অস্ত্র-বিতর্কের জেরে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে অন্যদেরও কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে সরকার। এর মাধ্যমে আট মাস বয়সি সরকার তার মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপদেষ্টা এমনকি দল বিএনপির জন্যও জোরালো বার্তা দিল। আইন ও ন্যায়ের পরিপন্থী কোনো কর্মকাণ্ডে জড়ালে শেষ পর্যন্ত রেহাই পাওয়ার সুযোগ নেই— ইশরাকের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে সরকার সেই বার্তাই দিয়েছে।
সরকারের মন্ত্রী ও বিএনপির নেতাকর্মীদের ভাষ্য, দল কিংবা সরকারের ভেতরে অনিয়ম ও শৃঙ্খলাভঙ্গ করে কেউ পার পাবেন না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুরু থেকেই মৌখিকভাবে এ বার্তা দিয়ে আসছেন। ইশরাকের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে সেই অবস্থান আরও স্পষ্ট করলেন।
বিএনপি সরকার গঠনের মাত্র আট মাসে তিনজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। একই সঙ্গে একজন সংসদ সদস্যও পদত্যাগ করেছেন। এসব পদত্যাগের কোনোটিই তাদের নিজেদের ইচ্ছায় হয়নি, বরং সরকারের উচ্চ পর্যায় অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে তারা পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। সবশেষ পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।
গত শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেললাইনসংলগ্ন এলাকায় অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে নামেন ইশরাক। অভিযানে তার নিজের হাতে এবং সঙ্গে থাকা সহযোগীদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যায়। অস্ত্র উঁচিয়ে অভিযান পরিচালনার সেই ঘটনার ভিডিও নিজের ফেসবুক পেজে প্রচার করেন ইশরাক হোসেন। মুহূর্তেই সেটি ভাইরাল হয়ে যায়। এরপর দেশজুড়ে সমালোচনা শুরু হয়। কেবল সাধারণ মানুষের মাঝেই নয়, বরং বিএনপি এবং সরকারের উচ্চ পর্যায়েও তীব্র অস্বস্তি ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয় এ ঘটনায়। সমালোচনার মুখে রোববার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। নির্দেশের পর সোমবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন ডেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের ঘোষণা দেন ইশরাক।
ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের বিষয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা, কেউ যদি মানুষের প্রত্যাশার পরিপন্থী কোনো কাজ করেন, সেটি তার যত কাছের মানুষই হোন না কেন, সে বিষয়ে তিনি যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার, সেটিই নেবেন। তিনি ইতিমধ্যে সেটি প্রমাণ করেছেন। আমরা কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নই। সুতরাং এটি আমাদের সবার মাথায় রাখতে হবে।
এদিকে ইশরাক হোসেনের আগে ৮ মাস বয়সি বিএনপি সরকারের আরও দুই মন্ত্রী পদত্যাগ করেন। তারা হলেন— পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান ও তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। দায়িত্ব নেওয়ার সাড়ে তিন মাসের মাথায় গত ১ জুন পদত্যাগ করেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। এদিন সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। পরে তা গৃহীত হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগকে ঘিরে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়। পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১০২ দিনের মাথায় তার এই আকস্মিক পদত্যাগের পেছনে দীপেন দেওয়ান স্বাস্থ্যগত জটিলতার কথা বললেও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে ভিন্ন ঘটনা। এর পেছনে আঞ্চলিক রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক রেষারেষির বিষয় উঠে এসেছে। এই পদত্যাগের ঘটনায় পার্বত্য জেলা পরিষদগুলো পুনর্গঠনে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের সঙ্গে দীপেন দেওয়ানের দ্বন্দ্বও বড় করে সামনে আসে। এ ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা ও নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়েও আলোচনা ছিল।
দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার ও তাকে পুনর্বহালের দাবিতে রাঙামাটি শহরে বিক্ষোভ করেন তার অনুসারী-সমর্থকরা। তাদের দাবি, মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে। দুই মাস আগে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সাচিং প্রুকে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে গত ২২ আগস্ট পদত্যাগ করেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। যদিও তাকে ওইদিনই মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর আগের দিন তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান আন্দালিভ রহমান পার্থ। জহির উদ্দিন স্বপনের মন্ত্রিত্বও একরকম কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে আলোচনা আছে। এক প্রকার নীরবে তার মন্ত্রিত্ব কেড়ে নেওয়া হয়। অনেকে বিস্মিত হলেও পরে গণমাধ্যমে স্বপনের কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা খবর বেড়িয়েছে।
পদত্যাগে বাধ্য করা হয় মিষ্টিকে : রাজধানীর মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকেও পদত্যাগের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।
গত ১ অক্টোবর তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পদত্যাগপত্র জমা দেন। এরপর জাতীয় সংসদ সচিবালয় তার আসন শূন্য ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জমান দুদু সময়ের আলোকে বলেন, ইশরাক ও মিষ্টির পদত্যাগের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী নিঃসন্দেহে একটি বড় বার্তা দিয়েছেন। অন্তত আইন যে সবার জন্য সমান, তা বুঝিয়ে দিলেন। আইনবহির্ভূত কিছু মেনে নেওয়া হবে না। অর্থাৎ আইন নিজের হাতে তুলে নিলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এটি সরকারপ্রধানের ‘গুড সাইন’ বলে মনে করি। ক্ষমতা পেলেই আইন ভাঙবে; আর তা পার পেয়ে গেলে সমাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হবে। এটি খুবই ভালো পদক্ষেপ, যা অন্য নেতাকর্মীর জন্য কঠিন সতর্কবার্তা।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান এমপি সময়ের আলোকে বলেন, বার্তা তো একেবারে পরিষ্কার। সবাই বুঝতে পারছেন আপনারা। সরকারে থাকলে শৃঙ্খলা বেশি মেনে চলতে হয়। বিচারে যাতে বৈষম্য তৈরি না হয়, সেই চিন্তা করে প্রধানমন্ত্রী এই পদক্ষেপ নিয়েছেন। ইশরাকও প্রধানমন্ত্রীর কথায় পদত্যাগ করেছেন। এটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আর সরকারের এমন পদক্ষেপ নিশ্চয়ই ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বিএনপি পর্যবেক্ষণ করবে। সেখান থেকে নেতাকর্মীরা শিক্ষা নেবে।
অনধিকার চর্চাকারীদের জন্য সতর্কবার্তা— অধ্যাপক সাহাবুল হক : শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সাহাবুল হক সময়ের আলোকে বলেন, প্রথমত এটি দলের পক্ষ থেকে একটি কঠোর বার্তা বিএনপি নেতৃবৃন্দের প্রতি। মন্ত্রী-এমপিদের কেউ যদি কোনো ধরনের অনধিকার চর্চা করেন কিংবা বাড়াবাড়ি করেন কিংবা যার যে দায়িত্ব নয়, সেটির ভেতরে অধিকার প্রয়োগ করার চেষ্টা করেন, তাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। দল হিসেবে আমি মনে করি যে, দলের শৃঙ্খলা রক্ষা করার জন্য এই পদক্ষেপগুলো নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। বিএনপি যেটি করেছে সেটি প্রশংসনীয় কাজ করেছে এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলেরও উচিত একইভাবে তাদেরও দলের যদি কেউ এ ধরনের কোনো কর্মকাণ্ডের ভেতরে জড়িত থাকে, তাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। কারণ দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের একটি আস্থা আছে। সে আস্থাটুকু টিকিয়ে রাখার জন্য এইটা, এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 
























