শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে বিদ্যালয়ে ভর্তিতে বিদ্যমান লটারি পদ্ধতি বাতিল করে পুনরায় ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গতকাল (১৬ মার্চ) শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এক সংবাদ সম্মেলনে এই ঘোষণা দেন। এই ঘোষণার পর পরই বেশ কিছু সংবাদ মাধ্যমে সুশীল সমাজের বিজ্ঞ প্রতিনিধিরা লটারি পদ্ধতি বাতিল বিষয়ে মতামত প্রকাশ করছেন, যেটা ভবিষ্যত প্রজন্মকে অন্ধকারে ফেলে দেওয়ার পথ তৈরি করছে।
ভিকারুননিসা অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন এক বিবৃতিতে মঙ্গলবার বিদ্যালয়ে ভর্তিতে লটারি বাতিলের দাবি জানিয়ে একটি ব্যাখ্যাও দিয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ভিকারুননিসা অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন (VAA) অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছে যে, দেশের কিছু প্রথম সারির গণমাধ্যম স্কুল ভর্তিতে লটারি পদ্ধতি বাতিলের সরকারি সিদ্ধান্তকে ‘নেতিবাচক’ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে। VAA মনে করে, এই ধরনের প্রচারণা কেবল একপাক্ষিক নয়, বরং শিক্ষার গুণগত মান এবং ‘মেধাভিত্তিক সমাজ’ গঠনের চেতনার পরিপন্থী। লটারি পদ্ধতির ভয়াবহতা এবং VAA এর অবস্থান স্পষ্ট করতে নিচের বিষয়গুলো তুলে ধরা হলো-
১. মেধার অবমূল্যায়ন ও সামাজিক অবক্ষয়
লটারি পদ্ধতি একটি শিশুর মনে এই ধারণা গেঁথে দেয় যে ‘সাফল্য’ কঠোর পরিশ্রম বা সততার ওপর নয়, বরং কেবল ‘ভাগ্যের’ ওপর নির্ভরশীল। এটি শিশুর শৈশবেই সময়ানুবর্তিতা, দক্ষতা ও প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতাকে বাধাগ্রস্ত করে। যখন পরিশ্রম ছাড়াই কেউ সুযোগ পায়, তখন তার মধ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ যে কোন কিছুর প্রতিই শ্রদ্ধা কমিয়ে দেয়, পড়াশোনার প্রতি নিষ্ঠা ও একাগ্রতা কমে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে চরম সামাজিক অবক্ষয় ডেকে আনে।
অথচ ভর্তি পরীক্ষার একটি সংক্ষিপ্ত মূল্যায়নের মাধ্যমে শিশুর ভাষা, সামাজিক আচরণ এবং মৌলিক বোঝাপড়া সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। প্রত্যেক বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ও পদ্ধতি আলাদা। একটি সংক্ষিপ্ত ইন্টারঅ্যাকশনের মাধ্যমে বোঝা যায় শিশু সেই পরিবেশে কতটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে।
একটি সংক্ষিপ্ত পর্যবেক্ষণ শিশুর আত্মবিশ্বাস, যোগাযোগ দক্ষতা এবং সামাজিক আচরণ বোঝার সুযোগ দেয়, যা লটারিতে সম্ভব নয়। অনেক দেশে প্রাথমিক স্তরের ভর্তি প্রক্রিয়ায় সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন বা অভিভাবক-শিশু ইন্টারঅ্যাকশন পদ্ধতি বিদ্যমান, যা শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে সমর্থন করে।
এছাড়া ভর্তির সময় শিশুদের প্রাথমিক দক্ষতা সম্পর্কে ধারণা থাকলে শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষের শিক্ষাদান আরও কার্যকরভাবে পরিকল্পনা করতে পারেন।
২. লটারির আড়ালে ভয়াবহ ভর্তি বাণিজ্য ও দুর্নীতি
লটারি পদ্ধতি স্বচ্ছ হওয়ার পরিবর্তে দুর্নীতির একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ এর জানুয়ারি সেশন পর্যন্ত বিগত বছরগুলোতে ভিকারুননিসায় লটারির আড়ালে বয়স জালিয়াতি ও মাউশির নির্ধারিত কোটার অতিরিক্ত ছাত্রী বিশেষ করে সহোদরা কোটায় শত শত শিক্ষার্থী ভর্তির যে প্রমাণ পাওয়া গেছে, তা প্রমাণ করে যে লটারি মূলত ভর্তি বাণিজ্যের একটি আবরণ মাত্র।
২০২৪ সালে আপিল বিভাগ ভিকারুননিসার প্রথম শ্রেণিতে লটারির মাধ্যমে ভর্তি হয়েছে এমন ১৬৯ জন ছাত্রীর ভর্তিকে অবৈধ ঘোষণা করেন। মেধাভিত্তিক পরীক্ষা থাকলে এই অশুভ লবিং ও বাণিজ্যের সুযোগ থাকত না।
৩. ‘কোটা বা লটারি নয়, ‘মেধাভিত্তিক’ বাংলাদেশ গড়া
লটারি পদ্ধতি মূলত একটি বৈষম্যমূলক ‘কোটা’ ব্যবস্থার মতোই, যেখানে যোগ্যরা বঞ্চিত হয় আর অযোগ্যরা সুযোগ পায়। আমরা মনে করি, কোটা বা লটারির মতো বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার যে কোনো অপচেষ্টা একটি বিশেষ মহলের কাজকে বহাল রাখার জন্যই করা হচ্ছে, যা বাংলাদেশেকে একটি মেধাহীন, নেতৃত্বহীন রাষ্ট্রে পরিণত করার নিমিত্তমাত্র।
৪. দীর্ঘমেয়াদী একাডেমিক ব্যর্থতা ও কোচিং নির্ভরতা
লটারির মাধ্যমে কোনো প্রস্তুতি ছাড়া ভর্তি হওয়ার পর থেকেই অভিভাবকরা শিক্ষার্থীর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেন প্রতিযোগিতামূলক পৃথিবীতে টিকে থাকার লড়াইয়ে। লটারি পরবর্তী এই ‘গ্যাপ’ পূরণে অভিভাবকরা শিশুদের স্কুলের বাইরে অতিরিক্ত কোচিং করানোর জন্য উন্মুখ থাকেন, যা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পর্যন্ত বজায় থাকে, যেটার প্রতিফলন চাকুরির বাজারেও পরিলক্ষিত। তথ্যমতে, বিগত দুই দশকে লটারিতে ভর্তি হওয়া অনেক শিক্ষার্থীই পরবর্তী জীবনে উচ্চশিক্ষা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল করতে পারেনি। লটারি তাদের মধ্যে ভিত্তিগত দুর্বলতা তৈরি করে, যা শেষ পর্যন্ত বড় কোনো অর্জনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
৫. মানসিক অবসাদ ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা
লটারির মাধ্যমে কোনো প্রস্তুতি বা মেধা যাচাই ছাড়া ভর্তি হওয়ার পর একজন শিক্ষার্থী যখন উন্নত ও প্রতিযোগিতামূলক পাঠ্যক্রমের সাথে মানিয়ে নিতে পারে না, তখন সে পরিবারের চাপে পড়ে এবং প্রচণ্ড মানসিক চাপে পড়ে। এই অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ তাকে অবসাদগ্রস্ত করে তোলে এবং সে হীনম্মন্যতায় ভোগে। এর ফলে ওই শিক্ষার্থী নিজের পরিবার ও সহপাঠীদের কাছে একপ্রকার অস্পৃশ্য বা ব্রাত্য হয়ে পড়ে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে গুরুতর মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়। লটারি পদ্ধতি শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৬. আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পিছিয়ে পড়া ও একাডেমিক ব্যর্থতা
জাপান সরকারের আন্ডারগ্রাজুয়েট বৃত্তি (MEXT) পরীক্ষা ও অন্যান্য বৈদেশিক বৃত্তি পরীক্ষার এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০০৫ সালের আগে যেখানে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা যারা সর্বোচ্চ নম্বর পেতো তারা ৭০-৮০% স্কোর করতো, সেখানে বর্তমানে তা কমে ৪০-৫০ % নম্বরে নেমে এসেছে। আর গড়ে আগে ৪০-৫০% স্কোর করতো, এখন করে ১০-১৫%।
প্রাথমিক পর্যায়ে লটারির মাধ্যমে মেধা যাচাই ছাড়া ভর্তি এবং তার ফলে তৈরি হওয়া ভিত্তিগত দুর্বলতাই এই ধসের মূল কারণ। লটারিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের ভিত্তি এতটাই নড়বড়ে থাকে যে, তারা পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি বা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে।
৭. গণমাধ্যমের ভূমিকা ও বিভ্রান্তিকর সংবাদ
বেশ কিছু সংবাদ প্ল্যাটফর্মে ‘শিশুদের ওপর চাপ’ কমানোর অজুহাতে অনেকেই লটারি পদ্ধতির পক্ষে সাফাই গাইছে। তাঁরা ভর্তি বাণিজ্যের বিশাল দুর্নীতির দিকটি সুকৌশলে এড়িয়ে যাচ্ছেন। লটারি সিস্টেম কার্যকরভাবে বাংলাদেশকে মেধাশূন্য এবং বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে অকার্যকর মানবসম্পদ রাষ্ট্রে হিসেবে পরিণত করবে। সাংবাদিকরা একটি দেশের চোখ, তারা সঠিককে সঠিক বলবে এটাই দেশ ও জাতি আশা করে। কাজেই গণমাধ্যম গুলো লটারির নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে তথ্য সমৃদ্ধ পর্যালোচনা তুলে ধরবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
বিভিন্ন দৈনিক, প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক বার্তা সংস্থা তাদের প্রতিবেদনে শিশুদের ওপর মানসিক চাপ এবং কোচিং বাণিজ্যের প্রসারের বিষয়ে অনেকের বক্তব্যকে তুলে ধরেছেন। তবে ভিকারুননিসা অ্যালামনাই মনে করে—
-তাদের এই সংবাদ প্রকাশ পরোক্ষভাবে একটি অকার্যকর পদ্ধতিকে (লটারি) টিকিয়ে রাখবে, যা পরোক্ষভাবে অস্বচ্ছ ভর্তি প্রক্রিয়াকে প্রশ্রয় দেয়।
-যেখানে দেশে সংস্কারের মাধ্যমে সব ক্ষেত্রে মেধার জয়গান গাওয়া হচ্ছে, সেখানে স্কুল ভর্তিতে কেন ‘ভাগ্য’ বা ‘লটারি’ থাকবে—এই প্রশ্নটিই এখন জোরালো।
– বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করার প্রক্রিয়াতে শিশুদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বিশেষ মহলের এজেন্ডা বাস্তাবায়ন করার চেষ্টা হচ্ছে।
– যেখানে চীন, কোরিয়া সহ বেশ কিছু দেশ পড়াশোনায় বিশ্বে এগিয়ে গেছে এবং বিশ্বকে শাসন করছে, সেখানে বাংলাদেশ প্রাচীন ও নৈতিকতা বিবর্জিত লটারি মানসিকতায় বহাল থাকতে চাচ্ছে, যেটা লজ্জাজনক।
আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, শিশুদের ওপর চাপ কমাতে ভর্তি পরীক্ষাকে সহজ ও আনন্দদায়ক করা যেতে পারে, সে বিষয়ে তথ্য সমৃদ্ধ মতামত সংবাদ মাধ্যমে তুলে ধরা যেতে পারে। কিন্তু লটারির মতো একটি অস্বচ্ছ ও মেধাহীন পদ্ধতি কোনোভাবেই সমাধান হতে পারে না।
কিছু সংবাদ ও মতামতে বলা হয়েছে যে ভর্তি মূল্যায়ন চালু হলে কোচিং নির্ভরতা বাড়বে বা শিশুদের উপর চাপ সৃষ্টি হবে। কিন্তু যদি মূল্যায়নটি সংক্ষিপ্ত, পর্যবেক্ষণভিত্তিক ও পুনরাবৃত্তিহীন প্রশ্নে পরিচালিত হয়, তাহলে কোচিংয়ের প্রয়োজনই হবে না। এছাড়া এটি প্রতিযোগিতামূলক লিখিত পরীক্ষা নয়; বরং শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ বোঝার একটি প্রক্রিয়া।
প্রস্তাবিত পদ্ধতি
ক. লিখিত পরীক্ষা নয়, সংক্ষিপ্ত walk-in interaction
খ. শিশু ও অভিভাবকের সাথে ৫-১০ মিনিটের আলাপ
গ. ছবি, রং, গল্প বা সাধারণ পর্যবেক্ষণমূলক প্রশ্ন
ঘ. কোনো নম্বরভিত্তিক প্রতিযোগিতা নয়
ঙ. প্রশ্ন পুনরাবৃত্তি না হওয়া
প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি একটি শিশুর শিক্ষাজীবনের সূচনা। তাই শুধুমাত্র লটারির ওপর নির্ভর না করে একটি মানবিক, পর্যবেক্ষণভিত্তিক এবং স্বচ্ছ মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা হলে তা শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য অধিক কার্যকর হতে পারে।
ভিকারুননিসা অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন লটারি বাতিলের সিদ্ধান্তকে পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছে। আমরা দাবি করছি, একটি স্বচ্ছ, আধুনিক, সহজ, আনন্দদায়ক এবং মেধাভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে ধনী গরীব নির্বিশেষে যোগ্য শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন নিশ্চিত করা হোক। অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের এই যৌক্তিক দাবিকে বাস্তবায়ন করতে দেওয়া হোক। আমরা বাংলাদেশকে পৃথিবীতে মেধাবী, কর্মঠ জাতি হিসেবে দেখার অঙ্গীকার করি।

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 
























