মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন ও জটিল সমীকরণ উন্মোচিত হয়েছে। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ক্রমবর্ধমান ড্রোন ও সামরিক তৎপরতা মোকাবিলায় সউদী আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে পর্দার অন্তরালে কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা যোগাযোগ বৃদ্ধি পাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ডের (সেন্টকম) মধ্যস্থতায় আয়োজিত এই গোপন আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হলো হুথিদের বিরুদ্ধে যৌথ স্ট্র্যাটেজি তৈরি করা এবং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান নিশ্চিত করা।
আঞ্চলিক কূটনীতিক ও সংবাদসূত্রের বরাতে একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেরুজালেম পোস্ট ও আমেরিকার বেশ কয়েকটি মূলধারার সংবাদমাধ্যম এই গোপন বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। দাবি করা হয়েছে, হুথিদের সামরিক অবস্থান, ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং চলাচলের সুনির্দিষ্ট তথ্য রিয়াদকে সরবরাহ করছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এর আগে হরমোজ প্রণালী ও লোহিত সাগর এলাকায় ইরানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তাদের উন্নত ড্রোন ও প্রযুক্তিগত গোয়েন্দা সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই এখন সউদী আরবকে সহযোগিতা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা আল জাজিরার রিপোর্ট অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে ২.৮ বিলিয়ন ডলার মূল্যমানের আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বেলজিয়ান ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক এলাইজা ম্যাগনেইর মনে করেন,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেন বা এই অঞ্চলে সরাসরি বড় কোনো যুদ্ধে না জড়িয়ে, ইসরায়েলের মাধ্যমে পক্সি পদ্ধতিতে সউদী আরবকে সুরক্ষা ও কৌশলগত অস্ত্র দিতে চায়। সউদী আরব নিজেরাই সরাসরি মার্কিন অস্ত্র নেওয়ার বদলে ইসরায়েলি কাঠামোর সাহায্য চাইছে, যাতে এসব অস্ত্র ইরান এবং হুথিদের বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়।
সম্প্রতি সউদী আরবের বেশ কয়েকটি তেল পাইপলাইন ও পাম্পিং স্টেশনে হুথিরা সফল ড্রোন হামলা চালায়। এ ছাড়া ইয়েমেন সীমান্ত সংলগ্ন অঞ্চলের সামরিক স্থাপনা ও বেসামরিক অবস্থানও লক্ষ্যবস্তু হয়।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই সউদী সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, হুথিরা ড্রোন ছুড়ে পবিত্র নগরী মক্কায় হামলা চালানোর চেষ্টা করেছে। তবে, সউদী কর্তৃপক্ষ এই গুরুতর দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ তুলে ধরেনি।
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর রাজনৈতিক ব্যুরোর প্রভাবশালী সদস্য হিজাম আল আসাদ ও মোহাম্মদ আল বুখাইতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে স্পষ্ট করে বলেন, কাবার প্রতিটি ধূলিকণা ইয়েমেনিদের কাছে পরম পবিত্র এবং ইয়েমেনিরাই যুগে যুগে বায়তুল্লাহর প্রকৃত রক্ষক। ইয়েমেনি বাহিনীর লড়াই কেবল সৌদি আরবের সামরিক ঘাঁটি, তেল পরিকাঠামো ও অবৈধ অবরোধের বিরুদ্ধে; মক্কা বা কোনো পবিত্র স্থান তাদের লক্ষ্যবস্তু নয়।
সানার প্রধান বিমানবন্দর ধ্বংস ও মানবিক অবরুদ্ধতার জবাব দিতেই কেবল রিয়াদ ও সৌদি আরবের সামরিক ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে সুনির্দিষ্ট নিশানায় হামলা চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে হুথিরা।
বিখ্যাত মার্কিন ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক মেয়ারশাইমার তার বিশ্লেষণে জানান, সউদী আরব একটি নির্দিষ্ট ন্যারেটিভ বা ‘গল্প’ তৈরি করেছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো মুসলিম বিশ্বের সহানুভূতি অর্জন করা এবং সাধারণ মুসলিম দেশগুলোকে ইরান ও ইয়েমেনের বিরুদ্ধে একজোট করা।
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক মারান্ডির মতে, মক্কায় হামলার এই প্রচারণা সম্পূর্ণ পরিকল্পিত। সম্ভবত ইসরায়েলি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বিশেষজ্ঞরাই রিয়াদকে এ ধরনের ভুয়া গল্প প্রচারের পরামর্শ দিয়েছে, যাতে হুথিদের আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা যায়।
হুথি নেতৃবৃন্দ মনে করিয়ে দেন যে, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আমলেও ইয়েমেনি জাতি কাবার সুরক্ষায় অগ্রগামী ছিল। ইসলামিক ইতিহাসের সূত্রে ইয়েমেনিদের বিশেষ মর্যাদার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়: সহীহ বুখারীর ৪৩৯০ নম্বর হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন- তোমাদের কাছে ইয়েমেনের লোক এসেছে, তারা নরম দিল ও কোমল হৃদয়ের অধিকারী। ঈমান হলো ইয়েমেনি এবং প্রজ্ঞা হলো ইয়েমেনি।
রাসূল (সা.)-এর বিশেষ দোয়া: সহীহ বুখারীর ৭০৯৪ নম্বর হাদিসে উল্লেখ আছে, মহানবী (সা.) কাবার আঙিনায় দাঁড়িয়ে দোয়া করেছিলেন- হে আল্লাহ! আমাদের শামে বরকত দিন, আমাদের ইয়েমেনে বরকত দিন।
পবিত্র কুরআনের সূরা সাবা (আয়াত ১৫) এবং সূরা বুরুজে (আয়াত ৪-৭) ইয়েমেনের সাবা জনপদ ও নাজরানের অটল ঈমানদার অধিবাসীদের ঐতিহাসিক ঈমানী দৃঢ়তার প্রশংসা করা হয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, তেল ও সামরিক স্থাপনায় ইয়েমেনি মিসাইল ও ড্রোনের চরম চাপের মুখে পড়েই মূলত মক্কায় হামলার এই রাজনৈতিক গল্প সামনে আনা হয়েছে। একদিকে সৌদি রাজতন্ত্র ধর্মীয় আবেগকে কৌশলগত ঢাল হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে হুথি বিদ্রোহীরা ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় সংযোগ তুলে ধরে প্রমাণ করছে যে, এটি তাদের সংঘাত থেকে বিশ্বজনমতের দৃষ্টি সরানোর একটি ব্যর্থ রাজনৈতিক ও সামরিক ফন্দি মাত্র।
বিশ্লেষকরা আরো বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের প্রাথমিক অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর বড় ধরনের চাপ পড়েছে। অনেক মধ্যবর্তী অস্ত্রাগার ক্ষতিগ্রস্ত বা ব্যবহৃত হওয়ায় আমেরিকা এখন বাধ্য হয়ে ইসরায়েলের মাধ্যমে নতুন অস্ত্র বিন্যাস করছে এবং রিয়াদকে সামরিক তথ্য দিয়ে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 
























