গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা—এ চার উপজেলার নদীর বুকে রয়েছে ১৬৫টি চর। এসব চরে ভুট্টা, মরিচ, বাদাম, মিষ্টি কুমড়া, পাট, মিষ্টি আলুসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন হয়। এসব চরে বসবাসকারী প্রায় চার লাখ মানুষের প্রধান পেশা কৃষি। কৃষির ওপর নির্ভর করেই তারা খেয়ে-পরে বেঁচে থাকেন। বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় চরাঞ্চলের মানুষদের একমাত্র ভরসা ছিল জ্বালানি। সেই জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে কৃষি থেকে শুরু করে যাতায়াতসহ সব কাজে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে।
এ অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ লাগবে বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) জেলার ফুলছড়ি উপজেলার বালাসীঘাটে রসুলপুর ফিলিং স্টেশনের উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মাসুদুর রহমান মোল্লা। তবে চরাঞ্চলের বাসিন্দারা বলছেন, চাহিদার তুলনায় খুবই সামান্য তেল বিতরণ করা হচ্ছে। এতে চাষাবাদ নিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয় নদীবন্দরগুলোতে জ্বালানি তেলের সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বালাসীঘাট এলাকায় তেল বিতরণের কেন্দ্র খোলা হয়েছে। ফলে কৃষকদের বাধ্য হয়ে ২০-৩০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে পেট্রোল পাম্প থেকে তেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে অতিরিক্ত খরচ।
নিয়ম অনুযায়ী বোতলে তেল বিক্রি নিষিদ্ধ থাকায় শহরের পাম্প থেকে তেল সংগ্রহ করতে পারছেন না অনেক কৃষক। ফলে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও তারা খালি হাতে ফিরে আসছেন।
জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে দুর্গম চরাঞ্চলে বসবাসরত কৃষকদের ওপর। নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিকাজ থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা—সবকিছুতেই নেমে এসেছে স্থবিরতা। বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় এসব অঞ্চলে সেচ, ভুট্টা মাড়াই, এমনকী যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম নৌকা চালাতেও নির্ভর করতে হয় শ্যালো মেশিনের ওপর। সেই মেশিন চালাতে প্রতিদিনই প্রয়োজন জ্বালানি তেলের। কিন্তু সংকটের কারণে সেই তেলই এখন দুর্লভ হয়ে উঠেছে।
ফুলছড়ির এড়েন্ডাবাড়ী এলাকার কৃষক হাসমত মন্ডল। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘শুনছি সরকারিভাবে বালাসীতে তেল দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এই চর থেকে বালাসী ঘাটে যেতে সময় লাগে তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা। সময়মতো না গেলে তেল পাওয়া যায় না। তাহলে আমি কাজই করবো নাকি তেলের পেছনে ছুটবো?’
কোচখালী চরের কৃষক মজিবর রহমান বলেন, ‘কয়েকদিন আগেও সহজেই স্থানীয় ঘাট থেকে তেল পাওয়া যেত। এখন সেই ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। প্রতিদিন কাজ ফেলে মাত্র দুই লিটার তেলের জন্য গাইবান্ধা শহরে যেতে হচ্ছে। তাতেও নিশ্চয়তা নেই তেল পাওয়া যাবে কি-না। ফলে জমিতে সেচ দিতে দেরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেতেই ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।’
আট বিঘা জমিতে আগাম জাতের ভুট্টা চাষ করেছেন কৃষক আজিম উদ্দিন। এখন চলছে ভুট্টা মাড়াইয়ের কাজ। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাড়াই করা প্রয়োজন। কিন্তু তেল সংকটের কারণে মেশিন বেশি সময় ধরে চালাতে পারছি না। প্রতিদিন শহরে গিয়ে বোতল করে তেল আনতে হচ্ছে। দীর্ঘসময় লাইনে দাঁড়িয়ে মাত্র দুই লিটার তেল পাই।’
সদরের রসুলপুরের কৃষক হাসান আলী বলেন, ‘তেল না থাকায় মরিচ, বেগুন ও ধানের জমিতে পানি দিতে পারছি না। গতকাল কৃষি অফিসারের মাধ্যমে দুই লিটার তেল কিনতে পেরেছি। কিন্তু আমার তেলের দরকার ১৫- ১৭ লিটার। চরে এভাবে টেনেটুনে তেল দিয়ে কিছুই হবে না।’
আরেক কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘নৌকা চালিয়ে নদী পারি দিয়ে শহরে তেল আনতে যেতে হয়। যাতায়াতেই পুরো একটি দিন চলে যায়। তেলের দামও বেড়েছে। তার ওপর বহনের খরচ যোগ হয়ে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। এমনটা হলে আমরা কৃষিকাজ করবো কী করে?’
বাজে ফুলছড়ি চরের বাসিন্দা আনসার আলী জাগো নিউজকে বলেন, ‘তেলের আকালের কারণে চরে সকলি (সবাই) সমস্যায় পড়ছি। আসা যাওয়া থেকে শুরু করে কৃষি কামের সক থানে (কৃষিসহ সব কাজে)। হামরা বেশি দর হলেও তেল চাই বাপু। নাতে হামরা আরও সমস্যায় পড়মো (তা নাহলে আমরা আরও সমস্যায় পড়েবা)।’
পুরোনো ফুলছড়ির খোয়া ঘাটের নৌকাচালক তোজাম্মেল প্রমাণিক। জ্বালানি সংকটে ভালো নেই তিনিও। আলাপকালে তিনি বলেন, ‘চরের মানুষজন মোটরসাইকেরে চড়ে খোয়াঘাটে আসতো। মালামাল নিয়ে যাতায়াত করতো। আমরা নৌকায় করে পৌঁছে দিতাম। জ্বালানির তেল অভাবের কারণে সবই বন্ধ। আমার শ্যালো মেশিনেও তেল নেই। তাই অলস সময় পার করছি।’
শুধু সেচ বা মাড়াই নয়, চরাঞ্চলের মানুষের যাতায়াতও এখন চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়েছে জ্বালানি সংকটের কারণে। নৌকা চালানোর জন্য জ্বালানি না থাকায় অনেকেই প্রয়োজনীয় কাজেও বাইরে যেতে পারছেন না। অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া, বাজার করা কিংবা জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াত সবকিছুতেই দেখা দিয়েছে বড় ধরনের সংকট।
বালাসীঘাটের নৌকাচালক রবিউল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আগে ঘাটে থেকে নিজেদের প্রয়োজনমতো তেল কিনতে পারতাম, এখন সেই সুযোগ নেই। শহরের পাম্পে গিয়ে তেল নিতে হয়। অনেক সময় তারা জারকিনে (পাত্র) তেল দেয় না, তখন বাইরে থেকে বেশি দামে কিনতে হয়। আমরা দূরে কোথাও যেতে পারি না। তাই ঘাট থেকে দূরের চরের লোকদের যাতায়াতে খুব সমস্যা হচ্ছে।’
চিকিৎসা ক্ষেত্রেও চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন চরের মানুষ। রোগীকে হাসপাতালে নিতে বেগ পেতে হচ্ছে। আসমা বেগম নামের একজন গৃহিণী বলেন, ‘বাচ্চা অসুস্থ হলে হাসপাতালে নেওয়া খুব কঠিন হয়ে গেছে। কোনো যানবাহন পাওয়া যায় না। অনেক সময় বিপদে পড়তে হয়। আমরা চাই জ্বালানি সমস্যা দূর সমাধান হোক।’
জানতে চাইলে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘কৃষকদের জ্বালানি তেলের বিষয়টি আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। এটি জেলা প্রশাসন করবে। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী গতকাল (বৃহস্পতিবার) থেকে তেল সরবরাহ শুরু হয়েছে। একবারে তো সমস্যা সমাধান করা যাবে না।’
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা বলেন, ‘চরের মানুষের কষ্ট লাঘবের জন্য বালাসীঘাটে জ্বালানি তেলের কেন্দ্র চালু করে সরবরাহ শুরু হয়েছে। চরের অন্যান্য নৌবন্দরগুলোতে চালুর চেষ্টা চলছে।’

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 
























