জানুয়ারি থেকে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়ার পর ফেব্রুয়ারির শুরুতে কাতারের আল-উদেইদ ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্র ট্রাক-লঞ্চারে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছে এমন তথ্য উঠে এসেছে উপগ্রহের ছবিতে। আধা-স্থায়ী উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের বদলে সহজে স্থানান্তরযোগ্য ট্রাকে ক্ষেপণাস্ত্র বসানোর ফলে এগুলো দ্রুত ব্যবহার করা যাবে, আবার প্রয়োজন হলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই স্থান বদল করাও সম্ভব হবে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে বোঝা যাচ্ছে যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা এখন বাস্তব যুদ্ধের ঝুঁকির পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলবিরোধী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেহরানের সমর্থনের কারণে এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে হামলার হুমকি দিয়েছেন। একই সঙ্গে যুদ্ধ এড়াতে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা চলছে। কাতার ছাড়াও ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, সৌদি আরব, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, তুরস্ক এবং ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বড় সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এসব ঘাঁটিকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন সামরিক তৎপরতা চোখে পড়ার মতো বেড়েছে।
ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, তাদের ভূখণ্ডে কোনো হামলা হলে আশপাশের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে সরাসরি আঘাত হানা হবে। উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষক উইলিয়াম গুডহিন্ড জানান, জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারির শুরুতে পুরো অঞ্চলে মার্কিন বিমান ও অস্ত্রের উপস্থিতি অনেক বেড়েছে। তার মতে, আল-উদেইদ ঘাঁটিতে এম৯৮৩ এইচইএমটিটি ট্রাকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র বসানো হয়েছে যেন সেগুলো সহজে সরানো ও দ্রুত মোতায়েন করা যায়।
তবে মঙ্গলবার পর্যন্ত এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এখনও ট্রাকেই আছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ বিষয়ে পেন্টাগন কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্যও করেনি। ইরান দাবি করছে, তাদের কাছে পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ রয়েছে এবং গত বছর ইসরাইলের সঙ্গে প্রায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, তা তারা ইতিমধ্যেই পূরণ করে ফেলেছে।
ওই যুদ্ধে ইসরাইল ইরানের একাধিক সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল এবং কয়েক ডজন সামরিক কর্মকর্তা ও পরমাণু বিজ্ঞানী নিহত হন। যুদ্ধের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রও ইসরাইলের পক্ষে ইরানি পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। তেহরানের আশপাশে এবং কেরমানশাহ, সেমনান ও উপসাগরীয় উপকূল এলাকায় ইরানের একাধিক ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি রয়েছে, যেগুলোকে তারা সবচেয়ে সংবেদনশীল সামরিক স্থাপনা হিসেবে বিবেচনা করে। উপগ্রহচিত্রে দেখা গেছে, ২৭ জানুয়ারি ইরানের নৌবাহিনীর ড্রোনবাহী রণতরী ‘আইআরআইএস শহিদ বাঘেরি’ বন্দর আব্বাস থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছিল। ১০ ফেব্রুয়ারিতেও সেটি একই এলাকায় দেখা যায়।
১ ফেব্রুয়ারির ছবিতে এই ঘাঁটিতে একটি আরসি-১৩৫ নজরদারি বিমান, তিনটি সি-১৩০ হারকিউলিস, ১৮টি কেসি-১৩৫ ট্যাঙ্কার এবং সাতটি সি-১৭ পরিবহন বিমান দেখা গেছে। পাশাপাশি প্রায় ১০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র এইচইএমটিটি ট্রাকে রাখা ছিল। ২ ফেব্রুয়ারির ছবিতে মুওয়াফফাকে ১৭টি এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান, আটটি এ-১০ থান্ডারবোল্ট, চারটি সি-১৩০ এবং চারটি হেলিকপ্টার দেখা গেছে। একই ঘাঁটির আরেক স্থানে চারটি ইএ-১৮জি যুদ্ধবিমানও মোতায়েন ছিল, যা জানুয়ারিতে সেখানে ছিল না। সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান ঘাঁটিতে ফেব্রুয়ারির শুরুতে একটি সি-৫ গ্যালাক্সি ও একটি সি-১৭ বিমান দেখা গেছে। ওমানের দুখান ঘাঁটি এবং দিয়েগো গার্সিয়াতেও জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারিতে বিমানের সংখ্যা বেড়েছে। সব মিলিয়ে উপগ্রহের এসব তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করছে, আর ইরানও পাল্টা অবস্থান নিচ্ছে। দুই পক্ষের কূটনৈতিক আলোচনা চললেও বাস্তবে পুরো অঞ্চল এখন স্পষ্টভাবেই যুদ্ধের ছায়ায় ঢুকে পড়েছে।

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 
























