এক সময়ের বিষাক্ত তামাকের মাঠ এখন রঙিন গোলাপে ছেয়ে গেছে। যে মাঠে মিলত তামাকের তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ, আজ সেখানকার বাতাসে ভেসে বেড়ায় গোলাপের মনকাড়া সুবাস। কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়ন এখন দেশজুড়ে ‘গোলাপ গ্রাম’ বা ‘গোলাপ পল্লি’ হিসেবে পরিচিত।
ক্ষতিকর তামাক চাষের পথ পরিহার করে এই এলাকার কৃষক এখন বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষে সৃষ্টি করেছেন এক নতুন বিপ্লব। চাষের পরিধি বাড়লেও হিমাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে প্রতি বছর কোটি টাকার ফুল নষ্ট হচ্ছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উপজেলা কৃষি অফিসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চকরিয়ার বরইতলী ও হারবাং ইউনিয়নের ১০৫ একরেরও বেশি জমিতে এখন বাণিজ্যিকভাবে গোলাপের আবাদ করা হচ্ছে। এই ইউনিয়নে দুই শতাধিক ফুল চাষি পরিবার সরাসরি এই পেশার সঙ্গে যুক্ত।
স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে বরইতলীর কয়েকজন উদ্যমী কৃষক পরীক্ষামূলকভাবে গোলাপ চাষ শুরু করেন। এখানকার দোআঁশ মাটি এবং অনুকূল আবহাওয়া গোলাপ চাষের জন্য এতটাই চমৎকার প্রমাণিত হয় যে, দ্রুতই তা পুরো ইউনিয়নে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে বরইতলীর উত্তর ও দক্ষিণপাড়া, একতা বাজার, ডেইঙ্গাকাটাসহ বিস্তীর্ণ এলাকার জমিতে বাণিজ্যিকভাবে গোলাপের চাষ হচ্ছে।
বাংলাদেশে গোলাপ চাষের মূল মৌসুম শীতকাল হওয়ায় বছরের এই সময়ে (অক্টোবর) বরইতলীর বাগানগুলোয় চলছে উৎসবমুখর প্রস্তুতি। কৃষকরা এখন নতুন চারা রোপণ, পুরোনো গাছের ছাঁটাই (Pruning), নিড়ানি এবং সার-কীটনাশক প্রয়োগের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়,নভেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে বাগানগুলো লাল, হলুদ ও সাদা গোলাপে রঙিন হতে শুরু করবে। মূলত ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চলে বিক্রির মূল মৌসুম (পিক-সিজন)। বিশেষ করে ইংরেজি নববর্ষ, ১৬ ডিসেম্বর, বসন্ত উৎসব, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস এবং একুশে ফেব্রুয়ারির মতো বড় বড় উৎসবে এখানকার গোলাপের চাহিদা থাকে আকাশচুম্বী। বরইতলী থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার গোলাপ রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম ও পর্যটন শহর কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয়।
বরইতলী গোলাপ বাগান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও সফল গোলাপ চাষি মঈনুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, তামাক চাষে কঠোর খাটুনি আর স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকলেও লাভ হতো সামান্য। কিন্তু এক বিঘা জমিতে গোলাপ চাষ করে এখন আমরা তামাকের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি লাভ করছি। এটি যেমন পরিবেশবান্ধব, তেমনি লাভজনক। বরইতলী ও পার্শ্ববর্তী হারবাংয়ের প্রায় শতাধিক একর জমিতে এখন বাণিজ্যিক গোলাপের চাষ হচ্ছে।
তবে প্লাস্টিক ও কাগজের কৃত্রিম ফুলের দাপট এবং সংরক্ষণের অভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মঈনুল ইসলাম বলেন, বাজারে কৃত্রিম ফুলের দাপটের কারণে আমরা মাঝেমধ্যে বড় ধাক্কা খাই। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, আমাদের এখানে কোনো হিমাগার বা ফুল প্রক্রিয়াজাতকরণের সুবিধা নেই। সুগন্ধি বা গোলাপের নির্যাস তৈরির কোনো উদ্যোগ না থাকায় শুধু বরইতলী ইউনিয়নেই প্রতি বছর অবিক্রীত অবস্থায় গাছে ও বাজারে প্রায় ৩০-৩৫ লাখ গোলাপ নষ্ট হয়ে যায়। সরকার যদি এখানে পারফিউম বা সুগন্ধি তৈরির কারখানা স্থাপনে উদ্যোগ নিত, তবে এই অপচয় রোধ করা যেত।
চকরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহানাজ ফেরদৌসী এলাকার ফুল চাষের বর্তমান চিত্র ও সম্ভাবনা নিয়ে কালবেলাকে বলেন, এক সময়ের তামাকপ্রবণ এই অঞ্চলে কৃষক এখন পরিবেশবান্ধব ও লাভজনক গোলাপ চাষে ঝুঁকছেন, যা মাটির উর্বরতা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক। কৃষি বিভাগ থেকে আমরা চাষিদের আধুনিক চাষ পদ্ধতি ও রোগবালাই দমনে নিয়মিত কারিগরি সহায়তা দিচ্ছি। ফুল পচনশীল পণ্য হওয়ায় এর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে এবং সংরক্ষণের জন্য হিমাগার স্থাপনের বিষয়ে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বরইতলীর এই গোলাপ একদিন বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব।
বাণিজ্যিক দিক ছাড়াও বরইতলীর এই গোলাপ বাগানগুলো এখন স্থানীয় পর্যটনের অন্যতম বড় আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। শীতের মৌসুমে নয়নকাড়া এই দৃশ্য উপভোগ করতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত পর্যটক চকরিয়ার এই গোলাপ গ্রামে ভিড় জমান। স্থানীয়রা মনে করছেন,ফুল চাষকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলে কৃষি-পর্যটন বিকাশের এক বিশাল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 























