দীর্ঘদিনের অবহেলা, দখল ও দূষণে দেশের অধিকাংশ খালই অস্তিত্বসংকটে পড়েছে। অনেক খাল পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, আবার অনেক জায়গায় খাল ভরাট করে গড়ে উঠেছে স্থায়ী অবকাঠামো, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার, সড়ক ও বসতবাড়ি। এমন পরিস্থিতিতে খাল পুনরুদ্ধার ও খনন কার্যক্রমে অন্যতম বাধা হয়ে সামনে আসতে পারে এসব অবৈধ স্থাপনা। এগুলো উচ্ছেদ করতে গেলে সংঘাতের আশঙ্কাও করছেন কেউ কেউ। তবে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, বন্যানিয়ন্ত্রণ ও জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল উদ্ধারে বদ্ধপরিকর সরকার।
সরকার জানিয়েছে, ১৬ মার্চ দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলা থেকে সারা দেশে খাল খনন কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই দিনে আরও ৫৪টি জেলায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা স্থানীয় প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে এ কর্মসূচি শুরু করবেন। সরকারের আশা, খাল পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে বন্যা মোকাবিলা, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। দেশে প্রথম খাল খনন কর্মসূচি হাতে নেন জিয়াউর রহমান। কৃষি উন্নয়ন ও খাদ্য ঘাটতি মেটাতে সারা দেশে প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হয়। এতে ফসল উৎপাদন বেড়ে যায় কয়েক গুণ। জিয়াউর রহমানের খনন করা অধিকাংশ খালই আজ নিশ্চিহ্ন। প্রায় সাড়ে ৪ দশক পর আবারও বিএনপি খাল খনন কর্মসূচি নিয়েছে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত দেড় যুগে ১৭৮টি নদীর প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার পুনঃখননের জন্য একটি ড্রেজিং মাস্টারপ্ল্যান নেওয়া হয়েছিল। তবে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে কাক্সিক্ষত সুফল মেলেনি। বর্তমান সরকার পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলাশয় খননের পরিকল্পনা নিয়েছে। ছয় মাসে ১ হাজার কিলোমিটার খাল দখলমুক্ত, খনন ও পুনঃখনন করা হবে। পর্যায়ক্রমে এ কর্মসূচি সারা দেশে বিস্তৃত হবে। এ লক্ষ্যে দেশের প্রায় ৩০ হাজার খাল চিহ্নিত করতে ৩১ দশমিক ৫৭ কোটি টাকার একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় খালগুলোর শ্রেণিবিন্যাস ও জিও-ইনফরমেশনভিত্তিক একটি ডাটাবেজ তৈরি করা হবে। খাল খনন কার্যক্রম তদারকিতে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে একটি বিশেষ সেল গঠন করা হয়েছে। ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, বিএস বা আরএস খতিয়ানে থাকা অনেক খালের অবস্থান এখন আর স্পষ্ট নয়। বহু স্থানে খাল ভরাট করে অবৈধভাবে ভবন, কারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এসব স্থাপনা উচ্ছেদ করতে গেলে দখলদারদের বাধা এবং আদালতের স্থিতাদেশের মতো আইনি জটিলতাও তৈরি হয়।
নদী গবেষক ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর ট্রেজারার আমিনুর রসুল বলেন, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ খালই দখল বা ভরাট হয়ে গেছে। গত বছরের শুরুতে যশোরের মনিরামপুরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খনন করা একটি খাল ভরাট করে প্লট বিক্রির সাইনবোর্ড লাগানোর ঘটনাও ঘটেছে। উত্তরায় আহসানিয়া মিশন ক্যানসার হাসপাতালটিও খালে।
তার মতে, অনেক খালের ওপর বিশ্ববিদ্যালয়, কারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, উপাসনালয়, কবরস্থান ও বাজার গড়ে ওঠায় উচ্ছেদ কার্যক্রমে বাধা আসতে পারে। সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে। কেউ কেউ উচ্ছেদে স্থিতাদেশ আনতে আদালতে যেতে পারে। দেশ ও মানুষের স্বার্থে সরকারকে কঠোর হতে হবে। আদালত থেকে সহজে স্থিতাদেশ এনে উচ্ছেদ প্রক্রিয়া বন্ধ করার সুযোগ সীমিত করতে আইনি কাঠামো শক্ত করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু খাল খনন করলেই হবে না। নদীর সঙ্গে খালের স্বাভাবিক সংযোগ নিশ্চিত করা এবং নদীতে নিয়মিত ড্রেজিং করাও জরুরি।
আমিনুর রসুল বলেন, হাইড্রোগ্রাফিক জরিপের মাধ্যমে নদীতে ক্যাপিটাল ড্রেজিং করা দরকার। উজান থেকে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করতে না পারলে খাল খননের সুফল পাওয়া যাবে না। একই সঙ্গে খননের পর আবার দখল ও দূষণ ঠেকাতে কার্যকর নীতিমালা ও একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রয়োজন রয়েছে। সরেজমিন রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলার খাল পরিদর্শন এবং প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে দেখা গেছে, অধিকাংশ খালই দখল ও ভরাটের কারণে সংকটে রয়েছে। গাজীপুরের ঐতিহ্যবাহী লবলং খালের বড় অংশ দখল করে বিভিন্ন কারখানা ও অফিস স্থাপন করা হয়েছে। শ্রীপুর থেকে মির্জাপুর হয়ে লবণদহ ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় ২৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এ খাল এখন বিলীনের পথে। মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় শতবর্ষী বাগবাড়ি-শিমুলিয়া খাল প্রায় ভরাট হয়ে গেছে। স্থানীয়রা খালের ভিতরেই রাস্তা তৈরি করেছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্যান্টনমেন্ট ও গুলশান সার্কেলের অধীনে থাকা ২০টির বেশি বড় খালের বাস্তব অস্তিত্ব নেই। উত্তরার দিয়াবাড়ি খাল দখল করে নির্মাণ হয়েছে বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি এবং উত্তরা ইউনিভার্সিটির স্থায়ী ক্যাম্পাস।
এ ছাড়া গাইবান্ধা, কুষ্টিয়া, মুন্সিগঞ্জ, রাজশাহী, বরগুনা ও কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় খাল দখল ও ভরাটের অসংখ্য উদাহরণ পাওয়া গেছে। কোথাও খালের জায়গায় বাজার বসেছে, কোথাও রাস্তা বা বহুতল ভবন নির্মাণ হয়েছে। ফলে কৃষি সেচ, পানি নিষ্কাশন এবং স্থানীয় পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
খাল পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সক্রিয় ভূমিকা রাখতে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ইতোমধ্যে অনেকেই মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছেন। পানি সম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, খাল খনন সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির মধ্যে অন্যতম। কৃষি ও পরিবেশ রক্ষায় খালগুলো উদ্ধার করতেই হবে। অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে খাল পুনরুদ্ধার করে হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা হবে। বার্তা পরিষ্কার- খালের জায়গা কেউ দখলে রাখতে পারবে না। একই সঙ্গে প্রতিটি খালের সুনির্দিষ্ট ডাটাবেজ তৈরি করা হবে। তবে সফল খাল খননের জন্য দখলদার উচ্ছেদ ও স্থানীয় সমর্থন জরুরি। একা পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষে এ কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়; এর সঙ্গে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সম্পৃক্ততা ও সমন্বয় থাকবে। এ লক্ষ্যে আমরা ইতোমধ্যেই আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক করেছি।

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 























