ঢাকা , শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ ভিসা নীতিমালার খসড়া পরিমার্জন ও চূড়ান্তকরণে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা, বাস্তবায়নে কতটা আশার আলো চাকরিজীবীদের জন্য দুই দফায় মিলবে যে ছুটি প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর পরামর্শ অলির সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ৩ বাহিনীর জন্য বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  তিনি বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামারিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।  জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলছে। নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য (এমপি) মাছুম মোস্তফার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি থেকে শিল্পে রুপান্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা

মহাসড়কের বুক চিরে প্রকৃতির রঙিন সৌন্দর্য

ভাওয়ালের ঐতিহ্যবাহী শাল–গজারি বনের বুক চিরে ছুটে গেছে দেশের অন্যতম ব্যস্ত ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়ক। প্রতিদিন হাজারো যানবাহনের কোলাহলে মুখর এই সড়ক এখন আর কেবল যাতায়াতের পথ নয়, বরং প্রকৃতির রঙিন সাজে সেজে উঠেছে। এটি হয়ে উঠেছে এমন এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্যপট, যা মুহূর্তেই বদলে দেয় যাত্রাপথের অনুভূতি।

গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুর এলাকায় পৌঁছালেই যেন বদলে যায় পথচলার অভিজ্ঞতা। মহাসড়কের মাঝের বিভাজকজুড়ে ফুটে থাকা নানান রঙের ফুল আর সবুজ পাতার সমারোহ মুহূর্তেই ভেঙে দেয় দীর্ঘ পথচলার একঘেয়েমি। সাদা, গোলাপি ও লালচে রঙের ফুলে সাজানো ডিভাইডার যেন যাত্রীদের স্বাগত জানায় এক রঙিন প্রকৃতির রাজ্যে।

দুপুরের প্রখর রোদ, পড়ন্ত বিকেলের স্নিগ্ধ আলো কিংবা গভীর রাতের নিস্তব্ধ অন্ধকারে মহাসড়কের এই অংশে ধরা দেয় প্রকৃতির ভিন্ন ভিন্ন রূপ।

দুপুরের প্রখর রোদে ঝলমলে আলোয়, পড়ন্ত বিকেলের স্নিগ্ধ আলো কিংবা গভীর রাতের নিস্তব্ধ অন্ধকারে—প্রতিটি সময়েই মহাসড়কের এই অংশে ধরা দেয় প্রকৃতির ভিন্ন ভিন্ন রূপ। চলন্ত গাড়ির জানালা দিয়ে তাকালেই চোখে পড়ে ফুলে ভরা সবুজ ডিভাইডার। মনে হয়, ব্যস্ত এই মহাসড়কের মাঝেও প্রকৃতি নিজেই যাত্রীদের স্বাগত জানাচ্ছে রঙিন এক পথে।

গাজীপুর সদর উপজেলার হোতাপাড়া এলাকা থেকে চান্দনা চৌরাস্তা পেরিয়ে শ্রীপুর উপজেলার মাওনা চৌরাস্তা, গড়গড়িয়া নতুন বাজার, মাস্টারবাড়ি ও নয়নপুর জৈনাবাজার পর্যন্ত বিস্তৃত এই মহাসড়কের বিভাজকে ফুটে থাকা ফুল এখন সবার নজর কাড়ছে। পথচারী, পরিবহনচালক কিংবা যাত্রী—অনেকে গাড়ি থামিয়ে ফুলের সঙ্গে ছবি তুলছেন। কেউ আবার মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করছেন। বাসের জানালা থেকেও অনেক যাত্রীকে এই মনোরম দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করতে দেখা যায়।

সরেজমিনে দেখা যায়, চান্দনা চৌরাস্তা থেকে কয়েক কিলোমিটার সামনে অগ্রসর হলে দুই পাশে চোখে পড়ে ভাওয়ালের সবুজ শাল–গজারি বন। মাঝেমধ্যে শিল্পকারখানার উপস্থিতি থাকলেও মহাসড়কের ডিভাইডারে লাগানো ফুল ও গাছপালা পুরো পরিবেশে এনে দিয়েছে ভিন্ন এক প্রাণবন্ততা। লালচে–গোলাপি আর সাদা ফুলের সারি যেন পথচারীদের আহ্বান জানায় কিছুক্ষণ থেমে প্রকৃতির সান্নিধ্য উপভোগ করতে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চান্দনা চৌরাস্তা থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত প্রায় ৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মহাসড়কের প্রায় ১৩ ফুট প্রশস্ত ডিভাইডারে রোপণ করা হয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির ফুলগাছ ও বৃক্ষ। শহরের কোলাহল পেরিয়ে এই সড়কে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে সবুজের সমারোহ আর ফুলের বর্ণিল ছটা, যা যাত্রীদের মনে এনে দেয় এক ধরনের প্রশান্তি। বিশেষ করে শ্রীপুর উপজেলার বিভিন্ন অংশে এই সৌন্দর্য আরও বেশি চোখে পড়ে এবং ধীরে ধীরে ময়মনসিংহ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে সবুজ ও ফুলের এই শোভা।

মহাসড়কের বিভাজকে নীল কাঞ্চন, কামিনী, কৃষ্ণচূড়া, জোড়া টগর, রাধাচূড়া, অগ্নিশ্বর, পলাশ, গৌরীচূড়া, কনকচূড়া, কনকচাঁপা, কদম, কাঠবাদাম, জারুল ও রক্তকরবীসহ নানা প্রজাতির ফুলগাছ রয়েছে। এসব গাছে বছরজুড়েই পর্যায়ক্রমে ফুল ফোটে। ফলে ঋতু বদলের সঙ্গে সঙ্গে মহাসড়কটিও যেন নতুন নতুন রঙে সেজে ওঠে।

শ্রীপুর থেকে আসা শিক্ষার্থী সুমন মিয়া বলেন, ‘ফেসবুকে এই ফুলের একটি ভিডিও দেখেছিলাম। তাই সরাসরি দেখতে এখানে এসেছি। বাস্তবে এসে দেখলাম, দৃশ্যটি আরও বেশি সুন্দর।’

একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘বন্ধুর মাধ্যমে ফুলের খবর পেয়ে কয়েকজন মিলে দেখতে এলাম। মনে হচ্ছে যেন বিদেশের কোনো সড়কে দাঁড়িয়ে আছি।’

তবে এই সৌন্দর্য দেখতে এসে অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর প্রতিদিনই মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে মানুষের ভিড় বাড়ছে। কেউ কেউ সরাসরি ডিভাইডারের ওপর উঠে ছবি তুলছেন, আবার কেউ মহাসড়কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বা বসে ভিডিও ধারণ করছেন। এতে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

এ ছাড়া কিছু অসচেতন দর্শনার্থী ফুলের সৌন্দর্য নষ্টও করছেন। গাছের ডালে উঠে ফুল তুলতে গিয়ে অনেকেই ডালপালা ভেঙে ফেলছেন, ফলে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে এই নান্দনিক পরিবেশ।

স্থানীয়দের মতে, মহাসড়কে এমন অনিয়ন্ত্রিত ভিড় ও ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ বন্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে ট্রাফিক পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়িয়ে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

গাজীপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মুহাম্মদ তারিক হাসান জানান, মহাসড়ককে দৃষ্টিনন্দন ও পরিবেশবান্ধব করতে ডিভাইডারে কয়েক হাজার চারা রোপণ করা হয়েছে। কোথাও ২ থেকে ৫ মিটার প্রস্থের জায়গায় তিন সারিতে এবং কোথাও ১ থেকে ২ মিটার প্রস্থে এক সারিতে গাছ লাগানো হয়েছে। নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে এসব গাছের সৌন্দর্য রক্ষা করা হচ্ছে।

নদী ও প্রকৃতি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম বলেন, ‘মহাসড়কের বিভাজকে এ ধরনের সবুজায়ন ও ফুলের গাছ রোপণ পরিবেশ রক্ষার জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক উদ্যোগ। এটি শুধু সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না, বায়ুদূষণ কমানো, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এই সৌন্দর্য রক্ষায় মানুষের সচেতনতা জরুরি।’

পরিবেশবিদদের মতে, মহাসড়কের ডিভাইডারে লাগানো এসব গাছ এক লেনের গাড়ির হেডলাইটের আলো বিপরীত লেনের চালকদের চোখে সরাসরি পড়া থেকেও কিছুটা সুরক্ষা দেয়। পাশাপাশি ধুলাবালি ও শব্দদূষণ কমাতেও এগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিদিন হাজারো যানবাহনের কোলাহলের মাঝেও ভাওয়ালের সবুজ বন আর ফুলে সাজানো এই মহাসড়ক যেন মনে করিয়ে দেয়—যান্ত্রিক জীবনের ভিড়েও প্রকৃতি তার সৌন্দর্যের রঙ ছড়িয়ে দিতে জানে। তবে এই সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি সমানভাবে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

জনপ্রিয় সংবাদ

মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ

মহাসড়কের বুক চিরে প্রকৃতির রঙিন সৌন্দর্য

আপডেট টাইম : ০৭:২৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬

ভাওয়ালের ঐতিহ্যবাহী শাল–গজারি বনের বুক চিরে ছুটে গেছে দেশের অন্যতম ব্যস্ত ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়ক। প্রতিদিন হাজারো যানবাহনের কোলাহলে মুখর এই সড়ক এখন আর কেবল যাতায়াতের পথ নয়, বরং প্রকৃতির রঙিন সাজে সেজে উঠেছে। এটি হয়ে উঠেছে এমন এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্যপট, যা মুহূর্তেই বদলে দেয় যাত্রাপথের অনুভূতি।

গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুর এলাকায় পৌঁছালেই যেন বদলে যায় পথচলার অভিজ্ঞতা। মহাসড়কের মাঝের বিভাজকজুড়ে ফুটে থাকা নানান রঙের ফুল আর সবুজ পাতার সমারোহ মুহূর্তেই ভেঙে দেয় দীর্ঘ পথচলার একঘেয়েমি। সাদা, গোলাপি ও লালচে রঙের ফুলে সাজানো ডিভাইডার যেন যাত্রীদের স্বাগত জানায় এক রঙিন প্রকৃতির রাজ্যে।

দুপুরের প্রখর রোদ, পড়ন্ত বিকেলের স্নিগ্ধ আলো কিংবা গভীর রাতের নিস্তব্ধ অন্ধকারে মহাসড়কের এই অংশে ধরা দেয় প্রকৃতির ভিন্ন ভিন্ন রূপ।

দুপুরের প্রখর রোদে ঝলমলে আলোয়, পড়ন্ত বিকেলের স্নিগ্ধ আলো কিংবা গভীর রাতের নিস্তব্ধ অন্ধকারে—প্রতিটি সময়েই মহাসড়কের এই অংশে ধরা দেয় প্রকৃতির ভিন্ন ভিন্ন রূপ। চলন্ত গাড়ির জানালা দিয়ে তাকালেই চোখে পড়ে ফুলে ভরা সবুজ ডিভাইডার। মনে হয়, ব্যস্ত এই মহাসড়কের মাঝেও প্রকৃতি নিজেই যাত্রীদের স্বাগত জানাচ্ছে রঙিন এক পথে।

গাজীপুর সদর উপজেলার হোতাপাড়া এলাকা থেকে চান্দনা চৌরাস্তা পেরিয়ে শ্রীপুর উপজেলার মাওনা চৌরাস্তা, গড়গড়িয়া নতুন বাজার, মাস্টারবাড়ি ও নয়নপুর জৈনাবাজার পর্যন্ত বিস্তৃত এই মহাসড়কের বিভাজকে ফুটে থাকা ফুল এখন সবার নজর কাড়ছে। পথচারী, পরিবহনচালক কিংবা যাত্রী—অনেকে গাড়ি থামিয়ে ফুলের সঙ্গে ছবি তুলছেন। কেউ আবার মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করছেন। বাসের জানালা থেকেও অনেক যাত্রীকে এই মনোরম দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করতে দেখা যায়।

সরেজমিনে দেখা যায়, চান্দনা চৌরাস্তা থেকে কয়েক কিলোমিটার সামনে অগ্রসর হলে দুই পাশে চোখে পড়ে ভাওয়ালের সবুজ শাল–গজারি বন। মাঝেমধ্যে শিল্পকারখানার উপস্থিতি থাকলেও মহাসড়কের ডিভাইডারে লাগানো ফুল ও গাছপালা পুরো পরিবেশে এনে দিয়েছে ভিন্ন এক প্রাণবন্ততা। লালচে–গোলাপি আর সাদা ফুলের সারি যেন পথচারীদের আহ্বান জানায় কিছুক্ষণ থেমে প্রকৃতির সান্নিধ্য উপভোগ করতে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চান্দনা চৌরাস্তা থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত প্রায় ৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মহাসড়কের প্রায় ১৩ ফুট প্রশস্ত ডিভাইডারে রোপণ করা হয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির ফুলগাছ ও বৃক্ষ। শহরের কোলাহল পেরিয়ে এই সড়কে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে সবুজের সমারোহ আর ফুলের বর্ণিল ছটা, যা যাত্রীদের মনে এনে দেয় এক ধরনের প্রশান্তি। বিশেষ করে শ্রীপুর উপজেলার বিভিন্ন অংশে এই সৌন্দর্য আরও বেশি চোখে পড়ে এবং ধীরে ধীরে ময়মনসিংহ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে সবুজ ও ফুলের এই শোভা।

মহাসড়কের বিভাজকে নীল কাঞ্চন, কামিনী, কৃষ্ণচূড়া, জোড়া টগর, রাধাচূড়া, অগ্নিশ্বর, পলাশ, গৌরীচূড়া, কনকচূড়া, কনকচাঁপা, কদম, কাঠবাদাম, জারুল ও রক্তকরবীসহ নানা প্রজাতির ফুলগাছ রয়েছে। এসব গাছে বছরজুড়েই পর্যায়ক্রমে ফুল ফোটে। ফলে ঋতু বদলের সঙ্গে সঙ্গে মহাসড়কটিও যেন নতুন নতুন রঙে সেজে ওঠে।

শ্রীপুর থেকে আসা শিক্ষার্থী সুমন মিয়া বলেন, ‘ফেসবুকে এই ফুলের একটি ভিডিও দেখেছিলাম। তাই সরাসরি দেখতে এখানে এসেছি। বাস্তবে এসে দেখলাম, দৃশ্যটি আরও বেশি সুন্দর।’

একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘বন্ধুর মাধ্যমে ফুলের খবর পেয়ে কয়েকজন মিলে দেখতে এলাম। মনে হচ্ছে যেন বিদেশের কোনো সড়কে দাঁড়িয়ে আছি।’

তবে এই সৌন্দর্য দেখতে এসে অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর প্রতিদিনই মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে মানুষের ভিড় বাড়ছে। কেউ কেউ সরাসরি ডিভাইডারের ওপর উঠে ছবি তুলছেন, আবার কেউ মহাসড়কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বা বসে ভিডিও ধারণ করছেন। এতে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

এ ছাড়া কিছু অসচেতন দর্শনার্থী ফুলের সৌন্দর্য নষ্টও করছেন। গাছের ডালে উঠে ফুল তুলতে গিয়ে অনেকেই ডালপালা ভেঙে ফেলছেন, ফলে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে এই নান্দনিক পরিবেশ।

স্থানীয়দের মতে, মহাসড়কে এমন অনিয়ন্ত্রিত ভিড় ও ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ বন্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে ট্রাফিক পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়িয়ে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

গাজীপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মুহাম্মদ তারিক হাসান জানান, মহাসড়ককে দৃষ্টিনন্দন ও পরিবেশবান্ধব করতে ডিভাইডারে কয়েক হাজার চারা রোপণ করা হয়েছে। কোথাও ২ থেকে ৫ মিটার প্রস্থের জায়গায় তিন সারিতে এবং কোথাও ১ থেকে ২ মিটার প্রস্থে এক সারিতে গাছ লাগানো হয়েছে। নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে এসব গাছের সৌন্দর্য রক্ষা করা হচ্ছে।

নদী ও প্রকৃতি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম বলেন, ‘মহাসড়কের বিভাজকে এ ধরনের সবুজায়ন ও ফুলের গাছ রোপণ পরিবেশ রক্ষার জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক উদ্যোগ। এটি শুধু সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না, বায়ুদূষণ কমানো, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এই সৌন্দর্য রক্ষায় মানুষের সচেতনতা জরুরি।’

পরিবেশবিদদের মতে, মহাসড়কের ডিভাইডারে লাগানো এসব গাছ এক লেনের গাড়ির হেডলাইটের আলো বিপরীত লেনের চালকদের চোখে সরাসরি পড়া থেকেও কিছুটা সুরক্ষা দেয়। পাশাপাশি ধুলাবালি ও শব্দদূষণ কমাতেও এগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিদিন হাজারো যানবাহনের কোলাহলের মাঝেও ভাওয়ালের সবুজ বন আর ফুলে সাজানো এই মহাসড়ক যেন মনে করিয়ে দেয়—যান্ত্রিক জীবনের ভিড়েও প্রকৃতি তার সৌন্দর্যের রঙ ছড়িয়ে দিতে জানে। তবে এই সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি সমানভাবে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।