ঢাকা , মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কাল যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন, কী অপেক্ষা করছে ট্রাম্পের ভাগ্যে

যুক্তরাষ্ট্রে আগামীকাল মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই নির্বাচন দেশটির রাজনৈতিক গতিপথ বদলে দিতে পারে। একই সঙ্গে নির্ধারিত হবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতায় থাকার শেষ দুই বছরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। খবর: রয়টার্স, বিসিসি।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের চার বছর মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় বলে একে মধ্যবর্তী নির্বাচন বলা হয়। এতে প্রেসিডেন্ট নিজে নির্বাচনে অংশ নেন না। তবে এই নির্বাচনকে সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ও তার রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন হিসেবে দেখা হয়।

বর্তমানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি হোয়াইট হাউসের পাশাপাশি কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটরা আবারও কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে চায়। আর রিপাবলিকানদের লক্ষ্য নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখা।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান কংগ্রেসের নতুন সদস্য নির্বাচিত হবেন। প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে এবং ১০০ সদস্যের সিনেটের ৩৫টি আসনে ভোট হবে। এর মধ্যে ফ্লোরিডা ও ওহাইও অঙ্গরাজ্যে দুটি বিশেষ নির্বাচনও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ছেড়ে দেওয়া আসন পূরণে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ ছাড়া ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচিত করবেন ভোটাররা।

প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যরা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধিত্ব করেন। তাদের মেয়াদ দুই বছর। অন্যদিকে সিনেটরদের মেয়াদ ছয় বছর। প্রতি ১০ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের জনশুমারির ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যগুলোর জনসংখ্যা অনুযায়ী প্রতিনিধি পরিষদের আসন বণ্টন করা হয়। সবচেয়ে জনবহুল অঙ্গরাজ্য ক্যালিফোর্নিয়ায় রয়েছে ৫২টি আসন। আর ওয়াইয়োমিং ও ভারমন্টের মতো কম জনসংখ্যার অঙ্গরাজ্যগুলোতে রয়েছে একটি করে আসন।

প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে কোনো দলকে অন্তত ২১৮টি আসন নিশ্চিত করতে হয়। বর্তমানে রিপাবলিকানদের দখলে রয়েছে ২১৮টি আসন। ডেমোক্র্যাটদের রয়েছে ২১৪টি। একজন স্বতন্ত্র সদস্য রিপাবলিকানদের সঙ্গে অবস্থান করছেন। আর দুটি আসন শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে একটি আসন আগে রিপাবলিকান এবং অন্যটি ডেমোক্র্যাট সদস্যের দখলে ছিল। নতুন নির্বাচিত প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যরা ২০২৭ সালের ৩ জানুয়ারি শপথ নেবেন।

এবারের নির্বাচন এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, দেশটি যুদ্ধে জড়িত এবং ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেয়াদের সময়ও কমে আসছে। ফলে নির্বাচনের ফলাফলের ওপর আগামী দুই বছরের আইন প্রণয়ন ও সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান অনেকটাই নির্ভর করবে।

এদিকে নির্বাচন সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কয়েক দশকের প্রচলিত রীতির বাইরে গিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বিচার বিভাগ সরাসরি নির্বাচনী বিরোধে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সাধারণত কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর সুবিধার জন্য আইন প্রয়োগের ক্ষমতা ব্যবহার হচ্ছে—এমন ধারণা তৈরি এড়াতে বিচার বিভাগ নির্বাচনী বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নেয়।

ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রায় ২০ হাজার ভোটারের ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট আলাদা করে রাখার আবেদন করেছিল বিচার বিভাগ। তাদের অভিযোগ, এসব ভোটারের অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক নন এবং আইন অনুযায়ী তাদের ভোট দেওয়ার অধিকার নেই। এ ঘটনায় বিচার বিভাগ একটি ফৌজদারি তদন্তের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট নথিও চেয়েছে। তবে ক্যালিফোর্নিয়া কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অ-নাগরিকদের ভোট দেওয়া ঠেকাতে তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রয়েছে। একই সঙ্গে ব্যালট আটকে দেওয়ার বিষয়ে বিচার বিভাগের আইনগত ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে রাজ্যটি। আদালত বিচার বিভাগের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে।

আলাস্কায়ও একই ধরনের আইনি বিরোধ তৈরি হয়েছে। সেখানে রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সুলিভানের সঙ্গে একই নামের একজন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। বিচার বিভাগের অভিযোগ, ভোটারদের বিভ্রান্ত করতেই এই প্রার্থীকে নির্বাচনে আনা হয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মেরি পেলটোলার প্রচারশিবির অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ড্যানিয়েল জে. সুলিভানকে নির্বাচনে অংশ নিতে উৎসাহিত করার সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে পেলটোলার প্রচারশিবির এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, দুই সুলিভানের কোনো প্রচারশিবিরের সঙ্গেই তাদের সম্পৃক্ততা নেই।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই বিচার বিভাগকে আলাস্কা নিয়ে মামলা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় বলা হয়েছিল, ভোটের ব্যবধান কম হলে ভোটারদের বিভ্রান্তির সম্ভাবনা তদন্ত করতে হবে এবং ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন বা প্রত্যয়ন করা বন্ধ রাখতে হবে। তবে আলাস্কার ফেডারেল বিচারক শ্যারন গ্লিসন রোববার মামলাটি খারিজ করে দেন। তার মতে, ভোটের গোপনীয়তা বজায় রেখে এ ধরনের তদন্ত করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব মূলত অঙ্গরাজ্যগুলোর। বিচার বিভাগ এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে।

সমালোচকদের আশঙ্কা, নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে সন্দেহ তৈরির যেকোনো প্রচেষ্টায় বিচার বিভাগের এই ভূমিকা ব্যবহার করা হতে পারে। এর ফলে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গভর্নর নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

এর আগে ২০২০ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর ট্রাম্প ব্যাপক ভোট জালিয়াতির অভিযোগ করেছিলেন। তবে স্বাধীন গবেষণা ও বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের নিরীক্ষায় ভোট জালিয়াতির ঘটনা বিরল বলে উঠে এসেছে। ওই নির্বাচনের ফল চ্যালেঞ্জ করে ট্রাম্পের সমর্থক বিভিন্ন সংগঠন ৬০টির বেশি মামলা করেছিল। তবে সবগুলোই ব্যর্থ হয়। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে বিচার বিভাগের কর্মকর্তারাও এসব প্রচেষ্টায় বিভাগকে যুক্ত করার চাপ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব অঙ্গরাজ্যগুলোর। তবে ট্রাম্পের অভিযোগ, ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণাধীন অঙ্গরাজ্যগুলো অ-নাগরিকদের ভোট দেওয়া ঠেকাতে যথেষ্ট ব্যবস্থা নিচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, দেশটির নাগরিক নন এমন ব্যক্তিদের ফেডারেল নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই।

ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন বিচার বিভাগের সাবেক কর্মকর্তারাও। আগে নির্বাচনী আইন ও নাগরিক অধিকারসংক্রান্ত হুমকি মোকাবিলায় বিচার বিভাগের নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনাকারী কর্মকর্তাদের নেতৃত্ব দেওয়া মার্ক ব্লুমবার্গ বলেছেন, প্রশাসন বিচার বিভাগকে এমনভাবে ব্যবহার করতে চাইছে, যা আগে নিষিদ্ধ ছিল। তার মতে, বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা জরুরি।

রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সময় ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করা পিটার কেইসলারও বলেছেন, রাজনৈতিক বিরোধে বিচার বিভাগের পক্ষ নেওয়ার ধারণা তৈরি হলে আইন প্রয়োগের সিদ্ধান্তের ওপর মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তবে অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ দাবি করেছেন, বিচার বিভাগের পদক্ষেপ আইনসম্মত এবং ভোটের স্বচ্ছতা রক্ষার উদ্দেশ্যেই নেওয়া হয়েছে। বিভাগের মুখপাত্র কিয়েরস্টেন পেলস বলেছেন, কোনো নির্বাচনী প্রচারশিবিরকে সহায়তা করা হচ্ছে না; বরং আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে।

বিচার বিভাগের নির্বাচনী তদন্তের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এনেছে ট্রাম্প প্রশাসন। আগে নির্বাচনী আইন নিয়ে কাজ করা অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত পাবলিক ইন্টিগ্রিটি বিভাগের পরামর্শ নেওয়া হতো। নির্বাচনের ফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যয়নের আগে তদন্তে হস্তক্ষেপ না করার পরামর্শও দিতেন তাঁরা। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন এই বিভাগের জনবল কমিয়েছে এবং নির্বাচনী দুর্নীতির তদন্তে ফেডারেল প্রসিকিউটরদের ওই বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করার বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়েছে।

এখন তদন্তকারী কর্মকর্তা ও প্রসিকিউটরদের মধ্যে কোনো বিষয়ে মতবিরোধ তৈরি হলে তা ট্রাম্পের রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা নিষ্পত্তি করবেন বলে সংশ্লিষ্ট তিন ব্যক্তি জানিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় মধ্যস্থতা করবে। সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, নির্বাচনী তদন্তে এই কার্যালয়ের সরাসরি ভূমিকা নেওয়ার ঘটনা খুবই বিরল। তবে বিচার বিভাগের মুখপাত্রের দাবি, মাঠপর্যায়ে কোনো বিরোধের সমাধান না হলে তা নিষ্পত্তি করাই ওই কার্যালয়ের দায়িত্ব।

সব মিলিয়ে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের আসন নির্ধারণের লড়াই নয়। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য, নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসনের আগামী দিনের কার্যক্রমও এই নির্বাচনের ফলাফলের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

Bangal Kantha

জনপ্রিয় সংবাদ

কাল যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন, কী অপেক্ষা করছে ট্রাম্পের ভাগ্যে

আপডেট টাইম : এক ঘন্টা আগে

যুক্তরাষ্ট্রে আগামীকাল মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই নির্বাচন দেশটির রাজনৈতিক গতিপথ বদলে দিতে পারে। একই সঙ্গে নির্ধারিত হবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতায় থাকার শেষ দুই বছরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। খবর: রয়টার্স, বিসিসি।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের চার বছর মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় বলে একে মধ্যবর্তী নির্বাচন বলা হয়। এতে প্রেসিডেন্ট নিজে নির্বাচনে অংশ নেন না। তবে এই নির্বাচনকে সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ও তার রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন হিসেবে দেখা হয়।

বর্তমানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি হোয়াইট হাউসের পাশাপাশি কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটরা আবারও কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে চায়। আর রিপাবলিকানদের লক্ষ্য নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখা।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান কংগ্রেসের নতুন সদস্য নির্বাচিত হবেন। প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে এবং ১০০ সদস্যের সিনেটের ৩৫টি আসনে ভোট হবে। এর মধ্যে ফ্লোরিডা ও ওহাইও অঙ্গরাজ্যে দুটি বিশেষ নির্বাচনও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ছেড়ে দেওয়া আসন পূরণে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ ছাড়া ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচিত করবেন ভোটাররা।

প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যরা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধিত্ব করেন। তাদের মেয়াদ দুই বছর। অন্যদিকে সিনেটরদের মেয়াদ ছয় বছর। প্রতি ১০ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের জনশুমারির ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যগুলোর জনসংখ্যা অনুযায়ী প্রতিনিধি পরিষদের আসন বণ্টন করা হয়। সবচেয়ে জনবহুল অঙ্গরাজ্য ক্যালিফোর্নিয়ায় রয়েছে ৫২টি আসন। আর ওয়াইয়োমিং ও ভারমন্টের মতো কম জনসংখ্যার অঙ্গরাজ্যগুলোতে রয়েছে একটি করে আসন।

প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে কোনো দলকে অন্তত ২১৮টি আসন নিশ্চিত করতে হয়। বর্তমানে রিপাবলিকানদের দখলে রয়েছে ২১৮টি আসন। ডেমোক্র্যাটদের রয়েছে ২১৪টি। একজন স্বতন্ত্র সদস্য রিপাবলিকানদের সঙ্গে অবস্থান করছেন। আর দুটি আসন শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে একটি আসন আগে রিপাবলিকান এবং অন্যটি ডেমোক্র্যাট সদস্যের দখলে ছিল। নতুন নির্বাচিত প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যরা ২০২৭ সালের ৩ জানুয়ারি শপথ নেবেন।

এবারের নির্বাচন এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, দেশটি যুদ্ধে জড়িত এবং ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেয়াদের সময়ও কমে আসছে। ফলে নির্বাচনের ফলাফলের ওপর আগামী দুই বছরের আইন প্রণয়ন ও সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান অনেকটাই নির্ভর করবে।

এদিকে নির্বাচন সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কয়েক দশকের প্রচলিত রীতির বাইরে গিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বিচার বিভাগ সরাসরি নির্বাচনী বিরোধে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সাধারণত কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর সুবিধার জন্য আইন প্রয়োগের ক্ষমতা ব্যবহার হচ্ছে—এমন ধারণা তৈরি এড়াতে বিচার বিভাগ নির্বাচনী বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নেয়।

ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রায় ২০ হাজার ভোটারের ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট আলাদা করে রাখার আবেদন করেছিল বিচার বিভাগ। তাদের অভিযোগ, এসব ভোটারের অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক নন এবং আইন অনুযায়ী তাদের ভোট দেওয়ার অধিকার নেই। এ ঘটনায় বিচার বিভাগ একটি ফৌজদারি তদন্তের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট নথিও চেয়েছে। তবে ক্যালিফোর্নিয়া কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অ-নাগরিকদের ভোট দেওয়া ঠেকাতে তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রয়েছে। একই সঙ্গে ব্যালট আটকে দেওয়ার বিষয়ে বিচার বিভাগের আইনগত ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে রাজ্যটি। আদালত বিচার বিভাগের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে।

আলাস্কায়ও একই ধরনের আইনি বিরোধ তৈরি হয়েছে। সেখানে রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সুলিভানের সঙ্গে একই নামের একজন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। বিচার বিভাগের অভিযোগ, ভোটারদের বিভ্রান্ত করতেই এই প্রার্থীকে নির্বাচনে আনা হয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মেরি পেলটোলার প্রচারশিবির অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ড্যানিয়েল জে. সুলিভানকে নির্বাচনে অংশ নিতে উৎসাহিত করার সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে পেলটোলার প্রচারশিবির এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, দুই সুলিভানের কোনো প্রচারশিবিরের সঙ্গেই তাদের সম্পৃক্ততা নেই।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই বিচার বিভাগকে আলাস্কা নিয়ে মামলা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় বলা হয়েছিল, ভোটের ব্যবধান কম হলে ভোটারদের বিভ্রান্তির সম্ভাবনা তদন্ত করতে হবে এবং ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন বা প্রত্যয়ন করা বন্ধ রাখতে হবে। তবে আলাস্কার ফেডারেল বিচারক শ্যারন গ্লিসন রোববার মামলাটি খারিজ করে দেন। তার মতে, ভোটের গোপনীয়তা বজায় রেখে এ ধরনের তদন্ত করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব মূলত অঙ্গরাজ্যগুলোর। বিচার বিভাগ এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে।

সমালোচকদের আশঙ্কা, নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে সন্দেহ তৈরির যেকোনো প্রচেষ্টায় বিচার বিভাগের এই ভূমিকা ব্যবহার করা হতে পারে। এর ফলে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গভর্নর নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

এর আগে ২০২০ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর ট্রাম্প ব্যাপক ভোট জালিয়াতির অভিযোগ করেছিলেন। তবে স্বাধীন গবেষণা ও বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের নিরীক্ষায় ভোট জালিয়াতির ঘটনা বিরল বলে উঠে এসেছে। ওই নির্বাচনের ফল চ্যালেঞ্জ করে ট্রাম্পের সমর্থক বিভিন্ন সংগঠন ৬০টির বেশি মামলা করেছিল। তবে সবগুলোই ব্যর্থ হয়। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে বিচার বিভাগের কর্মকর্তারাও এসব প্রচেষ্টায় বিভাগকে যুক্ত করার চাপ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব অঙ্গরাজ্যগুলোর। তবে ট্রাম্পের অভিযোগ, ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণাধীন অঙ্গরাজ্যগুলো অ-নাগরিকদের ভোট দেওয়া ঠেকাতে যথেষ্ট ব্যবস্থা নিচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, দেশটির নাগরিক নন এমন ব্যক্তিদের ফেডারেল নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই।

ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন বিচার বিভাগের সাবেক কর্মকর্তারাও। আগে নির্বাচনী আইন ও নাগরিক অধিকারসংক্রান্ত হুমকি মোকাবিলায় বিচার বিভাগের নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনাকারী কর্মকর্তাদের নেতৃত্ব দেওয়া মার্ক ব্লুমবার্গ বলেছেন, প্রশাসন বিচার বিভাগকে এমনভাবে ব্যবহার করতে চাইছে, যা আগে নিষিদ্ধ ছিল। তার মতে, বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা জরুরি।

রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সময় ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করা পিটার কেইসলারও বলেছেন, রাজনৈতিক বিরোধে বিচার বিভাগের পক্ষ নেওয়ার ধারণা তৈরি হলে আইন প্রয়োগের সিদ্ধান্তের ওপর মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তবে অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ দাবি করেছেন, বিচার বিভাগের পদক্ষেপ আইনসম্মত এবং ভোটের স্বচ্ছতা রক্ষার উদ্দেশ্যেই নেওয়া হয়েছে। বিভাগের মুখপাত্র কিয়েরস্টেন পেলস বলেছেন, কোনো নির্বাচনী প্রচারশিবিরকে সহায়তা করা হচ্ছে না; বরং আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে।

বিচার বিভাগের নির্বাচনী তদন্তের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এনেছে ট্রাম্প প্রশাসন। আগে নির্বাচনী আইন নিয়ে কাজ করা অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত পাবলিক ইন্টিগ্রিটি বিভাগের পরামর্শ নেওয়া হতো। নির্বাচনের ফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যয়নের আগে তদন্তে হস্তক্ষেপ না করার পরামর্শও দিতেন তাঁরা। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন এই বিভাগের জনবল কমিয়েছে এবং নির্বাচনী দুর্নীতির তদন্তে ফেডারেল প্রসিকিউটরদের ওই বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করার বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়েছে।

এখন তদন্তকারী কর্মকর্তা ও প্রসিকিউটরদের মধ্যে কোনো বিষয়ে মতবিরোধ তৈরি হলে তা ট্রাম্পের রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা নিষ্পত্তি করবেন বলে সংশ্লিষ্ট তিন ব্যক্তি জানিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় মধ্যস্থতা করবে। সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, নির্বাচনী তদন্তে এই কার্যালয়ের সরাসরি ভূমিকা নেওয়ার ঘটনা খুবই বিরল। তবে বিচার বিভাগের মুখপাত্রের দাবি, মাঠপর্যায়ে কোনো বিরোধের সমাধান না হলে তা নিষ্পত্তি করাই ওই কার্যালয়ের দায়িত্ব।

সব মিলিয়ে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের আসন নির্ধারণের লড়াই নয়। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য, নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসনের আগামী দিনের কার্যক্রমও এই নির্বাচনের ফলাফলের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।