জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্রতা, অনিশ্চিত বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং অব্যবস্থাপনা, যন্ত্রায়ণের ধীরগতি ও ফসলের স্বল্প বৈচিত্র্য—এসবের বিরূপ প্রভাবে কৃষি খাতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০৩০-৫০ সালের মধ্যে ধানের উৎপাদন সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ কমে যেতে পারে, যা খাদ্য নিরাপত্তাব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে।
গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক সেমিনারে গবেষণা প্রতিবেদনে এমন তথ্য তুলে ধরা হয়। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিআইডিএস কনফারেন্স রুমে এই সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
এতে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার। সভাপতিত্ব করেন বিআইডিএসের মহাপরিচালক প্রফেসর এ কে এনামুল হক। অনুষ্ঠানে গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক মোহাম্মদ ইউনুস।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ুর মারাত্মক পরিবর্তন বাংলাদেশের কৃষিকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগস্ত করছে।
তাপমাত্রা প্রতিবছর বাড়ছে, মৌসুমি বৃষ্টিপাত কখনো অতিরিক্ত, কখনো বা সম্পূর্ণ অনিয়মিত। এতে ধান, গম, ভুট্টাসহ প্রধান খাদ্যশস্যের জীবনচক্র ব্যাহত হচ্ছে। মাঠে কাজ করা শ্রমিকদের ওপরও তাপমাত্রার সরাসরি প্রভাব পড়ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিভিন্ন জেলায় তাপপ্রবাহের কারণে কৃষি শ্রমঘণ্টা কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ।
এতে উৎপাদনশীলতা কমছে, জমি প্রস্তুত করতে সময় বেশি লাগছে, শ্রম ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে।
দীর্ঘমেয়াদি হিসাব বলছে, শুধু কৃষক নয়, এই ধাক্কা লাগছে পুরো গ্রামীণ অর্থনীতিতে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে শ্রমিক উৎপাদন কমে গেলে ক্রয়ক্ষমতা, বাজারে লেনদেন, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সেই সঙ্গে বন্যা, খরা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো জলবায়ুজনিত দুর্যোগ কৃষিকে আরো অস্থিতিশীল করে তুলছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, জলবায়ুকেন্দ্রিক সংকটের পাশাপাশি অপরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলোও কৃষিকে পিছিয়ে দিচ্ছে।
যন্ত্রায়ণের অগ্রগতি হলেও মূলত উচ্চমূল্য, তথ্যের ঘাটতি এবং প্রশিক্ষণের অভাবে ক্ষুদ্র কৃষকরা এখনো এই প্রযুক্তি পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারছেন না। এতে উৎপাদনশীলতা বাড়লেও মাঠ পর্যায়ে সেই সুবিধা পৌঁছাতে সময় বেশি লাগছে। দেশের ৮০ শতাংশ কৃষিজমি এখনো একক ফসল—মূলত ধাননির্ভর, যা কৃষি অর্থনীতিকে বৈচিত্র্যহীন করছে ও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। একক ফসলের ওপর এত বেশি নির্ভরশীলতা মানে একটি মৌসুম ব্যর্থ হলে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় সরাসরি আঘাত।
সবচেয়ে বড় সংকট দেখা যাচ্ছে বোরো ধানের উৎপাদনে। বিগত কয়েক বছর ধরে কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো সতর্ক করে আসছে যে বোরো মৌসুমে উৎপাদন বৃদ্ধির হার স্থবির হয়ে গেছে। নতুন হাইব্রিড, পানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি বা লবণাক্ততা সহনশীল জাত না নিলে ভবিষ্যতে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমটি মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত সার, কীটনাশক ও রাসায়নিকের সীমাহীন ব্যবহার এখন ভূমি ও পানির গুণগত মান নষ্ট করছে। বিশেষ করে ভূগর্ভস্থ পানিতে নাইট্রেট ও ফসফেটের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই কৃষিকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। চাষিরা দ্রুত ফলনের আশায় সার বেশি ব্যবহার করছেন। এতে দিন দিন জমির উর্বরতা কমে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ উৎপাদন অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল ও আন্তর্জাতিক জলবায়ুসংক্রান্ত বিশ্লেষণ বলছে, ভবিষ্যতের কৃষিব্যবস্থাকে বাঁচাতে হলে এখনই বহুমাত্রিক পদক্ষেপ নিতে হবে—ফসল বৈচিত্র্য, আধুনিক কৃষিযন্ত্র, পানি ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, গবেষণানির্ভর নতুন জাত ও টেকসই কীটনাশক ব্যবহারের ওপর জোর দিতে হবে। অন্যথায় ২০৫০ সালের মধ্যে খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অনুষ্ঠানে বিআইডিএসের মহাপরিচালক এনামুল হক বলেন, কৃষিতে মূল্য সংযোজন ১২ থেকে বেড়ে ২৪ শতাংশে পৌঁছেছে, যা দারিদ্র্য হ্রাসে বিভিন্ন ফসলের সম্মিলিত অবদানকে শক্তিশালী করেছে। তবে ধানের মতো যেসব বাজারে সরকার দাম নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে দারিদ্র্য কমার প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম। শ্রমশক্তি বেশি হলেও কৃষকের লাভ সীমিত থাকায় তাঁরা এখন চুক্তিভিত্তিক চাষে বেশি ঝুঁকছেন। এদিকে ইউরিয়া সারের ব্যবহার বাড়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, যদিও প্রমাণ এখনো চূড়ান্ত নয়। জলবায়ু পরিবর্তনও কৃষিতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনাসচিব শাকিল আখতার বলেন, বাংলাদেশের কৃষি তথ্যব্যবস্থায় বড় ধরনের গড়মিল রয়েছে। বিবিএস ও খামারবাড়ীর তথ্য এক নয়, অথচ এ দুটি প্রতিষ্ঠান একই এলাকার মধ্যে। সঠিক সমন্বয় না থাকায় ফসল উৎপাদনের তথ্যও নির্ভরযোগ্য থাকে না। তিনি উল্লেখ করেন, কৃষকের জন্য প্রতিবছর বড় অঙ্কের প্রকল্প নেওয়া হলেও কতগুলো প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, তা স্পষ্ট নয়। অনেক কৃষি প্রকল্পে খরচ অযথা বাড়ে এবং ফেজ শেষ হওয়ার পর কাজ আর এগোয় না। একটি কৃষি ইনস্টিটিউশনের প্রকল্পে বিদেশ থেকে যন্ত্রাংশ আনার অযৌক্তিক ব্যাখ্যাও তিনি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। এসব কারণে কৃষি উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।