ঢাকা , শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ ভিসা নীতিমালার খসড়া পরিমার্জন ও চূড়ান্তকরণে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা, বাস্তবায়নে কতটা আশার আলো চাকরিজীবীদের জন্য দুই দফায় মিলবে যে ছুটি প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর পরামর্শ অলির সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ৩ বাহিনীর জন্য বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  তিনি বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামারিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।  জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলছে। নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য (এমপি) মাছুম মোস্তফার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি থেকে শিল্পে রুপান্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা

ক্ষমতার শীর্ষে একই পরিবারের তৃতীয় সদস্য

একই পরিবারের একাধিক সদস্য রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান হওয়ার ঘটনা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন নয়। তবে রাজতন্ত্রের বাইরে গণতান্ত্রিক বা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় একই পরিবারের তিন প্রজন্মের তিনজনের ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানোর ঘটনা খুবই কম। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে যেখানে বাবা জিয়াউর রহমান, মা খালেদা জিয়ার পর ছেলে তারেক রহমান সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন।

নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকারের নেতৃত্বে আসছে। সবকিছু ঠিক থাকলে এ সরকারের প্রধান হচ্ছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এর মাধ্যমে জিয়া পরিবার বিশ্বের সেই স্বল্পসংখ্যক পরিবারের কাতারে নাম লেখাতে যাচ্ছে, যাদের তিন সদস্য রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন।

বাংলাদেশে জিয়া পরিবারের রাজনৈতিক উত্থান : রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে জিয়া পরিবারের যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর শীর্ষ পদে আসীন হন এবং পরে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি তিনি নতুন রাজনৈতিক দল বিএনপি প্রতিষ্ঠা করে বহুদলীয় রাজনীতির পথ সুগম করেন।

১৯৮১ সালে তার হত্যাকান্ডের পর রাজনীতিতে সক্রিয় হন খালেদা জিয়া। শুরুতে গৃহিণী হলেও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে দ্রুতই জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের মাধ্যমে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন এবং পরবর্তী সময়ে দুই দফায় সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার পর খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলের নেতৃত্ব নেন তারেক রহমান। নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফিরে নির্বাচনে নেতৃত্ব দিয়ে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি সরকারপ্রধান হওয়ার পথে, যা জিয়া পরিবারের তিন প্রজন্মের ধারাবাহিক নেতৃত্বের ইতিহাস তৈরি করতে যাচ্ছে।

ভারতের নেহরু-গান্ধী পরিবার : দক্ষিণ এশিয়ায় একই পরিবারের তিন প্রজন্মের রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ভারতের নেহরু-গান্ধী পরিবার। স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু দীর্ঘ সময় দেশ পরিচালনা করেন এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত গড়ে তোলেন। তার মেয়ে ইন্দিরা গান্ধী দুই দফায় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার শাসনামলে জরুরি অবস্থা জারি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলেও ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়।

ইন্দিরার মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী হন তার ছেলে রাজীব গান্ধী। মাত্র ৪০ বছর বয়সে দায়িত্ব নেওয়া রাজীব ভারতের সবচেয়ে কম বয়সী প্রধানমন্ত্রী। এই তিনজনের মাধ্যমে ভারতের রাজনীতিতে তিন প্রজন্মের ধারাবাহিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

পাকিস্তানের ভুট্টো পরিবার : পাকিস্তানে জুলফিকার আলি ভুট্টো রাষ্ট্রপতি ও পরে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার নেতৃত্বে দেশ নতুন সংবিধান পায়। সামরিক শাসনামলে তার মৃত্যুদ- কার্যকর হওয়ার পর রাজনীতিতে নেতৃত্ব দেন তার মেয়ে বেনজির ভুট্টো, যিনি মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। বর্তমানে তার স্বামী আসিফ আলি জারদারি প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে এবং তাদের ছেলে বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি দলের নেতৃত্বে থাকায় এই পরিবার এখনো পাকিস্তানের রাজনীতিতে প্রভাবশালী।

শ্রীলঙ্কার বন্দরনায়েকে-কুমারাতুঙ্গা পরিবার : শ্রীলঙ্কায় এস ডব্লিউ আর ডি বন্দরনায়েকে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার হত্যাকা-ের পর স্ত্রী শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং একাধিক মেয়াদে সরকার পরিচালনা করেন।

তাদের মেয়ে চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা প্রধানমন্ত্রী ও পরে প্রেসিডেন্ট হন। একসময় মা ছিলেন প্রধানমন্ত্রী আর মেয়ে প্রেসিডেন্ট, যা বিশ্ব রাজনীতিতে বিরল এক নজির।

থাইল্যান্ডের সিনাওয়াত্রা পরিবার : থাইল্যান্ডে থাকসিন সিনাওয়াত্রা ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রী হন। পরে তার বোন ইংলাক সিনাওয়াত্রা সরকারপ্রধান হন। সাম্প্রতিককালে তার মেয়ে পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা প্রধানমন্ত্রী হয়ে একই পরিবারের তিন সদস্যের ক্ষমতায় যাওয়ার নজির গড়েন। যদিও সামরিক অভ্যুত্থান ও আদালতের রায়ের কারণে তাদের শাসনকাল বিভিন্ন সময়ে বাধাগ্রস্ত হয়।

উত্তর কোরিয়ার কিম পরিবার : উত্তর কোরিয়ায় ১৯৪৮ সাল থেকে ক্ষমতায় রয়েছে কিম পরিবার। প্রতিষ্ঠাতা নেতা কিম ইল-সাং, তার ছেলে কিম জং-ইল এবং বর্তমান নেতা কিম জং-উন এ তিন প্রজন্ম ধরে দেশ শাসন করছেন। এটি বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী পারিবারিক রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার একটি।

ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার উদাহরণ : গ্রিসে জর্জিওস পাপানড্রেউ, তার ছেলে আন্দ্রেয়াস পাপানড্রেউ এবং নাতি জর্জ পাপানড্রেউ এ তিনজনই প্রধানমন্ত্রী হন।

আনাস্তাসিও সোমোজা গার্সিয়া, তার দুই ছেলে লুইস সোমোজা দেবায়লে ও আনাস্তাসিও সোমোজা দেবায়লে তিনজনই প্রেসিডেন্ট ছিলেন। দীর্ঘ সময় দেশটি কার্যত পারিবারিক শাসনে ছিল।

এ ছাড়া পেরুতে মারিয়ানো ইগনাসিও প্রাদো, তার ছেলে মানুয়েল প্রাদো উগারতেচে দুই মেয়াদে প্রেসিডেন্ট এবং আরেক ছেলে হাভিয়ের প্রাদো উগারতেচে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।

দুই প্রজন্মের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার : বিশ্বের বহু দেশে দুই প্রজন্মের নেতৃত্ব দেখা গেছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ ও জর্জ ডব্লিউ বুশ, বাংলাদেশে শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনা, সিঙ্গাপুরে লি কুয়ান ইউ ও লি সিয়েন লুং, কানাডায় পিয়েরে ট্রুডো ও জাস্টিন ট্রুডো।

কেন বিরল এ ধারাবাহিকতা : বিশ্লেষকদের মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য দলীয় সংগঠন, জনপ্রিয়তা, রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার সমন্বয় প্রয়োজন। একই পরিবারের তিন প্রজন্মের ক্ষেত্রে এ ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন। তাই বিশ্বে এমন উদাহরণ হাতেগোনা।

বাংলাদেশে জিয়া পরিবারের সম্ভাব্য এ নতুন অধ্যায় শুধু দেশের রাজনীতিতেই নয়, বিশ্ব রাজনীতির বিরল ধারাবাহিকতার তালিকাতেও গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যেখানে পরিবার, দলীয় ঐতিহ্য ও ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উত্তরাধিকার মিলিয়ে তৈরি হয় ক্ষমতার দীর্ঘ পথচলা।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ

ক্ষমতার শীর্ষে একই পরিবারের তৃতীয় সদস্য

আপডেট টাইম : ০৪:২৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

একই পরিবারের একাধিক সদস্য রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান হওয়ার ঘটনা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন নয়। তবে রাজতন্ত্রের বাইরে গণতান্ত্রিক বা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় একই পরিবারের তিন প্রজন্মের তিনজনের ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানোর ঘটনা খুবই কম। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে যেখানে বাবা জিয়াউর রহমান, মা খালেদা জিয়ার পর ছেলে তারেক রহমান সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন।

নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকারের নেতৃত্বে আসছে। সবকিছু ঠিক থাকলে এ সরকারের প্রধান হচ্ছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এর মাধ্যমে জিয়া পরিবার বিশ্বের সেই স্বল্পসংখ্যক পরিবারের কাতারে নাম লেখাতে যাচ্ছে, যাদের তিন সদস্য রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন।

বাংলাদেশে জিয়া পরিবারের রাজনৈতিক উত্থান : রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে জিয়া পরিবারের যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর শীর্ষ পদে আসীন হন এবং পরে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি তিনি নতুন রাজনৈতিক দল বিএনপি প্রতিষ্ঠা করে বহুদলীয় রাজনীতির পথ সুগম করেন।

১৯৮১ সালে তার হত্যাকান্ডের পর রাজনীতিতে সক্রিয় হন খালেদা জিয়া। শুরুতে গৃহিণী হলেও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে দ্রুতই জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের মাধ্যমে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন এবং পরবর্তী সময়ে দুই দফায় সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার পর খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলের নেতৃত্ব নেন তারেক রহমান। নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফিরে নির্বাচনে নেতৃত্ব দিয়ে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি সরকারপ্রধান হওয়ার পথে, যা জিয়া পরিবারের তিন প্রজন্মের ধারাবাহিক নেতৃত্বের ইতিহাস তৈরি করতে যাচ্ছে।

ভারতের নেহরু-গান্ধী পরিবার : দক্ষিণ এশিয়ায় একই পরিবারের তিন প্রজন্মের রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ভারতের নেহরু-গান্ধী পরিবার। স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু দীর্ঘ সময় দেশ পরিচালনা করেন এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত গড়ে তোলেন। তার মেয়ে ইন্দিরা গান্ধী দুই দফায় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার শাসনামলে জরুরি অবস্থা জারি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলেও ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়।

ইন্দিরার মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী হন তার ছেলে রাজীব গান্ধী। মাত্র ৪০ বছর বয়সে দায়িত্ব নেওয়া রাজীব ভারতের সবচেয়ে কম বয়সী প্রধানমন্ত্রী। এই তিনজনের মাধ্যমে ভারতের রাজনীতিতে তিন প্রজন্মের ধারাবাহিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

পাকিস্তানের ভুট্টো পরিবার : পাকিস্তানে জুলফিকার আলি ভুট্টো রাষ্ট্রপতি ও পরে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার নেতৃত্বে দেশ নতুন সংবিধান পায়। সামরিক শাসনামলে তার মৃত্যুদ- কার্যকর হওয়ার পর রাজনীতিতে নেতৃত্ব দেন তার মেয়ে বেনজির ভুট্টো, যিনি মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। বর্তমানে তার স্বামী আসিফ আলি জারদারি প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে এবং তাদের ছেলে বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি দলের নেতৃত্বে থাকায় এই পরিবার এখনো পাকিস্তানের রাজনীতিতে প্রভাবশালী।

শ্রীলঙ্কার বন্দরনায়েকে-কুমারাতুঙ্গা পরিবার : শ্রীলঙ্কায় এস ডব্লিউ আর ডি বন্দরনায়েকে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার হত্যাকা-ের পর স্ত্রী শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং একাধিক মেয়াদে সরকার পরিচালনা করেন।

তাদের মেয়ে চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা প্রধানমন্ত্রী ও পরে প্রেসিডেন্ট হন। একসময় মা ছিলেন প্রধানমন্ত্রী আর মেয়ে প্রেসিডেন্ট, যা বিশ্ব রাজনীতিতে বিরল এক নজির।

থাইল্যান্ডের সিনাওয়াত্রা পরিবার : থাইল্যান্ডে থাকসিন সিনাওয়াত্রা ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রী হন। পরে তার বোন ইংলাক সিনাওয়াত্রা সরকারপ্রধান হন। সাম্প্রতিককালে তার মেয়ে পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা প্রধানমন্ত্রী হয়ে একই পরিবারের তিন সদস্যের ক্ষমতায় যাওয়ার নজির গড়েন। যদিও সামরিক অভ্যুত্থান ও আদালতের রায়ের কারণে তাদের শাসনকাল বিভিন্ন সময়ে বাধাগ্রস্ত হয়।

উত্তর কোরিয়ার কিম পরিবার : উত্তর কোরিয়ায় ১৯৪৮ সাল থেকে ক্ষমতায় রয়েছে কিম পরিবার। প্রতিষ্ঠাতা নেতা কিম ইল-সাং, তার ছেলে কিম জং-ইল এবং বর্তমান নেতা কিম জং-উন এ তিন প্রজন্ম ধরে দেশ শাসন করছেন। এটি বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী পারিবারিক রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার একটি।

ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার উদাহরণ : গ্রিসে জর্জিওস পাপানড্রেউ, তার ছেলে আন্দ্রেয়াস পাপানড্রেউ এবং নাতি জর্জ পাপানড্রেউ এ তিনজনই প্রধানমন্ত্রী হন।

আনাস্তাসিও সোমোজা গার্সিয়া, তার দুই ছেলে লুইস সোমোজা দেবায়লে ও আনাস্তাসিও সোমোজা দেবায়লে তিনজনই প্রেসিডেন্ট ছিলেন। দীর্ঘ সময় দেশটি কার্যত পারিবারিক শাসনে ছিল।

এ ছাড়া পেরুতে মারিয়ানো ইগনাসিও প্রাদো, তার ছেলে মানুয়েল প্রাদো উগারতেচে দুই মেয়াদে প্রেসিডেন্ট এবং আরেক ছেলে হাভিয়ের প্রাদো উগারতেচে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।

দুই প্রজন্মের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার : বিশ্বের বহু দেশে দুই প্রজন্মের নেতৃত্ব দেখা গেছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ ও জর্জ ডব্লিউ বুশ, বাংলাদেশে শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনা, সিঙ্গাপুরে লি কুয়ান ইউ ও লি সিয়েন লুং, কানাডায় পিয়েরে ট্রুডো ও জাস্টিন ট্রুডো।

কেন বিরল এ ধারাবাহিকতা : বিশ্লেষকদের মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য দলীয় সংগঠন, জনপ্রিয়তা, রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার সমন্বয় প্রয়োজন। একই পরিবারের তিন প্রজন্মের ক্ষেত্রে এ ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন। তাই বিশ্বে এমন উদাহরণ হাতেগোনা।

বাংলাদেশে জিয়া পরিবারের সম্ভাব্য এ নতুন অধ্যায় শুধু দেশের রাজনীতিতেই নয়, বিশ্ব রাজনীতির বিরল ধারাবাহিকতার তালিকাতেও গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যেখানে পরিবার, দলীয় ঐতিহ্য ও ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উত্তরাধিকার মিলিয়ে তৈরি হয় ক্ষমতার দীর্ঘ পথচলা।