ঢাকা , শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ ভিসা নীতিমালার খসড়া পরিমার্জন ও চূড়ান্তকরণে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ঘোষণা, বাস্তবায়নে কতটা আশার আলো চাকরিজীবীদের জন্য দুই দফায় মিলবে যে ছুটি প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর পরামর্শ অলির সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ৩ বাহিনীর জন্য বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  তিনি বলেন, বৃহত্তর বগুড়াতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সরকার। উন্নত ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক নজরদারী প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সামারিক বাহিনীর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ায় কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।  জাতীয় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন সংযোজন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক শিল্পাঞ্চল (ডিআইজি) স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অধিকতর উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নের কার্যক্রমও চলছে। নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীন সংসদ সদস্য (এমপি) মাছুম মোস্তফার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিন বছর এবং সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। কৃষি থেকে শিল্পে রুপান্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন এআই অভিনেত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা

আমার এবাদত

সত্তরের কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর পর বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গের আর কোনো কবির কবিতা পড়ার মতো পড়িনি। পড়ার মতো পড়া বলতে একেবারে গভীর পাঠ, কবিতাসমগ্র কিনে নিমগ্ন হয়ে পাঠ। হ্যাঁ, একেবারে যে পড়িনি তা নয়। পড়েছি তবে বিচ্ছিন্নভাবে। দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকীতে অথবা কোনো ছোটকাগজে। কোনো কেনো কবির কবিতা পড়ে খানিকটা আন্দোলিতও হয়েছি। সেই হিসেবে সত্তর-আশি ও নব্বই দশকে যারা কবিতা লিখেছেন, তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত না হলেও মোটামুটি ধারণা আছে বলা যায়।

স্বীকার করি, সত্তর পরবর্তীকালের কবিদের কবিতা ভালোভাবে না পড়াটা আমার চরম ব্যর্থতা। অন্যায়ও। শূন্য দশক সম্পর্কে তো আমার কেনো খোঁজই নেই। এই দশকের কবিদের চিনি, তবে কারা কেমন লেখেন সেই ব্যাপারে একেবারেই অজ্ঞ। কথাসাহিত্যের বিস্তারিত জগত সম্পর্কে খোঁজখবর রাখতে গিয়ে এই সময়ের বাংলা কবিতা আমার ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। তবে ভয়ে ভয়ে এও বলি, শূন্য দশকের অধিকাংশ কবির (আবার বলছি, সব কবি নয়, অধিকাংশ কবি) কবিতা আমার বুঝে আসে না। এই না বুঝে আসাটাও আমার ব্যর্থতা। বোঝার মতো জ্ঞান হয়ত অর্জন করতে পারিনি। ফলে গত প্রায় এক যুগের কবিদের কবিতা সম্পর্কে আমি মোটামুটি অজ্ঞ- এ কথা নিঃসন্দেহে বলতে পারি।

মজিদ মাহমুদ কোন দশকের কবি আমার ঠিক জানা নেই। সম্ভবত আশির দশকের। তার সঙ্গে আমার ভালোভাবে পরিচয়ও নেই। একবার কনকর্ডে সৈকত হাবিবের ‘প্রকৃতি’তে, একবার রূপসী বাংলা হোটেলের বলরুমে এবং একবার সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রের ছাদে- এই মোট তিনবার তার সঙ্গে দেখা হয় আমার। নিশ্চিত নই, এখন তার সঙ্গে দেখা হলে তিনি আমাকে চিনতে পারবেন কিনা।

সেদিন সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রের ছাদে কবি আলমগীর নিষাদ আমাকে বলেছিলেন, মজিদ মাহমুদের কথা। বলেছিলেন, মজিদ মাহমুদ ভালো কবি, ভালো কবিতা লেখেন। বলে মজিদ মাহমুদের কবিতার দুটি লাইনও আবৃত্তি করেছিলেন। নিষাদের কথাটা গুরুত্ব দেইনি। এই গুরুত্ব না দেয়ার কারণ হয়ত সত্তর পরবর্তী কবিদের সম্পর্কে আমার উন্নাসিকতা। নিষাদের কথাকে গুরুত্ব না দেয়ার পেছনে আরো কারণ আছে। ফরহাদ মজহারের পক্ষে তার একতরফা ওকালতি আমার ভালো লাগে না। ফরহাদ মজহার বড় কবি, সন্দেহ করি না। তার এরশাদবিরোধী কয়েকটি কবিতা এবং ‘এবাদতনামা’র কবিতাগুলো আমাকে আন্দোলিত করেছিল। ফলে তার প্রতি ভেতর থেকে একটা শ্রদ্ধাবোধও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে হেফাজত-জামায়াতের মধ্যযুগীয় ধ্যান-ধারণার পক্ষে তার ন্যাংটো তৎপরতার ফলে তার প্রতি আমার ভেতরের শ্রদ্ধাবোধটা উবে গেছে। এই উবে যাওয়ার কারণ, আমি মনে করি, কবিরা ভবিষ্যতের কথা বলবেন। ভবিষ্যতের পক্ষে ওকালতি করবেন। অন্ধকারকে প্রশয় দেবেন না। মধ্যযুগের নয়, কবিরা মানুষকে আলোকিত ভবিষ্যতের পথ দেখাবেন।

সে যাই হোক, বেশ কিছুদিন আগে একদিন কবি-প্রাবন্ধিক জাহেদ সরওয়ারের সঙ্গে ইটিসি বাসে চড়ে শাহবাগ থেকে মিরপুর যাচ্ছিলাম। কথা প্রসঙ্গে মজিদ মাহমুদ সম্পর্কে বললেন জাহেদ ভাই। নিষাদের কথারই পুনরাবৃত্তি করলেন, ‘মজিদ মাহমুদ ভালো কবি।’ নিষাদ ও জাহেদ সরওয়ার- দুজন কবির মুখে মজিদ মাহমুদের প্রশংসা শুনে তাঁর সম্পর্কে আগ্রহবোধ করি। কেমন ভালো কবি মজিদ মাহমুদ, পড়ে তো দেখতে হয়!

একদিন লেখকবন্ধুদের সঙ্গে শাহবাগ সড়কদ্বীপে বসে আড্ডা দিচ্ছি। কবি ও বাংলালিপি পত্রিকার সম্পাদক কুতুব হিলালীও ছিলেন সেখানে। তার ব্যাগ থেকে একটা বই বের করে তিনি আমার হাতে দিলেন। বইটি মজিদ মাহমুদের। নাম ‘মাহফুজামঙ্গল’। সঙ্গে একটি চিঠিও। চিঠিটা পরে হারিয়ে ফেলেছি, কী লেখা ছিল মনে নেই। সম্ভবত ‘মাহফুজামঙ্গলের পঁচিশ বছর’ এই জাতীয় কিছু। চিঠির প্রতি আমার কোনো আগ্রহ নেই, এমন আমন্ত্রণপত্রের প্রতি আমার আগ্রহ ছিল না কোনোদিনই। আগ্রহ বইটির প্রতি। মজিদ মাহমুদ ভালো কবি- দুজন কবি সাক্ষী দিয়েছেন, তাই তাঁর বইটিই আমার কাছে মূল্যবান। কুতুব হিলালী শর্ত দিয়েছিলেন, বইটি পড়ে যেন ফেরত দেই। বলেছিলাম, নিশ্চয় হিলালী। বই মেরে দেয়ার অভ্যেস আমার নেই।

বাসে উঠে বইটি খুলি। কথা প্রকাশ থেকে বের হওয়া। বেশি বড় নয়, মাত্র ৯৪ পৃষ্ঠার বই। পড়তে দুতিন ঘণ্টার বেশি লাগবে না। পড়তে শুরু করি। প্রথম কবিতা ‘কুরশিনামা’। কবিতার শুরুটা এমন :

ঈশ্বরকে ডাক দিলে মাহফুজা সামনে এসে দাঁড়ায়

আমি প্রার্থনার জন্য যতবার হাত তুলি সন্ধ্যা বা সকালে

সেই নারী এসে আমার হৃদয় তোলপাড় করে যায়।

তখন আমার রুকু

আমার সেজদা

জায়নামাজ চেনে না

সাষ্টাঙ্গে আভূমি লুণ্ঠিত হই।

লাইন কটি পড়ে খানিকটা চমকে ওঠি। মনে হলো, ঈশ্বরকে খারিজ করে দিয়ে যে কবি কাব্যের প্রথম কটি লাইনেই মানুষকে মহান করে তুললেন, তার পরবর্তী কবিতাগুলো ভালো না হয়ে পারে না। আমার খুলির ভেতর ঘুরপাক খায় লালনের পংক্তি- ‘মানুষে মনস্কামনা সিদ্ধ কর বর্তমানে/ চৌদ্দ ভুবন ঘুরাই নিশান এই মানুষের মনভুবনে।’ মজিদ মাহমুদ যেন আধুনিক ভাষায়, আধুনিক আঙ্গিকে লালনের কথারই পুনরাবৃত্তি করলেন। পাঠক হিসেবে আমার সামনে মাহফুজা নারী নয়, প্রেমিকা নয়, বেশ্যা নয়, কন্যা নয়, মাতা নয়- সমগ্র মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে হাজির হয়। মাহফুজা আমার সাষ্টাঙ্গ দখল করে নেয়। আমি পৃষ্ঠা ওল্টাই। দ্বিতীয় কবিতা ‘এবাদত’। কবিতাটির শুরু এভাবে : মাহফুজা তোমার শরীর আমার তছবির দানা/ আমি নেড়েচেড়ে দেখি আর আমার এবাদত হয়ে যায়।

কী ভয়ঙ্কর কথা! এবারও লালন এসে আমার কানে কানে বলে যান- ‘পড়গে নামাজ জেনে শুনে/নিয়ত করগে মানুষ কেবলা জেনে।’ নিজেকেই প্রশ্ন করি- ‘এবাদত’ কবিতার রচয়িতা কি লালন?মানুষ কি সত্যি পুনর্জন্ম গ্রহণ করতে পারে?লালন কি তবে আবার জন্ম নিয়ে মজিদ মাহমুদ নাম গ্রহণ করলেন? পেছনের মলাট উল্টাই। লালন নয়, দেখি ক্লিনসেভ করা, চশমা পরা যুবক কবির ছবি। ছবির নিচে লেখা- মজিদ মাহমুদ। জন্ম ১৬ এপ্রিল ১৯৬৬।

সম্মোহিতের মতো আমি বাকি কবিতাগুলো পড়তে থাকি…পড়তে থাকি। পড়ি আর ভাবি, মজিদ মাহমুদের কবিতায় কী যেন আছে…কী যেন আছে। সেই ‘কী যেন’টা আমাকে ভাবায়, উপলব্ধির জগতকে প্রসারিত করে, শিল্পরস যোগায়। মিরপুর দশ নম্বর আসতে আসতে প্রায় পঁচিশটির মতো কবিতা পড়া হয়ে যায়। টের পাই, আমি যেন বুঁদ হয়ে আছি। সত্যি, আমি যেন প্রকৃত কবিতা পাঠ করেছি। যে কবিতা পাঠ করলে পাঠক বুঁদ হয়, আমি সেই কবিতাই পাঠ করেছি। বাস থেকে নামার সময় টের পাই মাথার ভেতর কবিতার লাইনগুলো ঘুরপাক খাচ্ছেÑ ‘আর সুখের দিনে তোমাকে ভুলে যাব কী করে মাহফুজা/ আমার রক্ত এখন মনসুর হাল্লাজের মত ধ্বনি তোলে মাহফুজা।’ মুমিন যেমন কথার আগে পিছে তার খোদার নামটি জুড়ে দেয়, মজিদ মাহমুদও মানবমুমিন, কবিতার আগে পিছে তিনি মানুষী মাহফুজাকে জুড়ে দিয়েছেন। তাঁর মাহফুজা বন্দনা, তাঁর মানববন্দনা কবি হিসেবে তাঁর প্রতি আমার আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। ভেবেছিলাম, বইটি কবি হিলালীকে ফেরত দেব। এখন মনে হচ্ছে, না, বইটি ফেরত দেয়া যাবে না। এটি সংরক্ষণ করার মতো বই। হিলালী যা-ই মনে করুন না কেন, এটি সজ্ঞানে মেরে দেব।

হিলালী, আপনার দেয়া বইটি সজ্ঞানে মেরে দিলাম। এ জন্য আমার পক্ষ থেকে কোনো অনুতাপ নেই, দুঃখ প্রকাশও করব না। আপনি কবি মজিদ মাহমুদের কাছ থেকে আরেকটি বই সংগ্রহ করে নেবেন। আর তাঁকে আমার শুভেচ্ছা জানাবেন। বলবেন, স্বকৃত নোমান নামের জনৈক পাঠক আপনার কবিতার প্রশংসা করেছে। বলেছে, আপনার কবিতায় কী যেন আছে। আরো বলবেন, সত্তর পরবর্তী কবিতা সম্পর্কে আমার ভেতর যে উন্নাসিকতা ছিল তা কেটে গেছে। একজন নাদান পাঠক হিসেবে আমি সত্তর পরবর্তী কবিদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। আমি আজ থেকে আবার কবিতা পড়া শুরু করব। গত চল্লিশ বছরের প্রত্যেক কবির কবিতার বইগুলো সংগ্রহ করব। পড়ে দেখব, মজিদ মাহমুদের মতো আর কারো কবিতায় এমন প্রকৃত শিল্পসৃষ্টির প্রয়াস আছে কিনা, পাঠক হিসেবে আমাকে এতটা আন্দোলিত করতে পারে কিনা।

লেখক: কথাশিল্পী ও সাংবাদিক

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে ৬৮ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ

আমার এবাদত

আপডেট টাইম : ০৫:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ এপ্রিল ২০১৬

সত্তরের কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর পর বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গের আর কোনো কবির কবিতা পড়ার মতো পড়িনি। পড়ার মতো পড়া বলতে একেবারে গভীর পাঠ, কবিতাসমগ্র কিনে নিমগ্ন হয়ে পাঠ। হ্যাঁ, একেবারে যে পড়িনি তা নয়। পড়েছি তবে বিচ্ছিন্নভাবে। দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকীতে অথবা কোনো ছোটকাগজে। কোনো কেনো কবির কবিতা পড়ে খানিকটা আন্দোলিতও হয়েছি। সেই হিসেবে সত্তর-আশি ও নব্বই দশকে যারা কবিতা লিখেছেন, তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত না হলেও মোটামুটি ধারণা আছে বলা যায়।

স্বীকার করি, সত্তর পরবর্তীকালের কবিদের কবিতা ভালোভাবে না পড়াটা আমার চরম ব্যর্থতা। অন্যায়ও। শূন্য দশক সম্পর্কে তো আমার কেনো খোঁজই নেই। এই দশকের কবিদের চিনি, তবে কারা কেমন লেখেন সেই ব্যাপারে একেবারেই অজ্ঞ। কথাসাহিত্যের বিস্তারিত জগত সম্পর্কে খোঁজখবর রাখতে গিয়ে এই সময়ের বাংলা কবিতা আমার ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। তবে ভয়ে ভয়ে এও বলি, শূন্য দশকের অধিকাংশ কবির (আবার বলছি, সব কবি নয়, অধিকাংশ কবি) কবিতা আমার বুঝে আসে না। এই না বুঝে আসাটাও আমার ব্যর্থতা। বোঝার মতো জ্ঞান হয়ত অর্জন করতে পারিনি। ফলে গত প্রায় এক যুগের কবিদের কবিতা সম্পর্কে আমি মোটামুটি অজ্ঞ- এ কথা নিঃসন্দেহে বলতে পারি।

মজিদ মাহমুদ কোন দশকের কবি আমার ঠিক জানা নেই। সম্ভবত আশির দশকের। তার সঙ্গে আমার ভালোভাবে পরিচয়ও নেই। একবার কনকর্ডে সৈকত হাবিবের ‘প্রকৃতি’তে, একবার রূপসী বাংলা হোটেলের বলরুমে এবং একবার সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রের ছাদে- এই মোট তিনবার তার সঙ্গে দেখা হয় আমার। নিশ্চিত নই, এখন তার সঙ্গে দেখা হলে তিনি আমাকে চিনতে পারবেন কিনা।

সেদিন সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রের ছাদে কবি আলমগীর নিষাদ আমাকে বলেছিলেন, মজিদ মাহমুদের কথা। বলেছিলেন, মজিদ মাহমুদ ভালো কবি, ভালো কবিতা লেখেন। বলে মজিদ মাহমুদের কবিতার দুটি লাইনও আবৃত্তি করেছিলেন। নিষাদের কথাটা গুরুত্ব দেইনি। এই গুরুত্ব না দেয়ার কারণ হয়ত সত্তর পরবর্তী কবিদের সম্পর্কে আমার উন্নাসিকতা। নিষাদের কথাকে গুরুত্ব না দেয়ার পেছনে আরো কারণ আছে। ফরহাদ মজহারের পক্ষে তার একতরফা ওকালতি আমার ভালো লাগে না। ফরহাদ মজহার বড় কবি, সন্দেহ করি না। তার এরশাদবিরোধী কয়েকটি কবিতা এবং ‘এবাদতনামা’র কবিতাগুলো আমাকে আন্দোলিত করেছিল। ফলে তার প্রতি ভেতর থেকে একটা শ্রদ্ধাবোধও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে হেফাজত-জামায়াতের মধ্যযুগীয় ধ্যান-ধারণার পক্ষে তার ন্যাংটো তৎপরতার ফলে তার প্রতি আমার ভেতরের শ্রদ্ধাবোধটা উবে গেছে। এই উবে যাওয়ার কারণ, আমি মনে করি, কবিরা ভবিষ্যতের কথা বলবেন। ভবিষ্যতের পক্ষে ওকালতি করবেন। অন্ধকারকে প্রশয় দেবেন না। মধ্যযুগের নয়, কবিরা মানুষকে আলোকিত ভবিষ্যতের পথ দেখাবেন।

সে যাই হোক, বেশ কিছুদিন আগে একদিন কবি-প্রাবন্ধিক জাহেদ সরওয়ারের সঙ্গে ইটিসি বাসে চড়ে শাহবাগ থেকে মিরপুর যাচ্ছিলাম। কথা প্রসঙ্গে মজিদ মাহমুদ সম্পর্কে বললেন জাহেদ ভাই। নিষাদের কথারই পুনরাবৃত্তি করলেন, ‘মজিদ মাহমুদ ভালো কবি।’ নিষাদ ও জাহেদ সরওয়ার- দুজন কবির মুখে মজিদ মাহমুদের প্রশংসা শুনে তাঁর সম্পর্কে আগ্রহবোধ করি। কেমন ভালো কবি মজিদ মাহমুদ, পড়ে তো দেখতে হয়!

একদিন লেখকবন্ধুদের সঙ্গে শাহবাগ সড়কদ্বীপে বসে আড্ডা দিচ্ছি। কবি ও বাংলালিপি পত্রিকার সম্পাদক কুতুব হিলালীও ছিলেন সেখানে। তার ব্যাগ থেকে একটা বই বের করে তিনি আমার হাতে দিলেন। বইটি মজিদ মাহমুদের। নাম ‘মাহফুজামঙ্গল’। সঙ্গে একটি চিঠিও। চিঠিটা পরে হারিয়ে ফেলেছি, কী লেখা ছিল মনে নেই। সম্ভবত ‘মাহফুজামঙ্গলের পঁচিশ বছর’ এই জাতীয় কিছু। চিঠির প্রতি আমার কোনো আগ্রহ নেই, এমন আমন্ত্রণপত্রের প্রতি আমার আগ্রহ ছিল না কোনোদিনই। আগ্রহ বইটির প্রতি। মজিদ মাহমুদ ভালো কবি- দুজন কবি সাক্ষী দিয়েছেন, তাই তাঁর বইটিই আমার কাছে মূল্যবান। কুতুব হিলালী শর্ত দিয়েছিলেন, বইটি পড়ে যেন ফেরত দেই। বলেছিলাম, নিশ্চয় হিলালী। বই মেরে দেয়ার অভ্যেস আমার নেই।

বাসে উঠে বইটি খুলি। কথা প্রকাশ থেকে বের হওয়া। বেশি বড় নয়, মাত্র ৯৪ পৃষ্ঠার বই। পড়তে দুতিন ঘণ্টার বেশি লাগবে না। পড়তে শুরু করি। প্রথম কবিতা ‘কুরশিনামা’। কবিতার শুরুটা এমন :

ঈশ্বরকে ডাক দিলে মাহফুজা সামনে এসে দাঁড়ায়

আমি প্রার্থনার জন্য যতবার হাত তুলি সন্ধ্যা বা সকালে

সেই নারী এসে আমার হৃদয় তোলপাড় করে যায়।

তখন আমার রুকু

আমার সেজদা

জায়নামাজ চেনে না

সাষ্টাঙ্গে আভূমি লুণ্ঠিত হই।

লাইন কটি পড়ে খানিকটা চমকে ওঠি। মনে হলো, ঈশ্বরকে খারিজ করে দিয়ে যে কবি কাব্যের প্রথম কটি লাইনেই মানুষকে মহান করে তুললেন, তার পরবর্তী কবিতাগুলো ভালো না হয়ে পারে না। আমার খুলির ভেতর ঘুরপাক খায় লালনের পংক্তি- ‘মানুষে মনস্কামনা সিদ্ধ কর বর্তমানে/ চৌদ্দ ভুবন ঘুরাই নিশান এই মানুষের মনভুবনে।’ মজিদ মাহমুদ যেন আধুনিক ভাষায়, আধুনিক আঙ্গিকে লালনের কথারই পুনরাবৃত্তি করলেন। পাঠক হিসেবে আমার সামনে মাহফুজা নারী নয়, প্রেমিকা নয়, বেশ্যা নয়, কন্যা নয়, মাতা নয়- সমগ্র মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে হাজির হয়। মাহফুজা আমার সাষ্টাঙ্গ দখল করে নেয়। আমি পৃষ্ঠা ওল্টাই। দ্বিতীয় কবিতা ‘এবাদত’। কবিতাটির শুরু এভাবে : মাহফুজা তোমার শরীর আমার তছবির দানা/ আমি নেড়েচেড়ে দেখি আর আমার এবাদত হয়ে যায়।

কী ভয়ঙ্কর কথা! এবারও লালন এসে আমার কানে কানে বলে যান- ‘পড়গে নামাজ জেনে শুনে/নিয়ত করগে মানুষ কেবলা জেনে।’ নিজেকেই প্রশ্ন করি- ‘এবাদত’ কবিতার রচয়িতা কি লালন?মানুষ কি সত্যি পুনর্জন্ম গ্রহণ করতে পারে?লালন কি তবে আবার জন্ম নিয়ে মজিদ মাহমুদ নাম গ্রহণ করলেন? পেছনের মলাট উল্টাই। লালন নয়, দেখি ক্লিনসেভ করা, চশমা পরা যুবক কবির ছবি। ছবির নিচে লেখা- মজিদ মাহমুদ। জন্ম ১৬ এপ্রিল ১৯৬৬।

সম্মোহিতের মতো আমি বাকি কবিতাগুলো পড়তে থাকি…পড়তে থাকি। পড়ি আর ভাবি, মজিদ মাহমুদের কবিতায় কী যেন আছে…কী যেন আছে। সেই ‘কী যেন’টা আমাকে ভাবায়, উপলব্ধির জগতকে প্রসারিত করে, শিল্পরস যোগায়। মিরপুর দশ নম্বর আসতে আসতে প্রায় পঁচিশটির মতো কবিতা পড়া হয়ে যায়। টের পাই, আমি যেন বুঁদ হয়ে আছি। সত্যি, আমি যেন প্রকৃত কবিতা পাঠ করেছি। যে কবিতা পাঠ করলে পাঠক বুঁদ হয়, আমি সেই কবিতাই পাঠ করেছি। বাস থেকে নামার সময় টের পাই মাথার ভেতর কবিতার লাইনগুলো ঘুরপাক খাচ্ছেÑ ‘আর সুখের দিনে তোমাকে ভুলে যাব কী করে মাহফুজা/ আমার রক্ত এখন মনসুর হাল্লাজের মত ধ্বনি তোলে মাহফুজা।’ মুমিন যেমন কথার আগে পিছে তার খোদার নামটি জুড়ে দেয়, মজিদ মাহমুদও মানবমুমিন, কবিতার আগে পিছে তিনি মানুষী মাহফুজাকে জুড়ে দিয়েছেন। তাঁর মাহফুজা বন্দনা, তাঁর মানববন্দনা কবি হিসেবে তাঁর প্রতি আমার আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। ভেবেছিলাম, বইটি কবি হিলালীকে ফেরত দেব। এখন মনে হচ্ছে, না, বইটি ফেরত দেয়া যাবে না। এটি সংরক্ষণ করার মতো বই। হিলালী যা-ই মনে করুন না কেন, এটি সজ্ঞানে মেরে দেব।

হিলালী, আপনার দেয়া বইটি সজ্ঞানে মেরে দিলাম। এ জন্য আমার পক্ষ থেকে কোনো অনুতাপ নেই, দুঃখ প্রকাশও করব না। আপনি কবি মজিদ মাহমুদের কাছ থেকে আরেকটি বই সংগ্রহ করে নেবেন। আর তাঁকে আমার শুভেচ্ছা জানাবেন। বলবেন, স্বকৃত নোমান নামের জনৈক পাঠক আপনার কবিতার প্রশংসা করেছে। বলেছে, আপনার কবিতায় কী যেন আছে। আরো বলবেন, সত্তর পরবর্তী কবিতা সম্পর্কে আমার ভেতর যে উন্নাসিকতা ছিল তা কেটে গেছে। একজন নাদান পাঠক হিসেবে আমি সত্তর পরবর্তী কবিদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। আমি আজ থেকে আবার কবিতা পড়া শুরু করব। গত চল্লিশ বছরের প্রত্যেক কবির কবিতার বইগুলো সংগ্রহ করব। পড়ে দেখব, মজিদ মাহমুদের মতো আর কারো কবিতায় এমন প্রকৃত শিল্পসৃষ্টির প্রয়াস আছে কিনা, পাঠক হিসেবে আমাকে এতটা আন্দোলিত করতে পারে কিনা।

লেখক: কথাশিল্পী ও সাংবাদিক