কোনো তথ্য মনে রাখতে হবে না, জটিল প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মাথা ঘামাতে হবে না, এমনকি সঠিক শব্দ খুঁজে বের করারও প্রয়োজন নেই। কয়েকটি শব্দ লিখে চ্যাটজিপিটিকে নির্দেশ দিলেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে প্রয়োজনীয় তথ্য, সারসংক্ষেপ কিংবা জটিল বিষয়ের ব্যাখ্যা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) এই সুবিধা মানুষের কাজ ও শেখার পদ্ধতিকে সহজ করে তুলেছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কি মানুষের স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্বেগের বিষয় শুধু এআই ব্যবহারের পরিমাণ নয়; বরং এআই যখন মানুষের হয়ে চিন্তা করা, তথ্য মনে রাখা ও সমস্যা সমাধানের কাজ করতে শুরু করে, তখন শেখার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া কতটা বাধাগ্রস্ত হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের চেন্নাইয়ের গ্লেনিগলস হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক নিউরোসার্জন ও বিভাগীয় প্রধান ডা. নাইজেল পিটার সিমস বলেন, মানুষের মস্তিষ্কের শেখা ও মনে রাখার ক্ষমতা তথ্যের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত থাকার ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে। তার ভাষায়, মানুষের মস্তিষ্ক শেখা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে নিজেকে পরিবর্তন ও মানিয়ে নিতে পারে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় নিউরোপ্লাস্টিসিটি। অর্থাৎ মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলোর মধ্যে সংযোগ তৈরি ও শক্তিশালী হওয়ার ক্ষমতা।
কীভাবে স্মৃতি তৈরি ও সংরক্ষিত হয়?
কোনো কিছু মনে রাখার প্রক্রিয়া শুধু তথ্য জমা রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রথমে মস্তিষ্ক তথ্য গ্রহণ করে, পরে তা সংরক্ষণের উপযোগী করে এবং প্রয়োজনের সময় স্মৃতি থেকে ফিরিয়ে আনে। মনোযোগ, পুনরাবৃত্তি, পূর্বজ্ঞান ও সক্রিয় অংশগ্রহণ এ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে।
মস্তিষ্কের গভীরে অবস্থিত হিপোক্যাম্পাস নতুন স্মৃতি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নতুন কিছু শেখার সময় মস্তিষ্ক তথ্য প্রক্রিয়াজাত করে এবং এমন স্নায়বিক সংযোগ তৈরি করে, যা পরবর্তী সময়ে সেই তথ্য মনে করতে সাহায্য করে।
নিজের স্মৃতি থেকে তথ্য মনে করার এই অনুশীলনকে বলা হয় অ্যাকটিভ রিকল। এটি শেখার একটি স্বীকৃত পদ্ধতি। শুধু সামনে তথ্য দেখে চিনে নেওয়ার পরিবর্তে নিজের চেষ্টা দিয়ে তথ্য মনে করার অভ্যাস স্মৃতিশক্তি চর্চায় সহায়তা করে।
এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার প্রভাব
চ্যাটজিপিটির মতো এআই টুল দীর্ঘ লেখা সংক্ষেপ করতে পারে, প্রবন্ধ লিখতে পারে, অপরিচিত বিষয় বুঝিয়ে দিতে পারে এবং জটিল সমস্যার সমাধানও প্রস্তাব করতে পারে। তবে সমস্যা তৈরি হয় যখন মানুষ নিজের চিন্তা ও শেখার পরিবর্তে সম্পূর্ণভাবে এআইয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
ডা. সিমসের মতে, প্রাপ্তবয়স্করা অতিরিক্ত এআইনির্ভর হয়ে পড়লে নিজের স্মৃতি থেকে তথ্য মনে করা এবং স্বাধীনভাবে বিশ্লেষণ করার অনুশীলনের সুযোগ কমে যেতে পারে। প্রতিবার শেখা কোনো বিষয় নিজে মনে করার চেষ্টা করলে স্মৃতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্নায়বিক সংযোগ শক্তিশালী হতে সহায়তা করে।
শিশুদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। তারা যদি নিজেরা চেষ্টা না করে এআইয়ের মাধ্যমে সব কাজ সম্পন্ন করে, তাহলে যুক্তি প্রয়োগ, মনোযোগ ধরে রাখা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা চর্চার সুযোগ হারাতে পারে।
গবেষণায় কী উঠে এসেছে?
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটি মিডিয়া ল্যাবের ‘ইয়োর ব্রেইন অন চ্যাটজিপিটি’ শীর্ষক একটি গবেষণা আলোচনায় এসেছে। গবেষকেরা ইলেকট্রোএনসেফালোগ্রাফি (ইইজি) পদ্ধতিতে অংশগ্রহণকারীদের মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। এ সময় কেউ চ্যাটজিপিটির সহায়তায় এবং কেউ এআই ব্যবহার না করে প্রবন্ধ লেখেন।
গবেষণায় দেখা যায়, এআইয়ের সহায়তা নেওয়া অংশগ্রহণকারীদের মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে সামগ্রিক সংযোগ তুলনামূলক কম ছিল। তবে গবেষণাটি প্রাথমিক পর্যায়ের এবং এর ফলাফল দিয়ে এআই ব্যবহারে স্থায়ী স্মৃতিশক্তি হ্রাস কিংবা মস্তিষ্কের শারীরিক ক্ষতি হয়—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
ডা. সিমসও সতর্ক করে বলেছেন, এআই ব্যবহারের কারণে স্থায়ী স্মৃতিশক্তি হ্রাস বা মস্তিষ্কের শারীরিক ক্ষতি হয়, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো নেই।
তার মতে, শেখার কাজে এআইকে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা এবং সম্পূর্ণ শেখার প্রক্রিয়াটিই এআইয়ের হাতে ছেড়ে দেওয়া—দুটি এক বিষয় নয়। এআইয়ের দেওয়া তথ্য যাচাই করা, প্রশ্ন করা, উত্তর বিশ্লেষণ করা এবং নিজে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা জরুরি। প্রযুক্তিকে মানুষের চিন্তাশক্তির বিকল্প নয়, বরং সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করাই হওয়া উচিত।
সূত্র: নিউজ ১৮

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 























