কিশোরগঞ্জের মিঠামইনের বিস্তীর্ণ হাওরের আকাশজুড়ে তখনও যেন ঝুলে ছিল শোকের ভারী মেঘ। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল স্বজনের দীর্ঘশ্বাস, সহকর্মীদের নীরব কান্না আর হাজারো মানুষের বুকচাপা বেদনা। সেই অশ্রুসিক্ত বিদায়ের মধ্যেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন সন্ত্রাসী হামলায় নিহত মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি এএইচএম জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর। তার রক্তাক্ত প্রস্থান শুধু একটি পরিবারের স্বপ্নই ভেঙে দেয়নি; যেন পুরো হাওর জনপদের হৃদয়ে এঁকে দিয়েছে এক গভীর শোকের কালো রেখা। জল আর আকাশের এই বিস্তীর্ণ ভূখ-ে সেদিন মানুষের চোখের জলই যেন হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে নীরব ভাষাÑএকটি নির্মম হত্যাকা-ের বিরুদ্ধে শোক, ক্ষোভ ও অপূরণীয় শূন্যতার ভাষা।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) বাদ জুমা জেলার মিঠামইন উপজেলা সদরের হেলিপ্যাড প্রাঙ্গণে হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় তার নামাজে জানাজা। পরে কাঠবাজার সংলগ্ন পারিবারিক কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক শোকের আবহে তাকে দাফন করা হয়। জানাজায় বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম এমপি, কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান, কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম, জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাজী ইসরাইল মিয়াসহ জেলা ও উপজেলা বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী, সমর্থকসহ দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। মিঠামইন হেলিপ্যাড প্রাঙ্গণজুড়ে তখন ছিল কান্না, দোয়া আর হত্যাকা-ের বিচার দাবিতে নীরব প্রতিজ্ঞার এক বেদনাময় পরিবেশ।
জানাজার আগে সমবেত মুসল্লিদের উদ্দেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম এমপি বলেন, “এই নৃশংস হত্যাকা-ের পেছনে যারা যত শক্তিশালীই হোক, যারাই জড়িত থাকুক, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আমাদের আশ্বস্ত করেছেন-অপরাধীরা গ্রেপ্তার হবে এবং আইনের মুখোমুখি দাঁড়াবে।”
আবেগঘন বক্তব্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান এমপি বলেন, “হাওরের ইতিহাসে এমন নির্মম ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি। ঢাকা থেকে ভাড়াটে সন্ত্রাসী এনে জাহাঙ্গীরের মতো একজন রাজনৈতিক কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে; এ দৃশ্য এই জনপদ কখনও দেখেনি। আমি যদি আর কিছুদিন বেঁচে থাকি, আর আমার দল যদি রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকে, তবে এই হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত একজনও রেহাই পাবে না।”
কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম বলেন, “অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে আমাদের সকলের প্রিয় জাহাঙ্গীরকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় সরাসরি জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে বলে আমি আশা করি।”
এর আগে প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম, ফজলুর রহমান এমপি ও মাজহারুল ইসলাম এমপি, হাজী ইসরাইল মিয়াসহ নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে কামালপুর গ্রামের নিজ বাড়িতে গিয়ে নিহত জাহাঙ্গীরের মরদেহে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তারা শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সান্ত¡না দেন এবং কফিনে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মাধ্যমে শেষ গভীর শ্রদ্ধা জানান। স্বজনদের আহাজারিতে তখন পুরো বাড়ির পরিবেশ হয়ে ওঠে ভারাক্রান্ত; যেন একটি পরিবারের নয়, পুরো হাওরের বুকেই নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
উল্লেখ্য, গত বুধবার (১৫ জুলাই) রাত সাড়ে ৯টার দিকে দলীয় কর্মী হাদিস মিয়াকে সঙ্গে নিয়ে মিঠামইন বাজার থেকে নিজ বাড়ির উদ্দেশে ফিরছিলেন মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি এএইচএম জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর। পথে উপজেলার বেড়িবাঁধ এলাকার বাগানবাড়ির সামনে আগে থেকেই ওঁত পেতে থাকা সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা অতর্কিত হামলা চালায়। অভিযোগ রয়েছে, চাপাতিসহ ধারালো অস্ত্রে সজ্জিত তিন হামলাকারী মুহূর্তেই তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। রক্তাক্ত জাহাঙ্গীরকে বাঁচাতে এগিয়ে গেলে হামলাকারীদের আঘাত থেকে রেহাই পাননি তার সঙ্গী হাদিস মিয়াও; তিনিও গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা দ্রুত দু’জনকে উদ্ধার করে প্রথমে মিঠামইন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে রাত সাড়ে ১১টার দিকে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. আনন্দ বসাক জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরকে মৃত ঘোষণা করেন। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে হাওরের জনপদ হারায় এক পরিচিত রাজনৈতিক মুখ, আর নৃশংস সেই হামলা পরিণত হয় সমগ্র অঞ্চলের শোক ও ক্ষোভের প্রতীকে।
এ ঘটনায় পুলিশ তিন সন্দেহভাজন ভাড়াটে হামলাকারীকে আটক করেছে। তারা হলেনÑবরগুনার বামনা উপজেলার চালিতাবুনিয়া গ্রামের মো. হেলাল (২৫), লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার দুধরাজপুর গ্রামের মো. মহিন উদ্দিন (৩২) এবং একই উপজেলার মধ্যপাড়া গ্রামের মো. শাকিল হোসেন ওরফে শাহীন (২৫)।
জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরের রক্তাক্ত বিদায়ের পর হাওরের জনপদে এখন একটাই প্রশ্ন; কার নির্দেশে, কী উদ্দেশ্যে এবং কোন ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এই হত্যাকা- সংঘটিত হলো? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তাকিয়ে আছে শোকাহত পরিবার, রাজনৈতিক অঙ্গন এবং সমগ্র হাওরবাসী। তাদের প্রত্যাশা; শুধু ভাড়াটে ঘাতক নয়, এই হত্যার নেপথ্যে থাকা প্রতিটি কুশীলবও আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়াবে, আর জাহাঙ্গীর হত্যার বিচারই হবে তার প্রতি সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক শ্রদ্ধাঞ্জলি।
মিঠামইন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনোয়ার হোসেন বলেন, এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া তিন আসামিকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাদের দেওয়া তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করে হত্যাকা-ের নেপথ্যের পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা এবং জড়িত অন্যান্য ব্যক্তিদের শনাক্তে তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 
























