বিশ্ব ইজতেমা তুরাগ নদীর তীরে যেভাবে শুরু হয়েছিল

পুরো পৃথিবীতে সফল, কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য দাওয়াতি কাফেলার নাম ‘তাবলিগ জামাত’। এই জামাতের নিবেদিতপ্রাণ সাথিরা নিঃস্বার্থভাবে প্রতিনিয়ত মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করে যাচ্ছেন। ইসলামের ছয়টি মৌলিক বিষয়কে সামনে রেখে তাবলিগ জামাত তার দাওয়াতি কার্যক্রম গোটা বিশ্বে পরিচালনা করে আসছে দুর্বার গতিতে। ছয়টি মৌলিক বিষয় হচ্ছে—১. কালেমা, ২. নামাজ, ৩. ইলম ও জিকির, ৪. ইকরামুল মুসলিমিন, ৫. সহিহ নিয়ত, ৬. দাওয়াত ও তাবলিগ।

তাঁদের বলিষ্ঠ পদচারণে সারা দুনিয়ার দিকদিগন্ত মুখরিত। তাঁদের এই সাধনার বদৌলতে আজ পৃথিবীর দিকদিগন্তে হেদায়াতের শাশ্বত জ্যোতি পৌঁছে গেছে কোটি প্রাণে। আল্লাহকে ভুলে থাকা মানুষ চিনেছে আল্লাহকে নতুনভাবে। গড়ে তুলেছে মজবুত আমলময় জিন্দেগি।
যুগান্তকারী এ দাওয়াতি কাজের সূচনা করেছিলেন বিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত সাধক, দারুল উলুম দেওবন্দের কৃতী সন্তান মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলভি (রহ.)। যিনি ছিলেন দারুল উলুম দেওবন্দের ছাত্র ও শায়খুল হিন্দ আল্লামা মাহমুদুল হাসান দেওবন্দি (রহ.)-এর স্নেহধন্য শিষ্য। ১৩২৬ হিজরিতে তিনি দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি হন এবং এক পর্যায়ে শায়খুল হিন্দ (রহ.)-এর কাছে বুখারি শরিফ ও তিরমিজি শরিফ অধ্যয়ন করেন। ১৯১০ সালে ভারতের রাজস্থানের মেওয়াতে মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) তাবলিগ জামাতের গোড়াপত্তন করেন।

১৯২০ সালে তৎকালীন দেওবন্দ মাদরাসার সব আকাবির ও আসলাফের পরামর্শ মোতাবেক মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) দিল্লির নিজামুদ্দীনে তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম শুরু করেন। ১৯৪৪ সালে মাওলানা ইলিয়াস (রহ.)-এর ইন্তেকালের পর তাবলিগ জামাতের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁর সন্তান মাওলানা ইউসুফ কান্ধলভি (রহ.)-কে। মাওলানা ইউসুফ (রহ.)-এর ইন্তেকালের পর তাবলিগ জামাতের আমিরের দায়িত্ব দেওয়া হয় মাওলানা ইনামুল হাসান (রহ.)-কে। মাওলানা ইনামুল হাসান (রহ.)-এর ইন্তেকালের আগে তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত সুচারুরূপে পরিচালনার লক্ষ্যে ১০ সদস্যের একটি আলমি শুরা গঠন করা হয়।

বিশ্ব ইজতেমার ইতিকথা

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠে শিল্পনগরী টঙ্গীর সুবিশাল ময়দান

বিশ্ব ইজতেমা বিশ্ব তাবলিগ জামাতের সর্ববৃহৎ সমাবেশ। বাংলাদেশের তাবলিগ জামাতের প্রধান মার্কাজ হলো ঢাকার কাকরাইল মসজিদ। এই কাকরাইল মসজিদেই ১৯৪৬ সালে প্রথম বিশ্ব ইজতেমা শুরু হয়। ১৯৪৮ সালে অনুষ্ঠিত হয় চট্টগ্রামে। এরপর নারায়ণগঞ্জে ১৯৫৮ সালে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। তারপর টঙ্গীর পাগার নামক স্থানে ইজতেমা হয় ১৯৬৬ সালেএরপর ১৯৬৭ সাল থেকে তুরাগ নদের পূর্ব তীরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে বিশ্ব ইজতেমা। মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পাকিস্তান, ভারত ও ইউরোপীয় দেশগুলোসহ বিশ্বের প্রায় ৫০-এর বেশি দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমান বিশ্ব ইজতেমায় অংশ নিয়ে থাকেন। আখেরি মোনাজাতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করে থাকেন। বর্তমান বিশ্ব ইজতেমা ময়দান ১৯৯৫ সালে সরকার স্থায়ীভাবে বরাদ্দ দেয়।

তাবলিগ জামাত ও ওলামায়ে কেরাম

তাবলিগ জামাতের এই কাফেলা শুরু থেকে আজ অবধি ওলামায়ে কেরামের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে এবং এর উশুল ও মূলনীতি কোরআন-হাদিসের আলোকে ওলামায়ে কেরামের মাধ্যমেই প্রণীত ও সুবিন্যস্ত। সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা যায়, দাওয়াত ও তাবলিগের সহিহ মেহনত বজায় রাখতে ওলামায়ে কেরামের নেতৃত্ব ও নির্দেশনার বিকল্প নেই। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেই ওলামায়ে কেরামের হাতে দাওয়াত ও তাবলিগের এই মহান দায়িত্ব অর্পণ করে গেছেন। মহানবী (সা.) বলেছেন, ওলামায়ে কেরাম নবীদের ওয়ারিশ, আর নবীরা কাউকে সোনা-রুপার ওয়ারিশ বানাননি। তাঁরা ইলমের ওয়ারিশ বানিয়েছেন।

সুতরাং ওহির শাশ্বত জ্ঞান নবীদের কাছে আসার পর তাঁদের যে দায়িত্ব ছিল, কিয়ামত পর্যন্ত আলেমদের ওপর সেই একই দায়িত্ব অর্পিত। আম্বিয়ায়ে কেরাম যেভাবে মানুষের কাছে দ্বিনের দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছেন, ওলামায়ে কেরামও একইভাবে মানুষের কাছে দ্বিনের দাওয়াত পৌঁছে দেবেন। আবদুল্লাহ বিন আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহ তাআলা বান্দাদের কাছ থেকে ইলম ছিনিয়ে নেবেন না; কিন্তু তিনি ওলামায়ে কেরামকে উঠিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে ইলমও উঠিয়ে নেবেন। এভাবে যখন কোনো আলেম অবশিষ্ট থাকবে না, তখন মানুষ কিছু মূর্খ লোকের শরণাপন্ন হবে। অতঃপর ধর্মীয় বিষয়ে তাদের প্রশ্ন করা হবে, তারা ইলম ছাড়াই ফতোয়া দেবে। এর ফলে তারা নিজেরাও গোমরাহ হবে এবং মানুষকেও গোমরাহ করবে। (সহিহ বুখারি ১/২০, সহিহ মুসলিম ২/৩৪০, জামে তিরমিজি ২/৯৩-৯৪)

সুতরাং তাবলিগ জামাতের নেতৃত্বে ওলামায়ে কেরামের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব কতটুকু—তা বলার অপেক্ষা রাখে না। রব্বে কারিম আমাদের সবাইকে ওলামায়ে কেরামের দিকনির্দেশনায় হিদায়াতের পথে নিজে চলে, অন্যকেও আহ্বান করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর