ঢাকা , শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ ভিসা নীতিমালার খসড়া পরিমার্জন ও চূড়ান্তকরণে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা, বাস্তবায়নে কতটা আশার আলো চাকরিজীবীদের জন্য দুই দফায় মিলবে যে ছুটি প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর পরামর্শ অলির সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ৩ বাহিনীর জন্য বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  তিনি বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামারিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।  জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলছে। নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য (এমপি) মাছুম মোস্তফার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি থেকে শিল্পে রুপান্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা

যে হারেনি, ইতিহাস হয়েছে

ফুটবল ইতিহাসে অনেক কিংবদন্তি আছে, যাদের হাতে ট্রফি উঠেছে। কিন্তু এমন অনেক কিংবদন্তি আছেন, যাদের হাতে ট্রফি না এলেও কোটি মানুষের শ্রদ্ধায় সিক্ত হয়েছেন তারা। কেপ ভার্দে জাতীয় ফুটবল দলের গোলকিপার ভোজিনহা ঠিক তেমনই একজন।

ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। যে দেশের জনসংখ্যা বিশ্বের অনেক শহরের থেকেও কম। পশ্চিম আফ্রিকার এই ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রে ১৯৮৬ সালের ৩ জুন জন্ম নেয় একটি শিশেু। সাও ভিসেন্তে দ্বীপের শহর মিন্ডেলোতে জন্ম নেওয়া শিশুটির নাম রাখা হয় জোসিমার জোসে এভোরা ডিয়াজ। বর্তমানে পুরো পৃথিবী তাকে এক নামেই চেনে-ভোজিনহা।

ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রে জন্ম নিলেও ভোজিনহার স্বপ্ন ছিল অনেক বড়। ছোটবেলায় স্বপ্ন দেখেছিলেন, একদিন দেশের জার্সি গায়ে চাপিয়ে বিশ্বমঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করবেন। অনেক বাধা, অবহেলা আর সংগ্রাম পেরিয়ে ভোজিনহা তার সেই স্বপ্ন পূরণে শতভাগ সফল।

পথচলা সহজ ছিল না

কিন্তু, তার এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। ভোজিনহার বাবা তখন সামরিক বাহিনীতে কর্মরত। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে তার মা দীর্ঘ সময় কাজ করতেন। ফলে, ছোট্ট জোসিমারের শৈশব কেটেছে বাবা-মায়ের নয়, বরং দাদা-দাদির স্নেহে। সেই বৃদ্ধ দুই মানুষই ছিলেন তার পৃথিবী, তার আশ্রয়, তার সবচেয়ে বড় শক্তি।

প্রতিদিন বিকেলে পাড়ার বড় ছেলেদের সঙ্গে রাস্তায় ফুটবল খেলতে যেতেন ভোজিনহা। বয়সে ছোট হওয়ায় প্রায়ই ধাক্কা খেতেন, পড়ে যেতেন, মারও খেতেন। খেলা শেষে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে দাদির কাছে অভিযোগও দিতেন বিস্তর। সে কারণেই পাড়ার ছেলেরা মজা করে তাকে ডাকতে শুরু করেন ‘ভোজিনহা’। পর্তুগিজ ভাষায় এর অর্থ ‘ছোট দাদি’ বা ‘দাদির আদরের ছেলে’। প্রথমে এই নামটি তার ভালো লাগতো না। কিন্তু এক সময় সেই ডাকনামই হয়ে যায় তার পরিচয়, ফুটবল বিশ্বকাপের এই মঞ্চে যে নাম উঠে গেছে কিংবদন্তিদের তালিকায়।

হতে চেয়েছিলেন স্ট্রাইকার

মজার বিষয় হলো, ছোটবেলায় কিন্তু ভোজিনহা গোলকিপার হতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন মাঠে গোল করতে, স্ট্রাইকার হতে। কিন্তু ধীরে ধীরে ভাগ্য তাকে নিয়ে যায় গোলপোস্টের নিচে। সেখানেই তিনি খুঁজে পান নিজের সত্যিকারের পরিচয়।

নিজের দেশের ক্লাব বাতুকে এফসি থেকে শুরু হয় পেশাদার ফুটবল জীবন। এরপর খেলেছেন সিএস মিন্দেলেন্সে, অ্যাঙ্গোলার প্রগ্রেসো, মলদোভার জিমব্রু কিশিনাউ, পর্তুগালের গেল ভিসেন্তে, সাইপ্রাসের এইইএল লিমাসোল, স্লোভাকিয়ার এএস ত্রেনচিন এবং পরে আবার পর্তুগালের শাভেস ক্লাবে।

২০১২ সালে কেপ ভার্দে জাতীয় দলে অভিষেকের পর থেকে তিনি হয়ে ওঠেন দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মুখ। ছোট্ট একটি দেশের গোলপোস্ট পাহারা দিতে দিতে তিনি বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব পেরিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চেও নিজের নাম উজ্জ্বল করেছেন।

স্পেনের বিপক্ষে চমক দিয়ে শুরু

বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সের পর যখন পুরো বিশ্ব তার প্রশংসায় বুঁদ, তখন ম্যাচ শেষে তার চোখে ছিল পানি। সাংবাদিকদের সামনে তিনি বলেছিলেন- যারা তাকে মানুষ করেছেন, সেই দাদা-দাদি আর বেঁচে নেই। তারা তার সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিলেন, কিন্তু তাকে বিশ্বমঞ্চে দেখে যেতে পারেননি। তার মা-ও ভিসার জটিলতার কারণে প্রথম ম্যাচে উপস্থিত থাকতে পারেননি।

আজ ভোজিনহা সাধারণ কোনো গোলকিপারের নাম নয়। তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন, পৃথিবীর মানচিত্রে দেশ যত ছোটই হোক, স্বপ্ন কখনো ছোট হয় না। দাদা-দাদির ভালোবাসায় বড় হওয়া সেই ছোট্ট ছেলেটি একদিন পুরো বিশ্বের সামনে দাঁড়িয়ে একটি দেশের মাথা উঁচু করেছে। কিছু মানুষ ট্রফি জিতে কিংবদন্তি হয়। আর কিছু মানুষ ভালোবাসা, সংগ্রাম আর আত্মত্যাগ দিয়ে ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে যান। ভোজিনহা ভালোবাসা, সংগ্রাম আর আত্মত্যাগ দিয়ে ইতিহাসে জায়গা করে নেওয়া একটি নাম।

২০২৪ সালের আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে কেপ ভার্দের রূপকথাযাত্রার অন্যতম নায়ক ছিলেন ভোজিনহা। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে অসাধারণ গোলকিপিং করে তিনি দলকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরে তিনি স্বীকার করেছিলেন, দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে টাইব্রেকারে বিদায়ের কষ্টে জাতীয় দল ছাড়ার কথাও মাথায় এসেছিল তার। কিন্তু, সতীর্থদের অনুরোধে তিনি থেকে যান, কারণ তার স্বপ্ন তখনও শেষ হয়নি।

এরপর এল ২০২৬ বিশ্বকাপ। কেপ ভার্দে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে। প্রতিপক্ষ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন। সবাই ভেবেছিল, ম্যাচটা একপেশে হবে। কিন্তু সেদিন গোলপোস্টের নিচে যেন একজন মানুষ নয়, প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে যান ভোজিনহা। স্পেনের বিপক্ষে করেন ৭টি দুর্দান্ত সেভ। ফেরান তোরেস, পেদ্রি, লাপোর্তার একের পর এক আক্রমণ ফিরিয়ে দিয়ে ম্যাচ শেষ করেন গোলশূন্য ড্রয়ে। সেদিন তিনি ম্যান অব দ্য ম্যাচ নির্বাচিত হন।

কিন্তু, এখানেই গল্প শেষ হয়নি তার। নকআউট পর্বে সামনে পান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে। অনেকেই ভেবেছিলেন কেপ ভার্দে বড় ব্যবধানে হারবে। অথচ, ভোজিনহা এদিন নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ম্যাচ খেলেন। তিনি ৮টি সেভ করেন, যার মধ্যে মেসির বিপক্ষেই ছিল একাধিক অবিশ্বাস্য সেভ। বিশেষ করে মেসির দ্রুত নেওয়া ফ্রি-কিক ঠেকানোর মুহূর্তটি পুরো বিশ্বের প্রশংসা কুড়িয়েছে। শেষ পর্যন্ত কেপ ভার্দে অতিরিক্ত সময়ে ৩-২ গোলে হেরে গেলেও, ম্যাচের আসল নায়ক ছিলেন ভোজিনহাই।

বিশ্বকাপের আগে বাছাইপর্বেও তিনি ছিলেন দলের সবচেয়ে বড় ভরসা। ১০ ম্যাচে ৮টি গোল হজম করেন এবং ৭টি ক্লিন শিট রাখেন। সেই পারফরম্যান্সই কেপ ভার্দেকে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে নিয়ে আসে। ভোজিনহার গল্প শুধু একজন গোলকিপারের গল্প নয়।

আজ তিনি বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচ খেলে ফেলেছেন, হয়তো আর কোনো বিশ্বক্যাপে সোনালি গ্লাভস হাতে তাকে দেখা যাবে না। কিন্তু, পৃথিবীর কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে থেকে যাবেন তিনি। ভোজিনহা এমন এক নাম, যাকে মনে রাখা হবে সাহস, আত্মত্যাগ আর অসম্ভবকে সম্ভব করার প্রতীক হিসেবে।

সব নায়ক ট্রফি জেতেন না। কেউ কেউ শুধু গ্লাভস পরে দাঁড়িয়ে থেকে পুরো পৃথিবীকে শেখান, শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত লড়াই করতে হয়। ভোজিনহা তাদেরই একজন।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ

যে হারেনি, ইতিহাস হয়েছে

আপডেট টাইম : ১০:১২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬

ফুটবল ইতিহাসে অনেক কিংবদন্তি আছে, যাদের হাতে ট্রফি উঠেছে। কিন্তু এমন অনেক কিংবদন্তি আছেন, যাদের হাতে ট্রফি না এলেও কোটি মানুষের শ্রদ্ধায় সিক্ত হয়েছেন তারা। কেপ ভার্দে জাতীয় ফুটবল দলের গোলকিপার ভোজিনহা ঠিক তেমনই একজন।

ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। যে দেশের জনসংখ্যা বিশ্বের অনেক শহরের থেকেও কম। পশ্চিম আফ্রিকার এই ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রে ১৯৮৬ সালের ৩ জুন জন্ম নেয় একটি শিশেু। সাও ভিসেন্তে দ্বীপের শহর মিন্ডেলোতে জন্ম নেওয়া শিশুটির নাম রাখা হয় জোসিমার জোসে এভোরা ডিয়াজ। বর্তমানে পুরো পৃথিবী তাকে এক নামেই চেনে-ভোজিনহা।

ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রে জন্ম নিলেও ভোজিনহার স্বপ্ন ছিল অনেক বড়। ছোটবেলায় স্বপ্ন দেখেছিলেন, একদিন দেশের জার্সি গায়ে চাপিয়ে বিশ্বমঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করবেন। অনেক বাধা, অবহেলা আর সংগ্রাম পেরিয়ে ভোজিনহা তার সেই স্বপ্ন পূরণে শতভাগ সফল।

পথচলা সহজ ছিল না

কিন্তু, তার এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। ভোজিনহার বাবা তখন সামরিক বাহিনীতে কর্মরত। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে তার মা দীর্ঘ সময় কাজ করতেন। ফলে, ছোট্ট জোসিমারের শৈশব কেটেছে বাবা-মায়ের নয়, বরং দাদা-দাদির স্নেহে। সেই বৃদ্ধ দুই মানুষই ছিলেন তার পৃথিবী, তার আশ্রয়, তার সবচেয়ে বড় শক্তি।

প্রতিদিন বিকেলে পাড়ার বড় ছেলেদের সঙ্গে রাস্তায় ফুটবল খেলতে যেতেন ভোজিনহা। বয়সে ছোট হওয়ায় প্রায়ই ধাক্কা খেতেন, পড়ে যেতেন, মারও খেতেন। খেলা শেষে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে দাদির কাছে অভিযোগও দিতেন বিস্তর। সে কারণেই পাড়ার ছেলেরা মজা করে তাকে ডাকতে শুরু করেন ‘ভোজিনহা’। পর্তুগিজ ভাষায় এর অর্থ ‘ছোট দাদি’ বা ‘দাদির আদরের ছেলে’। প্রথমে এই নামটি তার ভালো লাগতো না। কিন্তু এক সময় সেই ডাকনামই হয়ে যায় তার পরিচয়, ফুটবল বিশ্বকাপের এই মঞ্চে যে নাম উঠে গেছে কিংবদন্তিদের তালিকায়।

হতে চেয়েছিলেন স্ট্রাইকার

মজার বিষয় হলো, ছোটবেলায় কিন্তু ভোজিনহা গোলকিপার হতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন মাঠে গোল করতে, স্ট্রাইকার হতে। কিন্তু ধীরে ধীরে ভাগ্য তাকে নিয়ে যায় গোলপোস্টের নিচে। সেখানেই তিনি খুঁজে পান নিজের সত্যিকারের পরিচয়।

নিজের দেশের ক্লাব বাতুকে এফসি থেকে শুরু হয় পেশাদার ফুটবল জীবন। এরপর খেলেছেন সিএস মিন্দেলেন্সে, অ্যাঙ্গোলার প্রগ্রেসো, মলদোভার জিমব্রু কিশিনাউ, পর্তুগালের গেল ভিসেন্তে, সাইপ্রাসের এইইএল লিমাসোল, স্লোভাকিয়ার এএস ত্রেনচিন এবং পরে আবার পর্তুগালের শাভেস ক্লাবে।

২০১২ সালে কেপ ভার্দে জাতীয় দলে অভিষেকের পর থেকে তিনি হয়ে ওঠেন দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মুখ। ছোট্ট একটি দেশের গোলপোস্ট পাহারা দিতে দিতে তিনি বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব পেরিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চেও নিজের নাম উজ্জ্বল করেছেন।

স্পেনের বিপক্ষে চমক দিয়ে শুরু

বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সের পর যখন পুরো বিশ্ব তার প্রশংসায় বুঁদ, তখন ম্যাচ শেষে তার চোখে ছিল পানি। সাংবাদিকদের সামনে তিনি বলেছিলেন- যারা তাকে মানুষ করেছেন, সেই দাদা-দাদি আর বেঁচে নেই। তারা তার সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিলেন, কিন্তু তাকে বিশ্বমঞ্চে দেখে যেতে পারেননি। তার মা-ও ভিসার জটিলতার কারণে প্রথম ম্যাচে উপস্থিত থাকতে পারেননি।

আজ ভোজিনহা সাধারণ কোনো গোলকিপারের নাম নয়। তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন, পৃথিবীর মানচিত্রে দেশ যত ছোটই হোক, স্বপ্ন কখনো ছোট হয় না। দাদা-দাদির ভালোবাসায় বড় হওয়া সেই ছোট্ট ছেলেটি একদিন পুরো বিশ্বের সামনে দাঁড়িয়ে একটি দেশের মাথা উঁচু করেছে। কিছু মানুষ ট্রফি জিতে কিংবদন্তি হয়। আর কিছু মানুষ ভালোবাসা, সংগ্রাম আর আত্মত্যাগ দিয়ে ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে যান। ভোজিনহা ভালোবাসা, সংগ্রাম আর আত্মত্যাগ দিয়ে ইতিহাসে জায়গা করে নেওয়া একটি নাম।

২০২৪ সালের আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে কেপ ভার্দের রূপকথাযাত্রার অন্যতম নায়ক ছিলেন ভোজিনহা। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে অসাধারণ গোলকিপিং করে তিনি দলকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরে তিনি স্বীকার করেছিলেন, দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে টাইব্রেকারে বিদায়ের কষ্টে জাতীয় দল ছাড়ার কথাও মাথায় এসেছিল তার। কিন্তু, সতীর্থদের অনুরোধে তিনি থেকে যান, কারণ তার স্বপ্ন তখনও শেষ হয়নি।

এরপর এল ২০২৬ বিশ্বকাপ। কেপ ভার্দে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে। প্রতিপক্ষ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন। সবাই ভেবেছিল, ম্যাচটা একপেশে হবে। কিন্তু সেদিন গোলপোস্টের নিচে যেন একজন মানুষ নয়, প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে যান ভোজিনহা। স্পেনের বিপক্ষে করেন ৭টি দুর্দান্ত সেভ। ফেরান তোরেস, পেদ্রি, লাপোর্তার একের পর এক আক্রমণ ফিরিয়ে দিয়ে ম্যাচ শেষ করেন গোলশূন্য ড্রয়ে। সেদিন তিনি ম্যান অব দ্য ম্যাচ নির্বাচিত হন।

কিন্তু, এখানেই গল্প শেষ হয়নি তার। নকআউট পর্বে সামনে পান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে। অনেকেই ভেবেছিলেন কেপ ভার্দে বড় ব্যবধানে হারবে। অথচ, ভোজিনহা এদিন নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ম্যাচ খেলেন। তিনি ৮টি সেভ করেন, যার মধ্যে মেসির বিপক্ষেই ছিল একাধিক অবিশ্বাস্য সেভ। বিশেষ করে মেসির দ্রুত নেওয়া ফ্রি-কিক ঠেকানোর মুহূর্তটি পুরো বিশ্বের প্রশংসা কুড়িয়েছে। শেষ পর্যন্ত কেপ ভার্দে অতিরিক্ত সময়ে ৩-২ গোলে হেরে গেলেও, ম্যাচের আসল নায়ক ছিলেন ভোজিনহাই।

বিশ্বকাপের আগে বাছাইপর্বেও তিনি ছিলেন দলের সবচেয়ে বড় ভরসা। ১০ ম্যাচে ৮টি গোল হজম করেন এবং ৭টি ক্লিন শিট রাখেন। সেই পারফরম্যান্সই কেপ ভার্দেকে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে নিয়ে আসে। ভোজিনহার গল্প শুধু একজন গোলকিপারের গল্প নয়।

আজ তিনি বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচ খেলে ফেলেছেন, হয়তো আর কোনো বিশ্বক্যাপে সোনালি গ্লাভস হাতে তাকে দেখা যাবে না। কিন্তু, পৃথিবীর কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে থেকে যাবেন তিনি। ভোজিনহা এমন এক নাম, যাকে মনে রাখা হবে সাহস, আত্মত্যাগ আর অসম্ভবকে সম্ভব করার প্রতীক হিসেবে।

সব নায়ক ট্রফি জেতেন না। কেউ কেউ শুধু গ্লাভস পরে দাঁড়িয়ে থেকে পুরো পৃথিবীকে শেখান, শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত লড়াই করতে হয়। ভোজিনহা তাদেরই একজন।