পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকিরের সাম্প্রতিক বক্তব্য দুঃখজনক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের অনুমতি পেলে পুলিশ ক্রসফায়ার করবে বলে তিনি জানিয়েছেন। দেশের সর্বোচ্চ পুলিশ কর্মকর্তার মুখে এমন বক্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এর মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পুরোনো আতঙ্ক নতুন করে সামনে এসেছে। একই অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন তিনি। এসব বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার সংগঠন ও সাংবাদিক সমাজ। এরই মধ্যে আইজিপির অপসারণের দাবিও উঠেছে। পরিস্থিতি এখন সরকারের দায়িত্বশীল পদক্ষেপ দাবি করছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ক্রসফায়ার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু, স্বজন হারানোর বেদনা এবং বিচারহীনতার দীর্ঘ ইতিহাস। অতীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বহু অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা আজও মানুষের স্মৃতিতে অমলিন। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে সেই অন্ধকার অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই কাম্য নয়। রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অপরাধ দমন পুলিশের সাংবিধানিক ও আইনগত কর্তব্য। তবে অপরাধী শনাক্ত করা, তদন্ত পরিচালনা এবং বিচারের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। সেই প্রক্রিয়া অতিক্রম করার অধিকার কারও নেই। সরকারের অনুমতিও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দিতে পারে না। সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের জীবন ও আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার নিশ্চিত করেছে। পুলিশপ্রধানের বক্তব্যে এই মৌলিক নীতির প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধার প্রতিফলন পাওয়া যায়নি।
আইজিপির বক্তব্যের প্রতিবাদে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, তা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলও কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। এসব প্রতিবাদকে নিছক রাজনৈতিক বিরোধিতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে রাষ্ট্রের মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহির প্রশ্ন জড়িত।
অবশ্য সমালোচনার পর পুলিশ সদর দপ্তর একটি ব্যাখ্যা দিয়েছে। সেখানে ক্রসফায়ার শব্দটিকে রূপক অর্থে ব্যবহারের দাবি করা হয়েছে। কিন্তু এমন ব্যাখ্যায় উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হয় না। এ ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতা প্রত্যাশিত।
আধুনিক পুলিশব্যবস্থার ভিত্তি পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা, মানবিকতা ও জবাবদিহি। জনগণের আস্থা অর্জন ছাড়া কোনো বাহিনী দীর্ঘ মেয়াদে সফল হতে পারে না। ভয় দেখিয়ে সাময়িক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হলেও তাতে আইনের শাসন শক্তিশালী হয় না। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপান সফর শেষে দেশে ফেরার পর আইজিপির বক্তব্যের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। আমরা আশা করি, সরকার বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব দেবে। শুধু ব্যাখ্যা দিয়ে এ বিতর্কের অবসান ঘটানো যথেষ্ট নয়। বক্তব্যের প্রাতিষ্ঠানিক পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সরকারের সুস্পষ্ট অবস্থান ঘোষণা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের মানুষ আর গুম, ক্রসফায়ার ও বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে ফিরে যেতে চায় না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশের শক্তির উৎস জনগণের আস্থা। সেই আস্থা রক্ষার দায়িত্ব পুলিশপ্রধানেরও। সরকারকে এখন প্রমাণ করতে হবে, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। অপরাধ দমনের নামে বেআইনি পন্থার কোনো স্থান থাকতে পারে না। ক্রসফায়ারের হুমকি নয়, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনই হোক রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি।

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 
























