আওয়ামী লীগের ২৩৫ জন প্রার্থী কোটিপতি : টিআইবি

আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের মধ্যে ৮২ শতাংশ কোটিপতি। এ ছাড়া স্বতন্ত্র নির্বাচন করা প্রায় ৪৭ শতাংশ কোটিপতি প্রার্থী। কোটিপতি প্রার্থীর মোট সংখ্যা ৫৭১। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ২৩৫ জন কোটিপতি প্রার্থী রয়েছেন।

আজ মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডির ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কার্যালয়ে আয়োজিত ‘নির্বাচনী হলফনামার তথ্যচিত্র: জনগণকে কী বার্তা দিচ্ছে’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।

টিআইবি জানায়, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের মধ্যে ৫৭ শতাংশ প্রার্থীই ব্যবসায়ী। বিগত ১৫ বছরের ব্যবধানে ব্যবসায়ী প্রার্থীদের অংশগ্রহণের হার বেড়েছে ২১ শতাংশ। শুধু ব্যবসায়ী প্রার্থী নয়, বেড়েছে বছরে এক কোটি টাকা আয় করেন এমন প্রার্থীর সংখ্যা।

এবার নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ১৬৪ জন প্রার্থী বছরে কোটি টাকা আয় করেন। তবে কোটি টাকার কম আয় করেন এমন প্রার্থীর সংখ্যা ৬৫ দশমিক ৩০ শতাংশ। এ ছাড়া এবার প্রায় ২৭ ভাগ প্রার্থী কোটিপতি (অস্থাবর সম্পদমূল্যের ভিত্তিতে)। শতকোটিপতি প্রার্থী সংখ্যায় ১৮।
এই ১৮ জনের মধ্যে সবার ওপরে আছেন গোলাম দস্তগীর গাজী। তিনি বর্তমান বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী।হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, তাঁর সম্পদের (অস্থাবর সম্পদ মূল্যের ভিত্তিতে) মূল্য ১ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকার বেশি। এরপর ব্রাক্ষণবাড়িয়া-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এ কে একরামুজ্জামানের সম্পদমূল্য ৪২১.১৬ কোটি টাকা; ঢাকা-১ আসনের আওয়ামী লীগ প্রার্থী সালমান ফজলুর রহমানের সম্পদমূল্য ৩১৫.৭৬ কোটি টাকা; কুমিল্লা-৮ আসনের আওয়ামী লীগ প্রার্থী আবু জাফর মোহাম্মদ শফি উদ্দিনের সম্পদমূল্য ৩০৬.৬৮ কোটি টাকা; কুমিল্লা-৩ আসনের আওয়ামী লীগ প্রার্থী ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুনের সম্পদমূল্য ২৭৭.৬১ কোটি টাকা;  চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী দিলীপ কুমার আগর ওয়ালার সম্পদমূল্য ২৭৬.১৯ কোটি টাকা; সিরাজগঞ্জ-৫ আসনের আওয়ামী লীগের প্রার্থী আব্দুল মমিন মন্ডলের সম্পদমূল্য ২৫৩.২৪ কোটি টাকা; নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী গাজী গোলাম মূর্তজার সম্পদমূল্য ২৩৩ কোটি টাকা; নরসিংদী-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. সিরাজুল ইসলাম মোল্লার সম্পদমূল্য ১৭৪.০১ কোটি টাকা; ঢাকা-৬ আসনের আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোহাম্মদ সাইদ খোকনের সম্পদমূল্য ১৬৩ কোটি টাকা; ফরিদপুর-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুল কাদের আজাদের সম্পদমূল্য ১৫৬.৩৯ কোটি টাকা; গাইবান্ধা-১ আসনের আওয়ামী লীগ প্রার্থী আফরুজা বারীর সম্পদমূল্য ১৫৪.৬৬ কোটি টাকা; কুমিল্লা-২ আসনের আওয়ামী লীগ প্রার্থী সেলিমা আহমাদের সম্পদমূল্য ১৫২.২৮ কোটি টাকা; লক্ষীপুর-৪ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহমুদা বেগমের সম্পদমূল্য ১৩০.৪২ কোটি টাকা; লক্ষীপুর-৪ আসনের আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আবদুল্লাহর সম্পদমূল্যও ১৩০.৪২ কোটি টাকা; কুমিল্লা-১০ আসনের আওয়ামী লীগের প্রার্থী আহম মুস্তফা কামালের সম্পদমূল্য ১০৪.১৭ কোটি টাকা; জামালপুর-১ আসনের আওয়ামী লীগ প্রার্থী নূর মোহাম্মদের সম্পদমূল্য ১০২.৩৭ কোটি টাকা; মানিকগঞ্জ-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী দেওয়ান জাহিদ আহমেদের সম্পদমূল্য ১০০.৪৫ কোটি টাকা।

টিআইবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোটিপতি প্রার্থীর সংখ্যা ৫৭১।

এরমধ্যে আওয়ামী লীগের ২৩৫ জন কোটিপতি প্রার্থী রয়েছেন।এ সময় নবম, দশম, একাদশ ও দ্বাদশ নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনে দেওয়া প্রার্থীদের হলফনামার চিত্র তুলে ধরেন গবেষণা দলের প্রধান মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম। তিনি জানান, দ্বাদশ নির্বাচনে ১ হাজার ৮৯৬ জন অংশগ্রহণ করছেন। এর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী ১৮ শতাংশ, যার সংখ্যা ৩৪৭ জন। আর দলীয় প্রার্থী ৮২ শতাংশ। বিগত চার নির্বাচনের তুলনায় এবার স্বতন্ত্র প্রার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। নবম সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিল ১৪০ জন, দশমে ১০৫ জন, একাদশে ১৩৪ জন।

১৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ প্রার্থী স্বশিক্ষিত

নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ১৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ প্রার্থীই স্বশিক্ষিত বলে উঠে এসেছে হলফনামা বিশ্লেষণে। প্রার্থীদের মধ্যে প্রায় ৫৭ শতাংশ প্রার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। এর মধ্যে স্নাতক সবচেয়ে বেশি ২৯ দশমিক ৪১ শতাংশ, স্নাতকোত্তর ২৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ। ১৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ প্রার্থী স্বশিক্ষিত। আর উচ্চমাধ্যমিক পাস করেছেন এমন প্রার্থীর সংখ্যা ১১ শতাংশ এবং মাধ্যমিক পাস করেছেন ৯ শতাংশের কিছু বেশি।

৫৭ শতাংশ প্রার্থী ব্যবসায়ী

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের মধ্যে ৫৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ প্রার্থীর মূল পেশা ব্যবসা। আইন ও কৃষিকাজকে পেশা হিসেবে দেখিয়েছেন যথাক্রমে ৯ দশমিক ১৭ এবং ৭ দশমিক ৮১ শতাংশ প্রার্থী। এর পরেই রয়েছেন চাকরিজীবী ৫ দশমিক ১৬ শতাংশ, শিক্ষক ৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ। রাজনীতিকে পেশা হিসেবে দেখিয়েছেন ২ দশমিক ৮৬ শতাংশ প্রার্থী। অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ২ দশমিক ৭১ শতাংশ, চিকিৎসক ২ দশমিক ১৯ শতাংশ, সাংবাদিক শূন্য দশমিক ৮৩ শতাংশ, গৃহস্থালি শূন্য দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং অন্যান্য ৬ দশমিক ৩০ শতাংশ।

আওয়ামী লীগের ৮২ শতাংশ প্রার্থীই কোটিপতি

আওয়ামী লীগে নবম নির্বাচনে মাত্র ২৭ ভাগের কিছু বেশি প্রার্থী ছিলেন কোটিপতি। ১৫ বছরের ব্যবধানে কোটিপতি প্রার্থীর সংখ্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮২ শতাংশে। এ ছাড়া স্বতন্ত্র নির্বাচন করা প্রার্থীদের প্রায় ৪৭ শতাংশই কোটিপতি।

সংবাদ সম্মেলনে আরো জানানো হয়, দেশের আইনে (ল্যান্ড রিফর্ম অ্যাক্ট: ২০২৩) কোনো ব্যক্তির ভূমির মালিকানা পাওয়ার সর্বোচ্চ সীমা (কৃষিজমির ক্ষেত্রে ৬০ বিঘা এবং অকৃষি জমিসহ যা ১০০ বিঘা পর্যন্ত যেতে পারে) বেঁধে দিলেও অনেক প্রার্থীর নামেই বড় আকারের ভূমির মালিকানা রয়েছে।

হলফনামার তুলনামূলক হিসাব বলছে, একাদশ সংসদের সদস্যদের কারো কারো আয় সর্বোচ্চ ২ হাজার শতাংশের বেশি বেড়েছে। পাঁচ বছরে এমপিদের আয় বেড়েছে গড়ে ২ হাজার ২৩৮ শতাংশ আর ১৫ বছরে এই হার ৭ হাজার ১১৬ শতাংশ৷ এ ছাড়া পাঁচ বছরে এমপিদের নির্ভরশীলদের আয় বেড়েছে ২ হাজার ৪০৯ শতাংশ আর ১৫ বছরে এই হার ২ হাজার ৪০৯ শতাংশ।

নির্বাচনী হলফনামার বিষয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এবারের নির্বাচনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বড় আকারে অংশগ্রহণ। সংখ্যার বিচারে যা গেল চার নির্বাচনের চেয়ে সবচেয়ে বেশি। যদিও এর বড় অংশই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের মনোনয়নের বাইরে থাকা বা বিদ্রোহী প্রার্থী। কোনো দলই ৩০০ আসনে প্রার্থী দেয়নি, তবে শতভাগ আসনেই কমপক্ষে এক বা অনেক ক্ষেত্রে একাধিক প্রার্থী হয় ক্ষমতাসীন দলের সদস্য বা সমর্থনপুষ্ট।’

সংসদ সদস্যদের অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধির বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান সুলতানা কামাল বলেন, ‘আমাদের দেশের ভূমিহীন মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। দারিদ্র্যের স্তরও খুব বেশি বাড়াতে পারিনি। আমরা আসলে দুইটা সমাজ তৈরি করছি, যার মধ্যে একটা সমাজ অনেক সম্পদশালী, আরেকটা সমাজ দিন এনে দিন খায় অবস্থার মধ্যে আছে। অনেক সময় সেটাও জুটছে না। এ রকম একটা পরিস্থিতি দেশে বিরাজ করছে। মন্ত্রী-এমপিদের যে হারে সম্পদ বাড়ছে, সেটা দেখে অনেক সময় নিজের কাছেই অবাস্তব মনে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এখন সম্পদের বৈষম্য থাকাটাই নিউ-নরমাল হয়ে গেছে। কিন্তু এটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ভাবধারার বিষয় ছিল না। মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল সাম্যের জন্য।’

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর