মামলায় জেরবার বিএনপির নীতিনির্ধারক ফোরাম

মামলায় জেরবার বিএনপির নীতিনির্ধারক ফোরাম। ১৯ সদস্যবিশিষ্ট এ কমিটির ১৬ জনই একাধিক মামলার আসামি। হত্যা, বিস্ফোরণ, ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগে দ্রুত বিচার আইনের পাশাপাশি মামলা হয়েছে রাষ্ট্রদ্রোহ এবং তথ্য-প্রযুক্তি আইনে। রয়েছে দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের মামলাও। ব্যক্তিগত অভিযোগে দায়ের মামলার চেয়ে দলীয় মামলার সংখ্যাই বেশি। আদালতে চার্জ গঠন হচ্ছে একের পর এক মামলার। মামলা দায়েরের সময় যেসব ধারা উল্লেখ করা হয়েছে চার্জশিটের সময় নানা আইনে বিভক্ত হয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন মামলা। অনেক নেতা তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার সংখ্যাও জানেন না। নেতাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত ডজন ডজন মামলা স্থানান্তর করা হয়েছে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে। অনেকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলায় চলছে সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া। ফলে সপ্তাহের দুই থেকে তিনদিন তাদের কাটাতে হয় আদালতের আঙিনায়। রাজনীতিক ও আইনজীবী মহলের মতে, এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে তাদের অনেকেই আইনি জটিলতার মুখে পড়বেন আগামী জাতীয় নির্বাচনে। বিএনপি স্থায়ী কমিটির বেশির ভাগ সদস্যই একাধিকবার কারাভোগ করেছেন বর্তমান সরকারের আমলে। সবমিলিয়ে মামলা জটিলতায় জেরবার বিএনপির নীতিনির্ধারক ফোরাম। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের পর স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে সর্বাধিক মামলায় আসামির তালিকায় রয়েছে মির্জা আব্বাসের নাম। বর্তমানে তিনি ৮০টির বেশি মামলার আসামি। ৪০টির বেশি করে মামলা নিয়ে এরপরই রয়েছেন দুই প্রবীণ নেতা এমকে আনোয়ার ও ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া।
বিএনপি স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে ৯টি মামলা হয়েছিল ওয়ান ইলেভেনের জরুরি সরকারের আমলে। প্রায় দুই বছর কারাভোগ করেছেন তিনি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাশাপাশি নতুন কয়েকটি মামলা হয় ফৌজদারি আইনে। রাজধানী ঢাকা ও নিজ নির্বাচনী এলাকা মিলিয়ে বর্তমানে তার বিরুদ্ধে সচল মামলার সংখ্যা ১২টি। এসব মামলায় বর্তমান সরকারের আমলেও দুইবার কারাবরণ করেছেন তিনি। প্রবীণ নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ দুর্নীতির মামলায় কারাভোগ করেছেন ওয়ান ইলেভেন সরকারের আমলে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও তার বিরুদ্ধে দায়ের হয় একাধিক মামলা। এসব মামলায় কয়েক দফা কারাভোগও করেছেন তিনি। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে রয়েছে ২৩টি মামলা। মামলার ব্যাপারে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সব মামলাই ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বিরোধী নেতাকর্মীদের হয়রানির জন্য মামলা দিয়ে কোর্টকাচারিতে দৌড়াদৌড়ির মধ্যে রেখেছে সরকার। মামলার কারণে বিএনপি নেতারা নির্বাচনে সমস্যার মুখোমুখি হবেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, কিছু সমস্যা তো হবেই। তবে আগামী একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করতে চাইলে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলাগুলো প্রত্যাহার করতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরেই শারীরিকভাবে অসুস্থ আরেক প্রবীণ নেতা তরিকুল ইসলাম। দুর্নীতির অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় তিনিও দীর্ঘদিন কারাভোগ করেছেন ওয়ান ইলেভেনের জরুরি সরকারের আমলে। আওয়ামী লীগ আমলে বিশেষ ক্ষমতা আইন, বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে তার বিরুদ্ধে ১১টি মামলা দায়ের হয়েছে যশোরে। যার মধ্যে সচল রয়েছে ৯টি মামলা। ১৩টি মামলার বোঝা ঘাড়ে নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আসম হান্নান শাহ। বিএনপির প্রবীণ নেতাদের একজন সাবেক স্পিকার ও ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার। বিএনপি স্থায়ী কমিটির এ সদস্যের বিরুদ্ধে রয়েছে সংসদ সংক্রান্ত আটটি মামলা।
বয়সের বিচারে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ সদস্য এমকে আনোয়ার। ৮৫ বছর বয়স্ক এ নেতা সাবেক ক্যাবিনেট সচিব ও দুইবারের ক্যাবিনেট মিনিস্টার। ওয়ান ইলেভেনের পর স্বল্প মেয়াদে একবার কারাভোগ করেছেন তিনি। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিস্ফোরক দ্রব্য, দ্রুত বিচার, বিশেষ ক্ষমতা আইন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে দায়ের হয়েছে একের পর এক মামলা। দফায় দফায় কারাগারে গিয়েছেন তিনি। শারীরিকভাবে অসুস্থ এ নেতা বর্তমানে ৪০টির বেশি মামলার আসামি। বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক সানাউল্লাহ মিয়া জানান, শারীরিকভাবে অসুস্থ হলেও চলিশোর্ধ্ব মামলার আসামি এমকে আনোয়ারকে প্রায় আদালতে হাজিরা দিতে হয়।
অষ্টম সংসদে বিএনপি যখন ক্ষমতায় তখন রাজনীতিতে অনেকটাই নিষ্ক্রিয় ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া। ওয়ান ইলেভেনের পর তিনি ফের সক্রিয় হলে দলের পঞ্চম কাউন্সিলে স্থায়ী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ওয়ান ইলেভেনের সময়ও আইনি জটিলতার বাইরে ছিলেন সাবেক এ পূর্তমন্ত্রী। কিন্তু দলে এবং রাজনৈতিক মহলে স্পষ্টভাষী হিসেবে ইমেজ রয়েছে তার। বর্তমান সরকারের আমলে তার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক দ্রব্য, বিশেষ ক্ষমতা ও দ্রুত বিচার আইনে দায়ের হয়েছে একের পর এক মামলা। তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি মামলা রয়েছে- পল্টন, মিরপুর, পল্লবী ও যাত্রাবাড়ী থানায়। বিভিন্ন মেয়াদে দুইবার কারাভোগও করেছেন। তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত ৪১টি মামলার মধ্যে ২৭টি মামলাই স্থানান্তর করা হয়েছে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে। শারীরিকভাবে গুরুতর অসুস্থ ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া কিছুদিন আগে ব্রেন স্টোক করেছেন। তার স্ত্রী প্রফেসর ড. শাহিদা রফিক বলেন, ব্রেন স্টোকে আক্রান্ত হয়ে যখন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তখনও তার বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে আদালতে নেয়ার পর তার জামিন হয়। বর্তমানে প্রতি সপ্তাহে তিনদিন তাকে আদালতে হাজিরা দিতে হয়।
ঢাকার রাজনীতিতে একটি প্রভাবশালী চরিত্র বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। ওয়ান ইলেভেনের সময় দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তারের পর কারাভোগ করেছেন প্রায় দুই বছর। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে অংশও নিতে পারেননি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পল্টন, মতিঝিল ও রমনাসহ রাজধানীর বিভিন্ন থানায় দুর্নীতি, বিস্ফোরক দ্রব্য, সন্ত্রাসবিরোধী, বিশেষ ক্ষমতা ও দ্রুত বিচার আইনে নতুন করে তার বিরুদ্ধে ৬০টির বেশি মামলা হয়েছে। যার মধ্যে চার্জশিটের সময় একাধিক আইনে বিভক্ত হয়ে তৈরি হয়েছে নতুন নতুন মামলা। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে রয়েছে ৮০টির বেশি মামলা। বেশিরভাগ মামলায় চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত বেশ কয়েকটি মামলায় স্থানান্তর করা হয়েছে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে। কিছু মামলায় ইতিমধ্যে মধ্যে সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ২০১০ সালে হরতালের মিছিল থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে বিএনপির মিছিল থেকে নেতাকর্মীরা তার বাসায় আশ্রয় নিলে মির্জা আব্বাসের বাসায় ঢুকে তার বৃদ্ধা মা ও স্ত্রীসহ সবাইকে বেধড়ক মারধর ও আসবাবপত্র তছনছ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মামলা প্রসঙ্গে মির্জা আব্বাস বলেন, ‘যত রকম কালাকানুন ও কলাকৌশল’ রয়েছে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে তার সবগুলোই প্রয়োগ করছে বর্তমান সরকার। বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা হলে আসামির তালিকা থেকে মির্জা আব্বাসের নাম বাদ পড়ে না। ফলে একের পর এক মামলা হয়েছে, মামলার সংখ্যা মনে রাখাও কঠিন। প্রতিসপ্তাহেই আদালতে যেতে হয় হাজিরা, সাক্ষ্যসহ নানা কারণে। সরকারের সমালোচনায় মুখর বিএনপির সিনিয়র নেতাদের একজন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। বর্তমানে ৩৯ মামলার আসামি সিনিয়র এ নেতা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কয়েক দফায় কারাভোগ করেছেন। বিস্ফোরক দ্রব্য, দুর্নীতি, দ্রুত বিচার, সন্ত্রাসবিরোধী ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত বেশ কয়েকটি মামলা স্থানান্তর করা হয়েছে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে। বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বেশ কিছুদিন নিখোঁজ থাকার পর অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে আটক হন ভারতের মেঘালয় রাজ্যের রাজধানী শিলংয়ে। সেখানে তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার বিচার প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। দেশে তার বিরুদ্ধে রয়েছে ২৫টির মতো মামলা। স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ৬ মামলার আসামি।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর