ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ ভিসা নীতিমালার খসড়া পরিমার্জন ও চূড়ান্তকরণে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা, বাস্তবায়নে কতটা আশার আলো চাকরিজীবীদের জন্য দুই দফায় মিলবে যে ছুটি প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর পরামর্শ অলির সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ৩ বাহিনীর জন্য বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  তিনি বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামারিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।  জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলছে। নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য (এমপি) মাছুম মোস্তফার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি থেকে শিল্পে রুপান্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা

সংখ্যালঘুদের বাড়ি কারা পোড়ায়, কেন পোড়ায়

বাঙালী কণ্ঠ নিউজঃ গত ২৩-২৪ অক্টোবর ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে যে সেমিনারের আয়োজন করে, একজন আমন্ত্রিত হিসেবে সেখানে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। এই সেমিনারের ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য ছিল ছয়জন গবেষকের বাংলাদেশ সম্পর্কিত গবেষণার সারসংক্ষেপ উপস্থাপন এবং তাঁর ওপর আলোচনা। এসব গবেষণায় ব্যবসা-বাণিজ্য, সীমান্ত-যোগাযোগ ইত্যাদির পাশাপাশি জায়গা পেয়েছিল বাংলাদেশের মাটি–মানুষ, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। পুরোনো প্রজন্মের অনেকের মনে থাকার কথা, ১৯৭১ সালে আগরতলায় যে লোকসংখ্যা ছিল, তার দ্বিগুণ মানুষ গিয়েছিল বাংলাদেশ থেকে।

আগরতলার বাঙালিরা ভীষণ বাংলাদেশপ্রেমী, কলকাতার ‘বাবুদের’ মতো নাকউঁচু ভাব দেখান না। কবি রাতুল দেব বর্মণ লিখেছেন, ‘বাংলাদেশে মেঘ হলে আগরতলায় বৃষ্টি পড়ে/ বাংলাদেশ দুঃখ পেলে আগরতলায় অশ্রু ঝরে।’ আগরতলার বাঙালিদের অনেকের পৈতৃক বাড়ি ছিল বাংলাদেশে। সাতচল্লিশের দেশভাগের ঝড় তাঁদের ওখানে নিয়ে গেছে। আবার ওখান থেকেও অনেকে বাংলাদেশে এসেছেন। দুই দেশের মানুষই দেশভাগের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে। তবে সংখ্যালঘুদের যন্ত্রণাটা বেশি।

আগরতলার কাছেই ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর জন্মভূমি ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং শচীন দেববর্মণের স্মৃতিধন্য কুমিল্লা। ঢাকার খবর না রাখলেও আগরতলার লেখক-বুদ্ধিজীবী-শিল্পীরা কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার খোঁজখবর রাখেন। সরকারি উদ্যোগে শচীন দেববর্মণের বাড়ি সংস্কারের সংবাদ যেমন তাঁদের আনন্দ দেয়, তেমনি আলাউদ্দিন খাঁ জাদুঘরে মৌলবাদীদের হামলা কিংবা নাসিরনগরের সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে আক্রমণ তাঁদের ব্যথিত করে। এক সাংবাদিক বন্ধু জিজ্ঞাসা করলেন, আওয়ামী লীগের আমলেও কেন সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা হচ্ছে ? এই প্রশ্ন করার অধিকার তাঁদের আছে। সে বিষয়ে পরে আসছি। কৈফিয়তের সুরে বললাম, সরকার নাসিরনগরের হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে; ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর তৈরি করে দিয়েছে। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের অঘটন না ঘটে সে বিষয়ে সরকার সজাগ আছে। এর তিন সপ্তাহ না যেতেই বাংলাদেশে আরেকটি সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটল।

১০ নভেম্বর রংপুরের গঙ্গাচড়ার ঠাকুরপাড়া গ্রামে কয়েকটি সংখ্যালঘু বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের একদল লোক। এলাকাবাসীর অভিযোগ, হিন্দু পরিবারে আগুন দেওয়ার কয়েক দিন আগে থেকেই সেখানে সভা হয়েছে, মাইকিং হয়েছে। টিটু রায় নামে যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ছিল, ৫ নভেম্বর তাঁর নামে থানায় মামলাও হয়েছিল। তাহলে পুলিশ বা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা কী করেছেন ? পুলিশ আগেভাগে ব্যবস্থা নিলে হয়তো সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর রক্ষা করা যেত।

ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে, যাঁদের মধ্যে স্থানীয় বিএনপি–জামায়াতের নেতা-কর্মীরা রয়েছেন। আমরা চাই হামলাকারীরা ধরা পড়ুক, শাস্তি পাক। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় কাউকে ধরলে, কাউকে ছাড় দিলে পুরো মামলাটিই কেঁচে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। নাসিরনগরের জেলেপল্লিতে হামলার ঘটনা ঘটে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের কোন্দলের জের ধরে। পরে বিএনপির এক নেতাকে ফাঁসাতে গিয়ে মামলাটি গতি হারিয়েছে। যদিও মূল অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ নেতা দেওয়ান আতিকুর রহমান জেলে আছেন।

টিটু রায় নামে যে যুবকের মোবাইল নম্বর থেকে ধর্মের প্রতি অবমাননাকর স্ট্যাটাস দেওয়া হয়েছিল, তিনি এখন পুলিশের জিম্মায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, পরীক্ষা করে দেখা হবে তিনিই স্ট্যাটাস দিয়েছেন, না তাঁর মোবাইল থেকে অন্য কেউ দিয়েছেন। এর আগে পত্রিকায় দেখেছিলাম টিটু রায় নিরক্ষর। সে ক্ষেত্রে তাঁর পক্ষে স্ট্যাটাস দেওয়া সম্ভব নয়। তারপরও বলব, টিটু ধর্ম অবমাননাকর কিছু করলে প্রচলিত আইনে বিচার হবে।

কিন্তু তাঁর মা-বাবা তো কোনো অপরাধ করেননি। তাঁদের ও প্রতিবেশীদের বাড়িঘর কেন পোড়ানো হলো ? আমরা আশা করব, পুলিশ সত্য বের করবে। আটক ব্যক্তিকে মারধর করে জজ মিয়ার মতো স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেবে না।

গত বছর নভেম্বরে একই অভিযোগে নাসিরনগরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যে তাণ্ডব হয়েছে, তাদের ঘরবাড়ি ও মন্দিরে হামলা হয়েছে, তার ক্ষত এখনো শুকায়নি। সেই ঘটনার খলনায়ক করা হয়েছিল রসরাজ দাস নামে এক নিরক্ষর তরুণকে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে, তদন্তকারী কর্মকর্তা ও মানবাধিকার সংস্থার তদন্তে বেরিয়ে এসেছে জেলা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের কোন্দলের জের ধরেই সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা হয়েছে। সেই ঘটনায় আটটি মামলা হলেও কোনোটির অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি।

এর আগে কক্সবাজারের রামু ও আরও কয়েকটি জায়গায় একই ঘটনা ঘটেছে। সেখানে উত্তম বড়ুয়া নামে এক যুবকের নামে ভুয়া ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়ে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি ও উপাসনালয় ভাঙচুর করা হয়েছিল, পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। স্থানীয় বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও সেই ‘অভিযানে’ যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু মামলার চার্জশিটে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বাদ দেওয়া হয়েছে। এখন মামলার শুনানির জন্য সাক্ষীও পাওয়া যাচ্ছে না। ভারতের গুজরাটের দাঙ্গার মামলায় যদি সাক্ষী পাওয়া যায়, অপরাধীর বিচার হয়, বাংলাদেশে কেন হবে না ?

রামুর ঘটনা ঘটেছে পাঁচ বছর আগে। যাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে লঙ্কাকাণ্ড ঘটে গেছে, সেই উত্তম বড়ুয়া কোথায় আছেন কেউ জানেন না। রামুর ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে দ্রুত ভেঙে যাওয়া বাড়ি ও মন্দিরগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের যে মন ভেঙেছে, সেটি কে নির্মাণ করে দেবে ?

রামুর পর নাসিরনগর। নাসিরনগরের পর গোবিন্দগঞ্জ। গোবিন্দগঞ্জে যাঁদের ওপর হামলা হয়েছে, তাঁরা সংখ্যালঘুও নন; একেবারে প্রান্তিক মানুষ। বেঁচে থাকাই তাঁদের ধর্ম। আমরা ভিডিও ফুটেজে দেখলাম পুলিশ সদস্যরা তাঁদের বাড়িঘরে আগুন দিচ্ছেন। আইনের মানুষ কীভাবে আইন ভঙ্গ করেন ?

ওই পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কী কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে ? এক বছর পরও গোবিন্দগঞ্জের দরিদ্র ও নিঃস্ব সাঁওতালেরা সেই পুড়ে যাওয়া, ভেঙে যাওয়া বাড়িঘরেই বাস করছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র কিংবা সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ তাদের দিকে সহানুভূতির হাত বাড়ায়নি।

অনেকে বলেন, বাংলাদেশ ধর্মীয় সম্প্রীতির দেশ। ধর্মনির্বিশেষে সব মানুষ সুখে-শান্তিতে বসবাস করছে। সেটাই যদি হবে তাহলে কিছুদিন পরপর সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে আক্রমণের ঘটনা ঘটছে কেন ? তাদের বাড়িঘরে কারা আগুন দেয়, কেন দেয় বুঝতে অসুবিধা হয় না। একজন সংখ্যালঘু বাড়ি ছাড়লে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মানুষ সেটি সহজে দখল করে নিতে পারে।

পাকিস্তান ছিল ঘোষিত সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। সেই পাকিস্তানকে নাকচ করেই হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান—সবার সম্মিলিত প্রয়াসে আমরা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করলাম। এখনো কেন সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হবেন ? আগরতলার বন্ধুরা জানালেন, দেশভাগের পর গত ৭০ বছরে ত্রিপুরায় কখনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি। বাঙালি ও উপজাতিদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। কিন্তু বাঙালি হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানদের মধ্যে কোনো ঝগড়া হয়নি। আমরা কেন সে রকম একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারলাম না ?

আমরা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনেক সমালোচনা করতে পারি। তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে তিনি যে কাণ্ড করেছেন, তা অমানবিক ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। কিন্তু সেখানকার সংখ্যালঘু মুসলমানদের মমতা যে ছায়া দিয়ে রেখেছেন, তাদের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। সেখানকার সংখ্যালঘুরা জানাচ্ছেন, বামফ্রন্টের আমলের চেয়েও তারা ভালো আছেন।

একটি দেশ তখনই বড় হয় যখন ধর্মবর্ণ–নির্বিশেষে সব মানুষকে সমানভাবে দেখতে পারে। একজন নেতা তখনই বড় হন, যখন তাঁর ওপর সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ আস্থা রাখতে পারে। আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন, বিএনপি সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে আঁতাত করেছে, বিএনপি তাদের তোয়াজ করে চলে। আওয়ামী লীগের তোয়াজ করার প্রয়োজন নেই। অসাম্প্রদায়িক মানুষের ওপরই নাকি তারা ভরসা রাখেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সাম্প্রদায়িক শক্তির কোনো কোনো অংশকে তোয়াজ করে চলছে দলটি। আর সংখ্যালঘুদের ভরসার জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। একসময় বামপন্থীরা সংখ্যালঘুদের আশ্রয়স্থল ছিল। এখন সেই বামেরাই অন্যের ঘরে আশ্রিত হয়ে আছেন (সবাই নয়, কেউ কেউ)। বিগত নির্বাচনে সংখ্যালঘুরা আওয়ামী লীগকে শেষ আশ্রয় হিসেবে নিয়েছিল। কিন্তু রামু, নাসিরনগর কিংবা গঙ্গাচড়ার ঘটনা তাদের আরও নিরাশ্রয় করে তোলে।

সরকারের দাবি, সাম্প্রদায়িক অপশক্তি এসব অঘটন ঘটাচ্ছে। কিন্তু সেই অপশক্তির বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা তারা নিয়েছে বা নিচ্ছে ? বিএনপি-জামায়াত আমলে যে শত শত সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে বলে আওয়ামী লীগ প্রচার করছে, গত নয় বছরে তারই বা কয়টির বিচার হয়েছে? কতজন শাস্তি পেয়েছে ?

ধর্মীয় অবমাননার কথিত অভিযোগে রংপুরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনার পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে মনে করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। সরকারের কাজ তো ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচন ও অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া। শুধু মুখের কথায় তো সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে নিবৃত্ত করা যাবে না।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তুহিন ওয়াদুদ ঘটনাস্থল ঘুরে এসে লিখেছেন, আশপাশের এলাকা থেকে যেসব লোকজন আক্রান্তদের বাড়িঘর দেখতে এসেছেন, তাদের মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনই বেশি। বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় কি এতটাই সংকীর্ণমনা ? আক্রান্ত প্রতিবেশীকেও দেখতে যাবে না ? দেশের নাগরিক হিসেবে নিজেকে অপরাধী মনে হয়।

অতীতকে আমরা ফিরিয়ে আনতে পারব না। কিন্তু বর্তমানকে বদলাতে পারি। ভবিষ্যৎ নতুন করে তৈরি করতে পারি। আসুন, আগরতলার বন্ধুদের আমরা এই বলে আশ্বস্ত করি, আগামী পাঁচ, দশ, পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশে কোনো সংখ্যালঘু আক্রান্ত হবে না। কোনো সংখ্যালঘুর বাড়িতে কেউ হামলা করবে না, আগুন দেবে না। সেটাই হবে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি শ্রেষ্ঠ সম্মান প্রদর্শন এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার উত্তম পথ।

সোহরাব হাসান

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

জনপ্রিয় সংবাদ

মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ

সংখ্যালঘুদের বাড়ি কারা পোড়ায়, কেন পোড়ায়

আপডেট টাইম : ১০:০৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৭

বাঙালী কণ্ঠ নিউজঃ গত ২৩-২৪ অক্টোবর ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে যে সেমিনারের আয়োজন করে, একজন আমন্ত্রিত হিসেবে সেখানে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। এই সেমিনারের ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য ছিল ছয়জন গবেষকের বাংলাদেশ সম্পর্কিত গবেষণার সারসংক্ষেপ উপস্থাপন এবং তাঁর ওপর আলোচনা। এসব গবেষণায় ব্যবসা-বাণিজ্য, সীমান্ত-যোগাযোগ ইত্যাদির পাশাপাশি জায়গা পেয়েছিল বাংলাদেশের মাটি–মানুষ, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। পুরোনো প্রজন্মের অনেকের মনে থাকার কথা, ১৯৭১ সালে আগরতলায় যে লোকসংখ্যা ছিল, তার দ্বিগুণ মানুষ গিয়েছিল বাংলাদেশ থেকে।

আগরতলার বাঙালিরা ভীষণ বাংলাদেশপ্রেমী, কলকাতার ‘বাবুদের’ মতো নাকউঁচু ভাব দেখান না। কবি রাতুল দেব বর্মণ লিখেছেন, ‘বাংলাদেশে মেঘ হলে আগরতলায় বৃষ্টি পড়ে/ বাংলাদেশ দুঃখ পেলে আগরতলায় অশ্রু ঝরে।’ আগরতলার বাঙালিদের অনেকের পৈতৃক বাড়ি ছিল বাংলাদেশে। সাতচল্লিশের দেশভাগের ঝড় তাঁদের ওখানে নিয়ে গেছে। আবার ওখান থেকেও অনেকে বাংলাদেশে এসেছেন। দুই দেশের মানুষই দেশভাগের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে। তবে সংখ্যালঘুদের যন্ত্রণাটা বেশি।

আগরতলার কাছেই ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর জন্মভূমি ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং শচীন দেববর্মণের স্মৃতিধন্য কুমিল্লা। ঢাকার খবর না রাখলেও আগরতলার লেখক-বুদ্ধিজীবী-শিল্পীরা কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার খোঁজখবর রাখেন। সরকারি উদ্যোগে শচীন দেববর্মণের বাড়ি সংস্কারের সংবাদ যেমন তাঁদের আনন্দ দেয়, তেমনি আলাউদ্দিন খাঁ জাদুঘরে মৌলবাদীদের হামলা কিংবা নাসিরনগরের সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে আক্রমণ তাঁদের ব্যথিত করে। এক সাংবাদিক বন্ধু জিজ্ঞাসা করলেন, আওয়ামী লীগের আমলেও কেন সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা হচ্ছে ? এই প্রশ্ন করার অধিকার তাঁদের আছে। সে বিষয়ে পরে আসছি। কৈফিয়তের সুরে বললাম, সরকার নাসিরনগরের হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে; ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর তৈরি করে দিয়েছে। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের অঘটন না ঘটে সে বিষয়ে সরকার সজাগ আছে। এর তিন সপ্তাহ না যেতেই বাংলাদেশে আরেকটি সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটল।

১০ নভেম্বর রংপুরের গঙ্গাচড়ার ঠাকুরপাড়া গ্রামে কয়েকটি সংখ্যালঘু বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের একদল লোক। এলাকাবাসীর অভিযোগ, হিন্দু পরিবারে আগুন দেওয়ার কয়েক দিন আগে থেকেই সেখানে সভা হয়েছে, মাইকিং হয়েছে। টিটু রায় নামে যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ছিল, ৫ নভেম্বর তাঁর নামে থানায় মামলাও হয়েছিল। তাহলে পুলিশ বা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা কী করেছেন ? পুলিশ আগেভাগে ব্যবস্থা নিলে হয়তো সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর রক্ষা করা যেত।

ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে, যাঁদের মধ্যে স্থানীয় বিএনপি–জামায়াতের নেতা-কর্মীরা রয়েছেন। আমরা চাই হামলাকারীরা ধরা পড়ুক, শাস্তি পাক। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় কাউকে ধরলে, কাউকে ছাড় দিলে পুরো মামলাটিই কেঁচে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। নাসিরনগরের জেলেপল্লিতে হামলার ঘটনা ঘটে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের কোন্দলের জের ধরে। পরে বিএনপির এক নেতাকে ফাঁসাতে গিয়ে মামলাটি গতি হারিয়েছে। যদিও মূল অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ নেতা দেওয়ান আতিকুর রহমান জেলে আছেন।

টিটু রায় নামে যে যুবকের মোবাইল নম্বর থেকে ধর্মের প্রতি অবমাননাকর স্ট্যাটাস দেওয়া হয়েছিল, তিনি এখন পুলিশের জিম্মায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, পরীক্ষা করে দেখা হবে তিনিই স্ট্যাটাস দিয়েছেন, না তাঁর মোবাইল থেকে অন্য কেউ দিয়েছেন। এর আগে পত্রিকায় দেখেছিলাম টিটু রায় নিরক্ষর। সে ক্ষেত্রে তাঁর পক্ষে স্ট্যাটাস দেওয়া সম্ভব নয়। তারপরও বলব, টিটু ধর্ম অবমাননাকর কিছু করলে প্রচলিত আইনে বিচার হবে।

কিন্তু তাঁর মা-বাবা তো কোনো অপরাধ করেননি। তাঁদের ও প্রতিবেশীদের বাড়িঘর কেন পোড়ানো হলো ? আমরা আশা করব, পুলিশ সত্য বের করবে। আটক ব্যক্তিকে মারধর করে জজ মিয়ার মতো স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেবে না।

গত বছর নভেম্বরে একই অভিযোগে নাসিরনগরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যে তাণ্ডব হয়েছে, তাদের ঘরবাড়ি ও মন্দিরে হামলা হয়েছে, তার ক্ষত এখনো শুকায়নি। সেই ঘটনার খলনায়ক করা হয়েছিল রসরাজ দাস নামে এক নিরক্ষর তরুণকে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে, তদন্তকারী কর্মকর্তা ও মানবাধিকার সংস্থার তদন্তে বেরিয়ে এসেছে জেলা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের কোন্দলের জের ধরেই সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা হয়েছে। সেই ঘটনায় আটটি মামলা হলেও কোনোটির অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি।

এর আগে কক্সবাজারের রামু ও আরও কয়েকটি জায়গায় একই ঘটনা ঘটেছে। সেখানে উত্তম বড়ুয়া নামে এক যুবকের নামে ভুয়া ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়ে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি ও উপাসনালয় ভাঙচুর করা হয়েছিল, পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। স্থানীয় বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও সেই ‘অভিযানে’ যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু মামলার চার্জশিটে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বাদ দেওয়া হয়েছে। এখন মামলার শুনানির জন্য সাক্ষীও পাওয়া যাচ্ছে না। ভারতের গুজরাটের দাঙ্গার মামলায় যদি সাক্ষী পাওয়া যায়, অপরাধীর বিচার হয়, বাংলাদেশে কেন হবে না ?

রামুর ঘটনা ঘটেছে পাঁচ বছর আগে। যাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে লঙ্কাকাণ্ড ঘটে গেছে, সেই উত্তম বড়ুয়া কোথায় আছেন কেউ জানেন না। রামুর ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে দ্রুত ভেঙে যাওয়া বাড়ি ও মন্দিরগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের যে মন ভেঙেছে, সেটি কে নির্মাণ করে দেবে ?

রামুর পর নাসিরনগর। নাসিরনগরের পর গোবিন্দগঞ্জ। গোবিন্দগঞ্জে যাঁদের ওপর হামলা হয়েছে, তাঁরা সংখ্যালঘুও নন; একেবারে প্রান্তিক মানুষ। বেঁচে থাকাই তাঁদের ধর্ম। আমরা ভিডিও ফুটেজে দেখলাম পুলিশ সদস্যরা তাঁদের বাড়িঘরে আগুন দিচ্ছেন। আইনের মানুষ কীভাবে আইন ভঙ্গ করেন ?

ওই পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কী কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে ? এক বছর পরও গোবিন্দগঞ্জের দরিদ্র ও নিঃস্ব সাঁওতালেরা সেই পুড়ে যাওয়া, ভেঙে যাওয়া বাড়িঘরেই বাস করছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র কিংবা সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ তাদের দিকে সহানুভূতির হাত বাড়ায়নি।

অনেকে বলেন, বাংলাদেশ ধর্মীয় সম্প্রীতির দেশ। ধর্মনির্বিশেষে সব মানুষ সুখে-শান্তিতে বসবাস করছে। সেটাই যদি হবে তাহলে কিছুদিন পরপর সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে আক্রমণের ঘটনা ঘটছে কেন ? তাদের বাড়িঘরে কারা আগুন দেয়, কেন দেয় বুঝতে অসুবিধা হয় না। একজন সংখ্যালঘু বাড়ি ছাড়লে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মানুষ সেটি সহজে দখল করে নিতে পারে।

পাকিস্তান ছিল ঘোষিত সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। সেই পাকিস্তানকে নাকচ করেই হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান—সবার সম্মিলিত প্রয়াসে আমরা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করলাম। এখনো কেন সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হবেন ? আগরতলার বন্ধুরা জানালেন, দেশভাগের পর গত ৭০ বছরে ত্রিপুরায় কখনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি। বাঙালি ও উপজাতিদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। কিন্তু বাঙালি হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানদের মধ্যে কোনো ঝগড়া হয়নি। আমরা কেন সে রকম একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারলাম না ?

আমরা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনেক সমালোচনা করতে পারি। তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে তিনি যে কাণ্ড করেছেন, তা অমানবিক ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। কিন্তু সেখানকার সংখ্যালঘু মুসলমানদের মমতা যে ছায়া দিয়ে রেখেছেন, তাদের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। সেখানকার সংখ্যালঘুরা জানাচ্ছেন, বামফ্রন্টের আমলের চেয়েও তারা ভালো আছেন।

একটি দেশ তখনই বড় হয় যখন ধর্মবর্ণ–নির্বিশেষে সব মানুষকে সমানভাবে দেখতে পারে। একজন নেতা তখনই বড় হন, যখন তাঁর ওপর সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ আস্থা রাখতে পারে। আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন, বিএনপি সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে আঁতাত করেছে, বিএনপি তাদের তোয়াজ করে চলে। আওয়ামী লীগের তোয়াজ করার প্রয়োজন নেই। অসাম্প্রদায়িক মানুষের ওপরই নাকি তারা ভরসা রাখেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সাম্প্রদায়িক শক্তির কোনো কোনো অংশকে তোয়াজ করে চলছে দলটি। আর সংখ্যালঘুদের ভরসার জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। একসময় বামপন্থীরা সংখ্যালঘুদের আশ্রয়স্থল ছিল। এখন সেই বামেরাই অন্যের ঘরে আশ্রিত হয়ে আছেন (সবাই নয়, কেউ কেউ)। বিগত নির্বাচনে সংখ্যালঘুরা আওয়ামী লীগকে শেষ আশ্রয় হিসেবে নিয়েছিল। কিন্তু রামু, নাসিরনগর কিংবা গঙ্গাচড়ার ঘটনা তাদের আরও নিরাশ্রয় করে তোলে।

সরকারের দাবি, সাম্প্রদায়িক অপশক্তি এসব অঘটন ঘটাচ্ছে। কিন্তু সেই অপশক্তির বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা তারা নিয়েছে বা নিচ্ছে ? বিএনপি-জামায়াত আমলে যে শত শত সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে বলে আওয়ামী লীগ প্রচার করছে, গত নয় বছরে তারই বা কয়টির বিচার হয়েছে? কতজন শাস্তি পেয়েছে ?

ধর্মীয় অবমাননার কথিত অভিযোগে রংপুরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনার পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে মনে করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। সরকারের কাজ তো ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচন ও অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া। শুধু মুখের কথায় তো সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে নিবৃত্ত করা যাবে না।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তুহিন ওয়াদুদ ঘটনাস্থল ঘুরে এসে লিখেছেন, আশপাশের এলাকা থেকে যেসব লোকজন আক্রান্তদের বাড়িঘর দেখতে এসেছেন, তাদের মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনই বেশি। বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় কি এতটাই সংকীর্ণমনা ? আক্রান্ত প্রতিবেশীকেও দেখতে যাবে না ? দেশের নাগরিক হিসেবে নিজেকে অপরাধী মনে হয়।

অতীতকে আমরা ফিরিয়ে আনতে পারব না। কিন্তু বর্তমানকে বদলাতে পারি। ভবিষ্যৎ নতুন করে তৈরি করতে পারি। আসুন, আগরতলার বন্ধুদের আমরা এই বলে আশ্বস্ত করি, আগামী পাঁচ, দশ, পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশে কোনো সংখ্যালঘু আক্রান্ত হবে না। কোনো সংখ্যালঘুর বাড়িতে কেউ হামলা করবে না, আগুন দেবে না। সেটাই হবে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি শ্রেষ্ঠ সম্মান প্রদর্শন এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার উত্তম পথ।

সোহরাব হাসান