রাজনীতির মাঠে তাঁরা ছিলেন হেভিওয়েট প্রার্থী। কেউ কেউ ছিলেন দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে। এলাকার বাইরেও সারা দেশের মানুষের কাছে ছিলেন পরিচিত। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রায় প্রতিদিনই তাদের নিয়ে খবর হয়। জুলাই আন্দোলনে তাঁরা ছিলেন অগ্রগামী। বক্তৃতা, বিবৃতি কিংবা টকশোতেও তাঁরা আলোচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের স্ট্যাটাসে হাজার হাজার লাইক কমেন্ট পড়ে। কিন্তু এসব কিছুই নির্বাচনে কাজে লাগেনি। রাজনীতির মাঠে তাঁরা হেভিওয়েট প্রার্থী হলেও ভোটের মাঠে হেরে গেছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, হেভিওয়েট প্রার্থীর মধ্যে মাহমুদুর রহমান মান্না, গোলাম পরওয়ার, মামুনুল হক, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সারজিস আলম, তাসনিম জারা, শিশির মনির, মুজিবুর রহমান মঞ্জু, ব্যারিস্টার ফুয়াদ, সাইফুল হক, আমিনুল হকের মতো প্রার্থী নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারেননি। তবে পরাজিত হলেও এদের মধ্যে অনেকে বিজয়ী প্রার্থীর সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করেছেন।
মাহমুদুর রহমান মান্না : নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় থাকলেও ভোটের মাঠে তিনি জামানত হারিয়েছেন। ডাকসুর সাবেক ভিপি এবং আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন তিনি। গত পাঁচ দশক ধরে রাজনীতির মাঠে ছিল তাঁর সদর্প পদচারণ। বিগত আওয়ামী শাসনের সময় নাগরিক ঐক্য নামে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠা করে সরকারের বিরুদ্ধে মাঠে ছিলেন। জুলাই আন্দোলনেও এই প্ল্যাটফর্মের ভূমিকা ছিল। তবে এসব কিছুই ভোটের মাঠে তাঁকে বিজয়ী করতে পারেনি। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-২ আসনে অংশ নিয়ে কেটলি প্রতীকে তিনি মাত্র ৩ হাজার ৪২৬ ভোট পান। এই আসনে বিজয়ী বিএনপির প্রার্থী মীর শাহে আলম ১ লাখ ৪৫ হাজার ২৪ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থী মাওলানা শাহাদাতুজ্জামান পেয়েছেন ৯৩ হাজার ৫৪৮ ভোট।
মিয়া গোলাম পরওয়ার : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দ্বিতীয় শীর্ষ পদধারী, দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে হেরে গেছেন। খুলনা-৫ আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৪৪ হাজার ৯৫৬ ভোট। এই আসনে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আলি আসগার লবি। ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে তিনি গোলাম পরওয়ারের চেয়ে ২ হাজার ৭০২ ভোট বেশি পেয়েছেন।
হামিদুর রহমান আযাদ : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আরেক হেভিওয়েট প্রার্থী দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান আজাদ প্রায় ২৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। কক্সবাজার-২ আসনে বিএনপি প্রার্থী আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৪৩ ভোট পেয়ে জয়ী হন। জামায়াতের হামিদুর রহমান আজাদ পান ৯১ হাজার ৮৮৯ ভোট।
শিশির মনির : সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির ছিলেন জামায়াতের আলোচিত প্রার্থীদের একজন। ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল ও আইনজীবী শিশির মনির সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসনে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজয় বরণ করেন। ওই আসনটিতে ৯৭ হাজার ৭৯০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন ধানের শীষের প্রার্থী নাছির উদ্দিন চৌধুরী। দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে শিশির মনির ভোট পেয়েছেন ৫৭ হাজার ৮৫৮টি।
মামুনুল হক : মাঠের রাজনীতিতে মামুনুল হকের উত্থান বিগত আওয়ামী শাসনামলে। তিনি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম-মহাসচিব। কওমি ঘরানার এই রাজনীতিবিদের বিশেষ ভোটব্যাংক ছিল রাজধানীর মোহাম্মদপুরে। এ ছাড়া বিহারি ভোট টানতে তিনি উর্দুতে বক্তৃতা দিয়েও আলোচনায় আসেন। তবে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতে প্রভাব রাখলেও ভোটের মাঠে সেই প্রভাব কাজ করেনি। ঢাকা-১৩ আসনে (মোহাম্মদপুর-আদাবর-শ্যামলী) তিনি বিএনপি প্রার্থী ববি হাজ্জাজের সঙ্গে লড়াই করে অল্প ভোটের ব্যবধানে হেরে যান।
ব্যারিস্টার ফুয়াদ : মাঠের রাজনীতির চেয়েও তিনি মিডিয়ায় বেশি আলোচিত ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া (ব্যারিস্টার ফুয়াদ)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এবি পার্টির এই নেতার রয়েছে বিপুল অনুসারী। তবে এসব কিছু ভোটের মাঠে প্রভাব রাখতে পারেনি। বরিশাল-৩ (মুলাদী-বাবুগঞ্জ) আসনে ১১-দলীয় জোটের হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি ২১ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। এই আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী জয়নুল আবেদীন পেয়েছেন ৭৮ হাজার ১৩১ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ঈগল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করা ব্যারিস্টার ফুয়াদ পেয়েছেন ৫৭ হাজার ১৪৯ ভোট।
সাইফুল হক : বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক তিনি। ঢাকা-১২ আসনে নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হয়েছেন। এই আসনে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী সাইফুল আলম। দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে সাইফুল আলম পেয়েছেন ৫৩ হাজার ৭৭৩ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ‘কোদাল’ প্রতীকে পেয়েছেন ৩০ হাজার ৯৬৩ ভোট।
এ ছাড়া রাজনীতিতে হেভিওয়েট না হলেও ভোটের মাঠে আলোচিত বামপন্থি প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্তী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৫ আসনে বাসদ মনোনীত মই প্রতীকের প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্তী সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে বিজয়ী হতে চলেছেন বলে সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। পরে ফেসবুক পোস্টে জানিয়ে দেন, তাঁর এই জয়ের বিষয়টি গুজব ছিল। ডা. মনীষা চক্রবর্তী লেখেন, ‘একটি অনলাইন গুজবের পরিপ্রেক্ষিতে জানাচ্ছি যে, বরিশাল-৫ আসনে সংসদ সদস্য পদে নির্বাচনে আমি বিজয়ী হইনি। তবে বিজয়ী না হলেও যে জনগণের আকুণ্ঠ সমর্থনে আমাদের ভোট ব্যাপকভাবে বেড়েছে, তাদেরকে আমরা আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 






















