ঢাকা , শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা দেবে সরকার: কৃষিমন্ত্রী ভারি বর্ষণ নিয়ে যে বার্তা দিল আবহাওয়া অফিস প্রাথমিক-মাধ্যমিকে ১৩৩ বই পরিমার্জন, আসছে চার নতুন বই গ্রামাঞ্চলেও সমান গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসাসেবা প্রদানের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর চট্টগ্রামে পানিবন্দি সাড়ে ৪ লাখ মানুষ, তীব্র খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ বিশ্বকাপে ইতিহাস গড়ে ইয়ামাল বললেন, ফ্রান্স যদি কাউকে ভয় পায় সেটা স্পেন নিজেই গাড়ি চালিয়ে স্ত্রীর ক্যাম্পাসে প্রধানমন্ত্রী ইমাম-খতিবদের উদ্দেশে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সতর্কবার্তা অনেকে নিরুৎসাহিত করলেও হাল ছাড়েননি হামিদুল্লাহ, বিক্রি প্রায় ২ লাখ বিয়ের অনুমতি নিতেই মোটা টাকা খরচ টেইলর সুইফটের

মধুর সম্পর্ক থেকে তিক্ততা, কেন মুখোমুখি পাকিস্তান-আফগানিস্তান

সীমান্তে টানা উত্তেজনার মধ্যে পাকিস্তান নতুন করে বড় সামরিক অভিযানের ঘোষণা দিয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মুখপাত্র মোশাররফ জাইদি জানিয়েছেন, অপারেশন ‘গজব লিল হক’-এ আফগান তালেবানের ২৭টি সামরিক পোস্ট ধ্বংস এবং ৯টি দখল করা হয়েছে। জাইদির দাবি, অভিযানে ৮০টিরও বেশি ট্যাংক, কামান ও এপিসি ধ্বংস করা হয়েছে। তবে তালেবান পাল্টা দাবি করেছে, তারা পাকিস্তানের ১৯টি সামরিক চৌকি ও দুটি ঘাঁটি দখল করেছে এবং ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছেন। উভয় পক্ষের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন।

পাল্টাপাল্টি দাবির পেছনে কয়েক বছরের জমে থাকা অবিশ্বাস ও বিরোধ কাজ করছে। ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান কাবুলের ক্ষমতা দখল করলে পাকিস্তানে অনেকেই এটিকে কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখেছিলেন। ধারণা করা হয়েছিল, কাবুলে মিত্র শক্তি প্রতিষ্ঠা পেলে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ইসলামাবাদের প্রভাব আরও বাড়বে। সেই সময়ে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ রাশিদ আহমেদ বলেছিলেন, তালেবানের দ্রুত ক্ষমতা দখল একটি নতুন জোট তৈরি করবে। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তালেবানের প্রত্যাবর্তনকে আফগান জনগণের দাসত্বের শিকল ভাঙা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। কথাবার্তায় ছিল আশাবাদ, কূটনীতিতে উষ্ণতা।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। ২০২৪ সালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী আফগানিস্তানে দুবার বিমান হামলা চালায়। ইসলামাবাদ বলছে, হামলাগুলো টিটিপি বা তেহরিক-ই তালেবান পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। কিন্তু কাবুলের দৃষ্টিতে এটি তাদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন।

পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে তালেবানকে আশ্রয় ও সমর্থন দিয়েছে। ২০০১ সালের পর তালেবান সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থান নিয়েছে। কোয়েটা, পেশোয়ার, করাচি সহ বিভিন্ন শহর তাদের জন্য নিরাপদ জায়গা হিসেবে পরিচিত ছিল। পাকিস্তানের মাদ্রাসাগুলোতেও বহু তালেবান নেতা শিক্ষা নিয়েছেন। সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে।

তবে ক্ষমতায় এসে তালেবান নিজেদের অবস্থান নতুনভাবে সাজাতে শুরু করে। তারা আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়কে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং পাকিস্তানের সরাসরি প্রভাব কমাতে চাইছে। ডুরান্ড লাইন ইস্যু এই তিক্ততার বড় কারণ। ঔপনিবেশিক সময়ে নির্ধারিত এই সীমান্ত পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিলেও আফগানিস্তান কখনও মেনে নি। তালেবানও পূর্বসূরি সরকারের মতো সীমান্ত মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, ফলে কাঁটাতার, টহল ও চৌকি নিয়ে উত্তেজনা বেড়েছে।

টিটিপি ইস্যুও উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা বেড়েছে বলে ইসলামাবাদের দাবি। পাকিস্তান চায় আফগান ভূখণ্ডে থাকা টিটিপি নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু তালেবান বলছে, এটি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা।

পাকিস্তানের সামরিক পদক্ষেপ আফগান জনগণের মধ্যে পাকিস্তানবিরোধী মনোভাব বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের ভেতরেও পশতুন জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে তালেবান সামরিকভাবে শক্ত অবস্থানে নেই এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একঘরে। ফলে প্রকাশ্যে কঠোর ভাষা ব্যবহার করলেও তাদের বিকল্প সীমিত।

সব মিলিয়ে একসময়কার মিত্র দুই পক্ষ এখন অবিশ্বাস, সীমান্ত বিরোধ, সন্ত্রাস ও সামরিক পদক্ষেপের জটিল সমীকরণে আটকে গেছে। আঞ্চলিক শান্তি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার কথাও থাকলেও বাস্তবতা বলছে, সম্পর্ক এখন তিক্ত ও অনিশ্চিত এক মোড়ে দাঁড়িয়ে। তথ্যসূত্র : আল-জাজিরা

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা দেবে সরকার: কৃষিমন্ত্রী

মধুর সম্পর্ক থেকে তিক্ততা, কেন মুখোমুখি পাকিস্তান-আফগানিস্তান

আপডেট টাইম : ১০:৫৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সীমান্তে টানা উত্তেজনার মধ্যে পাকিস্তান নতুন করে বড় সামরিক অভিযানের ঘোষণা দিয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মুখপাত্র মোশাররফ জাইদি জানিয়েছেন, অপারেশন ‘গজব লিল হক’-এ আফগান তালেবানের ২৭টি সামরিক পোস্ট ধ্বংস এবং ৯টি দখল করা হয়েছে। জাইদির দাবি, অভিযানে ৮০টিরও বেশি ট্যাংক, কামান ও এপিসি ধ্বংস করা হয়েছে। তবে তালেবান পাল্টা দাবি করেছে, তারা পাকিস্তানের ১৯টি সামরিক চৌকি ও দুটি ঘাঁটি দখল করেছে এবং ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছেন। উভয় পক্ষের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন।

পাল্টাপাল্টি দাবির পেছনে কয়েক বছরের জমে থাকা অবিশ্বাস ও বিরোধ কাজ করছে। ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান কাবুলের ক্ষমতা দখল করলে পাকিস্তানে অনেকেই এটিকে কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখেছিলেন। ধারণা করা হয়েছিল, কাবুলে মিত্র শক্তি প্রতিষ্ঠা পেলে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ইসলামাবাদের প্রভাব আরও বাড়বে। সেই সময়ে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ রাশিদ আহমেদ বলেছিলেন, তালেবানের দ্রুত ক্ষমতা দখল একটি নতুন জোট তৈরি করবে। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তালেবানের প্রত্যাবর্তনকে আফগান জনগণের দাসত্বের শিকল ভাঙা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। কথাবার্তায় ছিল আশাবাদ, কূটনীতিতে উষ্ণতা।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। ২০২৪ সালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী আফগানিস্তানে দুবার বিমান হামলা চালায়। ইসলামাবাদ বলছে, হামলাগুলো টিটিপি বা তেহরিক-ই তালেবান পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। কিন্তু কাবুলের দৃষ্টিতে এটি তাদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন।

পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে তালেবানকে আশ্রয় ও সমর্থন দিয়েছে। ২০০১ সালের পর তালেবান সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থান নিয়েছে। কোয়েটা, পেশোয়ার, করাচি সহ বিভিন্ন শহর তাদের জন্য নিরাপদ জায়গা হিসেবে পরিচিত ছিল। পাকিস্তানের মাদ্রাসাগুলোতেও বহু তালেবান নেতা শিক্ষা নিয়েছেন। সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে।

তবে ক্ষমতায় এসে তালেবান নিজেদের অবস্থান নতুনভাবে সাজাতে শুরু করে। তারা আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়কে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং পাকিস্তানের সরাসরি প্রভাব কমাতে চাইছে। ডুরান্ড লাইন ইস্যু এই তিক্ততার বড় কারণ। ঔপনিবেশিক সময়ে নির্ধারিত এই সীমান্ত পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিলেও আফগানিস্তান কখনও মেনে নি। তালেবানও পূর্বসূরি সরকারের মতো সীমান্ত মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, ফলে কাঁটাতার, টহল ও চৌকি নিয়ে উত্তেজনা বেড়েছে।

টিটিপি ইস্যুও উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা বেড়েছে বলে ইসলামাবাদের দাবি। পাকিস্তান চায় আফগান ভূখণ্ডে থাকা টিটিপি নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু তালেবান বলছে, এটি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা।

পাকিস্তানের সামরিক পদক্ষেপ আফগান জনগণের মধ্যে পাকিস্তানবিরোধী মনোভাব বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের ভেতরেও পশতুন জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে তালেবান সামরিকভাবে শক্ত অবস্থানে নেই এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একঘরে। ফলে প্রকাশ্যে কঠোর ভাষা ব্যবহার করলেও তাদের বিকল্প সীমিত।

সব মিলিয়ে একসময়কার মিত্র দুই পক্ষ এখন অবিশ্বাস, সীমান্ত বিরোধ, সন্ত্রাস ও সামরিক পদক্ষেপের জটিল সমীকরণে আটকে গেছে। আঞ্চলিক শান্তি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার কথাও থাকলেও বাস্তবতা বলছে, সম্পর্ক এখন তিক্ত ও অনিশ্চিত এক মোড়ে দাঁড়িয়ে। তথ্যসূত্র : আল-জাজিরা