,



ইবি প্রো-ভিসির পিএইচডি ভুয়া

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ও বর্তমান প্রো-ভিসি প্রফেসর ড. শাহিনুর রহমানের বিরুদ্ধে নারী ও অর্থ কেলেঙ্কারির পর এবার পিএইচডি জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে।

পিএইচডি কোর্সে শেষ করতে একজন তত্ত্বাবধায়কের অধীনে কমপক্ষে ২ বছর সময় লাগলেও সেখানে মাত্র পাঁচ মাস সাত দিনে নিজ তত্ত্বাবধানে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছেন।

সোমবার (১৬ মে) দুপুর ২টায় বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গবন্ধু পরিষদ ও শাপলা ফোরামের নেতৃবৃন্দ এ অভিযোগ তুলে একটি সংবাদ সম্মেলন করেছেন।

সংবাদ সম্মেলনে উভয় সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষরিত একটি লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন শাপলা ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ও ছাত্র-উপদেষ্টা প্রফেসর ড. আনোয়ার হোসেন।

লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি শাখার বিভিন্ন নথিপত্র থেকে জানা গেছে, মানবিক ও সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের ৩৬ ও ৩৭ তম সভার কার্যবিবরণী ও সিদ্ধান্ত ক্রমিক নং (৫)-এর ২২৬ নং সিদ্ধান্ত মোতাবেক ড. শাহিনকে তার পিএইচডি কোর্সের রেজিস্ট্রেশনের সুপারিশ গৃহীত হয়। এ ছাড়াও ওই সভার ২২২, ২৩, ২৪, ২৫, ২৭, ২৮ নং সিদ্ধান্ত মোতাবেক তার সাথে ২০০২-০৩ শিক্ষাবর্ষে আরও সাতজন শিক্ষক রেজিস্ট্রেশনের জন্য আবেদন করেন। সেই সিদ্ধান্ত মোতাবেক ড. শাহিন পিএইচডি কোর্সে ভর্তির রেজিস্ট্রেশনের জন্য আবেদন করেন ২০০২-২০০৩ শিক্ষাবর্ষের ২৩ জুলাই।’

লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, ‘কিন্তু অফিস জালিয়াতির মাধ্যমে ড. শাহিনের স্বাক্ষরিত একটি আবেদনপত্রে দেখা যায়, তিনি ১৯৯৯-২০০০ সালের শিক্ষাবর্ষে পিএইচডি কোর্সে ভর্তির জন্য ২০০২-০৩ শিক্ষাবর্ষের ইবি অগ্রণী ব্যাংকে ২৮ আগস্ট ৪০০ টাকা সেশন ফি হিসেবে জমা দেন। অথচ তার পিএইচডি কোসের্র যোগদানপত্র দেখলে দেখা যায় তিনি ভর্তির আগেই ১১ জুলাই ২০০২ সালে ওই কোর্সে যোগদান করেছেন, যা সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূত।’

আওয়ামীপন্থী শাপলা ফোরামের ড. আনোয়ার হোসেন লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘থিসিস জমাদানের একটি নথি অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, তিনি নিজেই নিজের তত্ত্বাবধানে রচিত একটি থিসিস ২০০২ সালের ৩ জুলাই জমা দেন। অথচ তিনি কোর্সের রেজিস্ট্রেশন করেন ২৩ জুলাই ২০০২ সালে। আবার তাকে ২০০২ সালের ৩ নভেম্বর পরীক্ষা কমিটির অনুমোদনের ভিত্তিতে স্বল্প সময়ের মধ্যেই ৩০ ডিসেম্বর ২০০২ সালের ১৭১-তম সিন্ডিকেটের ১২ তম সিদ্ধান্ত অনুয়ায়ী তার পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করা হয়।’

“তার থিসিসের শিরোনাম ছিল ‘রুডইয়ার্ড কিপলিংস’ থিওরি অব ‘হোয়াইট ম্যান’স বার্ডেন অ্যাজ রিফ্লেকটেড ইন হিজ রাইটিংস : অ্যা ক্রিটিক্যাল এক্সপজিশন।” কিন্তু অন্য শিক্ষকদের দুই বছর থেকে সাড়ে তিন বছর লাগলেও ড. শাহিন নিজ তত্ত্বাবধানে গবেষণাকর্ম (পিএইচডি ডিগ্রি) সমাপ্ত করেন। বিধি অনুসারে একজন গবেষককে তার গবেষণা গ্রহণ যোগ্য করতে কমপক্ষে ২টি সেমিনার করতে হয়। কিন্তু ড. শাহিন একটি সেমিনারও করেননি। দীর্ঘ মেয়াদি এই ডিগ্রি অর্জন মাত্র পাঁচ মাস সাত দিনে কোনো তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া কীভাবে সমাপ্ত করেছেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়, ‘তিনি ২০০২-০৩ সালের ২৩ জুলাই পিএইচডি কোর্সের ভর্তির রেজিস্ট্রেশন করলেও তার আবেদনপত্রে অবৈধভাবে অফিশিয়াল জালিয়াতির মাধ্যমে ১ জুলাই ১৯৯৯ থেকে কার্যকর করার কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্ত এই আবেদনপত্র নিয়মবহির্ভূতভাবে বোর্ড অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজ, বিভাগীয় একাডেমিক কমিটি, অনুষদীয় কমিটি ও একাডেমিক কাউন্সিলের সুপারিশ ছাড়াই প্রেরণ করেন বলে একটি নথি ঘেঁটে প্রমাণ মিলেছে। যেখানে সংশ্লিষ্ট কারো কোনো সুপারিশ নেই।’

‘তিনি প্রথমে ব্লুমিংটনের ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির কলেজ অব আর্টস অ্যান্ড সোস্যাল সায়েন্স-এর ডিসটিনগুইস প্রফেসর ড. হেনরি গ্লাসির অধীনে ১৯৯৯ সালের ১ জুলাই নিবন্ধন করেন এবং ২৩ আগস্ট থেকে তার গবেষণা শুরু করেন। সেখানে তিনি ৬০ ক্রেডিটের মধ্যে ৪০ ক্রেডিট আওয়ার অর্জন করেন। বাকি ২০ ক্রেডিট আওয়ার কাজ করতে ব্যর্থ হন এবং পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করতে পারেননি বলে গবেষণা থিসিস জমা দেওয়া-সংক্রান্ত একটি নথি থেকে জানা গেছে।’

‘অথচ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০২-২০০৩ সালে রেজিস্টার্ড হয়ে ইংরেজি বিভাগের সভাপতির দায়িত্বও পালন করা অবস্থায় তিনি কীভাবে ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটিতে ১৯৯৯ সালের পয়লা জুলাই থেকে কীভাবে গবেষক হিসেবে নিবন্ধিত হলেন।’

‘ডিগ্রি অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি নিজেই নিজের তত্ত্বাবধায়ক সেজে তার আগের তত্ত্বাবধায়কের নাম জালিয়াতি করে পুনরায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অবৈধভাবে পিএইচডি গবেষণাকাজ সম্পন্ন করার জন্য রেজিস্ট্রার বরাবর একটি আবেদন জমা দেন। ওই আবেদনপত্রেও তিনি ১৯৯৯ সালের ১ জুলাই থেকে রেজিস্ট্রার্ড গবেষক বলে উল্লেখ করেছেন।’

লিখিত অভিযোগে বলা হয়, ‘এই বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিবহির্ভূত হওয়া সত্ত্বেও প্রগতিশীল নামধারী এই গবেষককে এই সুবিধা প্রদান করেন তৎকালীন জামায়াতপন্থী ভিসি প্রফেসর ড. মুস্তাফিজুর রহমান। তার বিভিন্ন অসঙ্গতিপূর্ণ কাগজে ওই ভিসি ১৯৯৯-০১ শিক্ষাবর্ষের ভুয়া পিএইচডি যোগদানপত্রে সুপারিশ করেন।’

ঘটনাটি তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে দাবি জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বঙ্গববন্ধু পরিষদের সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর ড. মিজানুর রহমান, শাপলা ফোরামের সভাপতি প্রফেসর ড. মাহবুবুল আরফিন, সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর ড. আনোয়ার হোসেন, শাপলা ফোরামের সদস্য প্রফেসর ড. রাশিদ আশকারিসহ অর্ধশতাধিক শিক্ষক কর্মকর্তা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মরত বিভিন্ন পত্রপত্রিকার সাংবাদিকবৃন্দ।

এ ব্যাপারে প্রো-ভিসি ড. শাহিনুর রহমান বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। আমি ষড়যন্ত্রের শিকার। আমার পিএইচডি নিয়মতান্ত্রিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধান অনুযায়ী হয়েছে।’

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর