ঢাকা , শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ ভিসা নীতিমালার খসড়া পরিমার্জন ও চূড়ান্তকরণে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা, বাস্তবায়নে কতটা আশার আলো চাকরিজীবীদের জন্য দুই দফায় মিলবে যে ছুটি প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর পরামর্শ অলির সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ৩ বাহিনীর জন্য বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  তিনি বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামারিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।  জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলছে। নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য (এমপি) মাছুম মোস্তফার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি থেকে শিল্পে রুপান্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তোরণে জেনারেল ওয়াকারের ভূমিকা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে

একটি রাজনৈতিক গহীন অন্ধকার খাদের কিনারা থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করেছে জেনারেল ওয়াকারের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। শুধু খাদের কিনারা থেকে ফিরিয়ে আনেনি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথেও তারা একটি শান্তির পূর্ণপ্রত্যাবর্তন কাজে সহায়তা করে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার শুরু নিশ্চিত করেছে। ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনে ছুঁড়ে ফেলা গণতেন্ত্রর আকাঙ্ক্ষায় রক্তক্ষয়ী ৩৬ জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশে স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে। গণতান্ত্রিক রূপান্তরের অন্তবর্তী যাত্রায় নানা অনিশ্চয়তা, ঝুঁকি সবকিছু উৎরে বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক বন্দরে নোঙর করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। আরও স্পষ্ট করে বললে বলতে হয়, জেনারেল ওয়াকার উজ জামান জুলাই বিপ্লবের চুড়ান্ত ক্ষণে তিনি চাইলে খুব সহজেই সামরিক শাসন জারি করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর হতে পারতেন। সে সময়ে বিক্ষুব্ধ জনতা যেভাবে শেখ হাসিনার পতনে মরিয়া হয়ে উঠেছিল, তাতে তিনি যদি এমন সিদ্ধান্ত নিতেন তবুও জনগণ সেটাকেই আনন্দে এবং উৎফুল্ল চিত্তে গ্রহণ করতো। কিন্তু তিনি পেশাদারিত্বে অটল থেকেছেন। এটা অনেক বড় সেক্রিফাইস, সকলের পক্ষে এটা সম্ভব হয় না। এভাবেই তিনি অনেকটা খাদের প্রান্ত থেকে একটি দেশ ও একটি প্রতিষ্ঠানকে ফিরিয়ে এনেছেন। তার এই ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসের স্বর্ণালী অধ্যায় হিসেবে লিখিত থাকবে।

৩৬ জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বিশৃঙ্খল সময়ে থানা পাহারা দিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা পাহারা দিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এগুলো তাদের নিয়মিত কাজ নয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশকে একটি ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী রাস্তা থেকে ফিরিয়ে এনেছে। বাংলাদেশ প্রায় মিয়ানমারের পথে ঢুকে গিয়েছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিশেষ করে বর্তমান সেনাপ্রধান তার দৃঢ় নেতৃত্ব দিয়ে সেই পথ থেকে বাংলাদেশকে ফিরিয়ে এনেছেন। নানা ধরনের উস্কানি, চাপ, প্রলোভন, স্বজন প্রীতি এবং পরিস্থিতির ফাঁদে পা না দিয়ে তিনি সততা, দেশপ্রেম, দৃঢ়তাসহ জানা-অজানা অসংখ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে দেশকে একটি ভয়াবহ বিপদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। এমনকি তিনি এক এগারোর পথেও হাঁটেননি। এক এগারো ছিল একটি সামরিক অভ্যুত্থান। পরবর্তী সরকারে সেনাবাহিনীর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল বিভিন্ন মাত্রায়। কিন্তু ৫ আগস্ট কোন সামরিক অভ্যুত্থান ছিল না। এটি একটি গণঅভ্যুত্থান ছিল। এখানে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল কেবলমাত্র রক্তক্ষয় থেকে জাতিকে রক্ষা করা। আবার ৫ আগস্ট পরবর্তী সরকারের সেনাবাহিনীর কোন অংশগ্রহণ নেই। তারা দেশকে স্থিতিশীল রাখতে এবং গণতন্ত্রে উত্তরণের পথে একটি বেসামরিক সরকার গঠনে সহায়তা করেছে মাত্র। এর বেশি কিছু নয়। জেনারেল ওয়াকার সেনাপ্রধান হওয়ার পরে সবাই তাকে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় হিসেবেই চিত্রিত করেছিল। সেই জায়গা থেকে স্বজন প্রীতির ঊর্ধ্বে দেশপ্রেমকে স্থান দেয়া বর্তমান বিবেচনায় খুব সহজ কাজ ছিল না। কিন্তু তিনি দেখিয়েছেন দেশপ্রেম, পেশাদারিত্ব ও প্রতিষ্ঠান সবকিছুর ঊর্ধ্বে। সেদিন যদি তিনি সামান্য একটু ভুল করতেন তাহলে প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ পাকিস্তানের ইমরান খানের পতনের সময়কার মত পরিণতির দিকে এবং পরবর্তীকালে মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতির পথে বাংলাদেশ ধাবিত হতো। কিন্তু বর্তমান সেনাপ্রধান সে অবস্থা থেকে শুধু বাংলাদেশকে রক্ষা করেননি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ও রক্ষা করেছেন।

এই দেশের মানুষ ভালোবেসে সেনাবাহিনীর নাম উচ্চারণের সময় দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী বলে আখ্যায়িত করে থাকে। বর্তমান সেনাপ্রধানের বিজ্ঞজনোচিত ও দৃঢ়চেতা সিদ্ধান্তের কারণে ভুল পথে পরিচালনার অপচেষ্টার হাত থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে রক্ষা করে আবার তিনি জনগণের আস্থা ও ভালোবাসার সর্বোচ্চ চূড়ায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে প্রতিস্থাপন করতে পেরেছেন। ফলে সাধারণ মানুষ কিভাবে রাস্তায় দায়িত্ব পালন করা সেনাবাহিনীকে বুক দিয়ে গ্রহণ করেছে, ফুল দিয়ে বরণ করেছে সেগুলো আমরা দেখতে পেয়েছি। এভাবেই একটি সেনাবাহিনী দেশের মানুষের কাছে আস্থা ও ভরসার সর্বশেষ আশ্রয় হিসেবে পুনরায় টিকে গেল।

বাংলাদেশের বিভিন্ন সংকটে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বারবার এগিয়ে এসেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি প্রতিষ্ঠা, শান্তি মিশনের মাধ্যমে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা এমনকি গণতান্ত্রিক পদযাত্রায় বিভিন্ন সংকটে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এদেশের মানুষের আস্থার সর্বশেষ আশ্রয় হিসেবে পরিচিত ছিল। এজন্য নির্বাচন আসলে সব রাজনৈতিক দল সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে- এই দাবী করে থাকে। এটা সেনাবাহিনীর প্রতি জনগণের চূড়ান্ত আস্থার বহিঃপ্রকাশ। দুই একজন ব্যক্তির কারণে হয়তো মাঝেমধ্যে কিছু বিচ্যুতি হয়ে থাকলেও চূড়ান্ত বিচারে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এখন পর্যন্ত এই দেশের মানুষের আস্থা ও ভালোবাসার সর্বশেষ আশ্রয়।

শেষ করে বর্তমান ছাত্র জনতার বিপ্লবে দেশের মধ্যে যে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত পুলিশ যেভাবে মারমুখী অবস্থায় ছিল সেই অবস্থা থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হতো তাহলে দেশ এক ভয়াবহ অন্ধকারে পতিত হতো। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, শেখ হাসিনা সরকার পতনের অন্তত দুই দিন আগে থেকেই মাঠ পর্যায়ে মোতায়েনকৃত সেনাসদস্যরা দুয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া ছাত্র জনতার আন্দোলনে অনেকটা অঘোষিতভাবে শরিক হয়ে গিয়েছিল। যে কারণে তাদের বহন করা বিভিন্ন সামরিক যানবাহনে উঠে ছাত্রজনতা জাতীয় পতাকা হাতে স্লোগান দিলেও তারা মারমুখী হয়নি। পুলিশের মত এপিসির ভিতরে মেরে লাশ রাস্তায় ফেলে দেয় নি। বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ ও সশস্ত্র কঠোর অবস্থানে সেনাবাহিনীর সদস্যরা কৌশলগত অবস্থান না নিলে সেগুলো দখল করা ছাত্র-জনতার পক্ষে খুব কঠিন হতো। এবং বিপুল পরিমাণ হতাহতের ঘটনা ঘটতো। মিরপুর-১০, কুমিল্লা, উত্তরা, এরকম আরো অনেক উদাহরণ দেয়া যায়।

শুধু তাই নয়, বিপ্লবের পর জনগণের রুদ্ররোষ থেকে আটকে পড়া পুলিশ বাহিনীকে উদ্ধার, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান রক্ষা করাসহ দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে যা ইতোমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন মহলে প্রশংসিত হয়েছে। এরপর থেকে সেনাবাহিনী বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান রক্ষা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে তা অতুলনীয়। ৪/৫ লাখ পুলিশের কাজ থেকে শুরু করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন সহ অসংখ্য কাজ সেনাবাহিনীকে তুলনামূলকভাবে স্বল্প শক্তি দিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রমের বিনিময়ে সমাধা করতে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, আওয়ামী লীগের এবং পুলিশ বাহিনীর অনেক বিতর্কিত নেতা ও অফিসারদের জনতার রুদ্ররোষ থেকে রক্ষা করেছে সেনাবাহিনী। যেটা সেনাপ্রধান নিজেও জানিয়েছেন। এদেরকে রক্ষা না করলে এদের পরিণতি কী হতো তা নেপালে আমরা দেখতে পেয়েছি।

এমনকি ৫ আগস্ট যদি সেনাপ্রধান শেখ হাসিনাকে পালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে বোঝাতে সক্ষম না হতেন তাহলে কয়েক মিনিট পরেই গণভবনে আরেকটি ১৫ আগস্টের মত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটার সমূহ সম্ভাবনা ছিল। কেননা যেভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষের জনস্রোত চারদিক থেকে গণভবন অভিমুখী ছিল তা রোধ করা বিশ্বের কোন শক্তির পক্ষে সম্ভব ছিল না। কেননা এই জনগণ ইতোমধ্যেই ভয়কে জয় করে ফেলেছিল। পুলিশের ভাষায় ‘একটা গুলি মারলে একটাই মরে, একটাই যায়, বাকিডি যায় না’— এরকম ভয়ডরহীন মানসিকতা নিয়ে লক্ষ লক্ষ ছাত্র জনতা গণভবনের পথে রওনা দিয়েছিল। গুলি করে তাদের থামানো কারো পক্ষে সম্ভব ছিল না। ক্ষুব্ধ জনগণের রুদ্ররোষ কী অবস্থায় ছিল সেটি তাদের বঙ্গভবনে প্রবেশের পরবর্তী প্রতিক্রিয়া থেকে দেখা গিয়েছে। এমন অবস্থায় তারা যদি গণভবনে প্রবেশ করে সেখানে শেখ পরিবারের কাউকে পেত, তাহলে পরিস্থিতি কী হতো কল্পনা করাও কঠিন। সেই অবস্থায় সেনাপ্রধান নানা কৌশল অবলম্বন করে শেখ হাসিনাকে রাজি করিয়ে বলা যেতে পারে আরেকটি ১৫ আগস্টের ইতিহাস রচনা থেকে জাতিকে রক্ষা করেছেন। এ অবস্থা যারা মোকাবেলা করছেন, তারা বুঝতে পারছেন এই চ্যালেঞ্জ কতটা কঠিন। সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি ছিল, পরাজিত শক্তি ও তাদের দেশি বিদেশি দোসরা দেশকে পুনরায় পূর্বের অবস্থানে ফিরিয়ে নিতে নানামুখী ষড়যন্ত্র ও প্রচেষ্টা চালিয়েছে। কোন ধরনের সহিংস ঘটনা ছাড়াই সেই পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছে এই সেনাবাহিনী।

অভ্যুত্থান পরবর্তীকালে কিছু মানুষ নির্বাচন ৫ বছর পিছিয়ে দেয়ার দাবিতে মিছিল করেছে। বিভিন্ন মহল থেকে নির্বাচন পাঁচ-দশ বছর এমনকি ইউনুস সাহেবের বাকি জিন্দেগীর মধ্যে না হওয়ার দাবি তোলা হয়েছিল। অবাক কাণ্ড, যে প্রজন্ম আফসোস করত তাদের জীবদ্দশায় তারা ভোট দিতে পারেনি, দেড় দশকের অধিককাল দেশে তারা সুষ্ঠু নির্বাচন দেখেনি, তাদেরই একটি অংশ এখন অজানা কাল পর্যন্ত নির্বাচন পেছানোর দাবি তুলেছিল। আরো অবাক ব্যাপার, এই দেশে সেনাবাহিনী নির্বাচন চেয়েছে, আর সিভিলিয়ানরা (একাংশ) চাইছিল না। শেখ হাসিনার পতনের পর তিনি যখন সকল রাজনৈতিক দলগুলোকে পাশে রেখে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, আপনারা আমার উপর আস্থা রাখুন, তখন সকলেই তার উপর আস্থা রেখেছিলেন। কিন্তু কিছু গোষ্ঠী থেকে নির্বাচনকে পিছিয়ে দিতে নানা ধরণের অস্থিতিশীলতা তৈরি করে চলছিলো ঠিক সেসময় সেনাপ্রধান ১৮ মাসের মধ্যে নির্বাচন হওয়ার কঠোর বার্তা দিলেন। এই বার্তার পর তাকে লক্ষ্য করে নানা কটুক্তি, তীর্যক বাক্যবান ছোড়া হলো। ভেতর-বাইরে থেকে নানা ষড়যন্ত্র চলার খবর বের হলো। কিন্তু জেনারেল ওয়াকার সবকিছু সামলালেন অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় ও বিচক্ষণতার সাথে। চারপাশের সবকিছুকে উপেক্ষা করে তিনি তার লক্ষ ১৮ মাসে নির্বাচনের অবস্থানে অবিচল রইলেন। অবশেষে সকল ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে ১৭ মাসের মাথায় বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে উৎসবমুখর নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি তার কথা রক্ষা করলেন। নির্বাচনে কোন মহল যেন ষড়যন্ত্র করে বিতর্কিত বা বানচাল করতে না পারে সেজন্য জেনারেল ওয়াকার সেনাবাহিনীর প্রায় এক লাখ সদস্য মোতায়েন করে। নির্বাচনকে যেকোনো ধরনের অনিশ্চয়তা ও বিতর্কের হাত থেকে রক্ষা করতে তারা অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থা ছিল। তাদের এই অবস্থানের কারণে একটি সুন্দর ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। এর মাধ্যমে একটি দেশের সেনাবাহিনী, একজন জেনারেলের সহায়তায় বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক উত্তোরণের নবযাত্রা শুরু হলো। তিনি বারবার বলেছেন, সাংবিধানিক দায়িত্বের বাইরে আমার ভিন্ন কোনো ইচ্ছা নেই। তিনি সেটা প্রমাণ করেছেন। তাই এই বক্তব্য এতটাই সৎ ছিলো যে সেনবাহিনীর প্রতিটা সদস্য অনুধাবন করতে পেরেছিলেন এবং সর্বোচ্চটা দিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

কেবল গণতান্ত্রিক উত্তরণে বাংলাদেশকে সহায়তা নয়, দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এসময় জেনারেল ওয়াকারের ভূমিকা চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের বিদেশি স্বার্থে নেয়া দেশবিরোধী কিছু উদ্যোগ সেনাবাহিনী ও জেনারেল ওয়াকারের শক্ত অবস্থানের কারণে ভেস্তে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ভেতরে ও বাইরে থেকে বেশ কয়েকবার রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করে সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টির অপচেষ্টা করা হয়। এটা রুখতে জেনারেল ওয়াকারের নেতৃত্বে তিন বাহিনী প্রধান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মানবিক করিডরের নামে বাংলাদেশের মাটিতে বিদেশি এজেন্ডা বাস্তবায়নের ষড়যন্ত্র, দেশের সবচেয়ে লাভজনক চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনালের অপারেশন বিদেশি কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ড এর কাছে লিজ দেয়ার ব্যাপারে অত্যন্ত শক্ত অবস্থান নিয়েছিল তারা। ইউনুস সরকার বিদেশীদের স্বার্থে এই দুটো সুযোগ দেয়ার জন্য অনেকটা মরিয়া হয়েছিলো। কিন্তু বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও জেনারেল ওয়াকার অন্তর্বর্তী সরকারের এই ষড়যন্ত্র রুখে দিতে জোরালো ভূমিকা পালন করে। এর মধ্য দিয়ে দেশ যেমন এক দীর্ঘমেয়াদী প্রক্সি যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা পায়, তেমনি বাংলাদেশের স্বার্থ বিরোধী বিদেশি কোম্পানির সাথে বন্দর চুক্তি স্থগিত করতে বাধ্য হয়। এর মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনী তার নামের সাথে জড়িত থাকা দেশপ্রেমিক বিশেষণটি যথাযথ বলে আবারো প্রমাণ করতে সমর্থ্য হয়। এসবই সম্ভব হয়েছে বর্তমান সেনা প্রধানের সততা দেশপ্রেম পেশাদারিত্ব ও দৃঢ়চেতা সিদ্ধান্তের কারণে। এই জন্য তিনি ইতোমধ্যেই সমগ্র দেশবাসীর অকুণ্ঠ ভালবাসা ও আস্থার প্রতীক হিসেবে গণ্য হয়েছেন। বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে তার এই ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে রচিত থাকবে।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তোরণে জেনারেল ওয়াকারের ভূমিকা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে

আপডেট টাইম : ০১:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

একটি রাজনৈতিক গহীন অন্ধকার খাদের কিনারা থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করেছে জেনারেল ওয়াকারের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। শুধু খাদের কিনারা থেকে ফিরিয়ে আনেনি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথেও তারা একটি শান্তির পূর্ণপ্রত্যাবর্তন কাজে সহায়তা করে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার শুরু নিশ্চিত করেছে। ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনে ছুঁড়ে ফেলা গণতেন্ত্রর আকাঙ্ক্ষায় রক্তক্ষয়ী ৩৬ জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশে স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে। গণতান্ত্রিক রূপান্তরের অন্তবর্তী যাত্রায় নানা অনিশ্চয়তা, ঝুঁকি সবকিছু উৎরে বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক বন্দরে নোঙর করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। আরও স্পষ্ট করে বললে বলতে হয়, জেনারেল ওয়াকার উজ জামান জুলাই বিপ্লবের চুড়ান্ত ক্ষণে তিনি চাইলে খুব সহজেই সামরিক শাসন জারি করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর হতে পারতেন। সে সময়ে বিক্ষুব্ধ জনতা যেভাবে শেখ হাসিনার পতনে মরিয়া হয়ে উঠেছিল, তাতে তিনি যদি এমন সিদ্ধান্ত নিতেন তবুও জনগণ সেটাকেই আনন্দে এবং উৎফুল্ল চিত্তে গ্রহণ করতো। কিন্তু তিনি পেশাদারিত্বে অটল থেকেছেন। এটা অনেক বড় সেক্রিফাইস, সকলের পক্ষে এটা সম্ভব হয় না। এভাবেই তিনি অনেকটা খাদের প্রান্ত থেকে একটি দেশ ও একটি প্রতিষ্ঠানকে ফিরিয়ে এনেছেন। তার এই ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসের স্বর্ণালী অধ্যায় হিসেবে লিখিত থাকবে।

৩৬ জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বিশৃঙ্খল সময়ে থানা পাহারা দিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা পাহারা দিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এগুলো তাদের নিয়মিত কাজ নয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশকে একটি ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী রাস্তা থেকে ফিরিয়ে এনেছে। বাংলাদেশ প্রায় মিয়ানমারের পথে ঢুকে গিয়েছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিশেষ করে বর্তমান সেনাপ্রধান তার দৃঢ় নেতৃত্ব দিয়ে সেই পথ থেকে বাংলাদেশকে ফিরিয়ে এনেছেন। নানা ধরনের উস্কানি, চাপ, প্রলোভন, স্বজন প্রীতি এবং পরিস্থিতির ফাঁদে পা না দিয়ে তিনি সততা, দেশপ্রেম, দৃঢ়তাসহ জানা-অজানা অসংখ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে দেশকে একটি ভয়াবহ বিপদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। এমনকি তিনি এক এগারোর পথেও হাঁটেননি। এক এগারো ছিল একটি সামরিক অভ্যুত্থান। পরবর্তী সরকারে সেনাবাহিনীর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল বিভিন্ন মাত্রায়। কিন্তু ৫ আগস্ট কোন সামরিক অভ্যুত্থান ছিল না। এটি একটি গণঅভ্যুত্থান ছিল। এখানে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল কেবলমাত্র রক্তক্ষয় থেকে জাতিকে রক্ষা করা। আবার ৫ আগস্ট পরবর্তী সরকারের সেনাবাহিনীর কোন অংশগ্রহণ নেই। তারা দেশকে স্থিতিশীল রাখতে এবং গণতন্ত্রে উত্তরণের পথে একটি বেসামরিক সরকার গঠনে সহায়তা করেছে মাত্র। এর বেশি কিছু নয়। জেনারেল ওয়াকার সেনাপ্রধান হওয়ার পরে সবাই তাকে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় হিসেবেই চিত্রিত করেছিল। সেই জায়গা থেকে স্বজন প্রীতির ঊর্ধ্বে দেশপ্রেমকে স্থান দেয়া বর্তমান বিবেচনায় খুব সহজ কাজ ছিল না। কিন্তু তিনি দেখিয়েছেন দেশপ্রেম, পেশাদারিত্ব ও প্রতিষ্ঠান সবকিছুর ঊর্ধ্বে। সেদিন যদি তিনি সামান্য একটু ভুল করতেন তাহলে প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ পাকিস্তানের ইমরান খানের পতনের সময়কার মত পরিণতির দিকে এবং পরবর্তীকালে মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতির পথে বাংলাদেশ ধাবিত হতো। কিন্তু বর্তমান সেনাপ্রধান সে অবস্থা থেকে শুধু বাংলাদেশকে রক্ষা করেননি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ও রক্ষা করেছেন।

এই দেশের মানুষ ভালোবেসে সেনাবাহিনীর নাম উচ্চারণের সময় দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী বলে আখ্যায়িত করে থাকে। বর্তমান সেনাপ্রধানের বিজ্ঞজনোচিত ও দৃঢ়চেতা সিদ্ধান্তের কারণে ভুল পথে পরিচালনার অপচেষ্টার হাত থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে রক্ষা করে আবার তিনি জনগণের আস্থা ও ভালোবাসার সর্বোচ্চ চূড়ায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে প্রতিস্থাপন করতে পেরেছেন। ফলে সাধারণ মানুষ কিভাবে রাস্তায় দায়িত্ব পালন করা সেনাবাহিনীকে বুক দিয়ে গ্রহণ করেছে, ফুল দিয়ে বরণ করেছে সেগুলো আমরা দেখতে পেয়েছি। এভাবেই একটি সেনাবাহিনী দেশের মানুষের কাছে আস্থা ও ভরসার সর্বশেষ আশ্রয় হিসেবে পুনরায় টিকে গেল।

বাংলাদেশের বিভিন্ন সংকটে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বারবার এগিয়ে এসেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি প্রতিষ্ঠা, শান্তি মিশনের মাধ্যমে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা এমনকি গণতান্ত্রিক পদযাত্রায় বিভিন্ন সংকটে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এদেশের মানুষের আস্থার সর্বশেষ আশ্রয় হিসেবে পরিচিত ছিল। এজন্য নির্বাচন আসলে সব রাজনৈতিক দল সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে- এই দাবী করে থাকে। এটা সেনাবাহিনীর প্রতি জনগণের চূড়ান্ত আস্থার বহিঃপ্রকাশ। দুই একজন ব্যক্তির কারণে হয়তো মাঝেমধ্যে কিছু বিচ্যুতি হয়ে থাকলেও চূড়ান্ত বিচারে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এখন পর্যন্ত এই দেশের মানুষের আস্থা ও ভালোবাসার সর্বশেষ আশ্রয়।

শেষ করে বর্তমান ছাত্র জনতার বিপ্লবে দেশের মধ্যে যে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত পুলিশ যেভাবে মারমুখী অবস্থায় ছিল সেই অবস্থা থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হতো তাহলে দেশ এক ভয়াবহ অন্ধকারে পতিত হতো। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, শেখ হাসিনা সরকার পতনের অন্তত দুই দিন আগে থেকেই মাঠ পর্যায়ে মোতায়েনকৃত সেনাসদস্যরা দুয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া ছাত্র জনতার আন্দোলনে অনেকটা অঘোষিতভাবে শরিক হয়ে গিয়েছিল। যে কারণে তাদের বহন করা বিভিন্ন সামরিক যানবাহনে উঠে ছাত্রজনতা জাতীয় পতাকা হাতে স্লোগান দিলেও তারা মারমুখী হয়নি। পুলিশের মত এপিসির ভিতরে মেরে লাশ রাস্তায় ফেলে দেয় নি। বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ ও সশস্ত্র কঠোর অবস্থানে সেনাবাহিনীর সদস্যরা কৌশলগত অবস্থান না নিলে সেগুলো দখল করা ছাত্র-জনতার পক্ষে খুব কঠিন হতো। এবং বিপুল পরিমাণ হতাহতের ঘটনা ঘটতো। মিরপুর-১০, কুমিল্লা, উত্তরা, এরকম আরো অনেক উদাহরণ দেয়া যায়।

শুধু তাই নয়, বিপ্লবের পর জনগণের রুদ্ররোষ থেকে আটকে পড়া পুলিশ বাহিনীকে উদ্ধার, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান রক্ষা করাসহ দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে যা ইতোমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন মহলে প্রশংসিত হয়েছে। এরপর থেকে সেনাবাহিনী বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান রক্ষা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে তা অতুলনীয়। ৪/৫ লাখ পুলিশের কাজ থেকে শুরু করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন সহ অসংখ্য কাজ সেনাবাহিনীকে তুলনামূলকভাবে স্বল্প শক্তি দিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রমের বিনিময়ে সমাধা করতে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, আওয়ামী লীগের এবং পুলিশ বাহিনীর অনেক বিতর্কিত নেতা ও অফিসারদের জনতার রুদ্ররোষ থেকে রক্ষা করেছে সেনাবাহিনী। যেটা সেনাপ্রধান নিজেও জানিয়েছেন। এদেরকে রক্ষা না করলে এদের পরিণতি কী হতো তা নেপালে আমরা দেখতে পেয়েছি।

এমনকি ৫ আগস্ট যদি সেনাপ্রধান শেখ হাসিনাকে পালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে বোঝাতে সক্ষম না হতেন তাহলে কয়েক মিনিট পরেই গণভবনে আরেকটি ১৫ আগস্টের মত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটার সমূহ সম্ভাবনা ছিল। কেননা যেভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষের জনস্রোত চারদিক থেকে গণভবন অভিমুখী ছিল তা রোধ করা বিশ্বের কোন শক্তির পক্ষে সম্ভব ছিল না। কেননা এই জনগণ ইতোমধ্যেই ভয়কে জয় করে ফেলেছিল। পুলিশের ভাষায় ‘একটা গুলি মারলে একটাই মরে, একটাই যায়, বাকিডি যায় না’— এরকম ভয়ডরহীন মানসিকতা নিয়ে লক্ষ লক্ষ ছাত্র জনতা গণভবনের পথে রওনা দিয়েছিল। গুলি করে তাদের থামানো কারো পক্ষে সম্ভব ছিল না। ক্ষুব্ধ জনগণের রুদ্ররোষ কী অবস্থায় ছিল সেটি তাদের বঙ্গভবনে প্রবেশের পরবর্তী প্রতিক্রিয়া থেকে দেখা গিয়েছে। এমন অবস্থায় তারা যদি গণভবনে প্রবেশ করে সেখানে শেখ পরিবারের কাউকে পেত, তাহলে পরিস্থিতি কী হতো কল্পনা করাও কঠিন। সেই অবস্থায় সেনাপ্রধান নানা কৌশল অবলম্বন করে শেখ হাসিনাকে রাজি করিয়ে বলা যেতে পারে আরেকটি ১৫ আগস্টের ইতিহাস রচনা থেকে জাতিকে রক্ষা করেছেন। এ অবস্থা যারা মোকাবেলা করছেন, তারা বুঝতে পারছেন এই চ্যালেঞ্জ কতটা কঠিন। সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি ছিল, পরাজিত শক্তি ও তাদের দেশি বিদেশি দোসরা দেশকে পুনরায় পূর্বের অবস্থানে ফিরিয়ে নিতে নানামুখী ষড়যন্ত্র ও প্রচেষ্টা চালিয়েছে। কোন ধরনের সহিংস ঘটনা ছাড়াই সেই পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছে এই সেনাবাহিনী।

অভ্যুত্থান পরবর্তীকালে কিছু মানুষ নির্বাচন ৫ বছর পিছিয়ে দেয়ার দাবিতে মিছিল করেছে। বিভিন্ন মহল থেকে নির্বাচন পাঁচ-দশ বছর এমনকি ইউনুস সাহেবের বাকি জিন্দেগীর মধ্যে না হওয়ার দাবি তোলা হয়েছিল। অবাক কাণ্ড, যে প্রজন্ম আফসোস করত তাদের জীবদ্দশায় তারা ভোট দিতে পারেনি, দেড় দশকের অধিককাল দেশে তারা সুষ্ঠু নির্বাচন দেখেনি, তাদেরই একটি অংশ এখন অজানা কাল পর্যন্ত নির্বাচন পেছানোর দাবি তুলেছিল। আরো অবাক ব্যাপার, এই দেশে সেনাবাহিনী নির্বাচন চেয়েছে, আর সিভিলিয়ানরা (একাংশ) চাইছিল না। শেখ হাসিনার পতনের পর তিনি যখন সকল রাজনৈতিক দলগুলোকে পাশে রেখে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, আপনারা আমার উপর আস্থা রাখুন, তখন সকলেই তার উপর আস্থা রেখেছিলেন। কিন্তু কিছু গোষ্ঠী থেকে নির্বাচনকে পিছিয়ে দিতে নানা ধরণের অস্থিতিশীলতা তৈরি করে চলছিলো ঠিক সেসময় সেনাপ্রধান ১৮ মাসের মধ্যে নির্বাচন হওয়ার কঠোর বার্তা দিলেন। এই বার্তার পর তাকে লক্ষ্য করে নানা কটুক্তি, তীর্যক বাক্যবান ছোড়া হলো। ভেতর-বাইরে থেকে নানা ষড়যন্ত্র চলার খবর বের হলো। কিন্তু জেনারেল ওয়াকার সবকিছু সামলালেন অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় ও বিচক্ষণতার সাথে। চারপাশের সবকিছুকে উপেক্ষা করে তিনি তার লক্ষ ১৮ মাসে নির্বাচনের অবস্থানে অবিচল রইলেন। অবশেষে সকল ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে ১৭ মাসের মাথায় বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে উৎসবমুখর নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি তার কথা রক্ষা করলেন। নির্বাচনে কোন মহল যেন ষড়যন্ত্র করে বিতর্কিত বা বানচাল করতে না পারে সেজন্য জেনারেল ওয়াকার সেনাবাহিনীর প্রায় এক লাখ সদস্য মোতায়েন করে। নির্বাচনকে যেকোনো ধরনের অনিশ্চয়তা ও বিতর্কের হাত থেকে রক্ষা করতে তারা অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থা ছিল। তাদের এই অবস্থানের কারণে একটি সুন্দর ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। এর মাধ্যমে একটি দেশের সেনাবাহিনী, একজন জেনারেলের সহায়তায় বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক উত্তোরণের নবযাত্রা শুরু হলো। তিনি বারবার বলেছেন, সাংবিধানিক দায়িত্বের বাইরে আমার ভিন্ন কোনো ইচ্ছা নেই। তিনি সেটা প্রমাণ করেছেন। তাই এই বক্তব্য এতটাই সৎ ছিলো যে সেনবাহিনীর প্রতিটা সদস্য অনুধাবন করতে পেরেছিলেন এবং সর্বোচ্চটা দিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

কেবল গণতান্ত্রিক উত্তরণে বাংলাদেশকে সহায়তা নয়, দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এসময় জেনারেল ওয়াকারের ভূমিকা চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের বিদেশি স্বার্থে নেয়া দেশবিরোধী কিছু উদ্যোগ সেনাবাহিনী ও জেনারেল ওয়াকারের শক্ত অবস্থানের কারণে ভেস্তে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ভেতরে ও বাইরে থেকে বেশ কয়েকবার রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করে সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টির অপচেষ্টা করা হয়। এটা রুখতে জেনারেল ওয়াকারের নেতৃত্বে তিন বাহিনী প্রধান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মানবিক করিডরের নামে বাংলাদেশের মাটিতে বিদেশি এজেন্ডা বাস্তবায়নের ষড়যন্ত্র, দেশের সবচেয়ে লাভজনক চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনালের অপারেশন বিদেশি কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ড এর কাছে লিজ দেয়ার ব্যাপারে অত্যন্ত শক্ত অবস্থান নিয়েছিল তারা। ইউনুস সরকার বিদেশীদের স্বার্থে এই দুটো সুযোগ দেয়ার জন্য অনেকটা মরিয়া হয়েছিলো। কিন্তু বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও জেনারেল ওয়াকার অন্তর্বর্তী সরকারের এই ষড়যন্ত্র রুখে দিতে জোরালো ভূমিকা পালন করে। এর মধ্য দিয়ে দেশ যেমন এক দীর্ঘমেয়াদী প্রক্সি যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা পায়, তেমনি বাংলাদেশের স্বার্থ বিরোধী বিদেশি কোম্পানির সাথে বন্দর চুক্তি স্থগিত করতে বাধ্য হয়। এর মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনী তার নামের সাথে জড়িত থাকা দেশপ্রেমিক বিশেষণটি যথাযথ বলে আবারো প্রমাণ করতে সমর্থ্য হয়। এসবই সম্ভব হয়েছে বর্তমান সেনা প্রধানের সততা দেশপ্রেম পেশাদারিত্ব ও দৃঢ়চেতা সিদ্ধান্তের কারণে। এই জন্য তিনি ইতোমধ্যেই সমগ্র দেশবাসীর অকুণ্ঠ ভালবাসা ও আস্থার প্রতীক হিসেবে গণ্য হয়েছেন। বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে তার এই ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে রচিত থাকবে।