চার বছর অপেক্ষার অবসান। ফুটবলের দুই পরাশক্তি আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মহারণ দিয়ে পর্দা নামছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের। আজ যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় দিবাগত রাত ১টায় শুরু হবে আর্জেন্টিনা-স্পেন টানটান উত্তেজনার এই ফাইনাল। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর দৃষ্টি থাকবে এই মহারণে যেখানে বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি জয়ের লড়াইয়ে মুখোমুখি হবেন অভিজ্ঞ লিওনেল মেসি এবং তরুণ লামিন ইয়ামাল। এই ফাইনাল শুধু একটি ট্রফির লড়াই নয়; এটি দুই প্রজন্ম, দুই দর্শন এবং দুই ফুটবল সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণের মঞ্চও। একদিকে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের বিরল কীর্তি গড়তে চায়, অন্যদিকে ২০১০ সালের পর আবারো বিশ্বকাপ জিতে নতুন স্বর্ণযুগের সূচনা করতে মরিয়া স্পেন।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে আর্জেন্টিনা এখন পর্যন্ত তিনবার শিরোপা জিতেছে। কাতার ২০২২-এর সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এবার তারা টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের দ্বারপ্রান্তে। ব্রাজিল (১৯৫৮ ও ১৯৬২) এবং ইতালির (১৯৩৪ ও ১৯৩৮) পর তৃতীয় দল হিসেবে ব্যাক-টু-ব্যাক বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি গড়ার সুযোগ রয়েছে লিওনেল স্কালোনির শিষ্যদের সামনে। বিপরীতে স্পেনের লক্ষ্য দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়, যা তাদের আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সফল প্রজন্মকে আরো সমৃদ্ধ করবে।
ফাইনালে ওঠার পথে দুই দলের যাত্রাও ছিল ভিন্ন স্বাদের। স্পেন নকআউট পর্বে অস্ট্রিয়া, পর্তুগাল, বেলজিয়াম এবং সেমিফাইনালে শক্তিশালী ফ্রান্সকে হারিয়ে দুর্দান্ত আত্মবিশ্বাস নিয়ে ফাইনালে এসেছে। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে তাদের রক্ষণ ছিল অসাধারণ দৃঢ়, আর মাঝমাঠে রদ্রির নেতৃত্বে বলের দখল ও পাসিং ফুটবল প্রতিপক্ষকে বারবার অসহায় করে তুলেছে। পাশাপাশি আর্জেন্টিনার পথ ছিল অনেক বেশি নাটকীয়। নকআউট পর্বে কেপ ভার্দে, মিসর, সুইজারল্যান্ড এবং সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে গুঁড়িয়ে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছে তারা। বেশ কয়েকটি ম্যাচে পিছিয়ে পড়েও ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা দেখিয়েছে আলবিসেলেস্তেরা। বড় ম্যাচে চাপ সামলে জয়ের অভ্যাসই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠেছে।
এই ফাইনালের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নিঃসন্দেহে লিওনেল মেসি। ৩৯ বছর বয়সেও যেন তিনি টগবগে তরুণ। সময়কে হার মানিয়ে খেলছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। পুরো টুর্নামেন্টে গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে দলের আক্রমণের মূল ভরসা তিনি। অনেকের ধারণা, এটি হতে পারে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ। ফলে বিদায়বেলায় আরেকটি বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তোলার অনুপ্রেরণা মেসি ও তার সতীর্থদের বাড়তি শক্তি জোগাবে। স্কালোনিও বলেছেন, মেসি ‘বিশুদ্ধ ইতিহাস’, আর তাকে মাঠে যতদিন দেখা যায়, ততদিন উপভোগ করা উচিত। এদিকে স্পেনের প্রতীক হয়ে উঠেছেন ১৯ বছর বয়সী লামিন ইয়ামাল। ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপে আলো ছড়ানোর পর বিশ্বকাপেও তিনি নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তার গতি, ড্রিবলিং এবং সৃজনশীলতা স্পেনের আক্রমণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ইয়ামালের পাশাপাশি রদ্রি, পাউ কুবারসি, নিকো উইলিয়ামস ও মিকেল মেরিনোর মতো ফুটবলাররা স্পেনকে ভারসাম্যপূর্ণ দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কৌশলগত দিক থেকেও ফাইনাল ম্যাচটি হতে যাচ্ছে দারুণ উপভোগ্য। স্পেন বরাবরের মতো বলের দখল রেখে ছোট ছোট পাসে আক্রমণ গড়ে তুলতে চাইবে। তাদের লক্ষ্য থাকবে মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে ফেলা। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা অপেক্ষাকৃত সরাসরি আক্রমণ, দ্রুত ট্রানজিশন এবং পাল্টা-আক্রমণে বেশি কার্যকর। মাঝমাঠে এনজো ফার্নান্দেজ ও ম্যাক অ্যালিস্টারের ভূমিকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ হবে, তেমনি সামনে লাউতারো মার্তিনেজের ফিনিশিংও ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে।
রক্ষণেও দু’দলই বেশ শক্তিশালী। স্পেন পুরো টুর্নামেন্টে খুব কম সুযোগ প্রতিপক্ষকে দিয়েছে। আর আর্জেন্টিনার গোলপোস্টে এমিলিয়ানো মার্তিনেজ বড় ম্যাচের নির্ভরতার প্রতীক। টাইব্রেকারে তার মানসিক দৃঢ়তা প্রতিপক্ষের জন্য সব সময়ই বাড়তি চাপ তৈরি করে। ফলে ম্যাচ অতিরিক্ত সময় কিংবা টাইব্রেকারে গড়ালেও আর্জেন্টিনা নিজেদের এগিয়ে রাখতেই পারে। এই ফাইনালকে অনেকেই দেখছেন অতীত ও ভবিষ্যতের প্রতীকী লড়াই হিসেবে। একদিকে মেসির শেষ অধ্যায়, অন্যদিকে ইয়ামালের নতুন যুগের সূচনা। আবার এটি ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন বনাম দক্ষিণ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নেরও শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। সাবেক বার্সেলোনা তারকা জাভি হার্নান্দেজ ও হাভিয়ের মাসচেরানোও মনে করেন, দু’দলের খেলার ধরনে বার্সেলোনার ফুটবল দর্শনের গভীর প্রভাব রয়েছে, যা এই ম্যাচকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলবে। পরিসংখ্যান, সাম্প্রতিক ফর্ম এবং স্কোয়াডের গভীরতা বিবেচনায় ম্যাচটিতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। স্পেনের সংগঠিত ফুটবলের বিপরীতে আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞতা, লড়াকু মানসিকতা এবং বড় ম্যাচ জয়ের অভ্যাসÑ এই তিনটি উপাদান ফাইনালকে অনিশ্চয়তার চূড়ায় নিয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত কে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট মাথায় উঠাবে, তার উত্তর মিলবে মাঠেই। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, আজ মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফুটবল বিশ্ব সাক্ষী হতে যাচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত ও মর্যাদাপূর্ণ এক বিশ্বকাপ ফাইনালের।

বাঙ্গালী কণ্ঠ ডেস্ক 
























