বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ধর্মীয় সম্প্রীতি, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বরাবরই পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। কখনো এই সম্প্রীতি জাতীয় ঐক্যের শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, কখনো ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে সংঘটিত সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতা দেশের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে, আবার কখনো সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার প্রশ্ন রাজনৈতিক স্বার্থ ও কূটনৈতিক বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে। এমন এক বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে ২০২৬ সালের শারদীয় দুর্গাপূজার বর্ণাঢ্য আয়োজন, ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং উৎসব ঘিরে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সাংবাদিক বাংলাদেশের এবারের দুর্গাপূজার আয়োজনের প্রশংসা করেছেন। এমনকি ভারতের একটি প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্টে প্রকাশিত বিশ্লেষণেও তারেক রহমান সরকারের সামনে থাকা রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের আলোচনা করতে গিয়ে উৎসবের বর্ণাঢ্য আয়োজন ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ইতিবাচক দিক স্বীকার করা হয়েছে। এই স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, যে দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রতিবেশী ভারতের সংবাদমাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে নানা উদ্বেগ, অভিযোগ ও বিতর্ক প্রকাশিত হয়েছে, সেই দেশের ধর্মীয় উৎসবের সফল আয়োজনের প্রশংসা দুই দেশের জনপরিসরে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
তবে এই অর্জনকে শুধু রাজনৈতিক সাফল্য কিংবা ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রশংসা পাওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত মাহাত্ম্য অনুধাবন করা যাবে না। বরং একে দেখতে হবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা, সামাজিক সহাবস্থান, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ গতিপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে। তারেক রহমান সরকারের সামনে এবারের দুর্গাপূজা ছিল এমন একটি উপলক্ষ, যেখানে প্রশাসনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নাগরিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে প্রমাণ করার প্রয়োজন ছিল। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হাজার হাজার পূজামণ্ডপে বর্ণাঢ্য আয়োজন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক মোতায়েন, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি এবং উৎসব উপলক্ষে ছুটি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সরকারের সমন্বিত উদ্যোগের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
এ বছর বাংলাদেশজুড়ে ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়, যার মধ্যে রাজধানী ঢাকায় ছিল ২৫৮টি। গত বছরের তুলনায় পূজামণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় দেড় হাজার। উৎসবের নিরাপত্তায় বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর দুই লাখের বেশি সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ মণ্ডপে বিশেষ নিরাপত্তা, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে স্ট্রাইকিং টিম প্রস্তুত রাখা এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় বিজিবির তৎপরতা জোরদার করা হয়। সরকারি ছুটি বাড়িয়ে নিয়মিত সাপ্তাহিক ছুটিসহ কার্যত পাঁচ দিনের অবকাশের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। এসব পদক্ষেপের সম্মিলিত প্রভাব উৎসবের পরিবেশে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকারের জন্য এই সাফল্যের তাৎপর্য এখানেই যে, ধর্মীয় উৎসবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রতি অনুগ্রহ নয়; এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ যেন কোনো ভয়, চাপ কিংবা বাধা ছাড়াই তাঁদের ধর্মীয় আচার পালন করতে পারেন, সেই নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠা করা সরকারের মৌলিক কর্তব্য। একইভাবে মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও অন্যান্য ধর্মীয় পরিচয়ের নাগরিকদের ক্ষেত্রেও সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রের পরিচয় নির্ধারিত হয় তার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর শক্তি দিয়ে নয়, বরং প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার কতটা সুরক্ষিত, তা দিয়ে।
বাংলাদেশের আবহমান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এই সম্প্রীতির ভিত্তিকে শক্তিশালী করেছে। ঈদে মুসলমানদের আনন্দে যেমন অন্য ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ দেখা যায়, তেমনি দুর্গাপূজার আনন্দেও বহু মুসলমান প্রতিবেশী, বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে যুক্ত হন। মণ্ডপের শিল্পকর্ম, আলোকসজ্জা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় বহন করে। এবারের পূজার বর্ণাঢ্য আয়োজন সেই ঐতিহ্যকে নতুন করে সামনে এনেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মণ্ডপের সৌন্দর্য ও উৎসবের প্রাণবন্ত পরিবেশ প্রশংসিত হয়েছে। ভারতের গণমাধ্যমে প্রকাশিত ইতিবাচক মূল্যায়নও এই চিত্রকে সীমান্তের ওপারে পৌঁছে দিয়েছে।
দ্য প্রিন্টে প্রকাশিত বিশ্লেষণের গুরুত্ব বিশেষভাবে বিবেচনাযোগ্য। সেখানে এবারের দুর্গাপূজার আয়োজন, পূজামণ্ডপের সংখ্যা বৃদ্ধি, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন এবং উৎসব উপলক্ষে দীর্ঘ ছুটির ব্যবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে লেখাটিতে বলা হয়েছে, তারেক রহমান সরকারকে এই অর্জনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের আস্থা ধরে রাখতে হলে উৎসবের বাইরেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অর্থাৎ ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের এই মূল্যায়ন একদিকে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিবাচক উদ্যোগের স্বীকৃতি, অন্যদিকে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে বাংলাদেশের সামনে থাকা দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্বের স্মারক।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শিক্ষা রয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কোনো দেশ সম্পর্কে মূল্যায়ন সব সময় একরৈখিক হয় না। কখনো তারা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তুলে ধরে, কখনো প্রশাসনিক উদ্যোগের প্রশংসা করে, আবার কখনো রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও নির্বাচনী সমীকরণ বিশ্লেষণ করে। তাই ভারতীয় গণমাধ্যমে এবারের দুর্গাপূজার প্রশংসাকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রচারিত সব অভিযোগের অবসান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি দেখায়, বাস্তব পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটলে সমালোচনামুখর সংবাদমাধ্যমেও তার স্বীকৃতি পাওয়া সম্ভব। সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে এই ইতিবাচক অভিজ্ঞতাকে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতায় পরিণত করা।
অন্যদিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে আওয়ামী লীগের ভূমিকা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের বিষয়। হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে আওয়ামী লীগ নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির প্রধান ধারক এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার অন্যতম নিশ্চয়তাদাতা হিসেবে উপস্থাপন করেছে। কিন্তু নাসিরনগর, রংপুরের ঠাকুরপাড়া, কুমিল্লা ও পীরগঞ্জের মতো বিভিন্ন ঘটনায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর হামলা, উপাসনালয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের অভিযোগ দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এসব ঘটনার তদন্ত ও সংবাদ প্রতিবেদনে উসকানি, স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ভূমিকা, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতা নিয়ে নানা তথ্য ও অভিযোগ উঠে এসেছে।
এসব ঘটনা থেকে যে শিক্ষা নেওয়া জরুরি, তা হলো—মুখে ধর্মনিরপেক্ষতার ঘোষণা দিলেই কোনো সরকার অসাম্প্রদায়িক হয়ে ওঠে না। প্রকৃত মূল্যায়ন হয় যখন সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ঘটে, তাঁদের সম্পত্তি দখলের অভিযোগ ওঠে কিংবা ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো হয়; তখন রাষ্ট্র কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়, তার ভিত্তিতে। আওয়ামী লীগ আমলে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে যে ব্যবধানের অভিযোগ উঠেছে, তা ভবিষ্যতের যেকোনো সরকারের জন্য সতর্কবার্তা হওয়া উচিত।
সংখ্যালঘুদের ভোটকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কৌশল নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, হিন্দু সম্প্রদায়কে নিজেদের স্বাভাবিক ও একচ্ছত্র ভোটভিত্তি হিসেবে ধরে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছিল এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার প্রশ্ন রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল। এই অভিযোগের প্রতিটি দিককে আলাদা প্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ভোট কোনো দলের স্থায়ী সম্পত্তি নয়। হিন্দু নাগরিকেরা তাঁদের রাজনৈতিক পছন্দ স্বাধীনভাবে নির্ধারণ করবেন—এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক নিয়ম। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিনিময়ে রাজনৈতিক সমর্থন প্রত্যাশা করা কিংবা নিরাপত্তাহীনতাকে ভোটের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
স্বৈরাচার পতনের পর বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে যে উদ্বেগ ও সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছে, তা দুই দেশের সম্পর্কেও প্রভাব ফেলেছে। কিছু সংবাদ পরিবেশনে যাচাইহীন তথ্য, অতিরঞ্জন কিংবা বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে সামগ্রিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি হিসেবে তুলে ধরার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এই দুই বাস্তবতাকে পাশাপাশি রেখে বিচার করাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা ও বিশ্লেষণের দাবি। কারণ, সত্য গোপন করে দেশের ভাবমূর্তি রক্ষা করা যায় না; আবার অসম্পূর্ণ বা বিকৃত তথ্য দিয়ে একটি দেশের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরাও ন্যায়সংগত নয়।
এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমান সরকারের অধীনে দুর্গাপূজার ইতিবাচক আয়োজন বাংলাদেশের সামনে একটি নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রশংসা দেখিয়ে সরকার বলতে পারে, বাংলাদেশে ধর্মীয় উৎসবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা রয়েছে এবং সঠিক প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া হলে ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব। তবে সেই বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে পরবর্তী সময়ে সরকারের কাজের ওপর। উৎসবের কয়েকটি দিন নিরাপদ রাখার পাশাপাশি সারা বছর মন্দির, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ও সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। যেকোনো হামলার অভিযোগ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো, গুজবের মাধ্যমে উত্তেজনা সৃষ্টি কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে অপরাধ করার প্রবণতা প্রতিরোধ করতে হবে।
এখানে তারেক রহমানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি বড় পরীক্ষা রয়েছে। তিনি যদি ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক বিভাজনের উপকরণ হতে না দিয়ে সব নাগরিকের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন, তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংখ্যালঘু প্রশ্নের প্রচলিত মেরুকরণ দুর্বল হয়ে আসবে। শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন কিংবা ভবিষ্যতের নির্বাচনী সমীকরণ নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা চলতেই পারে; কিন্তু হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সমর্থন কোনো ব্যক্তির প্রত্যাবর্তন বা কোনো দলের নির্বাচনী কৌশলের ওপর নির্ভরশীল থাকা উচিত নয়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও আইনের শাসনই হবে নাগরিক অধিকারের প্রধান নিশ্চয়তা।
ভারতের সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের মধ্যে ভাষা, সংস্কৃতি, বাণিজ্য, ইতিহাস ও মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে ভারতীয় সমাজ ও সংবাদমাধ্যমের উদ্বেগ থাকতে পারে, কিন্তু সেই উদ্বেগকে দায়িত্বশীল ও তথ্যভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে প্রকাশ করা উচিত। অন্যদিকে বাংলাদেশেরও উচিত প্রকৃত সমস্যা অস্বীকার না করে সেগুলোর সমাধান করা এবং ভুল তথ্য বা অতিরঞ্জিত প্রচারের বিরুদ্ধে প্রমাণনির্ভর অবস্থান নেওয়া। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য আত্মমর্যাদা যেমন জরুরি, তেমনি স্বচ্ছতা, পারস্পরিক সম্মান ও বাস্তবতার স্বীকৃতিও অপরিহার্য।
এবারের দুর্গাপূজার বর্ণাঢ্য আয়োজন এবং ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রশংসা তাই বাংলাদেশের জন্য একটি ইতিবাচক কূটনৈতিক ও সামাজিক সুযোগ। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ দেখাতে পারে যে ধর্মীয় সম্প্রীতি কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি এবং নাগরিক জীবনের বাস্তব ভিত্তি। একই সঙ্গে সরকারকে মনে রাখতে হবে, একটি শান্তিপূর্ণ উৎসবের সাফল্য ভবিষ্যতের সব সমস্যার সমাধান নয়। বরং এটি প্রমাণ করার একটি সুযোগ যে প্রশাসনিক সদিচ্ছা, পরিকল্পনা ও জনগণের সহযোগিতা একত্র হলে ধর্মীয় উৎসবের নিরাপত্তা আরও কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব।
পরিশেষে বলতে চাই, স্বৈরাচারের দীর্ঘ শাসনামলে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিকে শিক্ষা নিতে হবে। ধর্মীয় পরিচয়কে ভোটের হিসাব কিংবা আন্তর্জাতিক কূটনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসাই হবে প্রকৃত অগ্রগতি। এবারের দুর্গাপূজার সাফল্য তারেক রহমান সরকারের জন্য সেই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হতে পারে। ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রশংসা বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করেছে; এখন সেই স্বীকৃতিকে স্থায়ী করতে হবে আইনের শাসন, নিরপেক্ষ বিচার এবং প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।
বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ যেন নির্ভয়ে দুর্গাপূজা উদ্যাপন করতে পারেন, মুসলমানেরা যেন প্রতিবেশীর আনন্দে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিতে পারেন এবং অন্য ধর্মের নাগরিকেরাও যেন সমান মর্যাদা ও নিরাপত্তা অনুভব করেন—এটাই হওয়া উচিত নতুন বাংলাদেশের অঙ্গীকার। সম্প্রীতির এই বাস্তব ভিত্তি শক্তিশালী হলে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে রাজনৈতিক দর-কষাকষির সুযোগ কমবে, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে অবিশ্বাসের দেয়াল দুর্বল হবে এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হবে। দুর্গাপূজার সাফল্য কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয়ের ঘোষণা নয়; এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক, নিরাপদ ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনের পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ। ধর্ম যার যার, নাগরিক অধিকার সবার—এই নীতির বাস্তবায়নই হোক বাংলাদেশের স্থায়ী পরিচয়ে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 
























