ঢাকা , শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ ভিসা নীতিমালার খসড়া পরিমার্জন ও চূড়ান্তকরণে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা, বাস্তবায়নে কতটা আশার আলো চাকরিজীবীদের জন্য দুই দফায় মিলবে যে ছুটি প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর পরামর্শ অলির সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ৩ বাহিনীর জন্য বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  তিনি বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামারিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।  জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলছে। নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য (এমপি) মাছুম মোস্তফার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি থেকে শিল্পে রুপান্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা

সুন্দরবনের মধু ও মৌয়ালেরা

সুন্দরবনের প্রথম মৌচাকের দেখা পেলাম কচিখালিতে কোস্টগার্ড বাংলোর উত্তরদিকের বনটিতে। দেখালেন সেখানকার কোস্টগার্ডের সিনিয়র অফিসার মেহেদী হাসান। আর সুন্দরবনের মধু প্রথমে খেয়েছিলাম হাড়বাড়িয়াতে বনবিভাগের কর্মকর্তা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ও বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র কামরুল ইসলাম এর বাংলোয়। চারদিনের স্টাডি ট্যুর ছিল সুন্দরবনে। এ সংক্ষিপ্ত সময়ে অনেককিছুই দেখা সম্ভব হয়নি। তাই বারবার বন বিভাগের দুই গান ম্যান আর আমাদের গাইড ইমরান ভাইয়ের কাছ থেকে জেনে নিতে হয়েছে অনেক প্রয়োজনীয় তথ্য। আমরা যে সময়ে সুন্দবনের গিয়েছিলাম সে সময় মৌয়ালদের জন্য অনুমতি ছিল না মধু সংগ্রহ করার। প্রতিবছর এপ্রিল থেকে ২-৩ মাসের জন্য মধু সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হয়। সৌভাগ্যক্রমে আমরা যে লঞ্চে ছিলাম এর দুই চালকের একজন আগে সুন্দরবনে পেশাদারভাবে মধু সংগ্রহ করত। যে কারণে তারকাছ থেকে অনেক প্রয়োজনীয় তথ্য পেয়েছি।

বাংলাদেশের মোট আয়তনের ৪.২ ভাগ এবং দেশের মোট বনভূমির ৪৪ ভাগজুড়ে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের সুন্দরবন। স্থানীয়ভাবে বাদাবন, প্যারাবন হিসেবে পরিচিত দুনিয়ার সবচে’ বড় এই ম্যানগ্রোভ বন।

অগণিত প্রাণিবৈচিত্র্যের সাথে স্থানীয় বাওয়ালী-মৌয়াল-মাঝি-জেলে-চুনরি-মুন্ডা-মাহাতো জনগণ গড়ে তুলেছে এক ঐতিহাসিক স্থায়িত্বশীল বননির্ভর জীবন।

সুন্দরবনের মধু বাংলাদেশের এক অনন্য ভৌগলিক নির্দেশনা। সুন্দরবনের মধু ও মোম আহরণের উপর নিভর্র করে পৃথিবীর একক আয়তনের সবচে’ বড় ম্যানগ্রোভ বনে গড়ে ওঠেছে মৌয়ালি নামের এক ঐতিহ্যগত বননির্ভর পেশা ও জীবন।

বাংলা চৈত্র মাসের অর্ধেকদিন থেকে শুরু হয় সুন্দরবনের মধু সংগ্রহের ঋতু। এ সময় বনবিভাগের স্থানীয় কার্যালয় থেকে স্থানীয় বনজীবীদের জন্য এক এক জনের জন্য একটি করে মধু কাটার পাশ এবং বনে প্রবেশের জন্য একটি মৌয়াল দলের নৌকার জন্য একটি বিএলসি পাশ দেওয়া হয়। নৌকার মালিক বা দলের প্রধান যাকে সাজুনী বলে তার নামে বিএলসি পাশ দেওয়া হয়।

গাইড ও সেই লঞ্চের নাবিক বাবুর মতে, সুন্দরবনে তিনরকমের মৌমাছি দেখা যায়। এর ভেতর আগুনে মৌমাছিই বেশি চাক বানায় এবং এদের চাকের মধুই সুন্দরবনের সেরা মধু। লালচে আভার মিষ্টি স্বাদের এই মধুকে পদ্মমধু বলে এবং খলিশা ফুল থেকে এই মধু সংগ্রহ করে মৌমাছিরা। তাদের মতে, এক ফোঁটা মধু সংগ্রহের জন্য একটি মৌমাছিকে প্রায় আশিটি ফুলে যেতে হয়। সুন্দরবনের মৌমাছিকে স্থানীয়রা পরিযায়ী মৌমাছি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কটকার বন বিভাগরে এক কর্মচারী জানালেন, মাঘ মাসের শ্রীপঞ্চমীর দিন মৌমাছিরা সুন্দরবনে চলে আসে। বনজীবীদের ধারণা এসব মৌমাছি মাঘ মাস থেকে সুন্দরবন এলাকায় আসতে শুরু করে এবং সুন্দরবনে তাদের মধুচক্রের সময়টা পাড় করে আষাঢ় মাসে আবার চলে যায়। বনজীবীরা বলেন, ‘ফুল ফোটার ঋতুকে মৌমাছিরা টের পায় এবং ঝাঁক বেঁধে ফুল ফোটার ঋতু মূলত বসন্তকালে সুন্দরবনে চলে আসে।’

মৌমাছির মধুগ্রন্থি যখন মধু রসে পূর্ণ থাকে তখন একে বনজীবীরা ‘ভারি পোকা’ বলে। ভারি পোকা তুলনামূলকভাবে ধীরগতিতে ওড়ে এবং ডানে-বামে না গিয়ে সোজা চাকের দিকে উড়তে থাকে। মৌয়ালরা ভারি পোকার চলন এবং গতিপথ দেখে তার পেছন পেছন গিয়ে চাকের সন্ধান করেন।

সুন্দরবনের সকল প্রজাতির গাছে মৌমাছি চাক বানায় না। তবে অনেকসময় পানির উপর হেলে পড়া ডালেও চাক দেখা যায়, সেক্ষেত্রে জোয়ারের সময় অনেকক্ষেত্রে চাক ডুবে যায় এবং এতে চাক ও মৌপোকাদের ক্ষতি হয়। কাঁকড়া ও জানা গাছে মৌমাছি বেশি চাক বানায়। কারণ এসব গাছে তুলনামূলকভাবে হেলানো ডাল বেশি থাকে। পশুর, ধুন্দল,কেওড়া ও ঢালচাকা গাছেও চাকের সংখ্যা বেশি দেখা যায়। তবে চান্দা, গোল গাছ, সুন্দরী এবং ঝোঁপে এবং বন লেবুতে গাছে চাক খুব কম দেখা যায়।

মধু চাকে জমা করার পর বাইরে যাতে না পড়ে যায় বা এতে যাতে জলীয়বাষ্প না জমা হয় তাই মৌমাছিরা পরাগরেণু দিয়ে মুখগুলো ঢেকে দেয়। একে বনজীবীরা গুটলি বলেন।

বৈশাখ মাসে সুন্দরবনের লতা জাতীয় গাছে ফুল ফোটে। জ্যৈষ্ঠে ফোটে বাইনের ফুল। এ মাসে ধুন্দুলের ফল ঝড়ে পড়ে ও অংকুরোদগম হয়। আষাঢ় মাসে গোলের ফল ঝরে পড়ে,আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে কেওড়া, অগ্রহায়ণে ধুন্দুলের ফুল, ফাল্গুন মাসে গেওয়া ও পশুরের নতুন পাতা দেখা দেয়। শ্রাবণে সুন্দরবনের প্রায় বৃক্ষের ফলই জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে পাকে এবং শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে সুন্দরবনে গাছের নতুন চারা জন্মে।

সুন্দরবনের সরগরম মধু মৌসুম চৈত্র থেকে বৈশাখ পর্যন্ত। এসময় খলিশার মধু বেশি পাওয়া যায়। তারপর গেওয়ার মধু এবং পরবর্তীতে বাইন, কেওড়ার মধু পাওয়া যায়।

দামের একটি হিসেব দিলেন সাবেক মৌয়াল বাবু। তিনি জানালেন, দেশ স্বাধীনের পর কিছুদিন এক সের মধুর দাম ছিল ২০ টাকা, এর পর ৭০ টাকা, বর্তমানে মৌয়ালরা প্রতি কেজি খলিশার মধু ১২০-১৫০ টাকা করে বিক্রি করলেও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এক কেজি মধু ৩০০ টাকা করে বিক্রি করেন।

গাইড ও বাবুর কাছে থেকে জানলাম, মধু আহরণ ঋতুতে যখন বাড়ির পুরুষেরা বনে থাকে তখন বাড়ির নারীদের নানান নিয়ম পালন করতে হয়। তারা এ সময় বাড়ির বাইরে খুব একটা দূরের এলাকায় যান না। নারীরা এ সময় মাথায় তেল-সাবান ব্যবহার করেন না।

এ সময় নারীরা দুপুরবেলা কোনোভাবেই চুলায় আগুন জ্বালান না। কারণ তারা বিশ্বাস করেন বাড়িতে এ সময় আগুন ধরালে বন এবং মধুর চাকের ক্ষতি হবে। মধু কাটার মাসে মৌয়ালিরা কারো সাথে ঝগড়া বিবাদ করেন না, এ সময় মিথ্যা বলা ও কোনো ধরনের অন্যায় আচরণ থেকে সকলেই বিরত থাকার চেষ্টা করেন।

মধু সংগ্রহের সময় মৌয়ালিরা বেশকিছু নিয়ম পালন করেন। একটি মৌয়াল দলের সকলেই দল প্রধান বা সাজুনীর দিকনির্দশনা মেনে চলেন। প্রথমে তারা পূর্বঅভিজ্ঞতা অনুযায়ী বা মৌমাছির গতিপথ দেখে বনের কিনারে নৌকা রেখে বনের ভেতর চাকের সন্ধান করেন। চাক খোঁজার সময় মৌয়ালদের দৃষ্টিটা উপরের দিকে থাকে বলে মৌয়ালরাই বাঘের আক্রমণের শিকার হন সবচে’ বেশি।

মৌয়ালদের সকলের মুখ তখন মৌমাছির হুল থেকে বাঁচার জন্য ঢাকা থাকে। তারপর ধারালো দা দিয়ে চাকের কেবলমাত্র মধুর অংশটুকু কাটা হয়। চাকের যে অংশে বাচ্চা ও মৌপোকারা থাকে তাদেরকে রেখে দেওয়া হয়। বড় মুখের পাত্রে মধু সংরক্ষণ করা হয় যাতে মধুর জলীয়বাষ্প উড়ে চলে যায়।

সুন্দরবনে বাংলা চৈত্র মাসের অর্ধেক দিন পর থেকে মধু সংগ্রহের পাশ দেয় বনবিভাগ। কিন্তু মৌয়ালদের মতে, ঋতুগত পরিবর্তন এবং ফুলের প্রস্ফুটনকাল এগিয়ে আসায় বর্তমানে এই পাশ আরো এগিয়ে এনে ৭-১০ চৈত্রের ভেতর করা উচিৎ। কারণ সময়মত মধু সংগ্রহ না করতে পারলে চাকের ভেতর মধু খাবার হিসেবে জমা থাকে এবং মধু সংগ্রহের প্রয়োজন না থাকায় মৌমাছিরা অলস হয়ে পড়ে এবং চাকের মধ্যে বসে থাকে।

সুন্দরবন নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে কাজ করছের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড.মনিরুজ্জামান মনে করেন, ‘সঠিক পদ্ধতিতে মধু সংগ্রহের ফলে সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি হয় না বরং তা সুন্দরবনের প্রাণিবৈচিত্র্যে বিকাশ ও বনের প্রাকৃতিক ব্যবস্থাপনার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। তবে অনেকে মধু সংগ্রহের ক্ষেত্রে সঠিক নিয়মনীতি মেনে চলে না। তারা পুরো চাক কেটে ফেলে। অনেকে চাকে আগুন দেয় তাতে বাচ্চা মৌপোকারা মারা যায়। অনেকে মধু কাটার নাম করে বনের গাছ কেটে ফেলে। এটা সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে হুমকিস্বরুপ।’

আবহাওয়াগত এ পরিবর্তনের ফলে বনজীবীদের ধারণা বিগত দু’বছরে সুন্দরবনের মৌমাছিদের আচরণগত পরিবর্তনও ঘটেছে। এতে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে বনজীবীদের মৌমাছির কামড় বেশি খেতে হয়েছে। তবে সিডর এবং আইলার পর সাতক্ষীরা রেঞ্জে মধুর পরিমাণ কমে যায়নি বলে বনজীবীরা মন্তব্য করেন।

একটি মৌপোকা মারলে ৫০ টাকা জরিমানা দেয়ার বিধান থাকলেও বনবিভাগ গুরুত্বপূর্ণ বন আইনগুলো মৌয়ালদের জানাচ্ছে না।

এছাড়া আরেকটি বিষয় হলো যে, নতুন প্রজন্ম সুন্দরবন এলাকায় বেড়ে ওঠছে তাদের অনেকেরই ঐতিহ্যগত মধু সংগ্রহের জ্ঞান ও পদ্ধতিগুলো জানা নেই। তাদের সংগৃহীত মধুর মান ও দামও অনেক কমে যায়। কারণ তাতে ময়লা ও জলীয়বাষ্প বেশি থাকে।

এখানে সঠিক লোকায়ত নিয়মে মধু সংগ্রহ করলে বনভূমির কোনো ক্ষতি হয় না, বরং এটি বনভূমির প্রাকৃতিক ব্যবস্থাপনারই একটি অংশ হিসেবে দেখেন বনজীবীরা। একটু পরোক্ষভাবে বলতে গেলে বলতে হবে সুন্দরবনের মৌমাছি ও মৌয়ালিরা এক জটিল প্রতিবেশীয় সহাবস্থানের ভেতর দিয়ে এখনও বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নে ভূমিকা রেখে চলেছেন।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ

সুন্দরবনের মধু ও মৌয়ালেরা

আপডেট টাইম : ০৪:২৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ এপ্রিল ২০১৭

সুন্দরবনের প্রথম মৌচাকের দেখা পেলাম কচিখালিতে কোস্টগার্ড বাংলোর উত্তরদিকের বনটিতে। দেখালেন সেখানকার কোস্টগার্ডের সিনিয়র অফিসার মেহেদী হাসান। আর সুন্দরবনের মধু প্রথমে খেয়েছিলাম হাড়বাড়িয়াতে বনবিভাগের কর্মকর্তা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ও বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র কামরুল ইসলাম এর বাংলোয়। চারদিনের স্টাডি ট্যুর ছিল সুন্দরবনে। এ সংক্ষিপ্ত সময়ে অনেককিছুই দেখা সম্ভব হয়নি। তাই বারবার বন বিভাগের দুই গান ম্যান আর আমাদের গাইড ইমরান ভাইয়ের কাছ থেকে জেনে নিতে হয়েছে অনেক প্রয়োজনীয় তথ্য। আমরা যে সময়ে সুন্দবনের গিয়েছিলাম সে সময় মৌয়ালদের জন্য অনুমতি ছিল না মধু সংগ্রহ করার। প্রতিবছর এপ্রিল থেকে ২-৩ মাসের জন্য মধু সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হয়। সৌভাগ্যক্রমে আমরা যে লঞ্চে ছিলাম এর দুই চালকের একজন আগে সুন্দরবনে পেশাদারভাবে মধু সংগ্রহ করত। যে কারণে তারকাছ থেকে অনেক প্রয়োজনীয় তথ্য পেয়েছি।

বাংলাদেশের মোট আয়তনের ৪.২ ভাগ এবং দেশের মোট বনভূমির ৪৪ ভাগজুড়ে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের সুন্দরবন। স্থানীয়ভাবে বাদাবন, প্যারাবন হিসেবে পরিচিত দুনিয়ার সবচে’ বড় এই ম্যানগ্রোভ বন।

অগণিত প্রাণিবৈচিত্র্যের সাথে স্থানীয় বাওয়ালী-মৌয়াল-মাঝি-জেলে-চুনরি-মুন্ডা-মাহাতো জনগণ গড়ে তুলেছে এক ঐতিহাসিক স্থায়িত্বশীল বননির্ভর জীবন।

সুন্দরবনের মধু বাংলাদেশের এক অনন্য ভৌগলিক নির্দেশনা। সুন্দরবনের মধু ও মোম আহরণের উপর নিভর্র করে পৃথিবীর একক আয়তনের সবচে’ বড় ম্যানগ্রোভ বনে গড়ে ওঠেছে মৌয়ালি নামের এক ঐতিহ্যগত বননির্ভর পেশা ও জীবন।

বাংলা চৈত্র মাসের অর্ধেকদিন থেকে শুরু হয় সুন্দরবনের মধু সংগ্রহের ঋতু। এ সময় বনবিভাগের স্থানীয় কার্যালয় থেকে স্থানীয় বনজীবীদের জন্য এক এক জনের জন্য একটি করে মধু কাটার পাশ এবং বনে প্রবেশের জন্য একটি মৌয়াল দলের নৌকার জন্য একটি বিএলসি পাশ দেওয়া হয়। নৌকার মালিক বা দলের প্রধান যাকে সাজুনী বলে তার নামে বিএলসি পাশ দেওয়া হয়।

গাইড ও সেই লঞ্চের নাবিক বাবুর মতে, সুন্দরবনে তিনরকমের মৌমাছি দেখা যায়। এর ভেতর আগুনে মৌমাছিই বেশি চাক বানায় এবং এদের চাকের মধুই সুন্দরবনের সেরা মধু। লালচে আভার মিষ্টি স্বাদের এই মধুকে পদ্মমধু বলে এবং খলিশা ফুল থেকে এই মধু সংগ্রহ করে মৌমাছিরা। তাদের মতে, এক ফোঁটা মধু সংগ্রহের জন্য একটি মৌমাছিকে প্রায় আশিটি ফুলে যেতে হয়। সুন্দরবনের মৌমাছিকে স্থানীয়রা পরিযায়ী মৌমাছি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কটকার বন বিভাগরে এক কর্মচারী জানালেন, মাঘ মাসের শ্রীপঞ্চমীর দিন মৌমাছিরা সুন্দরবনে চলে আসে। বনজীবীদের ধারণা এসব মৌমাছি মাঘ মাস থেকে সুন্দরবন এলাকায় আসতে শুরু করে এবং সুন্দরবনে তাদের মধুচক্রের সময়টা পাড় করে আষাঢ় মাসে আবার চলে যায়। বনজীবীরা বলেন, ‘ফুল ফোটার ঋতুকে মৌমাছিরা টের পায় এবং ঝাঁক বেঁধে ফুল ফোটার ঋতু মূলত বসন্তকালে সুন্দরবনে চলে আসে।’

মৌমাছির মধুগ্রন্থি যখন মধু রসে পূর্ণ থাকে তখন একে বনজীবীরা ‘ভারি পোকা’ বলে। ভারি পোকা তুলনামূলকভাবে ধীরগতিতে ওড়ে এবং ডানে-বামে না গিয়ে সোজা চাকের দিকে উড়তে থাকে। মৌয়ালরা ভারি পোকার চলন এবং গতিপথ দেখে তার পেছন পেছন গিয়ে চাকের সন্ধান করেন।

সুন্দরবনের সকল প্রজাতির গাছে মৌমাছি চাক বানায় না। তবে অনেকসময় পানির উপর হেলে পড়া ডালেও চাক দেখা যায়, সেক্ষেত্রে জোয়ারের সময় অনেকক্ষেত্রে চাক ডুবে যায় এবং এতে চাক ও মৌপোকাদের ক্ষতি হয়। কাঁকড়া ও জানা গাছে মৌমাছি বেশি চাক বানায়। কারণ এসব গাছে তুলনামূলকভাবে হেলানো ডাল বেশি থাকে। পশুর, ধুন্দল,কেওড়া ও ঢালচাকা গাছেও চাকের সংখ্যা বেশি দেখা যায়। তবে চান্দা, গোল গাছ, সুন্দরী এবং ঝোঁপে এবং বন লেবুতে গাছে চাক খুব কম দেখা যায়।

মধু চাকে জমা করার পর বাইরে যাতে না পড়ে যায় বা এতে যাতে জলীয়বাষ্প না জমা হয় তাই মৌমাছিরা পরাগরেণু দিয়ে মুখগুলো ঢেকে দেয়। একে বনজীবীরা গুটলি বলেন।

বৈশাখ মাসে সুন্দরবনের লতা জাতীয় গাছে ফুল ফোটে। জ্যৈষ্ঠে ফোটে বাইনের ফুল। এ মাসে ধুন্দুলের ফল ঝড়ে পড়ে ও অংকুরোদগম হয়। আষাঢ় মাসে গোলের ফল ঝরে পড়ে,আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে কেওড়া, অগ্রহায়ণে ধুন্দুলের ফুল, ফাল্গুন মাসে গেওয়া ও পশুরের নতুন পাতা দেখা দেয়। শ্রাবণে সুন্দরবনের প্রায় বৃক্ষের ফলই জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে পাকে এবং শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে সুন্দরবনে গাছের নতুন চারা জন্মে।

সুন্দরবনের সরগরম মধু মৌসুম চৈত্র থেকে বৈশাখ পর্যন্ত। এসময় খলিশার মধু বেশি পাওয়া যায়। তারপর গেওয়ার মধু এবং পরবর্তীতে বাইন, কেওড়ার মধু পাওয়া যায়।

দামের একটি হিসেব দিলেন সাবেক মৌয়াল বাবু। তিনি জানালেন, দেশ স্বাধীনের পর কিছুদিন এক সের মধুর দাম ছিল ২০ টাকা, এর পর ৭০ টাকা, বর্তমানে মৌয়ালরা প্রতি কেজি খলিশার মধু ১২০-১৫০ টাকা করে বিক্রি করলেও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এক কেজি মধু ৩০০ টাকা করে বিক্রি করেন।

গাইড ও বাবুর কাছে থেকে জানলাম, মধু আহরণ ঋতুতে যখন বাড়ির পুরুষেরা বনে থাকে তখন বাড়ির নারীদের নানান নিয়ম পালন করতে হয়। তারা এ সময় বাড়ির বাইরে খুব একটা দূরের এলাকায় যান না। নারীরা এ সময় মাথায় তেল-সাবান ব্যবহার করেন না।

এ সময় নারীরা দুপুরবেলা কোনোভাবেই চুলায় আগুন জ্বালান না। কারণ তারা বিশ্বাস করেন বাড়িতে এ সময় আগুন ধরালে বন এবং মধুর চাকের ক্ষতি হবে। মধু কাটার মাসে মৌয়ালিরা কারো সাথে ঝগড়া বিবাদ করেন না, এ সময় মিথ্যা বলা ও কোনো ধরনের অন্যায় আচরণ থেকে সকলেই বিরত থাকার চেষ্টা করেন।

মধু সংগ্রহের সময় মৌয়ালিরা বেশকিছু নিয়ম পালন করেন। একটি মৌয়াল দলের সকলেই দল প্রধান বা সাজুনীর দিকনির্দশনা মেনে চলেন। প্রথমে তারা পূর্বঅভিজ্ঞতা অনুযায়ী বা মৌমাছির গতিপথ দেখে বনের কিনারে নৌকা রেখে বনের ভেতর চাকের সন্ধান করেন। চাক খোঁজার সময় মৌয়ালদের দৃষ্টিটা উপরের দিকে থাকে বলে মৌয়ালরাই বাঘের আক্রমণের শিকার হন সবচে’ বেশি।

মৌয়ালদের সকলের মুখ তখন মৌমাছির হুল থেকে বাঁচার জন্য ঢাকা থাকে। তারপর ধারালো দা দিয়ে চাকের কেবলমাত্র মধুর অংশটুকু কাটা হয়। চাকের যে অংশে বাচ্চা ও মৌপোকারা থাকে তাদেরকে রেখে দেওয়া হয়। বড় মুখের পাত্রে মধু সংরক্ষণ করা হয় যাতে মধুর জলীয়বাষ্প উড়ে চলে যায়।

সুন্দরবনে বাংলা চৈত্র মাসের অর্ধেক দিন পর থেকে মধু সংগ্রহের পাশ দেয় বনবিভাগ। কিন্তু মৌয়ালদের মতে, ঋতুগত পরিবর্তন এবং ফুলের প্রস্ফুটনকাল এগিয়ে আসায় বর্তমানে এই পাশ আরো এগিয়ে এনে ৭-১০ চৈত্রের ভেতর করা উচিৎ। কারণ সময়মত মধু সংগ্রহ না করতে পারলে চাকের ভেতর মধু খাবার হিসেবে জমা থাকে এবং মধু সংগ্রহের প্রয়োজন না থাকায় মৌমাছিরা অলস হয়ে পড়ে এবং চাকের মধ্যে বসে থাকে।

সুন্দরবন নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে কাজ করছের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড.মনিরুজ্জামান মনে করেন, ‘সঠিক পদ্ধতিতে মধু সংগ্রহের ফলে সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি হয় না বরং তা সুন্দরবনের প্রাণিবৈচিত্র্যে বিকাশ ও বনের প্রাকৃতিক ব্যবস্থাপনার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। তবে অনেকে মধু সংগ্রহের ক্ষেত্রে সঠিক নিয়মনীতি মেনে চলে না। তারা পুরো চাক কেটে ফেলে। অনেকে চাকে আগুন দেয় তাতে বাচ্চা মৌপোকারা মারা যায়। অনেকে মধু কাটার নাম করে বনের গাছ কেটে ফেলে। এটা সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে হুমকিস্বরুপ।’

আবহাওয়াগত এ পরিবর্তনের ফলে বনজীবীদের ধারণা বিগত দু’বছরে সুন্দরবনের মৌমাছিদের আচরণগত পরিবর্তনও ঘটেছে। এতে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে বনজীবীদের মৌমাছির কামড় বেশি খেতে হয়েছে। তবে সিডর এবং আইলার পর সাতক্ষীরা রেঞ্জে মধুর পরিমাণ কমে যায়নি বলে বনজীবীরা মন্তব্য করেন।

একটি মৌপোকা মারলে ৫০ টাকা জরিমানা দেয়ার বিধান থাকলেও বনবিভাগ গুরুত্বপূর্ণ বন আইনগুলো মৌয়ালদের জানাচ্ছে না।

এছাড়া আরেকটি বিষয় হলো যে, নতুন প্রজন্ম সুন্দরবন এলাকায় বেড়ে ওঠছে তাদের অনেকেরই ঐতিহ্যগত মধু সংগ্রহের জ্ঞান ও পদ্ধতিগুলো জানা নেই। তাদের সংগৃহীত মধুর মান ও দামও অনেক কমে যায়। কারণ তাতে ময়লা ও জলীয়বাষ্প বেশি থাকে।

এখানে সঠিক লোকায়ত নিয়মে মধু সংগ্রহ করলে বনভূমির কোনো ক্ষতি হয় না, বরং এটি বনভূমির প্রাকৃতিক ব্যবস্থাপনারই একটি অংশ হিসেবে দেখেন বনজীবীরা। একটু পরোক্ষভাবে বলতে গেলে বলতে হবে সুন্দরবনের মৌমাছি ও মৌয়ালিরা এক জটিল প্রতিবেশীয় সহাবস্থানের ভেতর দিয়ে এখনও বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নে ভূমিকা রেখে চলেছেন।