নিজস্ব প্রতিবেদক, কিশোরগঞ্জ
কিশোরগঞ্জের হাওরবেষ্টিত ইটনা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা আনম উল্লাহ সানি। হাওরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধান, কৃষি ও কৃষকের স্বার্থ রক্ষা, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ এবং উপজেলা পরিষদে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠাকে সামনে রেখে ১২ দফা উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরতে চান তিনি।
হাওরের বিস্তীর্ণ জনপদে বর্ষায় নৌযোগাযোগের ওপর নির্ভরতা, শুকনো মৌসুমে সড়ক যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা, অকাল বন্যায় বোরো ফসলের ক্ষতি, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং দুর্গম এলাকার মানুষের জরুরি চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তি দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ। এসব সমস্যা মোকাবিলায় স্থানীয় মানুষের চাহিদাকে প্রাধান্য দিয়ে পরিকল্পিত উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন এই সাবেক ছাত্রনেতা।
ছাত্ররাজনীতি থেকে উপজেলা চেয়ারম্যান হওয়ার প্রত্যাশা
আনম উল্লাহ সানি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ (অনার্স) ও এমএ এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সদস্য ও সহ-সম্পাদক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া তিনি ঢাকায় ইটনা উপজেলা সমিতির সদস্য সচিব এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ত্যাগী ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে।
তাঁর বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সাত্তার কমান্ডার (বি.কম)। তিনি ইটনা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করছেন এবং ১৯৭২ সাল থেকে বিভিন্ন মেয়াদে পাঁচবার এ দায়িত্বে ছিলেন।
হাওরের উন্নয়নে ১২ দফা পরিকল্পনা
ইটনা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলে স্থানীয় সরকারের আইনগত এখতিয়ার, সরকারি বরাদ্দ এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে কাজ করতে চান আনম উল্লাহ সানি। তাঁর প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় কৃষি, যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক জবাবদিহির বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
১. কৃষি ও বোরো ফসল সুরক্ষা: অকাল বন্যার হাত থেকে বোরো ফসল রক্ষায় হাওরের বাঁধ নির্মাণ ও সময়মতো সংস্কারের উদ্যোগ, কৃষিযন্ত্র ব্যবহারে সহায়তা এবং সার-বীজের ন্যায্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয়।
২. যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন: ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম সড়কের সঙ্গে বিভিন্ন ইউনিয়ন ও গ্রামের সংযোগ জোরদার, প্রয়োজনীয় সড়ক পাকাকরণ, গ্রামীণ সড়ক সংস্কার এবং নৌপথে নিরাপদ যাতায়াত ও ভাড়া-সংক্রান্ত অনিয়ম প্রতিরোধে উদ্যোগ।
৩. শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষকসংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ, শিক্ষার্থীদের বৃত্তি ও সহায়তার সুযোগ বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল শিক্ষা ও পাঠাগার কার্যক্রম সম্প্রসারণ।
৪. স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা: উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও জরুরি চিকিৎসাসেবার প্রাপ্যতা বাড়াতে উদ্যোগ। দুর্গম এলাকার রোগীদের জন্য নৌ-অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের প্রস্তাব।
৫. যুবকদের কর্মসংস্থান: বেকার তরুণদের কারিগরি প্রশিক্ষণ, তথ্যপ্রযুক্তি ও ফ্রিল্যান্সিংয়ে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি এবং মাছ চাষ, হাঁস পালন ও শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো হাওরভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রশিক্ষণ ও ঋণপ্রাপ্তিতে সহযোগিতা।
৬. দুর্নীতি ও মাদক প্রতিরোধ: উপজেলা পরিষদের বরাদ্দ, উন্নয়ন প্রকল্প ও ব্যয়ের তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ, সেবাপ্রাপ্তিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং মাদক, জুয়া ও কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়।
৭. নারী, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের অধিকার: প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সরকারি ভাতা পৌঁছাতে সহযোগিতা, নারী উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, হস্তশিল্পে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সেবা ও চলাচলের সুযোগ সম্প্রসারণ।
৮. দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি: বন্যা, ঝড় ও অকাল বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলায় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা, শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, গবাদিপশুর খাদ্য সংরক্ষণ এবং উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সমন্বয়।
৯. মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ: হাওরের মাছের প্রজননক্ষেত্র রক্ষা, অবৈধ ও ক্ষতিকর মাছ ধরার পদ্ধতি প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে কাজ এবং জেলেদের জীবিকা সুরক্ষায় সহায়তা।
১০. কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ: ধানসহ কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ ও পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সরকারি ক্রয় কার্যক্রমে কৃষকদের অংশগ্রহণের সুযোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি।
১১. সামাজিক নিরাপত্তা ও জনসেবা: সরকারি সেবা পেতে হয়রানি কমানো, প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন এবং দরিদ্র ও অসহায় মানুষের অভিযোগ শুনতে নিয়মিত গণশুনানির ব্যবস্থা করার উদ্যোগ।
১২. জবাবদিহিমূলক উপজেলা পরিষদ: নিয়মিত উন্মুক্ত মতবিনিময় সভা, নাগরিকদের অভিযোগ গ্রহণ, উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি প্রকাশ এবং স্থানীয় মানুষের মতামতের ভিত্তিতে উন্নয়ন অগ্রাধিকার নির্ধারণ।
প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তবায়নে গুরুত্ব
আনম উল্লাহ সানির বক্তব্য অনুযায়ী, ইটনার মানুষের দীর্ঘদিনের সমস্যা চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ এবং জনসেবামুখী উপজেলা পরিষদ গড়ে তোলাই তাঁর লক্ষ্য। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলে স্থানীয় জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে চান তিনি।
তবে প্রস্তাবিত পরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়ন নির্ভর করবে উপজেলা পরিষদের আইনগত এখতিয়ার, বরাদ্দ, সরকারি অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সহযোগিতার ওপর। বিশেষ করে হাওরের বাঁধ, সড়ক যোগাযোগ, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে প্রয়োজন হবে সমন্বিত উদ্যোগ, সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা এবং কার্যকর তদারকি।
প্রার্থিতা চূড়ান্ত হবে দলীয় সিদ্ধান্ত ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায়
ইটনা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আনম উল্লাহ সানির সম্ভাব্য প্রার্থিতা নিয়ে আলোচনা থাকলেও তাঁর দলীয় মনোনয়ন বা আনুষ্ঠানিক সমর্থনের বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত বলে উল্লেখ করা হয়নি। নির্বাচনে অংশগ্রহণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, নির্বাচনী তফসিল এবং প্রযোজ্য আইন ও বিধিবিধান অনুসারেই পরবর্তী কার্যক্রম নির্ধারিত হবে।
হাওরের মানুষের জীবন-জীবিকা কৃষি, মৎস্যসম্পদ, নৌযোগাযোগ ও প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি কোন কাজ কখন বাস্তবায়ন করা হবে, অর্থের সংস্থান কীভাবে হবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কী অগ্রগতি অর্জিত হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরতে পারলে ভোটারদের সামনে তাঁর প্রস্তাব মূল্যায়নের সুযোগ আরও বাড়বে।

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 























