ঢাকা , শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ ভিসা নীতিমালার খসড়া পরিমার্জন ও চূড়ান্তকরণে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা, বাস্তবায়নে কতটা আশার আলো চাকরিজীবীদের জন্য দুই দফায় মিলবে যে ছুটি প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর পরামর্শ অলির সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ৩ বাহিনীর জন্য বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  তিনি বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামারিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।  জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলছে। নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য (এমপি) মাছুম মোস্তফার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি থেকে শিল্পে রুপান্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা

কল্যাণময় আদর্শ স্থাপন করেছেন শেখ রেহানা

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে পরিবারটির ভূমিকা সবচেয়ে বেশি, সেই পরিবারের সব সদস্যই যে রাজনীতি-সচেতন, তা নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না। সম্পৃক্ত হওয়ার সব সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নিজেকে আড়াল করে রাখার মধ্য দিয়ে যে নির্মোহ জীবনাচারের পরিচয় পাওয়া যায়, তা অতুলনীয়। পাদপ্রদীপের আলোয় আসার আকাঙ্ক্ষা সবারই থাকে। ইতিবাচক আলোচনার কেন্দ্রে থাকার ইচ্ছা দমন করা সহজ কাজ নয়। তার জন্য সাধনার প্রয়োজন হয়। সেই সাধনায় উত্তীর্ণ এক নারী শেখ রেহানা। জাতির জনকের কন্যা তিনি। বড় বোন বাংলাদেশের তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, কিন্তু তারপরও শেখ রেহানা বেছে নিয়েছেন নিভৃত গৃহকোণ, যেখানে রাজনীতির কূটকৌশল প্রবেশাধিকার পায়নি। তাই বলে এটা ভাবলে চলবে না যে, একেবারেই রাজনীতি-সচেতন নন তিনি। রাজনীতি তার রক্তে। একেবারেই নিরাসক্ত তিনি, এটা বলা যাবে না। যথেষ্ট রাজনীতি-সচেতন শেখ রেহানাকে তারপরও নেপথ্যের নিভৃতচারী।

জীবনটা তার জন্য সহজ ছিল না। জীবনের অনেকটা পথ রীতিমতো লড়াই করেই কাটাতে হয়েছে তাকে। বলতে গেলে জীবনের শুরুতেই জীবনযুদ্ধের সৈনিক তিনি। তারুণ্যের ঊষালগ্নে, যখন তার ভেসে যাওয়ার কথা উচ্ছলতার স্রোতধারায়, তখনই হোঁচট খেতে হয়েছে। থমকে দাঁড়াতে হয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই অভিশপ্ত দিনে হারিয়েছেন মা-বাবা, ভাইদের। হারিয়েছেন স্বদেশের আশ্রয়। আশ্রয়হীন পরিবেশে দেশে দেশে ঘুরেছেন। ছিল না নিশ্চিত নিরাপত্তা, জীবন যাপনের নিশ্চয়তাও ছিল অনুপস্থিত। জীবনযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয়েছে তাকে। বেছে নিতে হয়েছে অন্যরকম এক সংগ্রামী জীবন। লড়াই করেছেন দারিদ্র্যের সঙ্গে। কিন্তু জীবনের সত্য থেকে বিচ্যুত হননি কোনো দিন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার সত্য প্রবন্ধে বলেছেন, ‘আমাদের জাতি যেমন সত্যকে অবহেলা করে, এমন আর কোনো জাতি করে কি না জানি না। আমরা মিথ্যাকে মিথ্যা বলিয়া অনুভব করি না। মিথ্যা আমাদের পক্ষে অতিশয় সহজ স্বাভাবিক হইয়া গিয়াছে। আমরা অতি গুরুতর এবং অতি সামান্য বিষয়েও অকাতরে মিথ্যা বলি। …আমরা ছেলেদের সযত্নে ক খ শেখাই, কিন্তু সত্যপ্রিয়তা শেখাই না, তাহাদের একটি ইংরাজি শব্দের বানান ভুল দেখিলে আমাদের মাথায় বজ্রাঘাত হয়, কিন্তু তাহাদের প্রতিদিবসের সহস্র ক্ষুদ্র মিথ্যাচরণ দেখিয়া বিশেষ আশ্চর্য বোধ করি না। এমনকি, আমরা নিজে তাহাদিগকে ও তাহাদের সাক্ষাতে মিথ্যা কথা বলি ও স্পষ্টত তাহাদিগকে মিথ্যা কথা বলিতে শিক্ষা দিই। আমরা মিথ্যাবাদী বলিয়াই তো এত ভীরু! এবং ভীরু বলিয়াই এমন মিথ্যাবাদী। আমরা ঘুষি মারিতে লড়াই করিতে পারি না বলিয়া যে আমরা হীন তাহা নহে, স্পষ্ট করিয়া সত্য বলিতে পারি না বলিয়া আমরা এত হীন। আবশ্যক বা অনাবশ্যক মতো মিথ্যা আমাদের গলায় বাধে না বলিয়াই আমরা এত হীন। সত্য জানিয়া আমরা সত্যানুষ্ঠান করিতে পারি না বলিয়াই আমরা এত হীন। পাছে সত্যের দ্বারা আমাদের তিলার্ধমাত্র অনিষ্ট হয়, এই ভয়েই আমরা মরিয়া আছি।’

আমাদের রাজনীতিতে কবিগুরুর এই কথাগুলো কেমন অবলীলায় খাপ খেয়ে যায়। ১৯৭৫ সালের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আমরা তো আমাদের সমাজজীবনে এই মিথ্যার বেসাতি দেখেছি। অথচ কী আশ্চর্য, সমাজের একটি অংশ এই মিথ্যাকে আশ্রয় করেই বেড়ে উঠেছে। মিথ্যার রাজনীতি দেশের ক্ষমতাকেও কুক্ষিগত করে রেখেছিল দীর্ঘদিন। সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে আমাদের সময় লেগেছিল দীর্ঘদিন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ব্যক্তি প্রসঙ্গ প্রবন্ধগুচ্ছে গুরুসদয় দত্তের স্ত্রী সরোজনলিনী দত্ত সম্পর্কে বলেছেন, “অর্থভাণ্ডারে মূল্যবান সামগ্রী লইয়া মানুষ গর্ব করে। কিন্তু তাহার চেয়ে বড় কথা স্মৃতিভাণ্ডারের সম্পদ। সেই মানুষই একান্ত দরিদ্র, যাহার স্মৃতিসঞ্চয়ের মধ্যে অক্ষয় গৌরবের ধন বেশি কিছু নাই। সাধারণত আমরা যখন খাঁটি বাঙালির মেয়ের আদর্শ খুঁজি, তখন গৃহকোণচারিণীর ‘পরেই আমাদের দৃষ্টি পড়ে। গৃহসীমানার মধ্যে আবদ্ধ যে সংকুচিত জীবন তাহারই সংকীর্ণ আদর্শের বহুবেষ্টনরক্ষিত উৎকর্ষ দুর্লভ পদার্থ নহে। তাহার উপাদান অথবা তাহার ক্ষেত্র অপ্রশস্ত, তাহার পরীক্ষা অপেক্ষাকৃত অকঠোর।’

সরোজনলিনী বাহির সংসারের ভিড়ের মধ্যেই অধিকাংশ জীবন কাটাইয়াছেন, অনেক সময় বিদেশি সমাজের অতিথি বন্ধুদের লইয়া তাঁহাকে সামাজিকতা করিতে হইয়াছে, তাঁহার কর্মজীবনের পরিধি আত্মীয়স্বজন বন্ধুমণ্ডলীর মধ্যেই অবরুদ্ধ ছিল না; তাঁহার সংসার আত্মীয়-অনাত্মীয়, স্বদেশি বিদেশি, পরিচিত-অপরিচিত অনেক লোককে লইয়া। এই তাঁর বড় সংসারের মধ্যে সকলের সঙ্গে সম্বন্ধকে তিনি মাধুর্যের দ্বারা শোভন ও ত্যাগের দ্বারা কল্যাণময় করিয়াছিলেন। এইরূপ ক্ষেত্রেই নারী জীবনের যথার্থ পরিচয় ও পরীক্ষা। তাঁহার কাছে বাহিরের দ্বারা ঘর ও ঘরের দ্বারা বাহির পরাহত হয় নাই। এই উভয়ের সুন্দর সমন্বয়েই তাঁহার মহিমা প্রকাশিত হইয়াছে। আজকালকার দিনে নারী একান্তভাবেই গৃহিণী, তিনি আমাদের আদর্শ নহেন, ঘরে-বাহিরে সর্বত্রই যিনি কল্যাণী, তিনিই আদর্শ, যাঁহার জীবন কেবলমাত্র চিরাগত প্রাদেশিক প্রথা ও সংস্কারের ছাঁচে ঢালা, তিনি আদর্শ নহেন কিন্তু যাঁহার মধ্যে বৃহৎ বিশ্বের জ্ঞান ও ভাবের বিচিত্র ধারা গভীর ও সুন্দরভাবে সংগতি লাভ করিতে বাধা না পায় তিনিই আদর্শ।’

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ রেহানার ক্ষেত্রেও কবিগুরুর এই বাক্যগুলো একেবারে মিলে যায়। জীবনের সংগ্রামে তিনি মাধুর্যের দ্বারা শোভন ও ত্যাগের দ্বারা সবকিছু কল্যাণময় করেছেন। আদর্শ স্থাপন করেছেন তিনি।

জওহরলাল নেহরুর স্ত্রী কমলা নেহরু সম্পর্কে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘অপরিসীম তাঁর ধৈর্য, বীরত্ব তাঁর বিরাট, কিন্তু সকলের চেয়ে বড় তাঁর সুদৃঢ় সত্যনিষ্ঠা। পলিটিকসের সাধনায় আত্মপ্রবঞ্চনা ও পরপ্রবঞ্চনার পঙ্কিল আবর্তের মধ্যে তিনি নিজেকে কখনো হারিয়ে ফেলেননি। সত্য যেখানে বিপজ্জনক, সেখানে সত্যকে তিনি ভয় করেননি, মিথ্যা যেখানে সুবিধাজনক, সেখানে তিনি সহায় করেননি মিথ্যাকে। মিথ্যার উপচার আশু প্রয়োজনবোধে দেশপূজার যে অর্ঘ্যে অসংকোচে স্বীকৃত হয়ে থাকে, সেখানে তিনি সত্যের নির্মলতম আদর্শকে রক্ষা করেছেন। তাঁর অসামান্য বুদ্ধি কূটকৌশলের পথে ফললাভের চেষ্টাকে চিরদিন ঘৃণাভরে অবজ্ঞা করেছে। দেশের মুক্তি সাধনায় তাঁর এই চরিত্রের দান সকলের চেয়ে বড় দান।’

শেখ রেহানার জীবনাচার লক্ষ করলে আমরা তাঁর ভেতরে কমলা নেহরুর এই গুণের পরিচয় পাই। তিনি সত্যের নির্মলতম আদর্শকে রক্ষা করেছেন। আত্মপ্রবঞ্চনা ও পরপ্রবঞ্চনার পঙ্কিল আবর্তের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলেননি। সত্যকে তিনি ভয় করেননি। মিথ্যার সুবিধা ভোগে প্রবৃত্ত হননি কোনো দিন। আমরা জানি, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশ নামের জাতিরাষ্ট্রের মহান স্থপতির দুই কন্যার জীবনধারা সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছিল। সেই বদলে যাওয়া জীবনধারায় খাপ খাইয়ে নেয়া শেখ রেহানা নিজেকে গড়ে তুলেছেন সম্পূর্ণ অন্যভাবে। নিজের অতীত তিনি বিস্মৃত হননি। যদিও এত কিছুর পরও তিনি আড়ালে রেখেছেন নিজেকে। নিজের বড় বোন দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা, তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু শেখ রেহানা এক আশ্চর্য শক্তিবলে এই পরিচয়ের গণ্ডির বাইরে রেখেছেন নিজেকে।

রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হয়েও সব সময় রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখলেও তাঁকে রাজনীতি-বিচ্ছিন্ন কিংবা রাজনীতি-বিমুখ ভাবার কোনো কারণ নেই। যথেষ্ট রাজনীতি-সচেতন শেখ রেহানা আড়াল থেকেই তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন।

আজ তাঁর জন্মদিন। জন্মদিনে অনেক অনেক শুভেচ্ছা জানাই তাঁকে। তাঁর জয় হোক।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ

কল্যাণময় আদর্শ স্থাপন করেছেন শেখ রেহানা

আপডেট টাইম : ১২:৪৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে পরিবারটির ভূমিকা সবচেয়ে বেশি, সেই পরিবারের সব সদস্যই যে রাজনীতি-সচেতন, তা নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না। সম্পৃক্ত হওয়ার সব সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নিজেকে আড়াল করে রাখার মধ্য দিয়ে যে নির্মোহ জীবনাচারের পরিচয় পাওয়া যায়, তা অতুলনীয়। পাদপ্রদীপের আলোয় আসার আকাঙ্ক্ষা সবারই থাকে। ইতিবাচক আলোচনার কেন্দ্রে থাকার ইচ্ছা দমন করা সহজ কাজ নয়। তার জন্য সাধনার প্রয়োজন হয়। সেই সাধনায় উত্তীর্ণ এক নারী শেখ রেহানা। জাতির জনকের কন্যা তিনি। বড় বোন বাংলাদেশের তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, কিন্তু তারপরও শেখ রেহানা বেছে নিয়েছেন নিভৃত গৃহকোণ, যেখানে রাজনীতির কূটকৌশল প্রবেশাধিকার পায়নি। তাই বলে এটা ভাবলে চলবে না যে, একেবারেই রাজনীতি-সচেতন নন তিনি। রাজনীতি তার রক্তে। একেবারেই নিরাসক্ত তিনি, এটা বলা যাবে না। যথেষ্ট রাজনীতি-সচেতন শেখ রেহানাকে তারপরও নেপথ্যের নিভৃতচারী।

জীবনটা তার জন্য সহজ ছিল না। জীবনের অনেকটা পথ রীতিমতো লড়াই করেই কাটাতে হয়েছে তাকে। বলতে গেলে জীবনের শুরুতেই জীবনযুদ্ধের সৈনিক তিনি। তারুণ্যের ঊষালগ্নে, যখন তার ভেসে যাওয়ার কথা উচ্ছলতার স্রোতধারায়, তখনই হোঁচট খেতে হয়েছে। থমকে দাঁড়াতে হয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই অভিশপ্ত দিনে হারিয়েছেন মা-বাবা, ভাইদের। হারিয়েছেন স্বদেশের আশ্রয়। আশ্রয়হীন পরিবেশে দেশে দেশে ঘুরেছেন। ছিল না নিশ্চিত নিরাপত্তা, জীবন যাপনের নিশ্চয়তাও ছিল অনুপস্থিত। জীবনযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয়েছে তাকে। বেছে নিতে হয়েছে অন্যরকম এক সংগ্রামী জীবন। লড়াই করেছেন দারিদ্র্যের সঙ্গে। কিন্তু জীবনের সত্য থেকে বিচ্যুত হননি কোনো দিন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার সত্য প্রবন্ধে বলেছেন, ‘আমাদের জাতি যেমন সত্যকে অবহেলা করে, এমন আর কোনো জাতি করে কি না জানি না। আমরা মিথ্যাকে মিথ্যা বলিয়া অনুভব করি না। মিথ্যা আমাদের পক্ষে অতিশয় সহজ স্বাভাবিক হইয়া গিয়াছে। আমরা অতি গুরুতর এবং অতি সামান্য বিষয়েও অকাতরে মিথ্যা বলি। …আমরা ছেলেদের সযত্নে ক খ শেখাই, কিন্তু সত্যপ্রিয়তা শেখাই না, তাহাদের একটি ইংরাজি শব্দের বানান ভুল দেখিলে আমাদের মাথায় বজ্রাঘাত হয়, কিন্তু তাহাদের প্রতিদিবসের সহস্র ক্ষুদ্র মিথ্যাচরণ দেখিয়া বিশেষ আশ্চর্য বোধ করি না। এমনকি, আমরা নিজে তাহাদিগকে ও তাহাদের সাক্ষাতে মিথ্যা কথা বলি ও স্পষ্টত তাহাদিগকে মিথ্যা কথা বলিতে শিক্ষা দিই। আমরা মিথ্যাবাদী বলিয়াই তো এত ভীরু! এবং ভীরু বলিয়াই এমন মিথ্যাবাদী। আমরা ঘুষি মারিতে লড়াই করিতে পারি না বলিয়া যে আমরা হীন তাহা নহে, স্পষ্ট করিয়া সত্য বলিতে পারি না বলিয়া আমরা এত হীন। আবশ্যক বা অনাবশ্যক মতো মিথ্যা আমাদের গলায় বাধে না বলিয়াই আমরা এত হীন। সত্য জানিয়া আমরা সত্যানুষ্ঠান করিতে পারি না বলিয়াই আমরা এত হীন। পাছে সত্যের দ্বারা আমাদের তিলার্ধমাত্র অনিষ্ট হয়, এই ভয়েই আমরা মরিয়া আছি।’

আমাদের রাজনীতিতে কবিগুরুর এই কথাগুলো কেমন অবলীলায় খাপ খেয়ে যায়। ১৯৭৫ সালের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আমরা তো আমাদের সমাজজীবনে এই মিথ্যার বেসাতি দেখেছি। অথচ কী আশ্চর্য, সমাজের একটি অংশ এই মিথ্যাকে আশ্রয় করেই বেড়ে উঠেছে। মিথ্যার রাজনীতি দেশের ক্ষমতাকেও কুক্ষিগত করে রেখেছিল দীর্ঘদিন। সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে আমাদের সময় লেগেছিল দীর্ঘদিন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ব্যক্তি প্রসঙ্গ প্রবন্ধগুচ্ছে গুরুসদয় দত্তের স্ত্রী সরোজনলিনী দত্ত সম্পর্কে বলেছেন, “অর্থভাণ্ডারে মূল্যবান সামগ্রী লইয়া মানুষ গর্ব করে। কিন্তু তাহার চেয়ে বড় কথা স্মৃতিভাণ্ডারের সম্পদ। সেই মানুষই একান্ত দরিদ্র, যাহার স্মৃতিসঞ্চয়ের মধ্যে অক্ষয় গৌরবের ধন বেশি কিছু নাই। সাধারণত আমরা যখন খাঁটি বাঙালির মেয়ের আদর্শ খুঁজি, তখন গৃহকোণচারিণীর ‘পরেই আমাদের দৃষ্টি পড়ে। গৃহসীমানার মধ্যে আবদ্ধ যে সংকুচিত জীবন তাহারই সংকীর্ণ আদর্শের বহুবেষ্টনরক্ষিত উৎকর্ষ দুর্লভ পদার্থ নহে। তাহার উপাদান অথবা তাহার ক্ষেত্র অপ্রশস্ত, তাহার পরীক্ষা অপেক্ষাকৃত অকঠোর।’

সরোজনলিনী বাহির সংসারের ভিড়ের মধ্যেই অধিকাংশ জীবন কাটাইয়াছেন, অনেক সময় বিদেশি সমাজের অতিথি বন্ধুদের লইয়া তাঁহাকে সামাজিকতা করিতে হইয়াছে, তাঁহার কর্মজীবনের পরিধি আত্মীয়স্বজন বন্ধুমণ্ডলীর মধ্যেই অবরুদ্ধ ছিল না; তাঁহার সংসার আত্মীয়-অনাত্মীয়, স্বদেশি বিদেশি, পরিচিত-অপরিচিত অনেক লোককে লইয়া। এই তাঁর বড় সংসারের মধ্যে সকলের সঙ্গে সম্বন্ধকে তিনি মাধুর্যের দ্বারা শোভন ও ত্যাগের দ্বারা কল্যাণময় করিয়াছিলেন। এইরূপ ক্ষেত্রেই নারী জীবনের যথার্থ পরিচয় ও পরীক্ষা। তাঁহার কাছে বাহিরের দ্বারা ঘর ও ঘরের দ্বারা বাহির পরাহত হয় নাই। এই উভয়ের সুন্দর সমন্বয়েই তাঁহার মহিমা প্রকাশিত হইয়াছে। আজকালকার দিনে নারী একান্তভাবেই গৃহিণী, তিনি আমাদের আদর্শ নহেন, ঘরে-বাহিরে সর্বত্রই যিনি কল্যাণী, তিনিই আদর্শ, যাঁহার জীবন কেবলমাত্র চিরাগত প্রাদেশিক প্রথা ও সংস্কারের ছাঁচে ঢালা, তিনি আদর্শ নহেন কিন্তু যাঁহার মধ্যে বৃহৎ বিশ্বের জ্ঞান ও ভাবের বিচিত্র ধারা গভীর ও সুন্দরভাবে সংগতি লাভ করিতে বাধা না পায় তিনিই আদর্শ।’

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ রেহানার ক্ষেত্রেও কবিগুরুর এই বাক্যগুলো একেবারে মিলে যায়। জীবনের সংগ্রামে তিনি মাধুর্যের দ্বারা শোভন ও ত্যাগের দ্বারা সবকিছু কল্যাণময় করেছেন। আদর্শ স্থাপন করেছেন তিনি।

জওহরলাল নেহরুর স্ত্রী কমলা নেহরু সম্পর্কে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘অপরিসীম তাঁর ধৈর্য, বীরত্ব তাঁর বিরাট, কিন্তু সকলের চেয়ে বড় তাঁর সুদৃঢ় সত্যনিষ্ঠা। পলিটিকসের সাধনায় আত্মপ্রবঞ্চনা ও পরপ্রবঞ্চনার পঙ্কিল আবর্তের মধ্যে তিনি নিজেকে কখনো হারিয়ে ফেলেননি। সত্য যেখানে বিপজ্জনক, সেখানে সত্যকে তিনি ভয় করেননি, মিথ্যা যেখানে সুবিধাজনক, সেখানে তিনি সহায় করেননি মিথ্যাকে। মিথ্যার উপচার আশু প্রয়োজনবোধে দেশপূজার যে অর্ঘ্যে অসংকোচে স্বীকৃত হয়ে থাকে, সেখানে তিনি সত্যের নির্মলতম আদর্শকে রক্ষা করেছেন। তাঁর অসামান্য বুদ্ধি কূটকৌশলের পথে ফললাভের চেষ্টাকে চিরদিন ঘৃণাভরে অবজ্ঞা করেছে। দেশের মুক্তি সাধনায় তাঁর এই চরিত্রের দান সকলের চেয়ে বড় দান।’

শেখ রেহানার জীবনাচার লক্ষ করলে আমরা তাঁর ভেতরে কমলা নেহরুর এই গুণের পরিচয় পাই। তিনি সত্যের নির্মলতম আদর্শকে রক্ষা করেছেন। আত্মপ্রবঞ্চনা ও পরপ্রবঞ্চনার পঙ্কিল আবর্তের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলেননি। সত্যকে তিনি ভয় করেননি। মিথ্যার সুবিধা ভোগে প্রবৃত্ত হননি কোনো দিন। আমরা জানি, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশ নামের জাতিরাষ্ট্রের মহান স্থপতির দুই কন্যার জীবনধারা সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছিল। সেই বদলে যাওয়া জীবনধারায় খাপ খাইয়ে নেয়া শেখ রেহানা নিজেকে গড়ে তুলেছেন সম্পূর্ণ অন্যভাবে। নিজের অতীত তিনি বিস্মৃত হননি। যদিও এত কিছুর পরও তিনি আড়ালে রেখেছেন নিজেকে। নিজের বড় বোন দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা, তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু শেখ রেহানা এক আশ্চর্য শক্তিবলে এই পরিচয়ের গণ্ডির বাইরে রেখেছেন নিজেকে।

রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হয়েও সব সময় রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখলেও তাঁকে রাজনীতি-বিচ্ছিন্ন কিংবা রাজনীতি-বিমুখ ভাবার কোনো কারণ নেই। যথেষ্ট রাজনীতি-সচেতন শেখ রেহানা আড়াল থেকেই তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন।

আজ তাঁর জন্মদিন। জন্মদিনে অনেক অনেক শুভেচ্ছা জানাই তাঁকে। তাঁর জয় হোক।