বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিল ১৬ বছরের স্বপন মাহমুদ। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় পড়াশোনা ছেড়ে চালানো শুরু করে মোটরচালিত ভ্যান। প্রতিদিনের ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা আয়েই চলত প্রতিবন্ধী মা ও ছোট বোনের খাবার। কিন্তু সেই ভ্যানটিও চুরি হয়ে গেছে। আড়াই মাস ধরে উপার্জনের পথ বন্ধ। এখন প্রতিবেশীদের সাহায্যে কোনোমতে দিন কাটছে তিনজনের পরিবারটির।
জানা গেছে, কুষ্টিয়ার কুমারখালীর লাহিনীপাড়া-সান্দিয়ারা জিকে খাল সড়কের পাশে যদুবয়রা ইউনিয়নের উত্তর চাঁদপুর বাজার এলাকায় একটি টিনের খুপড়ি ঘরে বসবাস করেন শারীরিক প্রতিবন্ধী জোসনা খাতুন (৩৮)। প্রায় তিন বছর আগে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান তার দিনমজুর স্বামী। এরপর সংসারের দায়িত্ব নিতে পড়াশোনা বন্ধ করে ভ্যান চালানো শুরু করে স্বপন।
স্বপনের বাম পায়ে শক্তি কম। সে সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত। ভারী কাজ করতে পারে না। ধারদেনা ও ঋণ করে তাকে একটি মোটরচালিত ভ্যান কিনে দিয়েছিলেন মা। সেই ভ্যান চালিয়ে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা আয় করত সে। তা দিয়েই চলত তিনজনের সংসার।
কিন্তু প্রায় আড়াই মাস আগে বাড়ি থেকে ভ্যানটি চুরি হয়ে যায়। বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করেও সেটির সন্ধান মেলেনি। নতুন ভ্যান কেনার সামর্থ্যও নেই পরিবারের। ফলে একমাত্র উপার্জনের অবলম্বন হারিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছে পরিবারটি।
তিনি উপজেলার যদুবয়রা ইউনিয়নের উত্তর চাঁদপুর গ্রামের মৃত মামুনের স্ত্রী। শারীরিক প্রতিবন্ধী ছেলে স্বপন মাহমুদ (১৬) ও মেয়ে মারিয়া খাতুনকে (৯) নিয়ে তার সংসার।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে জোসনা খাতুন বলেন, ‘স্বামী মরে গেছে স্ট্রোক করে। ছেলের একখান ভ্যান কিনে দিছিলাম। সেই ভ্যানডা চুরি হয়া গেছে। না খ্যায়াই দিন যায়, রাত যায়। এখন চলব ক্যাম্বা দুডে ছোয়ালপাল নিয়ে। আমি প্রতিবন্ধী। আমার ছেলে প্রতিবন্ধী। একখান ভ্যান হলেই চলতে পারতাম।’
রোববার (৮ নভেম্বর) সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, গ্রামীণ সড়কের পাশে সামান্য জমির ওপর দাঁড়িয়ে আছে তাদের টিনের খুপড়ি ঘর। ছোট্ট বারান্দায় দুই সন্তানকে নিয়ে বসে আছেন জোসনা খাতুন। রান্নার চুলায় আগুন জ্বলেনি। প্রতিবেদকের উপস্থিতি টের পেয়ে ছুটে আসেন প্রতিবেশীরাও।
স্বপন মাহমুদ বলেন, ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা মারা যান। এরপর সংসার চালাতে পড়াশোনা বন্ধ করে ভ্যান চালানো শুরু করি। প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা আয় হতো। তা দিয়ে কোনোমতে মা-বোনকে খাওয়াতাম। কিন্তু সেই ভ্যানটিও চুরি হয়ে গেছে। এখন চেয়ে-চিন্তে কোনোমতে সংসার চলছে।
স্বপন আরও বলে, আমি প্রতিবন্ধী। ভারী কাজ করতে পারি না। একটা ভ্যান পেলে আবার নিজে আয় করে খেতে পারতাম।
জোসনা খাতুন বলেন, একটি ভ্যান কিনতে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা লাগে। এত টাকা পাব কোথায়? প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজন কখনো চাল-ডাল, আবার কখনো রান্না করা খাবার দিচ্ছেন। তা দিয়েই দিন পার করছি। সরকার যদি একটি ভ্যান কিনে দিত, তাহলে খেয়ে-পরে বাঁচতে পারতাম।
প্রতিবেশী ও যদুবয়রা ইউনিয়ন পরিষদের ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত সদস্য মরিয়ম খাতুন বলেন, পরিবারটি খুবই গরিব ও অসহায়। ভ্যান হারানোর পর থেকে মানবেতর জীবনযাপন করছে। সবাই মিলে এক মুঠো-দুই মুঠো করে চাল, ডাল ও রান্না করা খাবার দিচ্ছেন। তা দিয়েই কোনোমতে বেঁচে আছে তারা। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও সরকার একটি ভ্যান কিনে দিলে পরিবারটি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রাইসুল ইসলাম বলেন, প্রতিবন্ধী মা ও ছেলের একমাত্র উপার্জনের অবলম্বন ভ্যানটি চুরি হয়ে যাওয়ার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক ও মানবিক। লিখিত আবেদন পেলে সাধ্যমতো সহযোগিতা করা হবে। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও সহৃদয়বান ব্যক্তিদের পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 
























