১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চে এক দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক বিশ্বনেতাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রাখেন : উন্নয়নের এত আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির পরও দারিদ্র্য ও ক্ষুধা কেন থেকেই যাচ্ছে? শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দারিদ্র্য ও ক্ষুধার এই স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে শান্তি, মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক দায়িত্বের ভিত্তিতে বিশ্ব গড়ার আহবান জানিয়েছিলেন। আজ, প্রায় ১৬ হাজার ৮৩০ দিন পর, সেই একই মঞ্চে দাঁড়াতে যাচ্ছেন তাঁর সন্তান।
গল্পটা শুরু হয়েছিল ১৯৮০ সালে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সেদিন জাতিসংঘের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে ভাষণ দেন।
এই তাত্ত্বিক ক্ষেত্রে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান অনন্য।
এই ভাষণের ঠিক ১৩ বছর পর, ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর, ৪৮তম অধিবেশনে সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। এরপর ধারাবাহিকভাবে তাঁর কণ্ঠ শোনা গেছে জাতিসংঘের নানা মঞ্চে : ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর স্মারক সভায়, ২০০২ সালে শিশুবিষয়ক ২৭তম বিশেষ অধিবেশনে এবং ২০০৫ সালে ৬০তম অধিবেশনের দুটি পৃথক সভায়। জাতিসংঘের নথি অনুযায়ী, ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে মোট পাঁচবার তিনি সাধারণ পরিষদের কার্যক্রমে বক্তব্য দিয়েছেন, যা ছিল বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে নিয়মিত ও মর্যাদার সঙ্গে হাজির রাখার ধারাবাহিক সচেতন প্রয়াস। আজ প্রয়াত সেই মায়ের অনুপস্থিতিতে সন্তানের এই ভাষণে যোগ হবে এক অদৃশ্য আবেগ, যেন পোডিয়ামের পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন দুজন, একজন শহীদ বাবা, অন্যজন প্রয়াত মা।
এবার শুরু হচ্ছে তৃতীয় অধ্যায়, যেখানে চার দশকের পুরনো প্রশ্নটি নতুন অর্থ পেতে যাচ্ছে। বাবা যে প্রশ্ন তুলেছিলেন পণ্য ও জ্বালানি বাণিজ্যের ন্যায্যতা নিয়ে, ছেলে তাঁর প্রথম জাতিসংঘ ভাষণে সেই প্রশ্নকে নিয়ে যাচ্ছেন এক সম্পূর্ণ বদলে যাওয়া বাস্তবতায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের উদ্দেশে রওনা হয়ে ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন। তাঁর ভাষণে উঠে আসবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, আইনের শাসন ও জবাবদিহি, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কারের মতো বিষয়। পাশাপাশি থাকবে একাধিক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনা। সফরের ঘোষিত নীতিগত ভিত্তি ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’।
১৯৮০ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে ন্যায্যতার প্রশ্ন তুলেছিলেন পণ্য, তেল, বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহায়তা ঘিরে; আজ তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কার্বন, পানি, প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও জলবায়ুঝুঁকি। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে প্রযুক্তিতে সমান প্রবেশাধিকার, সক্ষমতা ও অর্থায়নের দাবি হয়ে উঠছে নতুন বৈশ্বিক ন্যায়ের প্রশ্ন, যা এক অর্থে একবিংশ শতাব্দীর নতুন ‘এনআইইও’। ফলে তারেক রহমানের প্রথম জাতিসংঘ ভাষণ শুধু একটি নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির উপস্থাপন নয়; এটি একই সঙ্গে চার দশক আগের একটি প্রশ্নের নতুন সময়ে পুনর্নির্ধারণ, যা স্পষ্ট করবে ভবিষ্যতের বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়।
এই সফরের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি হতে পারে জলবায়ু। ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে আয়োজিত ‘Climate Action and the Just Transition-এ উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। পরদিন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির অস্তিত্ব সংকট নিয়ে জাতিসংঘের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে তিনি উদ্বোধনী বক্তব্য দেবেন। বৈঠকটির উদ্দেশ্যই হলো সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি মোকাবেলায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বাস্তবসম্মত অঙ্গীকারের পথ তৈরি করা।
বাংলাদেশ বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে আনুমানিক ০.৩ শতাংশ অবদান রাখলেও ২০২৪ সালের ওয়ার্ল্ড রিস্ক ইনডেস্কে জলবায়ুঝুঁকিতে নবম অবস্থানে ছিল। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ বসবাস করে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড় তাই বাংলাদেশের কাছে কোনো দূরবর্তী পরিবেশগত সংকট নয়। এগুলো মানুষের বসতি, কৃষি, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, শুধু ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের কারণেই বাংলাদেশে বছরে গড়ে প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, যা জিডিপির প্রায় ০.৭ শতাংশের সমান।
এই পরিসংখ্যানগুলোর মধ্যে তাই একটি গভীর বৈশ্বিক বৈপরীত্য আছে। জলবায়ু সংকট তৈরিতে বাংলাদেশের অবদান তুলনামূলকভাবে সামান্য, কিন্তু সংকটের অভিঘাত বহন করতে হচ্ছে অত্যন্ত বেশি। সেই কারণেই বাংলাদেশের জলবায়ু-আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, ক্ষয়ক্ষতি ও জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। ২০২৬ সালের জাতিসংঘের সমুদ্রপৃষ্ঠ-উচ্চতা বিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের অবস্থান তাই ভৌগোলিক অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা একটি বৈশ্বিক নীতিগত প্রশ্ন হিসেবেও সামনে আসবে।
অন্যদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীদ্বয় বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকট প্রধানমন্ত্রীর এ সফরের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের সহিংসতা থেকে পালিয়ে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। আজ প্রায় ১.২ মিলিয়ন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে; এর মধ্যে ২০১৭ সালের পরবর্তী বছরগুলোতে নতুন করে আসা মানুষও রয়েছে। ২০২৬ সালে জাতিসংঘ ও সহযোগী সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং তাদের আশ্রয়দাতা বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর জরুরি প্রয়োজন মেটাতে ৭১০.৫ মিলিয়ন ডলারের আবেদন করেছে। অথচ এই আবেদন গত বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম, যখন সংকটটি এরই মধ্যে নবম বছরে প্রবেশ করেছে।
এই বাস্তবতায় রোহিঙ্গা ইস্যু শুধু মানবিকতার প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, সীমান্ত নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নও। জাতিসংঘে বাংলাদেশের অবস্থানও স্পষ্ট। রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, তাই এর টেকসই সমাধানও মিয়ানমারেই হতে হবে; প্রত্যাবাসন হতে হবে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই। নিউইয়র্ক সফরে এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং দ্রুত প্রত্যাবাসনের পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য বাড়তি তাৎপর্য বহন করছে। কারণ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বর্তমানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি। ১৯০টি ভোটের মধ্যে ৯৯টি ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়ে তিনি ১৯৮৬-৮৭ সালে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর পর দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে এই পদে বসেছেন। একই অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী প্রথমবার দেশকে প্রতিনিধিত্ব করছেন, আর পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেটির সভাপতিত্ব করছেন। এটি একই সঙ্গে বিরল, ঐতিহাসিক এবং বিশেষ সম্মান ও গর্বের বিষয়।
একটি মঞ্চ, তিনটি কণ্ঠ, চার দশকেরও বেশি সময়ের এক উত্তরাধিকার। ১৯৮০ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন, ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়া যার ধারাবাহিকতা বহন করেছেন, ২০২৬ সালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভাষণে সেই ইতিহাসই পৌঁছবে এক নতুন দিগন্তে। বাবার সময়ের বাংলাদেশ ছিল ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করা এক নবীন রাষ্ট্র। যে রাষ্ট্র বিশ্বকে বলেছিল, সীমাবদ্ধতা আমাদের বাস্তবতা হতে পারে, আত্মসমর্পণ নয়। মায়ের সময়ের বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের গণতান্ত্রিক পরিচয়, মানুষের অধিকার এবং উন্নয়নের দাবিকে আরো স্পষ্ট করে তুলছিল। আর আজকের বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতায়। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, রোহিঙ্গা সংকট, প্রযুক্তির দ্রুত রূপান্তর, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রার প্রত্যাশা নিয়ে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশ একদিন বিশ্বসভায় বলেছিল, ‘আমরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাইনি এবং হবও না।’ চার দশকেরও বেশি সময় পর সেই একই ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে তারেক রহমানের বাংলাদেশ আজ বলতে চলেছে, ‘আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্মাণ করতে এসেছি।’ ২৪ সেপ্টেম্বর তাই জিয়া পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের নতুন অধ্যায় উন্মোচনের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। সেদিন বাংলাদেশের কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা উচ্চারিত হবে তারেক রহমানের কণ্ঠে। বিশ্ব শুনবে দৃঢ়তা, দূরদৃষ্টি ও আত্মবিশ্বাসে উচ্চারিত এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন। আর সেই কণ্ঠ যেন বিশ্বকে জানিয়ে দেয়—বাংলাদেশ তার ইতিহাসকে বুকে ধারণ করে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যায় মাথা উঁচু করে। উত্তরাধিকার তার প্রেরণা, আর একটি সমৃদ্ধ, মর্যাদাশীল ও আত্মনির্ভর বাংলাদেশের নির্মাণই তার পরবর্তী অঙ্গীকার।
ড. মো. মোর্শেদ হাসান খান
লেখক : সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; অধ্যাপক, মার্কেটিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল : morshedhk@yahoo.com

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 
























