জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার বিলেরঘাট এলাকা। ভোরের আলো ফোটার আগেই দিন শুরু হয় আলাল উদ্দিনের। কুয়াশা ভেজা সকালে লাঠি হাতে গরুর পাল নিয়ে যখন তিনি মাঠের দিকে হাঁটতে শুরু করেন, তখন যেন গ্রামবাংলার বহু পুরনো এক ছবিই জীবন্ত হয়ে ওঠে। চারদিকে বিস্তীর্ণ সবুজ বিল।
নরম ঘাসে ঢাকা চারণভূমি। সেই মাঠজুড়ে ছড়িয়ে থাকে গরুর পাল। এই প্রকৃতির মাঝেই কেটে গেছে আলালের জীবনের ৫০ বছর।
বয়স এখন সত্তর ছুঁই ছুঁই। শরীর আর আগের মতো সায় দেয় না, কিন্তু কাজের প্রতি তাঁর আগ্রহে ভাটা পড়েনি। ভোরে গরুর পাল নিয়ে বের হওয়া আর সন্ধ্যায় ফিরে আসা—এই ছন্দেই কেটে যাচ্ছে দিন। রোদ, বৃষ্টি, ঝড়—যা-ই হোক না কেন, এই রুটিনের হেরফের নেই।
বিলের মাঠে গরুগুলো যখন নিশ্চিন্তে ঘাস খায়, আলাল তখন দূরে বসে আকাশের পানে তাকিয়ে থাকেন, আবার কখনো গরুগুলোর দিকে সতর্ক নজর রাখেন।তবে আলালের জীবন সবসময় এমন ছিল না। অভাব তাকে শৈশবেই দাঁড় করায় কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। বাবা ছিলেন কৃষক। প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেননি আলাল।
অন্যের গরু চড়ানোই হয়ে ওঠে কাজ। এভাবে তিলে তিলে সঞ্চয় করা টাকায় কিনে নেন গাভী। সেটিই আলালের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। গাভীর দুধ বিক্রি করে ধীরে ধীরে অভাব ঘোচাতে থাকেন। এখন তাঁর গোয়ালে ১০টি গরু। আলাল জানান, দুধ বিক্রি করেই সংসার চলে। আর যখন কোনো বাছুর বড় হয়ে ওঠে, তখন সেটি বিক্রি করলে একসঙ্গে কিছু টাকা হাতে আসে। এভাবেই বছরে প্রায় তিন লাখ টাকার মতো আয় হয় তাঁর। এই আয় দিয়েই তিন সন্তানকে পড়িয়েছেন।প্রাকৃতিক ঘাসেই গরুর খাবারের চাহিদা পূরণ হওয়ায় আলালকে খুব একটা পয়সা খরচ করতে হয় না। খড়, খৈল বা ভুসির মতো গোখাদ্য কিনতে না হওয়ায় খরচ কম। আর সেখানেই তাঁর লাভের পথ তৈরি হয়।
স্থানীয় মানুষের কাছে আলাল শুধু এক রাখাল নন, বরং গ্রামবাংলার চিরায়ত জীবনের এক প্রতীক। আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেক পেশাই বদলে গেছে, অনেক মানুষ শহরমুখী হয়েছে, আলাল এখনো বিলের মাঠে গরুর পাল নিয়ে হাঁটেন একই ছন্দে, একই ধৈর্যে। বিলের সবুজ ঘাস, গরুর পাল আর লাঠি হাতে আলালের ধীরপায়ে হাঁটা—এই দৃশ্যে লুকিয়ে আছে, প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা মানুষের জীবন। সংগ্রাম থাকলেও তাতে আছে তৃপ্তি, আছে নিজের পরিশ্রমে বাঁচার এক নিঃশব্দ গর্ব।