অচল হয়ে পড়ে। তখন আবার নতুন নোট ছাপাতে হয়, সেগুলো সারাদেশে পাঠাতে হয়, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রতিবছর রাষ্ট্রকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর নতুন নোট ছাপাতেই গড়ে ৬০০ কোটির বেশি টাকা খরচ হয়। এর সঙ্গে পরিবহন, নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা খরচ যোগ করলে এই ব্যয় কয়েক হাজার কোটি টাকায় পৌঁছে যায়। তবে বাস্তবতা হলো, দেশে এখনও নগদ অর্থের ব্যবহারই সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের পেমেন্ট সিস্টেম প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে এখনও ৬৭ শতাংশের বেশি লেনদেন নগদ তথা প্রচলিত মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোবাইল ব্যাংকিং, কিউআর পেমেন্ট, অনলাইন কেনাকাটা, ইউটিলিটি বিল ও দৈনন্দিন ছোট ছোট লেনদেন এখন দ্রুত ডিজিটাল মাধ্যমে চলে আসছে। ফলে লেনদেনের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও আন্তঃব্যাংকে বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তরের বেশির ভাগই এখনও আরটিজিএস ও অন্যান্য প্রচলিত ব্যাংকিং চ্যানেলে সম্পন্ন হয়। তাই অর্থমূল্যের হিসাবে ডিজিটালের অংশ এখনও তুলনামূলক কম।
নগদ টাকার পেছনে রাষ্ট্রের বড় ব্যয় : নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বেশ কিছু ব্যয়। নতুন নোট ছাপানো, সেগুলো সংরক্ষণ করা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহন করা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা-সবকিছুতেই বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়। গত ২৩ জুলাই পিআরআই আয়োজিত ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক তাৎক্ষণিক পেমেন্ট সিস্টেম’ নিয়ে এক কর্মশালায় সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিবছর নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে এবং এই ব্যয় প্রতি বছর বাড়ছে। এটি ডিজিটাল পেমেন্ট দ্রুত সম্প্রসারণের অর্থনৈতিক গুরুত্বকে তুলে ধরে। তাই এ ব্যয় কমাতে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।
নগদে এখনও ৬৭% লেনদেন : দেশে ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে মানুষের ভরসা এখনও নগদ ও প্রচলিত ব্যবস্থাই। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের পেমেন্ট সিস্টেম প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে দেশের মোট লেনদেনের অর্থমূল্যের ৬৭.২ শতাংশ এখনও অ-ডিজিটাল বা প্রচলিত মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। ডিজিটাল মাধ্যমে হয়েছে মাত্র ৩২.৮ শতাংশ।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে মোট ৩ লাখ ১১ হাজার ৭২৬ বিলিয়ন টাকা লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণ ১ লাখ ২ হাজার ২৪২ বিলিয়ন টাকা। বিপরীতে অ-ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে ২ লাখ ৯ হাজার ৪৮৩ বিলিয়ন টাকা, যা মোট লেনদেনের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি। তবে লেনদেনের সংখ্যার চিত্র একেবারেই ভিন্ন। গত বছর দেশে মোট লেনদেনের সংখ্যা ছিল ১০ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন। এর মধ্যে ৫ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন, অর্থাৎ ৫০ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে ডিজিটাল মাধ্যমে। অন্যদিকে অ-ডিজিটাল লেনদেনের সংখ্যা ছিল ৫ দশমিক ৪০ বিলিয়ন। অর্থাৎ মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেন করলেও বড় অঙ্কের অর্থ আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে এখনও প্রচলিত পদ্ধতির ওপর নির্ভরতা বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলা কিউআর, আন্তঃপরিচালনযোগ্য পেমেন্ট ব্যবস্থা, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট এবং নিরাপদ ডিজিটাল অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে আগামী কয়েক বছরে শুধু লেনদেনের সংখ্যাই নয়, মোট অর্থমূল্যেও ডিজিটালের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। বর্তমানে সংখ্যার বিচারে ডিজিটাল এগিয়ে থাকলেও টাকার অঙ্কে এখনও নগদ ও প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রভাবই সবচেয়ে বেশি।
বেসরকারি এবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) রিয়াজুল ইসলাম বলেন, বাংলা কিউআরের মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশে একটি একীভূত, নিরাপদ, সহজলভ্য এবং আন্তঃপরিচালনযোগ্য ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে তোলা। তবে নগদ অর্থের ব্যবহার একদিনেই কমে যাবে- এমনটি বলা বাস্তবসম্মত নয়। তবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, যখন ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা সহজ, দ্রুত ও সর্বজনগ্রাহ্য হয়, তখন ধীরে ধীরে নগদের ব্যবহার কমতে শুরু করে। বাংলা কিউআরের মাধ্যমে ছোট অঙ্কের দৈনন্দিন লেনদেন ডিজিটাল হবে, নগদ বহনের প্রয়োজন কমবে, আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের ক্যাশলেস অর্থনীতি গঠনের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যংকের প্রতিবেদন আরও বলছে, ২০২৫ সালে ডিজিটাল লেনদেনের অর্থমূল্য ১৩ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে অ-ডিজিটাল লেনদেনের অর্থমূল্য ৭ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ ধীরে ধীরে বড় অঙ্কের লেনদেনও ডিজিটাল মাধ্যমে আসছে, তবে সেই পরিবর্তনের গতি এখনও ধীর।

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 
























