রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আগামী মাসে চীনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছেন। এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন (এপেক) সম্মেলনের ফাঁকে এ বৈঠক আয়োজনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
আগামী ১৮ ও ১৯ নভেম্বর চীনের শেনজেনে এপেক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। রাশিয়া ও চীনের আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে। সংবেদনশীল বিষয় হওয়ায় তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন। বার্তাসংস্থা ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
রাশিয়ার পক্ষ থেকে বৈঠকের সম্ভাবনা তোলার পর চীন এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পেতে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বলে জানিয়েছেন বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক এশীয় কূটনীতিক।
বৈঠক হলে সেখানে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি উপস্থিত না-ও থাকতে পারেন।
সোমবার উজবেকিস্তানের সমরকন্দ সফরকালে সাংবাদিকদের মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, এ ধরনের বৈঠক নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
রুবিও বলেন, ‘যুদ্ধের অবসান ঘটাতে সহায়তা করার মতো কিছু করার সুযোগ থাকলে প্রেসিডেন্ট যেকোনো উদ্যোগের জন্যই প্রস্তুত বলে আমার মনে হয়।’
একই দিন সাংবাদিকদের ট্রাম্প জানান, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে ছাড়াই চীনে পুতিন ও শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে বসতে তিনি আগ্রহী। তবে এ ধরনের আলোচনা আদৌ হবে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলেননি তিনি।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানিয়েছেন, তিন নেতার বৈঠক নিয়ে ‘কাল্পনিকভাবে’ আলোচনা হয়েছে। তবে বৈঠক আয়োজন, সম্ভাব্য আলোচ্যসূচি কিংবা বৈঠকের বিষয়বস্তু নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব বা সমঝোতা হয়নি বলে জানান তিনি। এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
ইউক্রেন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে টানাপোড়েনের মধ্যে প্রস্তাব
ইউক্রেন যুদ্ধে প্রাণঘাতী হামলা বাড়ার পাশাপাশি উভয় পক্ষ বিভিন্ন অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। এমন পরিস্থিতিতে পুতিনের এই প্রস্তাবকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের সম্পর্কে দৃশ্যমান টানাপোড়েনকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারেন রুশ প্রেসিডেন্ট।
রোববার জেলেনস্কি অভিযোগ করেন, কোনো আগাম সতর্কতা ছাড়াই ইউক্রেনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংকে প্রবেশাধিকার সীমিত করেছে হোয়াইট হাউস। ইলন মাস্কের মালিকানাধীন এই সেবা ইউক্রেনের সামরিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে ট্রাম্প ও রুবিও এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ইউক্রেনকে বাদ দিয়ে রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের নেতাদের বৈঠকের ধারণার সমালোচনা করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘ইউক্রেন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার নেতাদের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক যুদ্ধ দ্রুত শেষ করতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতাদের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক ঠিক এর উল্টো ফল দেবে এটি পুতিনকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করবে।’
এর আগে রোববার ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, জেলেনস্কি ‘এই যুদ্ধের অবসান চান না, সম্ভবত কখনোই চাননি’। রাশিয়ার ডিজেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলার কারণে মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এ ছাড়া রাশিয়ার অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলতে পরিকল্পিত একটি বড় নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজও এর আগে আটকে রেখেছেন ট্রাম্প।
বৈঠক নিয়ে সতর্ক চীন
তবে পুতিনের প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন কেউই শেষ পর্যন্ত সম্মতি দেবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
১২ বছর পর প্রথমবারের মতো এপেক সম্মেলনের আয়োজক হতে যাচ্ছে চীন। আগামী ১৮ ও ১৯ নভেম্বর শেনজেনে ২১ সদস্যের এই অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এমন অবস্থায় বড় তিন নেতার উচ্চপর্যায়ের বৈঠক সম্মেলনের মূল আলোচনাকে আড়াল করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া ইউক্রেনের অন্যতম শক্তিশালী সমর্থক এবং চীনের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির ঝুঁকি নিয়েও সতর্ক বেইজিং।
রাশিয়ার আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তির মতে, এ ধরনের ত্রিপক্ষীয় বৈঠক ওয়াশিংটন বা বেইজিংয়ের তুলনায় মস্কোর স্বার্থের জন্য বেশি সহায়ক হবে।
তাই পুতিনের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অবস্থান এবং ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে বৃহত্তর কূটনৈতিক সমীকরণের ওপর।

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 
























